ঢাকার আকাশে ডানা মেলছে রিয়াদ এয়ার, অপেক্ষায় রয়েছে মাহান এয়ার

বাংলাদেশের আকাশপথে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে যাচ্ছে। সৌদি আরবের নতুন বিমান সংস্থা ‘রিয়াদ এয়ার’ ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি। এখন শুধু ফ্লাইট শিডিউল অনুমোদনের অপেক্ষা। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ঢাকায় বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করতে চায় এয়ারলাইন্সটি।
বিজ্ঞাপন
বেবিচক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রিয়াদ এয়ারের প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদনের কাজ প্রায় সম্পন্ন। তবে এখনো তারা নির্ধারিত ফ্লাইট সূচি জমা দেয়নি। শিডিউল অনুমোদনের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে পারবে সংস্থাটি।
বর্তমানে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স। নতুন করে রিয়াদ এয়ার যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য রুটে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিয়াদ এয়ার সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সপ্তাহে সাত দিন সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনা রুটেও ফ্লাইট বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু ঢাকা নয়, ভবিষ্যতে সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকেও সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনা যাচাই করছে সংস্থাটি। সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী, হজ ও উমরাহ যাত্রী এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের কারণে এই রুটকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করছে তারা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে রিয়াদ এয়ারের জেনারেল সেলস এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে রিদম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সোহাগ হোসেন বলেন, রিয়াদ এয়ারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুব দ্রুতই ফ্লাইট সূচি ঘোষণা করা হবে এবং এ বছরের মধ্যেই যাত্রী পরিবহন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের বাজার বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এয়ারলাইন্স যুক্ত হলে যাত্রীরা আরও প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া ও উন্নত সেবা পাবেন বলে আশা করছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, ইরানের বেসরকারি বিমান সংস্থা ‘মাহান এয়ার’ ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে। সংস্থাটি ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তেহরান-ঢাকা রুটে ফ্লাইট চালুর আবেদন করেছে। একইসঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে দুবাই, মাস্কাট, ইসলামাবাদ ও করাচিতে যাত্রী পরিবহনের জন্য ‘ফিফথ ফ্রিডম ট্রাফিক রাইটস’-এর অনুমতিও চেয়েছে।
এভিয়েশন খাতে ‘ফিফথ ফ্রিডম’ সুবিধা এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো বিদেশি এয়ারলাইন্স নিজ দেশের বাইরে অন্য দুটি দেশের মধ্যে যাত্রী পরিবহন করতে পারে। তবে মাহান এয়ারের এই আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি।
বেবিচকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হলেও এখনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত মাহান এয়ারের অনুমোদন ঝুলে আছে।
বিজ্ঞাপন
এভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিদেশি এয়ারলাইন্স যুক্ত হলে যাত্রীদের জন্য বিকল্প বাড়বে এবং বাজারে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যমুখী শ্রমবাজারে অতিরিক্ত সিট ক্যাপাসিটি যোগ হলে টিকিটের অতিরিক্ত ভাড়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে নতুন ফ্লাইট স্লট বরাদ্দ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক রুটে নতুন কোনো বড় এয়ারলাইন্স যুক্ত হয়নি। সে বিবেচনায় রিয়াদ এয়ার ও মাহান এয়ারের আগমন দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য রুটে চাহিদার তুলনায় সিট সংখ্যা কম থাকায় যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। নতুন এয়ারলাইন্স যুক্ত হলে সিট ক্যাপাসিটি বাড়বে, প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং তুলনামূলক কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ বাড়বে। একইসঙ্গে এ খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে মাহান এয়ারের ‘ফিফথ ফ্রিডম’ আবেদনের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার মতে, ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক এয়ার সার্ভিস কাঠামো না থাকায় এ ধরনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বিদেশি এয়ারলাইন্স অতিরিক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়ে স্থানীয় বাজারের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু করা মাহান এয়ার ইরানের তেহরানভিত্তিক একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স। সংস্থাটি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে। বিভিন্ন সময়ে সিরিয়া, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছে এয়ারলাইন্সটি।








