Logo

‘কিডনি বিক্রি করলেও কিছু হবে না আবার গজাবে’, দালালের আশ্বাস

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৩৮
‘কিডনি বিক্রি করলেও কিছু হবে না আবার গজাবে’, দালালের আশ্বাস
ছবি: সংগৃহীত

দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে নেপালের একটি গ্রামের অসংখ্য মানুষকে কিডনি বিক্রির ফাঁদে ফেলেছিল দালালচক্র। নানা প্রলোভন ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দরিদ্র মানুষকে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো হতো। এমনকি অনেককে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, একটি কিডনি বিক্রি করলেও স্বাভাবিক জীবনযাপনে কোনো সমস্যা হবে না। কেউ কেউ আবার এমন ভয়াবহ মিথ্যার শিকার হন যে, শরীর থেকে একটি কিডনি বের করে ফেললেও সেটি পরে আবার গজিয়ে উঠবে!

বিজ্ঞাপন

কিডনি বিক্রির দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে নেপালের হোকসে গ্রাম একসময় ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো ব্যক্তি কিডনি বিক্রি করেছেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

এই গ্রামের বাসিন্দা কাঞ্চা ও রামও আর্থিক সংকটের কারণে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন কাঞ্চা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যথায় ভোগার কারণে এখন আগের মতো কাজও করতে পারেন না তিনি।

কাঞ্চার ভাষ্য, ঠিক কত মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন, তার সঠিক হিসাব করা কঠিন। শুধু হোকসে নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও দালালদের প্রলোভনে পড়ে কিডনি বিক্রি করেছেন।

বিজ্ঞাপন

কিডনি বিক্রি অবৈধ হলেও বছরের পর বছর হোকসে ও এর আশপাশের এলাকায় সক্রিয় ছিল পাচারকারী দালালচক্র। দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসহায় মানুষকে লক্ষ্য করে তাদের সামনে নানা ধরনের প্রলোভন তুলে ধরা হতো। বলা হতো, একটি কিডনি ছাড়াও মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাপন করতে পারে। আবার অনেককে আরও ভয়াবহ মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলা হতো, কিডনি শরীরে পুনরায় তৈরি হয়ে যাবে।

দালালদের এসব প্রতারণায় কিডনি বিক্রি করা অনেক মানুষ পরবর্তী সময়ে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। অস্ত্রোপচারের জটিলতায় কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে পরিচিতির বদনাম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন হোকসের বাসিন্দারা। কিন্তু দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকট এখনো নেপালে কিডনি পাচারের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের এপ্রিলে স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে নেপালে কিডনি বিক্রির ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে কাজের আশায় থাকা দরিদ্র নেপালিদের একটি অংশ কিডনি বিক্রির মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কঠিন পরিবেশে কাজ করা কিছু নেপালি শ্রমিক দেশে ফেরার পর কিডনি বিকল অবস্থায় পড়ছেন। তীব্র গরম, পানিশূন্যতা ও কঠোর কর্মপরিবেশ এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বলে কয়েকজন বিজ্ঞানী উল্লেখ করেছেন।

আরও পড়ুন

•

বিজ্ঞাপন

•

•

এর মধ্যেই নেপাল-ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে নতুন করে কিডনি পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইএসএলএএমের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসহায় নেপালিদের ভারতে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। হোটেলে ভালো বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে সীমান্ত পার করার পর তাদের আটকে রেখে কিডনি অপসারণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সিন্ধুলির এক ব্যক্তি এমনই একটি চক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন। চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাকে ভারতে নেওয়ার পর প্রায় এক মাস একটি অ্যাপার্টমেন্টে আটকে রাখা হয়। পরে তার কিডনি অপসারণ করা হবে বলে জানানো হলে তিনি এতে রাজি হননি।

অভিযোগ রয়েছে, এরপর তাকে জোর করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অচেতন করে তার বাম কিডনি অপসারণ করা হয়। এর বিনিময়ে তাকে ৬ লাখ নেপালি রুপি দেওয়ার কথা থাকলেও দেশে ফেরার সময় হাতে দেওয়া হয় মাত্র ১০ হাজার রুপি।

বিজ্ঞাপন

দেশে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে পুরো ঘটনা জানান ওই ব্যক্তি। পরে তিনি নেপালের অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোতে অভিযোগ করেন।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিদেশে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষকে অঙ্গ পাচারচক্রের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

ফলে নেপালে একদিকে বহু পুরোনো ‘কিডনি ভ্যালি’র ক্ষত এখনো রয়ে গেছে, অন্যদিকে নতুন কৌশলে আবারও সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিডনি পাচারচক্রের বিরুদ্ধে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই এসব চক্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD