Logo

ভুয়া তথ্যে ধর্মীয় সম্মানি নিলে যাবজ্জীবন, ফেরত দিতে হবে টাকা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:২৪
ভুয়া তথ্যে ধর্মীয় সম্মানি নিলে যাবজ্জীবন, ফেরত দিতে হবে টাকা
ছবি: সংগৃহীত

মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় দায়িত্ব পালনকারী ইমাম, পুরোহিত, মুয়াজ্জিন, সেবায়েতসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সম্মানি দেওয়ার জন্য নতুন নীতিমালা করেছে সরকার। এতে ভুয়া তথ্য বা জাল সনদ দিয়ে সম্মানি গ্রহণ করলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

‘মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের জন্য সম্মানি ও কল্যাণ সহায়তা প্রদান নীতিমালা-২০২৬’ গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এর আগে ধর্ম মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ চলতি অর্থবছরে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে কর্মসূচিটি এখন আনুষ্ঠানিক কাঠামো পেল।

জাল তথ্য দিলে কঠোর শাস্তি

বিজ্ঞাপন

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভুয়া তথ্য বা জাল সনদ ব্যবহার করে সম্মানি গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ধারার মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা করে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচিত করার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৪৬৭ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা মূল্যবান জামানত জাল করার অপরাধে যাবজ্জীবন অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ৪৬৮ ধারায় প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড এবং ৪৭১ ধারায় জাল দলিল আসল হিসেবে ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট জালিয়াতির জন্য নির্ধারিত শাস্তির বিধান রয়েছে।

জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া সম্মানীর অর্থও ফেরত দিতে হবে। এ অর্থ ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন, ১৯১৩’ অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে আদায় করা হবে।

বিজ্ঞাপন

তৈরি হবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজ

সম্মানি কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একটি সেল গঠন করা হবে। প্রথম ধাপে দেশের মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় কর্মরত ব্যক্তিদের তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ তৈরি করা হবে।

এসব তথ্য আইবাস প্লাস প্লাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। নির্বাচিত প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ইউনিক আইডিও সংরক্ষণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

সম্মানি পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। তাকে উপজেলা কমিটি বা সিটি করপোরেশনের জোন কমিটির নির্বাচিত কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্রের ভিত্তিতে কর্মরত থাকতে হবে।

ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ কে কত পাবেন

নীতিমালা অনুযায়ী নির্বাচিত মসজিদের ইমাম মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার এবং খাদেম ২ হাজার টাকা সম্মানি পাবেন। অর্থাৎ একটি মসজিদে মাসে মোট ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

মন্দিরে পুরোহিত পাবেন ৫ হাজার এবং সেবায়েত ৩ হাজার টাকা। বৌদ্ধবিহারে অধ্যক্ষ ৫ হাজার ও উপাধ্যক্ষ ৩ হাজার টাকা এবং গির্জায় পুরোহিত ৫ হাজার ও সহকারী পুরোহিত ৩ হাজার টাকা করে মাসিক সম্মানি পাবেন।

একই পদে একাধিক ব্যক্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটি তাদের মধ্য থেকে একজনকে সম্মানি পাওয়ার জন্য নির্বাচন করবে।

মসজিদের সম্মানি প্রাপকদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১ হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা দেওয়া হবে। মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার সম্মানি প্রাপকেরা দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিনে এককালীন ২ হাজার টাকা করে পাবেন।

বিজ্ঞাপন

তবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট বিবেচনায় সরকার প্রয়োজনে সম্মানির হার পরিবর্তন করতে পারবে।

সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল হিসাবে টাকা

আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে জিটুপি বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতিতে সম্মানির অর্থ সরাসরি প্রাপকের ব্যাংক হিসাব অথবা নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে খোলা ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠানো হবে।

বিজ্ঞাপন

নীতিমালা অনুযায়ী পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সম্মানির অর্থ পরিশোধ করার কথা রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) এ কার্যক্রম তদারকি করবেন।

যেসব কারণে সম্মানি বন্ধ হবে

নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলে সম্মানি বাতিল হতে পারে। একইভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত বা পদত্যাগ, তথ্যের ক্ষেত্রে প্রতারণা, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সম্মানি বন্ধ হবে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত না থেকেও সম্মানি প্রাপক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো সংস্থা বা প্রকল্প থেকে বেতন-ভাতা নেওয়া, অসামাজিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়াও সম্মানি বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনের সঙ্গে লাগবে যেসব কাগজ

সম্মানি পেতে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। এর সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, দুই কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি, ব্যাংক হিসাব অথবা নিজের নামে খোলা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের তথ্য এবং নিয়োগপত্রের কপি জমা দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত বা ট্রাস্ট পরিচালিত প্রতিষ্ঠান এবং স্থায়ী অনুদানপ্রাপ্ত ও কর্মরত ব্যক্তিদের বেতন দেওয়া হয়—এমন প্রতিষ্ঠান বাদ থাকবে। নিম্ন আয়ের, দুর্গম ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

কোনো আবেদনকারী বা সম্মানি প্রাপক সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট কমিটিকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে।

সম্মানি সরকারি বেতন নয়

নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এই অর্থ সরকারি বেতন বা ভাতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্মানি হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে এ সম্মানি পাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে স্থায়ী নিয়োগের দাবি করতে পারবেন না।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছেই থাকবে। কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও তদারকিতে জেলা পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কমিটি, স্টিয়ারিং কমিটি এবং জাতীয় কমিটি কাজ করবে।

দুই ধাপে বাড়ছে উপকারভোগীর সংখ্যা

২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাইলট কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬ হাজার ১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে প্রথমবার সম্মানি দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে গত ১৪ মার্চ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসূচিটির উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে মাসিক সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সেল গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ওই সেলের সভাপতি।

গত ১০ আগস্ট সেলের সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আরও ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানি কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে ৮২ হাজার ৬৫৬টি মসজিদ, ৩ হাজার মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধবিহার এবং ৩০১টি গির্জা রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, সেবায়েত ও যাজক এ সুবিধার আওতায় আসবেন। গত ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জে দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

অনিয়ম বন্ধে আশাবাদ কর্তৃপক্ষের

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘ইমাম, মুয়াজ্জিন, সেবায়েত ও যাজকদের সম্মানি ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এতদিন এই নীতিমালাই অনুসরণ করেছি। নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত না হলেও এর ভিত্তিতেই ভাতা দেওয়া হয়েছে। এখন সেটিই আনুষ্ঠানিকভাবে একটি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।’

ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে সম্মানি নেওয়া ঠেকাতে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আশা করা যায় নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে কর্মসূচির অনিয়ম দূর হবে।’

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD