সংসদের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড, খতিয়ে দেখছে দুদক

জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান এবং এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুর রহিম জোয়ারদার।
বিজ্ঞাপন
দুদক বলছে, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজকে কেন্দ্র করে সরকারি অর্থ লুটপাটের একটি বড় চক্র সক্রিয় ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারেরও চেষ্টা হয়েছে।
দুদকের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় রেকর্ড হাতে পাওয়ার পর সেগুলো যাচাই-বাছাই করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
দুদক সূত্রের ভাষ্য, অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদার অন্যতম। বিভিন্ন মহলে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে ব্যবহৃত ‘এসআইএস’ সাউন্ড সিস্টেমের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের আড়ালে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ বা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও সেবার বিল দেখানো হয়েছে। এভাবে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
দুদকের ধারণা, যেসব যন্ত্রপাতি ও সেবার জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় দেখিয়ে বাড়তি অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে খরচ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ বিদেশে পাচারের একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ কৌশলে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। দুদক সূত্র বলছে, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমের বিষয়টি অনুসন্ধানের পাশাপাশি তার অন্যান্য আর্থিক কর্মকাণ্ডও নজরদারির মধ্যে আনা হতে পারে।
অনুসন্ধান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর সিস্টেমটি পুনরায় সচল করতে মেরামতের উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর।
বিজ্ঞাপন
এই সময় কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড সংশ্লিষ্ট সিস্টেমটি পরীক্ষা করে দাবি করে, তারাই এটি মেরামত করতে সক্ষম। পরে প্রতিষ্ঠানটি একটি ব্যয় প্রাক্কলন বা এস্টিমেট জমা দেয়।
কিন্তু সেই এস্টিমেট নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কেবল সিস্টেমটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রকৌশলীদের যাতায়াত, আবাসন ও সম্মানীর খাত দেখিয়ে প্রায় ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু একটি সাউন্ড সিস্টেম পরিদর্শনের জন্য এত বড় অঙ্কের ব্যয় অস্বাভাবিক।
বিজ্ঞাপন
এতেই শেষ নয়। পুরো সিস্টেমটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রায় চার কোটি টাকার একটি প্রাক্কলন জমা দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুদক এখন যাচাই করছে, এই প্রাক্কলন বাস্তবসম্মত ছিল কি না, নাকি অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
দুদক জানতে চায়, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডকে এই কাজ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে টেন্ডার ও ক্রয়সংক্রান্ত সব নথি তলব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কার্যাদেশ, দরপত্র আহ্বানের কাগজপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, দরদাতাদের তালিকা, অনুমোদনপত্র এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নথি।
বিজ্ঞাপন
দুদক আরও খতিয়ে দেখছে, প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল কি না এবং সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় এ ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনা বা মেরামতের পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের ছিল কি না।
অনুসন্ধান কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য চেয়েছেন। এসব নথির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা যাচাই করা হবে।
দুদক যেসব তথ্য ও নথি চেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত ও সংস্কারসংক্রান্ত টেন্ডার এবং কার্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ নথি। মালামাল কেনার চাহিদাপত্র, প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজারদর যাচাই প্রতিবেদন। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভার কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্ত। যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যাদেশ এবং গুণগত মান যাচাইয়ের সনদ। বিল পরিশোধের ভাউচার, স্টক রেজিস্টার, নোটশিট ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন। ৫ আগস্টের পর সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম ও অন্যান্য দাপ্তরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন। সিস্টেমটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের নাম, পদবি ও বর্তমান ঠিকানা।
বিজ্ঞাপন
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব নথি হাতে পাওয়ার পর অর্থ ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য অনিয়মের ধরণ স্পষ্ট হবে।
দুদক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখছে না, বরং পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ক্রয় কমিটির সদস্য এবং অনুমোদনদাতাদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে কারা কাজের অনুমোদন দিয়েছেন, কারা মূল্য যাচাই করেছেন, কারা বিল পাস করেছেন এবং কারা সরঞ্জামের গুণগত মানের সনদ দিয়েছেন—এসব বিষয় অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
দুদক সূত্র বলছে, অনুসন্ধানে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আনা হবে।







