সংবিধান ‘সংস্কার’ করা যায় না, সংশোধন হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংবিধান পরিবর্তন প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানকে ‘সংস্কার’ করা যায় না; এটি কেবল রহিত, স্থগিত কিংবা সংশোধনের মাধ্যমেই পরিবর্তন করা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন অবশ্যই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
সব দলের অংশগ্রহণে বিশেষ কমিটির প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ‘বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তার মতে, সরকারি দল, বিরোধী দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হলে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদের ভেতরেই বসে যৌথভাবে আলোচনা করে সংবিধান সংশোধনের রূপরেখা নির্ধারণ করা উচিত, বাইরের কোনো প্রভাব বা নির্দেশনার ভিত্তিতে নয়।
জুলাই আন্দোলনের প্রতিফলন সংবিধানে
বিজ্ঞাপন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের যে অভিপ্রায়, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো হবে। ২০২৪ সালের জুলাই জাতীয় সনদ ও ঘোষণাপত্রের মূল বক্তব্যগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলো চতুর্থ তফসিলে সংযোজন করা হবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস অনন্য—১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার তুলনা করা উচিত নয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন
বিজ্ঞাপন
সালাহউদ্দিন আহমদ পঞ্চদশ সংশোধনীকে ঘিরে নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘আইনি প্রতারণা’ যুক্ত করা হয়েছে, যার কিছু অংশ ইতোমধ্যে হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। বাকি অংশগুলো নিয়েও সংসদে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিশেষ করে সংবিধানের ৫, ৬ ও ৭ নম্বর তফসিলে সংযোজিত কিছু বিষয়কে ‘ভুল ইতিহাস’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সেগুলো বাতিল বা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট থেকে প্রোভিশনাল হেড অব স্টেট হিসেবে ঘোষণার বিষয়টি সংবিধানে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মীয় বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ
সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনর্বহালের কথাও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই নীতিটি পূর্বে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও জুলাই সনদে এটি অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা ছিল, কিছু দলের আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এটি পুনঃস্থাপনে সরকার উদ্যোগী থাকবে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
উচ্চকক্ষ গঠনের পরিকল্পনা
রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো সেখানে অংশ নেবে, যা আইন প্রণয়নে ভারসাম্য আনবে।
বিজ্ঞাপন
সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গা
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং সেই ক্ষমতার প্রয়োগ হয় সংসদের মাধ্যমে। তাই সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও সংসদেই নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হলে সংসদের ভেতরে খোলামেলা আলোচনা জরুরি এবং সেই পথেই এগোতে হবে—বাইরের কোনো ‘প্রেসক্রিপশন’ অনুসরণ করে নয়।








