Logo

হেলমেটের ছদ্মবেশে প্লাস্টিকের টুপি, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:৪১
হেলমেটের ছদ্মবেশে প্লাস্টিকের টুপি, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর মাথার সুরক্ষায় হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। তবে বাজারে হেলমেটের নামে বিক্রি হচ্ছে এমন কিছু পণ্য, যা দুর্ঘটনার সময় মাথা রক্ষায় কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মাত্র ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের হেলমেট পাওয়া যাচ্ছে রাজধানীর বাজারে। সস্তা ও আকর্ষণীয় নকশার পণ্য কিনলেও অনেক ক্রেতা এর নিরাপত্তামান যাচাই করছেন না। ফলে হেলমেট ব্যবহার করেও দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাত ও প্রাণহানির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১৫১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে একই সময়ে ১৫৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৯ জন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৫০ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৮টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৪৯৭টি। রাইড শেয়ারিং সেবা চালুর পর মোটরসাইকেলের নিবন্ধনও বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা নিয়মিত সামনে এলেও চালক ও আরোহীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক মানের হেলমেট দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় ৪৯টির মধ্যে ১২টি হেলমেটে ত্রুটি

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষাগারে গত ছয় মাসে আমদানি করা হেলমেটের ৪৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নমুনা মান যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অর্থাৎ পরীক্ষিত নমুনার প্রায় এক-চতুর্থাংশে গুণগত মানের ঘাটতি পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এলেও বাজারে নিম্নমানের পণ্যের উপস্থিতি, ক্রেতাদের অসচেতনতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

১৫০ টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হেলমেট

ঢাকার বাজারে মোটরসাইকেলের হেলমেট বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বাজার ঘুরে দেখা ও বিভিন্ন বিক্রয়তথ্য অনুযায়ী, ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার হেলমেটের পাশাপাশি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যেও বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

ভেগা, স্টিলবার্ড, স্টাডস ও গ্লাইডার্সের মতো ব্র্যান্ডের হেলমেটের দাম সাধারণত ১ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, উন্নত মানের বিদেশি ব্র্যান্ডের কিছু হেলমেটের দাম ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হেলমেট বিক্রেতা বলেন, বাজারে ১৫০ টাকার হেলমেটও পাওয়া যায়। তাঁর ভাষায়, ‘এগুলো আসলে হেলমেট না, আমরা ‘প্লাস্টিকের টুপি’ বলে থাকি। এটির বাইরে থাকে ক্যাপের মতো প্লাস্টিকের আবরণ ও ভেতরে পাতলা কাপড়ের আস্তরণ।’

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পণ্য রাইড শেয়ারিং চালকদের মধ্যে বেশি বিক্রি হয়। হাত দিয়ে জোরে চাপ দিলেই এগুলো ভেঙে যায়। তবে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার হেলমেটেরও ভালো চাহিদা রয়েছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

রাইড শেয়ারিং চালক রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের একটা হেলমেট একটু ভালো থাকলেও পেসেঞ্জার হেলমেট অতোটা ভালো থাকে না। কারণ, বাইকে হেলমেট রাখার জায়গা নাই। ময়লা হয়ে যায়, চুরি হয়ে যায়। আর যাত্রীরাও তেমন একটা পড়তে চান না। পুলিশের মামলার ভয়েই রাখতে হয় হেলমেট।’

হেলমেটের মান যাচাইয়ে কী দেখা হয়

মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য বাজারজাত করা হেলমেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মান ও নিরাপত্তা পরীক্ষার বিধান রয়েছে। আমদানি করা হেলমেটের নমুনা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সনদ গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় শুধু হেলমেটের বাইরের গঠন দেখা হয় না। দুর্ঘটনার সময় এটি আঘাত কতটা শোষণ করতে পারে, শক্ত বা ধারালো বস্তু ভেদ করে মাথায় পৌঁছাতে পারে কি না এবং মাথায় আটকে রাখার ফিতা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ও যাচাই করা হয়। পাশাপাশি তাপমাত্রা, পানি ও বিভিন্ন পরিবেশগত পরিস্থিতিতে হেলমেটের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।

মানসম্মত হেলমেট মৃত্যুঝুঁকি কমায়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালের ‘হেলমেটস: অ্যা রোড সেফটি ম্যানুয়াল ফর ডিসিশন-মেকার্স অ্যান্ড প্র্যাকটিশনার্স’ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নিরাপদ ও মানসম্মত হেলমেট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ছয় গুণেরও বেশি কমাতে পারে এবং মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ২০০৮ সালে ‘ককরেন ডেটাবেজ অব সিস্টেমেটিক রিভিউস’-এ প্রকাশিত ৬১টি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হেলমেট ব্যবহার মৃত্যুর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ এবং মাথায় আঘাতের ঝুঁকি ৬৯ শতাংশ কমাতে পারে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সব সময় এড়ানো সম্ভব না হলেও মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করলে মাথায় গুরুতর আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যুর ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমার তথ্য পাওয়া গেছে। তাই চালকদের নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের সময় অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

হেলমেট ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে সরকার ও অভিভাবক—উভয়ের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। অনেক অভিভাবক নিজেরা হেলমেট ব্যবহার করলেও সন্তানকে মোটরসাইকেলে নেওয়ার সময় তার জন্য হেলমেটের ব্যবস্থা করেন না। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চালকসহ প্রত্যেক আরোহীর জন্য আলাদা মানসম্মত হেলমেট থাকা জরুরি।

মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারের প্রচলন তেমন ছিল না। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এখন হেলমেট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে এখনো অনেকে পুলিশের মামলা এড়াতে কম দামের হেলমেট ব্যবহার করেন, যেগুলো নিরাপদ নয়।

তিনি বলেন, হেলমেটের মান নিশ্চিত করতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। তাঁর জানা মতে, এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অনুমোদন দেওয়া হলে বিএসটিআই অনুমোদিত হেলমেট ছাড়া অন্য হেলমেলের ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। অনুমোদন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না হওয়ায় বর্তমানে বিষয়টি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হেলমেট পরলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; সেটি মানসম্মত, সঠিক মাপের এবং যথাযথভাবে মাথায় আটকানো থাকা জরুরি। তাই ক্রেতাদের শুধু দাম বা নকশা দেখে হেলমেট না কিনে এর নিরাপত্তামান যাচাই করা প্রয়োজন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD