এবার চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বানাতে প্রতিযোগিতা ৩ দেশের

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন ও ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানকে সামনে রেখে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। দেশগুলোর পরিকল্পনায় চাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান এবং দূরবর্তী মহাকাশ অভিযানে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে নাসার ঠিকাদারদের এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে, যা মহাকাশযাত্রা সহ্য করতে পারবে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই পরিচালিত হতে পারবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুল্লিটি উৎক্ষেপণের উপযোগী করার লক্ষ্য রয়েছে নাসার।
অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে গোপনীয় অংশীদারত্বের আওতায় ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘সেলেনা’ নামে একটি চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে রাশিয়া। চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত চন্দ্রঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লির প্রয়োজন কেন
বিজ্ঞাপন
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ। চাঁদের দিনে সৌর প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও সেখানকার রাত পৃথিবীর হিসাবে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়। ফলে কেবল সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চালানো কঠিন।
পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলো ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং মানুষের সীমিত হস্তক্ষেপে দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা রাখে। প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সৌরশক্তি এবং রেডিওআইসোটোপ ব্যবস্থা ব্যবহার করে যন্ত্রপাতি সচল ও উষ্ণ রাখার পরিকল্পনা করছে। তবে বড় আকারের চন্দ্রঘাঁটি গড়ে তুলতে আরও বেশি শক্তির প্রয়োজন হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাসার প্রস্তাবিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ চুল্লি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে। মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পাঁচ বছর কাজ করার উপযোগী করে এটি নকশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ‘সেলেনা’ চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা হবে সর্বোচ্চ ১০ কিলোওয়াট এবং এটি এক দশক স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের এই প্রতিযোগিতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। দ্রুত চুল্লি নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নিলে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উৎক্ষেপণের সময় রকেট ব্যর্থ হলে চুল্লি দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত কঠিন হবে। পৃথিবীর মতো বড় সুরক্ষা কাঠামো সেখানে তৈরি করাও সহজ নয়। তাই নভোচারী ও যন্ত্রপাতিকে বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে চুল্লির আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রিত বা সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—দুই দেশই তাদের পারমাণবিক চুল্লি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এতে পরিবহনের সময় কিছু ঝুঁকি কমতে পারে। তবে নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও দুর্ঘটনার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
চাঁদের মালিকানা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতা চন্দ্রপৃষ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে পারে না। তবে কোনো দেশ সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করলে তার আশপাশে অন্যদের প্রবেশ সীমিত করতে পারবে কি না এবং চাঁদ থেকে উত্তোলন করা সম্পদের মালিকানা কার হবে—এসব প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে কোনো পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করলে নিরাপত্তার কারণে তার চারপাশে সীমিত প্রবেশাধিকার এলাকা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ কারণে নাসা তাদের পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাকাশ আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিরাপত্তার কারণে এমন কোনো এলাকা তৈরি করা হলে তা ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’-তে থাকা মহাকাশে অবাধ প্রবেশাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না।
বিজ্ঞাপন
তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—কোনো দেশই এখন পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি যে তাদের প্রস্তাবিত পারমাণবিক চুল্লি সফলভাবে চাঁদে স্থাপন ও পরিচালনা করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের কারণে নির্ধারিত সময়সূচিও পরিবর্তিত হতে পারে।








