জ্বালানির দাম বাড়ানো ঠিক আছে, তবে জনগণের কষ্ট হবে: জাহেদ উর রহমান

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে এবং সামনে আরও হতে পারে বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম সামান্য কমলেও পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ভবিষ্যতে দাম আবার বাড়তে পারে—এমন ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে জ্বালানি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘দু-তিন দিনে কিছু টাকা সামান্য দু-তিন পার্সেন্ট কমেছে। এখনও ১০০ ডলারের বেশি ক্রুড অয়েলের দাম। কিছুটা কমেছে। কিন্তু এটা আসলে সাসটেইন করার সম্ভাবনা নেই।’
বিজ্ঞাপন
তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা, সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে বাধা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেল স্থাপনায় হামলার মতো ঘটনাও ভবিষ্যতে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘জনগণের কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হবে। আমরা আগেও যখন অয়েল নিয়ে কথা বলছি, এটা কোথায় হচ্ছে না?’
তিনি জানান, সরকারকে একই সঙ্গে জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সব খাতে একসঙ্গে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির পরিকল্পনা থাকলেও আড়াই মাসের মধ্যেই এর প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি এই গতিতে ভর্তুকি গ্যাস-বিদ্যুৎ দেন, তাহলে বছর শেষে এটা সোয়া ১ লাখ কোটি টাকা থেকে দেড় লাখ কোটি টাকা দাঁড়াবে।’
ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বাড়বে বলে স্বীকার করেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। তবে সরকার যৌক্তিক পরিমাণে পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের চেষ্টা করবে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা, ওএমএস এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে কনডেনসেট থেকে এসব জ্বালানি উৎপাদন হলেও তা দিয়ে মোট চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। ফলে আমদানি করা ক্রুড অয়েল থেকেও পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরাট একটা অংশ পেট্রোল এবং অকটেন আমদানিকৃত ক্রুডের ওপরে ডিপেন্ড করে, সুতরাং ওখানে তো দাম বাড়ছেই।’
তার ভাষ্য, পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি দাম রাখার নীতিগত কারণও রয়েছে, কারণ এসব জ্বালানি তুলনামূলকভাবে সামর্থ্যবান মানুষ বেশি ব্যবহার করেন।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কোনো নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ধরনের কোনো শর্ত নেই।
তিনি বলেন, ‘না, এমন কোনো শর্ত আসলে নেই। আইএমএফের বেসিক নিয়ম যেটা আছে, তারা চায় না একটা সরকার খুব বেশি ভর্তুকি দিক।’
তবে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতে বিপুল ভর্তুকির চাপ কমানোর বিষয়টি সরকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই দেখছে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানিতে ভর্তুকির চাপের মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জাহেদ উর রহমান বলেন, সর্বশেষ ২০১৫ সালে বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় বেতন কাঠামো সংশোধন করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘একটা বেতন স্কেল ২০১৫, আমি যদি ভুল না করি সর্বশেষ হয়েছিল। তারপর ১০-১১ বছর পার হয়ে গেছে এবং আমাদের গ্রসলি প্রায় ১০ শতাংশের মতো করে একটা ইনফ্লেশন হয় কম-বেশি। তাহলে আপনি চিন্তা করুন এটা এর মধ্যে রিভাইসড হয়নি।’
তিনি আরও জানান, বেতন কমিশনের সিদ্ধান্ত একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন অগ্রাধিকারের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেও এভাবে ভারসাম্য করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সফর সংক্ষিপ্ত করার পেছনে ব্যয় সাশ্রয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘এত দীর্ঘ সফরের চেয়ে কম সময়ের সফর ব্যয় সাশ্রয়ী। আপনারা খেয়াল করবেন খুব ছোট একটা দল নিয়ে তিনি গেছেন। একই সঙ্গে দেশ একটা নানান রকম ভাবে কিছু সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং দেশে থাকা তার জন্য নিশ্চয়ই আরও বেটার প্রাইয়োরিটি এই মুহূর্তে।’
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কোনো সিদ্ধান্তের কথা তারা এখনো জানেন না বলেও জানান তিনি।
জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত এমপি কাজী নূরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে কাজী নূরুল ইসলাম দল থেকে পদত্যাগ করেননি, তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাই তিনি এখনো সংসদ সদস্য আছেন বলে জানান উপদেষ্টা।
বিজ্ঞাপন
অসদাচরণের অভিযোগের ভিত্তিতেও সদস্যপদ বাতিলের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সেটি একটি প্রক্রিয়াগত বিষয়। একই সঙ্গে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দুই বছর বা তার বেশি সাজা হলেও সংসদ সদস্যপদ নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফাঁসির রায় কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি স্বাধীন বিভাগ। কোনো মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা ফাঁসি কার্যকরে বিলম্বের বিষয়ে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটা স্বাধীন বিভাগ, যেটা লিড করেন আমাদের বাংলাদেশের, আমাদের কনস্টিটিউশনে লেখা আছে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি।’
তার ভাষ্য, অপরাধের পর আসামি গ্রেপ্তার, তদন্ত এবং চার্জশিট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া পর্যন্ত সরকারের দায়িত্ব থাকে। এরপর মামলাটি বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রক্রিয়ার মধ্যে চলে যায়।








