Logo

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বৈঠকে স্বাক্ষর হলো ৩ সমঝোতা চুক্তি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ জুন, ২০২৬, ১৫:৫৪
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বৈঠকে স্বাক্ষর হলো ৩ সমঝোতা চুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া সফরকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বল্প সময়ের এই সফরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত, শিক্ষা, শ্রমবাজার, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত বৈঠকের পাশাপাশি সীমিত ও সম্প্রসারিত পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় হয়।

সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে দুটি পৃথক ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ বিনিময় করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সফর শেষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া অন্তত নয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, শ্রমবাজার, শিক্ষা, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা।

তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন খাতে সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।

বৈঠকে দুই দেশের সরকারপ্রধান বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

হালাল শিল্পের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেও বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। এ খাতে মালয়েশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল পণ্য উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সনদ প্রদান, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়ে উভয় দেশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।

ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির সরকারকে দ্রুত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বল্প ব্যয়ে, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।

বিজ্ঞাপন

মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন জটিলতায় পড়া বা কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের অনুরোধও জানানো হয় বৈঠকে। এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিক্ষা খাতে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন করে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে দুই দেশ। সামরিক প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সমন্বিত কার্যক্রম এবং সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে।

জ্বালানি খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক। পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া এবং এমএমসি পোর্টের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

বিজ্ঞাপন

একই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির বলেন, দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্য, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজারসংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়ের হিসেবে সংক্ষিপ্ত হলেও এই সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ। গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সমঝোতাগুলো বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং জনশক্তি খাতে সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD