ভালো ঘুম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে ম্যাগনেসিয়াম কতটা কার্যকর?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই নানা ধরনের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ চোখে পড়ে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট। অনেক ইনফ্লুয়েন্সার দাবি করেন, রাতে ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করলে দ্রুত ভালো ঘুম আসে, এমনকি সহজেই ওজনও কমতে শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
সব দাবিকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্টের নানা আকর্ষণীয় প্রচারণাও দেখা যায়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বাস্তবতা এতটা সহজ নয়।
ম্যাগনেসিয়াম কি সত্যিই ভালো ঘুম আনতে সাহায্য করে?
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাগনেসিয়াম শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখলেও এটি অনিদ্রার তাৎক্ষণিক সমাধান নয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মিশিগান ইউনিভার্সিটির স্লিপ মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ও নিউরোলজির ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ডা. অনিতা শেলগিকার জানান, ম্যাগনেসিয়াম খাওয়ার পর এক রাতেই অনিদ্রা দূর হয়ে যাবে—এমন দাবির পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিজ্ঞাপন
তবে এই খনিজটি শরীরে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন উৎপাদনে সহায়তা করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে কিছুটা শিথিল রাখতে সাহায্য করে বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ সামান্থা ক্যাসেটি।
সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে দেখা গেছে, ম্যাগনেসিয়াম কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমিয়ে পড়ার সময় সামান্য কমাতে পারে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার কার্যকর চিকিৎসা নয়। এ কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়নও ঘুমের মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ম্যাগনেসিয়ামের সরাসরি স্বাস্থ্যগত দাবি অনুমোদন দেয়নি।
ওজন কমাতে কতটা ভূমিকা রাখে?
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাগনেসিয়াম কোনোভাবেই চর্বি গলানোর ওষুধ বা ‘ফ্যাট বার্নার’ নয়। তবে এটি শরীরের কিছু বিপাকীয় প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাগনেসিয়াম রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। শরীরে এই খনিজের ঘাটতি হলে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং মানসিক চাপের হরমোন কর্টিসল বেড়ে যায়। এর ফলে মিষ্টি ও ফাস্টফুডের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, ম্যাগনেসিয়াম সরাসরি ওজন কমায় না; বরং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রেখে ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
বিজ্ঞাপন
ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির লক্ষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব দেখা দিলে কয়েকটি সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
রাতে পায়ের পেশিতে বারবার টান ধরা বা ক্র্যাম্প হওয়া।
বিজ্ঞাপন
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা।
অনিদ্রা বা গভীর ঘুমে সমস্যা হওয়া।
মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা খিটখিটে মেজাজ বেড়ে যাওয়া।
বিজ্ঞাপন
কোষ্ঠকাঠিন্য বা হজমের সমস্যা।
হৃদস্পন্দনের অনিয়ম বা বুক ধড়ফড় করা।
দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে হাড় দুর্বল হয়ে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া।
বিজ্ঞাপন
প্রাকৃতিকভাবে ম্যাগনেসিয়াম পাওয়ার উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৩১০ থেকে ৪২০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুষম খাদ্য থেকেই এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
ম্যাগনেসিয়ামের ভালো প্রাকৃতিক উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বিজ্ঞাপন
চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও বিশেষ করে কুমড়ার বীজ।
পালং, পুঁইসহ গাঢ় সবুজ শাকসবজি।
লাল চাল, ওটস, গম ও অন্যান্য গোটা শস্য।
কলা, কালো শিম, ছোলা ও মসুর ডাল।
৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকোসমৃদ্ধ ডার্ক চকোলেট।
সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে পাওয়া ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
চিকিৎসকদের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন ৩৫০ মিলিগ্রামের বেশি ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নিজের সিদ্ধান্তে গ্রহণ করলে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, পেটব্যথা এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ভালো ঘুম বা ওজন কমানোর জন্য শুধুমাত্র একটি খনিজের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বাদাম, শাকসবজি, ডাল, ফলমূল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত।
এর পাশাপাশি ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ঘুমানোর আগে স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনলে ঘুমের মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।
সূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত।








