Logo

খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:২৩
খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
বেগম খালেদা জিয়া | ফাইল ছবি

৪৮ বছর পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি। তবে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দলের সাবেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটাই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এবার স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির ভবিষ্যৎ পথচলার বিষয়টি। দীর্ঘদিন দলের নেতৃত্বে থাকা এই নেত্রীর অবর্তমানে সংগঠনের ঐক্য, রাজনৈতিক কৌশল ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠা

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন ও সংকট পেরিয়ে বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দলটি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায়ের সঙ্গে তাই বিএনপির উত্থান-পতন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব

বিএনপির দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় দলের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকে তিনি সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

এরপর প্রায় চার দশক বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থেকে দল পরিচালনা করেন খালেদা জিয়া। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকার কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

বিজ্ঞাপন

সম্মিলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

তিনবার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হলে দ্বিতীয়বারের মতো সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া।

তবে তার রাজনৈতিক জীবন শুধু নির্বাচন ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তাকে যেতে হয়েছে।

২০০৭ সালের পর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সময়ে মামলা ও কারাবাসের মুখোমুখি হন তিনি। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সীমিত হয়ে পড়ে। বিএনপি এসব মামলাকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে খালেদা জিয়া মুক্তি পান। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।

দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটে।

বিজ্ঞাপন

অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে খালেদা জিয়া

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির আবেগ স্পষ্ট। দীর্ঘদিন তিনি শুধু দলের চেয়ারপারসনই ছিলেন না, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সাংগঠনিক ঐক্যেরও অন্যতম প্রধান প্রতীক ছিলেন।

তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা এখন নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক আদর্শ ও উত্তরাধিকার কীভাবে পরবর্তী নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হবে, সেটিও দলের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিজ্ঞাপন

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়

এই বাস্তবতায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে দলকে এগিয়ে নেওয়া, সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা এবং নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখা তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মরণ ও পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে নতুন নেতৃত্বে দলটি কীভাবে এগিয়ে যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিশেষ করে দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের সমন্বয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

৪৮ বছরে নতুন মোড়

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে এবং দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও আন্দোলন করেছে। নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশের রাজনীতিতে দলটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছে।

এই দীর্ঘ পথচলায় জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠাকালীন ভূমিকার পর সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গড়ে ওঠে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। এখন সেই নেত্রী নেই; রয়েছে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।

তাই খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়। তার উত্তরাধিকার ধারণ করে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি কীভাবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এগিয়ে যায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD