Logo

রংপুরের প্রকল্প যাচ্ছে লালমনিরহাটে, মন্ত্রীর ‘ডিও লেটারে’ ক্ষোভ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৯:১২
রংপুরের প্রকল্প যাচ্ছে লালমনিরহাটে, মন্ত্রীর ‘ডিও লেটারে’ ক্ষোভ
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাব ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রংপুরে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) ভিত্তিতে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা প্রকল্পটি রংপুরেই বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জোসেফা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত কাঠামো বিভাগের সদস্যের (সিনিয়র সচিব) কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চাওয়া হয়েছে।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) রংপুর বিভাগের কেন্দ্রটি রংপুর সদর উপজেলার মন্থনা মৌজায় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য বিভিন্ন খতিয়ানে মোট ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। তবে প্রস্তাবিত জমি তিন ফসলি হওয়ায় জমির মালিকেরা লিখিত আপত্তি জানান। এতে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয়।

এ অবস্থায় লালমনিরহাটে কেন্দ্রটি স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ডিও লেটার দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। প্রস্তাব অনুযায়ী, লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বৈরাগিকুমুর ও নওদাবস মৌজায় মোট ১০ একর জমিতে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করা হলে ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। মন্ত্রীর ডিও পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চাওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে ডিপিপি সংশোধনের সময় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।

১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকার প্রকল্প

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সাত বিভাগীয় শহরে কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

বর্তমানে দেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে মাত্র চারটি। ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় কেন্দ্র ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। রংপুর বিভাগের মানুষের জন্য সরকারি পর্যায়ে এ ধরনের কোনো নিরাময়কেন্দ্র না থাকায় চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট সেবা পেতে তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

রংপুর বিভাগের আট জেলার বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভাগীয় শহরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত প্রকল্পটি অন্য জেলায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, মন্থনা মৌজায় জমি অধিগ্রহণে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর রংপুর সদরের অন্য কোনো স্থানে বিকল্প জমি খোঁজার বিষয়ে চিঠিতে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

বিজ্ঞাপন

রংপুরেই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি বিএনপির

প্রকল্পটি রংপুরে বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারাও। রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কথা বলা হলেও এ বিষয়ে তাঁদের সহযোগিতা চাওয়া হয়নি। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রংপুরে প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া সম্ভব বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, কেন্দ্রটি রংপুরেই নির্মাণ করা উচিত।

রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করেই রংপুরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্য কোনো জেলা নিজ এলাকায় প্রকল্প চাইলে সেটি আলাদাভাবে করতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের আপত্তি

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর মহানগরের সদস্যসচিব আব্দুল মালেক বলেন, ‘রংপুরের জন্য প্রস্তাবিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে স্থানান্তরের জন্য ত্রাণমন্ত্রী আবেদন করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য হলে এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা, ন্যায্যতা ও জনস্বার্থ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়। বিষয়টি শুধু অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্ন নয়, এটি রংপুর অঞ্চলের মানুষের সেবা পাওয়ার অধিকার, উন্নয়নের ন্যায্য বণ্টন এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন।’

সমাজ পরিবর্তন ও উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি মোস্তফা সাব্বিরও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, ‘রংপুর বিভাগের প্রাণকেন্দ্র রংপুর সিটি করপোরেশন। ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটের বড়বাড়িতে স্থাপনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা অযৌক্তিক।’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘বড়বাড়ি একটি পকেট এরিয়া। সেখানে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান হলে বিভাগের অন্য জেলা ও উপজেলার মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই রংপুর শহরেই এটা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

রংপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘আমি এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করছি না। যেহেতু রংপুর সিটি করপোরেশন এবং বিভাগের হেডকোয়ার্টার, তাই এই ধরনের মাদক নিরাময় কেন্দ্র আমাদের এখানে হওয়াই উচিত। আমাদের এই ভাগের কেন্দ্রটা নিয়ে যাওয়া মোটেও সমীচীন নয়। আমি এর প্রতিবাদ করছি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘রংপুর এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখান থেকে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাটের মোগলহাটের দূরত্ব প্রায় সমান। ফলে সেবাধর্মী কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপন করা হলে সেবা শতভাগ নিশ্চিত হবে না। জনসেবা শতভাগ নিশ্চিত করতে যে স্থানে স্থাপন করলে সবাই সমানভাবে সুবিধা পাবে, সেটিই বেছে নেওয়া উচিত।’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় প্রকল্পের বড় অংশ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলে যেত। এখনো মন্ত্রীরা যদি প্রকল্প নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে যান, তাহলে সমতা বজায় থাকবে না। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়, তার ফলও তখন নিশ্চিত হয় না।’

প্রকল্প রংপুরে রাখার চেষ্টা চলছে: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন জানান, প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি অধিগ্রহণের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়ে জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছিল। এরপর অধিগ্রহণের গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ পরবর্তী কার্যক্রম জেলা প্রশাসন পরিচালনা করে। পরে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসন জমি অধিগ্রহণে কিছু জটিলতার কথা জানায় এবং সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করে।

বিজ্ঞাপন

মাসুদ হোসেন আরও বলেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন, প্রকল্পটি লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প পরিচালক সম্প্রতি লালমনিরহাটে গিয়ে প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। তবে কেন্দ্রটি রংপুরেই বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা কাজ করছেন।

প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন নিয়ে এখনো বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, জমি অধিগ্রহণের সমস্যা সমাধানে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে রংপুরেই কেন্দ্র নির্মাণ করা হোক, যাতে বিভাগের আট জেলার মানুষ সহজে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা পেতে পারেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD