বারবার মনে হচ্ছে ভালোবাসা কমে গেছে? বাস্তবতা নাকি মনের ভুল

ভালোবাসার সম্পর্কে সামান্য মান-অভিমান, অভিমান কিংবা সঙ্গীর অনুভূতি নিয়ে মাঝেমধ্যে দ্বিধা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক মানবিক বিষয়। কিন্তু এই সংশয় যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মনের মধ্যে নিয়মিত অস্থিরতা তৈরি করে এবং স্বাভাবিক চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে সঙ্গীর প্রতি নিজের অনুভূতি কিংবা সঙ্গী সত্যিই ভালোবাসেন কি না—এ বিষয়টি নিয়ে বারবার নিশ্চিত হতে চাওয়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজের আবেগ ও অনুভূতি নিয়েই দ্বন্দ্বে ভোগেন। তাদের মনে বারবার প্রশ্ন আসতে পারে—‘আমি কি সত্যিই তাকে ভালোবাসি?’, ‘আমি কি ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি?’ কিংবা ‘আমার অনুভূতি কি আগের মতোই আছে?’ কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরও যদি কিছুদিন পর একই ধরনের সংশয় আবার ফিরে আসে, তাহলে তা নেতিবাচক চিন্তার একটি পুনরাবৃত্ত চক্রে পরিণত হতে পারে।
এ অবস্থায় অনেকেই নিজের অনুভূতিকে বারবার পরীক্ষা করতে শুরু করেন। সঙ্গীর কাছে থাকলে আগের মতো আনন্দ বা রোমাঞ্চ অনুভূত হচ্ছে কি না, পুরোনো ছবি দেখলে আগের মতো আবেগ তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় দিয়ে নিজের ভালোবাসার গভীরতা যাচাই করার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার অন্য দম্পতিদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা করেন। কিন্তু এসব করার পর সাময়িকভাবে স্বস্তি মিললেও পরে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। ফলে সংশয়ের পরিধি আরও বাড়তে থাকে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া ভুক্তভোগীরা সঙ্গীর আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ আচরণ নিয়েও অতিরিক্ত সতর্ক ও শঙ্কিত থাকেন। সঙ্গীর সামান্য নীরবতা, খুদে বার্তার দেরিতে উত্তর দেওয়া বা প্রশংসায় ঘাটতি দেখলেই তারা ধরে নেন ভালোবাসা হয়তো কমে গেছে। মনের ভেতরের এই অস্বস্তি কাটাতে অনেকে সঙ্গীর কাছ থেকে বারবার নিশ্চয়তা চান অথবা বন্ধুমহলে একই সম্পর্কের গল্প বলে মতামত খোঁজেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে এসব তৎপরতা মনকে কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা কোনো সুফল বয়ে আনে না; বরং সম্পর্কের স্বাভাবিক সাবলীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিজ্ঞাপন
সংশয়ের এই মাত্রাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্ল্যাটফর্মগুলোতে অন্যান্য যুগলদের আনন্দঘন মুহূর্তের প্রদর্শনী দেখে অনেকেই বাস্তব সম্পর্কের তুলনা শুরু করেন, যা অযাচিত হীনম্মন্যতা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। তবে ডা. সানজিদা শাহরিয়া স্পষ্ট করেছেন যে সব দ্বিধাই কাল্পনিক নয়। যদি সম্পর্কে স্পষ্ট প্রতারণা, নিয়মিত মিথ্যাচার, অসম্মান বা দায়িত্বহীনতার মতো সুনির্দিষ্ট কারণ বিদ্যমান থাকে, তবে সেটি যৌক্তিক সমস্যা। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়া কেবল কাল্পনিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সারাক্ষণ সম্পর্কের স্থায়িত্ব যাচাই করার প্রবণতা মানসিক সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
এই নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রতিটি সন্দেহের তাৎক্ষণিক উত্তর খোঁজার অভ্যাস কমাতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাথায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা আসা মানেই সেটি বাস্তব সত্য নয়। কোনো অনুভূতি সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হওয়া বা কোনো দিন সঙ্গীর প্রতি আগের মতো আবেগ অনুভূত না হওয়াও সবসময় ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়।
একইভাবে বারবার সঙ্গীর কাছে নিশ্চয়তা চাওয়া, নিজের অনুভূতি পরীক্ষা করা এবং অন্য দম্পতিদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমানো জরুরি। সম্পর্কের প্রতিটি মুহূর্তে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা না করে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি সবসময় নিখুঁত নিশ্চয়তার ওপর তৈরি হয় না। বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান, খোলামেলা যোগাযোগ, দায়িত্ববোধ এবং কিছুটা অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতাই সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। তাই অকারণ সন্দেহকে বারবার যাচাই না করে নিজের চিন্তার ধরন বুঝতে চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়াই হতে পারে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার কার্যকর পথ।








