Logo

ঈদের খুশি বদলে গেল কান্নায়, আগুন কেড়ে নিল শতাধিক পরিবারের ঘর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ মে, ২০২৬, ১৪:৩১
ঈদের খুশি বদলে গেল কান্নায়, আগুন কেড়ে নিল শতাধিক পরিবারের ঘর
ছবি: সংগৃহীত

ঈদের আনন্দের প্রস্তুতিতে যখন ব্যস্ত সারা দেশ, তখন রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে নেমে এসেছে শোক আর হতাশার ছায়া। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে শতাধিক ঘর, দোকান ও মানুষের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সামান্য সঞ্চয়। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে অসংখ্য পরিবারকে। ঈদের আগে এমন বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

বিজ্ঞাপন

সোমবার সন্ধ্যায় কালশীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন দাউদাউ করে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যায় বহু ঘরবাড়ি ও দোকানপাট।

মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো এলাকায় এখনও পোড়া গন্ধ ভাসছে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে পড়ে আছে পোড়া টিন, কাঠ, কাপড়চোপড় ও গৃহস্থালির ভাঙা জিনিসপত্র। কেউ ছাইয়ের স্তূপে খুঁজছেন বাঁচানো যায় এমন কিছু, আবার কেউ পোড়া টিন ও লোহালক্কড় সংগ্রহ করে বিক্রির চেষ্টা করছেন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের দাবি, আগুনে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকেই এখন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খাবার ও জরুরি সহায়তা বিতরণ করতে দেখা গেছে।

সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে সাত বছর ধরে বস্তিটিতে বসবাস করছিলেন বকুলা বেগম। আগুনে তার দুটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, পরিবারের নয়জন সদস্য ওই দুই ঘরেই থাকতেন। ঈদের পর জায়গা ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু আগুনে সব শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ঈদের সময় বাসাবাড়ি থেকে মাংস সংগ্রহ করে কয়েকদিন ভালোভাবে খাওয়ার আশা করেছিলেন। এখন রান্না করার মতো জায়গাও নেই। বিধবা ভাতার টাকা এনে রাখলেও তা ব্যবহার করার আগেই আগুনে সব পুড়ে যায়। আগুন লাগার সময় পরিবারের সবাই শুধু পরনের কাপড় নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পেরেছেন।

বিজ্ঞাপন

আরেক ক্ষতিগ্রস্ত মো. নবাব জানান, আগুনে তার ১৫টি ঘর ও একটি মুদি দোকান পুড়ে গেছে। দীর্ঘ ২০ বছরের পরিশ্রমে যা গড়ে তুলেছিলেন, এক রাতের আগুনে সব শেষ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। দোকানে কয়েক লাখ টাকার মালামাল ছিল, যার কিছুই রক্ষা করা যায়নি।

ঈদ নিয়ে হতাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি বছর কোরবানি দিলেও এবার থাকার জায়গাটুকুও নেই। ঈদের দিন পরিবার নিয়ে রাস্তায় রাত কাটানোর আশঙ্কা করছেন তিনি।

কিশোরগঞ্জের শাহীন আলম পাঁচ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওই বস্তিতে ভাড়া থাকতেন। ভাঙারির দোকানে কাজ করে সংসার চালানো এই শ্রমিক সমিতি থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে ঈদের পর একটি রিকশা কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু আগুনে তার ঘরের সব মালামালের সঙ্গে প্রায় ৪২ হাজার টাকাও পুড়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

শাহীন বলেন, নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। রিকশা কিনে স্বাবলম্বী হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু আগুনে সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।

এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্তরা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছেন। কেউ পোড়া টিন, কেউ ভাঙা আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। পরে সেগুলো ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে কিছু অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। এলাকায় ভ্যান, অটোরিকশা ও ছোট ট্রাকে করে এসব পোড়া সামগ্রী নিয়ে যেতে দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

বস্তির বাসিন্দা মোহাম্মদ সবুজ জানান, তার ১১টি ঘর আগুনে পুড়ে গেছে। এখন পোড়া টিন বিক্রি করে অন্তত কিছু টাকা তুলে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। একইভাবে মোতালেব নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, তার ভাঙারির দোকান, গোডাউন ও তিনটি ঘর পুড়ে গেছে। আগুন লাগার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসতে হয়েছে। আগুনের তীব্রতায় পুরো এলাকা ফাঁকা হয়ে যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, ঈদের আগে তারা এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করছেন নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও আর্থিক সহায়তার। অনেকেই বলছেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন ঈদ কাটতে যাচ্ছে এবার।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD