সব পক্ষের মতামতে গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধন চায় বিশেষ কমিটি

সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি।
বিজ্ঞাপন
কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি হিসেবে রেখে বিদ্যমান সংবিধানের প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করা হবে এবং সব পক্ষের মতামতের আলোকে একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হবে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং সর্বস্তরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে প্রয়োজনীয় সংশোধনীগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মতামত গ্রহণ করা হবে। এসব পরামর্শ পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে কমিটি।
বিজ্ঞাপন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, কমিটি কত দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। বিরোধী দল বর্তমানে কমিটিতে প্রতিনিধি না দিলেও ভবিষ্যতে তারা নাম দিলে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এমনকি প্রতিনিধি না থাকলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের যেকোনো গঠনমূলক মতামত বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, লক্ষ্য একটাই—সব পক্ষের অংশগ্রহণে এমন একটি সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা, যা জনগণের প্রত্যাশা প্রতিফলিত করবে এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তি গড়ে তুলবে।
জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে যেসব বিষয়ে সম্মতি হয়েছে, সেগুলো সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আর যেসব বিষয়ে ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, জুলাই সনদের বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার এবং আলোচনায় উঠে আসা কিন্তু সনদে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে আলোচনা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে। তাই এই সনদকে সামনে রেখেই সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। তাঁর মতে, সংবিধানের একটি অংশ নয়, বরং পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করতে হবে, কারণ একাধিক ধারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
আইনমন্ত্রী বলেন, শুধু আবেগ বা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। জুলাই সনদের মূল চেতনা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হবে।
বিজ্ঞাপন
বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই সনদেই এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা রয়েছে। যেখানে কোনো বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে এবং তা তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলোকেও সংশোধনী প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিরোধী দল কমিটিতে না থাকলেও তাদের সুপারিশ গ্রহণের সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে ৩৩টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকায় বিরোধী দলের বিভিন্ন প্রস্তাবও ইতোমধ্যে সেই দলিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের আগে সমাজের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় করা হবে। এর মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত আন্দোলনকারী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা, সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহলের প্রতিনিধিরা থাকবেন। এছাড়া জুলাই সনদ প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গেও পৃথক আলোচনা করবে কমিটি।
বিজ্ঞাপন
কমিটির সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্য কেবল বর্তমান সময়ের প্রয়োজন মেটানো নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী দলও শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশেই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশেও রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।








