হঠাৎ পুরো ইউরোপকে ৭২ ঘণ্টার খাবার-পানি-ওষুধ মজুতের নির্দেশ!

ইউরোপের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধসহ জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি এমনভাবে ছড়ানো হচ্ছে, যেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ২১ সেপ্টেম্বর নতুন করে সব নাগরিককে তিন দিনের খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়েছে। তবে ইইউর সরকারি নথিতে এমন কোনো নতুন বাধ্যতামূলক নির্দেশের তথ্য নেই।
বিজ্ঞাপন
বরং ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার লক্ষ্যটি ইইউর ‘Preparedness Union Strategy’-এর অংশ। ইউরোপীয় কমিশন ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ এ কৌশল গ্রহণ করে। এতে বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলায় নাগরিক পর্যায়ে প্রস্তুতি বাড়ানো এবং অন্তত ৭২ ঘণ্টার মৌলিক স্বনির্ভরতার জন্য নির্দেশিকা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
কেন ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি?
বড় ধরনের দুর্যোগ বা সংকটের সময় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সময়ে জরুরি সেবা ও উদ্ধারকারী দলকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। তাই সংকটের প্রথম কয়েক দিন পরিবারগুলো যেন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন সামলাতে পারে, সে বিষয়ে প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
এই প্রস্তুতি শুধু সামরিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে নয়। ইউরোপীয় কমিশনের কৌশলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চরম আবহাওয়া, স্বাস্থ্যসংকট, সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কমিশনের কৌশলটি ‘all-hazards’ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
বিজ্ঞাপন
ফ্রান্সে কী বলা হয়েছে
ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। জরুরি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পানি, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার, নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, টর্চ, ব্যাটারি, যোগাযোগের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রস্তুত রাখার মতো বিষয় বিভিন্ন জাতীয় উদ্যোগে গুরুত্ব পেয়েছে।
ফলে ফ্রান্সে ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো নতুন গুজব নয়; এটি নাগরিক জরুরি প্রস্তুতির বৃহত্তর কাঠামোর অংশ।
বিজ্ঞাপন
ইউরোপে এখন বিষয়টি বেশি আলোচনায় কেন
৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভরতার ধারণাটি ২০২৫ সালের ইইউ কৌশলের আগে থেকেই ইউরোপীয় প্রস্তুতি আলোচনায় ছিল। ২০২৪ সালের নিনিস্তো প্রতিবেদনে সংকটের সময় অন্তত ৭২ ঘণ্টা মৌলিক সেবা ছাড়া নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হওয়ার জন্য ইউরোপীয় নাগরিকদের প্রস্তুত করার সুপারিশ করা হয়।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মতো বিষয়গুলো ইউরোপের সামগ্রিক সংকট-প্রস্তুতিকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনও বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের প্রস্তুতি জোরদারের কথা বলছে।
বিজ্ঞাপন
শুধু ফ্রান্স নয়
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে উৎসাহিত করছে। এর লক্ষ্য হলো কোনো বড় সংকটের শুরুতে সরকারি জরুরি সেবা সবার কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে না পারলেও পরিবারগুলো যেন কিছু সময় নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ইইউর প্রস্তুতি কৌশলেও নাগরিক সচেতনতা, আগাম সতর্কতা এবং ন্যূনতম ৭২ ঘণ্টার স্বনির্ভরতার জন্য নির্দেশিকা তৈরির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি সদস্যদেশগুলোর জন্য একটি সমন্বিত প্রস্তুতি কাঠামো; সব নাগরিকের জন্য একই ধরনের বাধ্যতামূলক খাদ্য বা ওষুধ মজুতের আইন নয়।
তাহলে কি ইউরোপ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
বিজ্ঞাপন
৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতিকে শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। ইইউর নীতিতে একাধিক ধরনের দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে বেসামরিক ও সামরিক প্রস্তুতির গুরুত্ব যে বেড়েছে, সেটিও ইউরোপীয় কমিশনের নথিতে স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘ইউরোপজুড়ে নতুন করে ৭২ ঘণ্টার খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ’—এমন দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে ৭২ ঘণ্টার স্বনির্ভরতার লক্ষ্যটি ২০২৫ সালের ইইউ Preparedness Union Strategy-এর অংশ। এর উদ্দেশ্য আতঙ্ক তৈরি করা নয়, বরং বড় কোনো সংকটের শুরুতে নাগরিক ও পরিবারগুলোর মৌলিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।








