জুলাই জাদুঘরের নিদর্শন ক্ষতি করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সুরক্ষায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। জাদুঘরের কোনো স্থাবর নিদর্শন বা এর অংশবিশেষ ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা একই সঙ্গে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন, ২০২৬’-এ এসব বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, স্মৃতিচিহ্ন, নিদর্শন ও প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণ, গবেষণা এবং জনসাধারণের সামনে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
স্থাবর নিদর্শন নষ্ট করলে কঠোর শাস্তি
আইনের ২২ ধারায় স্থাবর নিদর্শন সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি জাদুঘরের স্থাবর নিদর্শন বা এর কোনো অংশ ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিসাধন করলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে জাদুঘরের অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার, ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধন করলেও শাস্তির মুখে পড়তে হবে। আইনের ২৩ ধারায় এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
নিদর্শনে লিখলেও হতে পারে কারাদণ্ড
জাদুঘরের সংরক্ষিত বা নিবন্ধিত কোনো নিদর্শনের ওপর খোদাই করা, লেখা, কোনো লিপি উৎকীর্ণ করা কিংবা স্বাক্ষর করাকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের কাজ করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ফলে জাদুঘরের নিদর্শন শুধু চুরি বা ধ্বংস নয়, কোনোভাবে বিকৃত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
গোপন কারাগারও জাদুঘরের আওতায়
আইনের ৪ ধারায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের প্রধান কার্যালয় ঢাকার গণভবনে রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে যেসব গোপন কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোকে জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
বিজ্ঞাপন
কোনো গোপন কারাগার কোনো সরকারি বা অন্য কোনো সংস্থার অধীনে থাকলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সেটি যে অবস্থায় রয়েছে, সেই অবস্থাতেই জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এসব স্থান জাদুঘরের শাখা জাদুঘর হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা আইনে বলা হয়েছে।
জাদুঘরের কার্যক্রম কী
আইনের ৫ ধারায় জাদুঘরের বিভিন্ন কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, তৎকালীন সরকারের পতন ও পলায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন অনুসন্ধান, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শন।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে পূর্ববঙ্গের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিদর্শনও সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী কর্মকাণ্ড, ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাবলির স্মৃতিচিহ্ন ও প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণও জাদুঘরের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিদর্শন সংগ্রহ ও বিনিময়ের সুযোগ
বিজ্ঞাপন
আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, জাদুঘর পর্ষদের সুপারিশ এবং সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিদর্শন প্রদর্শন ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, অন্য কোনো জাদুঘর কিংবা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে নিদর্শন বিনিময় করতে পারবে।
এ ছাড়া নিদর্শন উপহার দেওয়া বা গ্রহণ করার সুযোগও থাকবে। তবে এ ধরনের বিনিময় বা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।
ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা নিদর্শনও যাচাই করা যাবে
বিজ্ঞাপন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো নিদর্শন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে—এমন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে জাদুঘরের মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট স্থান পরিদর্শন করতে পারবেন।
আইনের ১৬ ধারায় এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর আইন বা এর অধীনে প্রণীত বিধি ও প্রবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
দর্শনার্থীদের প্রবেশমূল্য থাকবে
বিজ্ঞাপন
আইনের ১৭ ধারায় জাদুঘরে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। পর্ষদ যে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করবে, তা পরিশোধের মাধ্যমে জনগণ জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট নিদর্শন সাধারণ মানুষের সামনে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা
জাদুঘরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিদর্শন ধ্বংস, ক্ষতিসাধন, চুরি, পাচার কিংবা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত দণ্ডের পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ থাকবে। তবে একই বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের লক্ষ্যেই আইনে এসব বিধান রাখা হয়েছে। ফলে জাদুঘরের নিদর্শন রক্ষা, ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য সেগুলো নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।








