শুধু সাংবাদিক নয়, কেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে যেতে পারবে না ম্যাজিস্ট্রেটরাও

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের চারশ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া কেউই মোবাইল ফোন বহন করতে পারবেন না। এই তালিকায় নেই দায়িত্বরত সাংবাদিক, নির্বাচন পর্যবেক্ষক এমনকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও।
বিজ্ঞাপন
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এতে বলা হয়েছে, ভোটের দিন কেন্দ্রের আশপাশে মোবাইল ফোন বহন বা ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকবে এবং নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসির আদেশ অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কেবল তিন শ্রেণির ব্যক্তি মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখতে পারবেন। তারা হলেন—ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার, কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ইনচার্জ এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী দুইজন আনসার সদস্য। এই তালিকার বাইরে থাকা কেউ, তা সে সাংবাদিক, প্রার্থী, পর্যবেক্ষক বা ম্যাজিস্ট্রেটই হোন না কেন, মোবাইল ফোন নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ৩৭ ভোটকেন্দ্র: ডিএমপি
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখা জানিয়েছে, ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্র থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ছবি, ভিডিও বা তথ্য বাইরে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট আনসার সদস্যদের জন্য অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ইসি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই সিদ্ধান্তের পর সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকরা। ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষেধাজ্ঞার ফলে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার গতি ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। সাংবাদিকদের ভাষ্য, বর্তমান সময়ের রিপোর্টিং পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। তথ্য সংগ্রহ, ছবি ও ভিডিও ধারণ, লাইভ আপডেট কিংবা দ্রুত সংবাদ পাঠানো—সবকিছুর মূল হাতিয়ারই মোবাইল ফোন।
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, এখন সাংবাদিকতা আর কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ছাড়া ভোটকেন্দ্রে রিপোর্টিং করা কার্যত অসম্ভব। ভোটের পরিবেশ, ভোটার উপস্থিতি, অনিয়ম বা অভিযোগের চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ধরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। কিন্তু মোবাইল নিষিদ্ধ থাকলে সেই দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিজ্ঞাপন
ভোটের স্বচ্ছতা রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা দিলেও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দাবি, সাধারণ ভোটার ও অসাধু চক্রের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, তা পেশাদার সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা যৌক্তিক নয়। তাদের মতে, পরিচয়পত্রধারী সাংবাদিকদের জন্য আলাদা নির্দেশনা বা সীমিত পরিসরে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
মিডিয়া নেতারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য যেমন কঠোর নিয়ম প্রয়োজন, তেমনি জনগণের জানার অধিকার ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে নির্বাচন ঘিরে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিজ্ঞাপন
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় এখন নজর সবার—নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে এই নির্দেশনায় কোনো শিথিলতা আনে কি না, নাকি কঠোর অবস্থানেই অটল থাকে।








