বিশ্বজুড়ে মে দিবস : দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছে শ্রমিকরা

আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বৃদ্ধি, পেনশন সুরক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং নানা রাজনৈতিক ইস্যুতে সংহতি প্রকাশে রাজপথে নেমেছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ, আমেরিকা—সবখানেই বিক্ষোভ, সমাবেশ ও পদযাত্রার কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, তুরস্কের ইস্তাম্বুলসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ রাজধানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বড় আকারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের মে দিবসে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ও দাবির মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
ইউরোপের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন ইউরোপিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন জানিয়েছে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাতের দায় শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপানো চলবে না। তাদের মতে, কর্মজীবী মানুষ আর নীরব থাকবে না; তারা নিজেদের চাকরি, অধিকার এবং জীবনমান রক্ষায় সরব হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবারের মে দিবসের আন্দোলনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ে শ্রমজীবী মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বড় শ্রমিক সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। দেশটির শ্রমিক নেতারা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে মজুরি বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। একইসঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে শ্রমিকরা টিকে থাকার লড়াই করছে।
পাকিস্তানে সরকারি ছুটি হলেও বহু দিনমজুরের পক্ষে কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। দৈনন্দিন আয় নির্ভরশীল শ্রমিকদের জন্য মে দিবসও হয়ে উঠেছে সংগ্রামের আরেকটি দিন। দেশটিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি—প্রায় ১৬ শতাংশ—এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিজ্ঞাপন
ইউরোপজুড়ে মে দিবসকে ঘিরে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফ্রান্সে ‘রুটি, শান্তি ও স্বাধীনতা’ স্লোগানে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে মে দিবস উপলক্ষে শ্রম আইন সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কও চলছে, যেখানে কিছু খাতে কাজের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
ইতালিতে সরকার কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রায় এক বিলিয়ন ইউরোর প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থানে উৎসাহ দেওয়া। তবে বিরোধীরা এটিকে কার্যকর নয় বলে সমালোচনা করেছে।
পর্তুগালে শ্রম আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন ও মালিকপক্ষের আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি। শ্রমিকদের অভিযোগ, নতুন প্রস্তাব তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবস সরকারি ছুটি না হলেও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ‘মে ডে স্ট্রং’ জোটের ব্যানারে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করছে। ‘শ্রমিক বনাম বিলিওনেয়ার’ স্লোগানে তারা রাস্তায় নেমেছে।
অভিবাসন নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে হাজারো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠকরা ‘নো স্কুল, নো ওয়ার্ক, নো শপিং’ কর্মসূচির মাধ্যমে এক ধরনের অর্থনৈতিক ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক অধিকার ও অভিবাসী ইস্যু একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০০৬ সালে অভিবাসন আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল, যা এখনও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মে দিবসের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ১৮৮০-এর দশকে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেট এলাকায় এক সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের গুলিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার পর কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের স্মরণেই ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও শিকাগোর সেই ঐতিহাসিক স্থানে শ্রমিকদের প্রতি উৎসর্গীকৃত স্মৃতিচিহ্ন এই আন্দোলনের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।








