Logo

প্রিয় দলের হারেই কেন ভেঙে পড়ে মন?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১১ জুলাই, ২০২৬, ১৫:৫২
প্রিয় দলের হারেই কেন ভেঙে পড়ে মন?
ছবি: সংগৃহীত

খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা বা বিনোদনের বিষয় নয়, অনেকের কাছে এটি গভীর আবেগেরও নাম। বিশ্বকাপ, ইউরো, কোপা আমেরিকা কিংবা আইপিএলের মতো বড় আসর এলেই বাংলাদেশের অসংখ্য ক্রীড়াপ্রেমী আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ভারতের মতো বিদেশি দলকে নিজেদের দলের মতো করেই সমর্থন করেন।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর অসংখ্য সমর্থককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভৌগোলিক বা ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও অন্য দেশের একটি দলের পরাজয়ে কেন এতটা মন খারাপ হয়? আবার পরিচিত কারও প্রিয় দল হারলেই কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল বা উপহাসের ঢল নামে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধুই আবেগ নয়; এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্ক ও মনস্তত্ত্বের নানা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

মিরর নিউরনের প্রভাব

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্কে ‘মিরর নিউরন’ নামে বিশেষ ধরনের কোষ রয়েছে। প্রিয় কোনো খেলোয়াড়—যেমন লিওনেল মেসি বা নেইমার—মাঠে হতাশ বা কান্নায় ভেঙে পড়লে সমর্থকদের মস্তিষ্কের এই কোষগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এর ফলে খেলোয়াড়ের কষ্ট ও হতাশা সমর্থকের মনেও প্রতিফলিত হয়। তখন দলের পরাজয় যেন নিজের ব্যক্তিগত হার বলেই মনে হয়।

সামাজিক পরিচয়ের প্রভাব

১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি’ নামে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তার গবেষণায় উঠে আসে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী বা দলের সঙ্গে নিজের পরিচয় যুক্ত করতে চায়। এতে তার আত্মপরিচয় আরও দৃঢ় হয়।

বিজ্ঞাপন

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি সমর্থক যখন নিজেকে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থক হিসেবে ভাবেন, তখন সেই দলের জয়কে নিজের সাফল্য এবং হারকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেন।

বার্গিং ও করফিং তত্ত্ব

স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট রবার্ট সিয়ালদিনি ও তার গবেষক দল ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পরিচালিত গবেষণায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ধারণা তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

বাস্কিং ইন রিফলেকটেড গ্লোরি (বার্গিং): প্রিয় দল জিতলে সমর্থকেরা নিজেরাও বিজয়ী হওয়ার অনুভূতি পান এবং গর্ব প্রকাশ করেন। তাই অনেকেই বলেন, ‘আমরা জিতে গেছি।’

কাটিং অফ রিফলেকটেড ফেইলর (করফিং): প্রিয় দল হারলে সমর্থকেরা হতাশা, লজ্জা ও সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়ার অনুভূতিতে ভোগেন। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের ট্রল বা উপহাস সেই মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

খেলার পরাজয় থেকে সৃষ্ট অতিরিক্ত মানসিক কষ্টকে মনোবিজ্ঞানে অনেক সময় ‘স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন’ বলা হয়। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস সাইকোলজির অধ্যাপক ডা. ড্যানিয়েল ওয়ান তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, খেলা শুরু থেকেই নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে এটি কেবল বিনোদনের একটি অংশ। বাস্তব জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতা এর ওপর নির্ভর করে না। তাই ব্যক্তিগত জীবন ও খেলার ফলাফলের মধ্যে মানসিক দূরত্ব রাখা জরুরি।

২৪ ঘণ্টার বেশি হতাশা নয়: সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. কেইটি গ্লেনের পরামর্শ, প্রিয় দলের পরাজয়ে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা মন খারাপ করা স্বাভাবিক। তবে এরপর আবার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসা উচিত। দীর্ঘ সময় ধরে হতাশা ধরে রাখা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল ডিটক্স করুন: বিশেষজ্ঞদের মতে, দল হারার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটালে প্রতিপক্ষের ট্রল, মিম ও কটূক্তি মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই কিছু সময়ের জন্য ফেসবুক, এক্সসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে বিরতি নেওয়া উপকারী।

সহসমর্থকদের সঙ্গে কথা বলুন: একা কষ্ট না পুষে রেখে একই দলের অন্য সমর্থকদের সঙ্গে আলোচনা করলে মন অনেকটাই হালকা হয়। মনোবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে ‘ক্যাথারসিস’ বা মানসিক রেচন বলা হয়।

শরীরচর্চায় মন দিন: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, খেলা শেষে মন খারাপ থাকলে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো বা শরীরচর্চা করা ভালো। এতে শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়ে, যা মানসিক চাপ কমিয়ে ইতিবাচক অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, মনোবিজ্ঞানবিষয়ক প্রকাশনা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত।

জেবি/এইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD