বর্তমানে নেই স্পিকার, নির্বাচিত সাংসদদের কে পড়াবেন শপথ?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন আর মাত্র ছয় দিনের অপেক্ষা। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে নতুন নির্বাচিত সাংসদদের শপথ গ্রহণ এবং সংসদ গঠন প্রক্রিয়া। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে। বর্তমানে স্পিকার পদটি শূন্য থাকা অবস্থায় নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কার হাত থেকে শপথ নেবেন?
বিজ্ঞাপন
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ দেওয়ার দায়িত্ব মূলত স্পিকারের। তবে স্পিকার পদ শূন্য থাকলে এটি নিজস্বভাবে করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে, সংবিধান ও সংসদের নিয়ম অনুযায়ী সবচেয়ে বড় ডেপুটি স্পিকার এই দায়িত্ব সামলাতে পারেন।
বিদায়ি সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করলেও তিনি নতুন সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াতে সক্ষম। সংবিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে কোনো বাধা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার বিরুদ্ধে মাত্র একটি মামলা রয়েছে, সেক্ষেত্রে আদালতে জামিন হলে এবং সরকার চাইলে তিনি যথাসময়ে প্রকাশ্যে এসে শপথ পড়াতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানাচ্ছেন, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সংবিধান এবং জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াতে পারবেন। জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫(১) দফায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির শপথ পড়ানোর সুযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
সরকার চাইলে কারাগারে থাকা ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুও শপথ পড়াতে পারবেন। এজন্য তাকে যদি জামিন না দেওয়া হয়, তবে সরকার তাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে শপথ পড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারবে। তবে শেষ পর্যন্ত কে শপথ পড়াবেন, তা নির্ধারণে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। ইতিমধ্যে সংসদ সচিবালয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে বিকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও শপথ পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, তবে এর জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশ প্রয়োজন। এর ফলে নতুন সংসদে শপথ গ্রহণের প্রক্রিয়া সুস্পষ্ট এবং বিতর্কমুক্তভাবে সম্পন্ন হবে।
বিজ্ঞাপন
ড. শাহদীন মালিক, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, বিদায়ি সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি বা অপারগতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারেন। তবে এতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন আবশ্যক। সংসদ সচিবালয় এই প্রক্রিয়া যথাযথ আইনি নিয়ম অনুসরণ করে সম্পন্ন করবে।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পতিত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সরকারের অধীনে ১৭ মাস পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিযোগিতা করছে।
বিজ্ঞাপন
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে বিদায়ি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াবেন। যদি তারা শপথ পড়াতে না পারেন, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনও বিদায়ি স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি না থাকলে ডেপুটি স্পিকার বা রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সভাপতিত্ব করবেন।
নতুন সংসদে শপথ গ্রহণের পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন এবং সংসদ অধিবেশন মুলতবি রাখার পর প্রয়োজনীয় কমিটি গঠন, হুইপ ও অন্যান্য পদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। বছরের প্রথম অধিবেশন হওয়ায় এটি সাধারণত দীর্ঘ হয়।
বিদায়ী সংসদের স্পিকার পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবন্দি থাকার কারণে শপথ গ্রহণের দায়িত্ব নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। তবে সংবিধান এবং কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী শিরীন শারমিন চৌধুরী বা ডেপুটি স্পিকার থাকলেই নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের কোনো আইনি বাধা নেই।
বিজ্ঞাপন
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন। পরবর্তীতে ওই সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা ও আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর একটি অধ্যাদেশ জারি করে সরকার।
অধ্যাদেশের চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, সংসদ সচিবালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য দায়িত্ব (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৪ অনুযায়ী সংসদ কার্য-সংক্রান্ত দায়িত্ব ব্যতীত) সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা পালন ও প্রয়োগ করতে পারবেন। এই অধ্যাদেশের আলোকে একটি কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সদস্যদের মধ্যে আছেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং অর্থ বিভাগের সচিব। কমিশন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন।








