অভিযোগ-পরামর্শ শুনতে ট্রেনে প্রতিমন্ত্রী, যা জানালেন যাত্রীরা

রেলসেবার মান সরেজমিনে যাচাই করতে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেন সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। সফরকালে তিনি বিভিন্ন বগি ঘুরে যাত্রীদের অভিযোগ, দাবি ও পরামর্শ শোনেন এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। খাবারের মান, ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবা, টিকিট সংকট, বিছানার চাদরের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে রেলপথ উন্নয়ন—বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে যাত্রীদের আলোচনায়।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি কক্সবাজার-দোহাজারী রেললাইনের দুই পাশের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিদর্শনে কক্সবাজার যান প্রতিমন্ত্রী। পরদিন গ্যাংকারে কক্সবাজার থেকে চকরিয়া পর্যন্ত রেললাইন পরিদর্শন শেষে বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সোনার বাংলা ট্রেনে যাত্রা করেন তিনি।
ট্রেনটি কুমিল্লা অতিক্রম করার সময় নিজের কেবিন থেকে বের হয়ে একে একে যাত্রীবগিগুলোতে প্রবেশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে যাত্রীদের কাছে জানতে চান, রেলের বর্তমান সেবার মান কেমন এবং কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আলোচনার সময় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী দেবাশীষ দত্ত ট্রেনের ক্যানটিনের খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, অনেক সময় যাত্রীদের বাসি খাবার পরিবেশন করা হয় এবং একবার এমন খাবার খেয়ে তিনি অসুস্থও হয়েছিলেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের পক্ষ থেকে কুড়িগ্রামের বাসিন্দা ও রাজউকের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার কুড়িগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি বলেন, এই পথে যাত্রীর সংখ্যা অনেক হলেও ট্রেনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, চলমান রেল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ রুটে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
বিজ্ঞাপন
রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) সুবক্তগীনও জানান, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ হয়ে নতুন রেলপথের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং ট্রেনের সংখ্যাও বাড়ানো সম্ভব হবে।
সাতকানিয়ার বাসিন্দা তৌহিদুর রহমান কক্সবাজার রেলপথের কারণে কিছু এলাকায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেই রেলপথ পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে কালভার্ট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে পানি চলাচলের সমস্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে হৃদরোগে আক্রান্ত এক যাত্রীর মৃত্যুর প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে। এক যাত্রী অভিযোগ করেন, স্টেশনে জরুরি চিকিৎসাসেবা কিংবা স্ট্রেচারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কমলাপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় স্টেশনগুলোতে স্থায়ী চিকিৎসাসেবা চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের যাত্রাসময় কমাতে কর্ডলাইন নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানান এক ব্যবসায়ী। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
রেলসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়। যাত্রীদের একজন ট্রেনে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর প্রস্তাব দিলে প্রতিমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের সুবিধা চালুর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনের সংখ্যা কম এবং টিকিটের কালোবাজারির অভিযোগও তোলেন কয়েকজন যাত্রী। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ না থাকায় বর্তমানে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ট্রেনের কেবিনে ব্যবহৃত বিছানার চাদরের অস্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি শুনে প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক জানান, নতুন চাদর সরবরাহের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব শিগগিরই উন্নতমানের চাদর যাত্রীদের দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সফরের সময় প্রতিমন্ত্রী মোট ১৯টি যাত্রীবগি পরিদর্শন করেন। তিনি ক্যানটিনে গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং খাবারের মান সম্পর্কে অভিযোগ শুনে ক্যানটিন ব্যবস্থাপনাকে সতর্ক করেন। বাসি বা অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নির্দেশ দেন তিনি।
সফর শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেলব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে। তবে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জানান, নিয়মিত যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াতকারী কয়েকজন যাত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা ও টয়লেট ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে যাত্রীর তুলনায় ট্রেন ও টিকিটের সংখ্যা এখনও কম। তাঁদের মতে, নতুন ট্রেন চালু এবং টিকিট সরবরাহ বাড়ানো গেলে কালোবাজারি কমবে এবং যাত্রীদের ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।








