পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান, শেষ হলো পরিবেশ মেলা

‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টম্বর) পরিবেশ অধিদপ্তরের নতুন ভবনের তৃতীয় তলার সম্মেলন কক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এর আগে গত ৯ জুলাই বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বুধবার আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান।
সকাল ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পারভেজ চৌধুরী স্বাগত বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তিনি জানান, এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, পরিবেশবিষয়ক প্রকল্প প্রস্তাব আহ্বান, পরিবেশ মেলায় অংশগ্রহণকারী শ্রেষ্ঠ স্টল নির্বাচন, পরিবেশবিষয়ক সেমিনার আয়োজন, ঢাকা মহানগরীর ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সহায়তা প্রদান এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়ে সেমিনার আয়োজন।
বিজ্ঞাপন
এসব কর্মসূচি সফলভাবে আয়োজন ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বাগত বক্তব্য শেষ করেন পারভেজ চৌধুরী।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, যেকোনো দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। এ উদ্দেশ্যে প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করা হয়।
তিনি বলেন, এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জলবায়ু কার্যক্রম’, যার বাংলা ভাবানুবাদ ‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’। গত বছরের প্রতিপাদ্য ছিল প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে। প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বর্তমানে গৃহীত কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সহনশীলতা তৈরি হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনায় অভিযোজন ও প্রশমনমূলক ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এরপর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, পরিবেশবিষয়ক প্রকল্প প্রস্তাব প্রতিযোগিতা এবং পরিবেশ মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান অর্জনকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
বিজ্ঞাপন
শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ১২ জন বিজয়ীর প্রত্যেককে সনদ, ক্রেস্ট, প্রাইজবন্ড ও জলরং দেওয়া হয়। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান অর্জনকারী তিনজনের প্রত্যেককে ৩ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড এবং উত্তম স্থান অর্জনকারী নয়জনের প্রত্যেককে ২ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড দেওয়া হয়।
বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিজয়ী এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রানার্সআপ হয়। বিজয়ী দলকে ৪০ হাজার টাকা এবং রানার্সআপ দলকে ৩০ হাজার টাকার পুরস্কার, ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয়।
পরিবেশবিষয়ক প্রকল্প প্রস্তাব প্রতিযোগিতায় মোট ৮১টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে তিনজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের যথাক্রমে ৩০ হাজার, ২৫ হাজার ও ২০ হাজার টাকা এবং সনদ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া পরিবেশ মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান অর্জনকারী সাত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তাদের প্রত্যেককে ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয়।
পুরস্কার বিতরণ শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি।’ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—পরিবেশগত সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি—জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, একবিংশ শতাব্দীর টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিই চালিকাশক্তি। এর মাধ্যমে সর্বনিম্ন কার্বন নিঃসরণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি নিশ্চিত করতে দূষণমুক্ত উৎপাদন ব্যবস্থা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কাজ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদের আওতায় বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০ প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান ৩.০ প্রণয়ন করে তা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদে দাখিল করেছে।
তিনি আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি সরকার দেশের শিল্পদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সবশেষে পুরস্কারপ্রাপ্ত সবাইকে ভবিষ্যতেও পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
পুরস্কার বিতরণ শেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০২৬ সফলভাবে আয়োজনের জন্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। পরে তিনি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।








