গুম কমলেও বাড়ছে গণগ্রেপ্তার ও জামিন না দেওয়ার প্রবণতা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে গুম, ভয়ভীতি ও দমন–পীড়নের যে পরিস্থিতি ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার কিছুটা পরিবর্তন এলেও গণগ্রেপ্তার, মব সহিংসতা এবং নিয়মিত জামিন না দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ঘোষিত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত বহু মানুষকে নির্বিচারে আটকের অভিযোগও তুলেছে তারা।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি)। এতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলেও সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এইচআরডব্লিউ জানায়, গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে থাকা বিভিন্ন সহিংস গোষ্ঠীর তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নারী অধিকার ও এলজিবিটিবিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর কথাও এতে উল্লেখ আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।
এইচআরডব্লিউ বলছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের যে সংস্কৃতি আগে ছিল, তা এখনো দেখা যাচ্ছে। অনেক মামলায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করার প্রবণতাও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দী। বিচার না হয়েই আটকে থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে অভিনেতা, আইনজীবী, সংগীতশিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মীও আছেন।
গত বছর শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আরও বহু মানুষ আটক হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এক রাজনৈতিক সমাবেশের পর সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় কয়েক শ আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করা হয়। একই ঘটনায় ৮ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের হয়, যাদের অধিকাংশই অজ্ঞাতনামা। যদিও সরকার গণগ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন; এর মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত ও ৮১ জন নিহত হয়েছেন।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী ব্যবহার করে গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগকে সাময়িক নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে দলটির সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা ও অনলাইন কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ হয়। ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর বহু হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মী বা সহিংস জনতার হাতে সংঘটিত হয়েছে। ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ অভিযোগে লেখক ও সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি কার্যক্রম নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এইচআরডব্লিউর মতে, সাইবার নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক সীমাবদ্ধতা আরোপের সুযোগ রাখছে। মার্চে আইনের ৯টি ধারা বাতিল হলেও বাকি কিছু বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।
বিজ্ঞাপন
তবে দায়ীদের জবাবদিহির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত বলে এইচআরডব্লিউ মন্তব্য করেছে। জুলাই মাসে পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, এ সংক্রান্ত ঘটনায় মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রতিবেদন আরও উল্লেখ করে, অতীতের অপরাধ বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ব্যবহার করা হলেও এর বিচারিক মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিছু আইনি সংস্কার হলেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ও রাজনৈতিক সংগঠন বিলুপ্তির ক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সংস্থাটির মত।
দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, পুলিশ, শ্রম ও নারী অধিকার খাতে সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন করলেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে দৃশ্যমান অগ্রগতি কম।
বিজ্ঞাপন
‘জুলাই ঘোষণা’ ও ‘জুলাই সনদ’ প্রকাশিত হলেও সংস্কার বাস্তবায়নে গতি কম বলে মন্তব্য করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশ এবং বৈদেশিক সহায়তা হ্রাসের কারণে মানবিক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।








