‘ছবর’ মানব চরিত্রের উন্নত এক ভূষণ; অতি প্রয়োজনীয় এক গুণ

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ছবরের সংজ্ঞা এবং প্রকারভেদঃ
বিজ্ঞাপন
'ছবর' মানব চরিত্রের উন্নত এক ভূষণ; অতি প্রয়োজনীয় এক গুণ। জীবনের সর্বক্ষেত্রে 'ছবর' গুণের প্রয়োজন। দুনিয়াবী কর্মে হউক, আখেরাতের কর্মে হউক, কিংবা খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার ক্ষেত্রেই অর্থ সংযম অবলম্বন করা, নাফসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা, হউক-সব ক্ষেত্রেই ছবর প্রয়োজন। 'ছবর' আরবী শব্দ-যাহার আভিধানিক বিচলিত না হওয়া, স্থির থাকা এবং বিপদে-আপদে, বালা-মুছিবতে ধৈর্য ধারণ করা ইত্যাদি।
পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে ছবরের চারটি শাখা দৃষ্ট হয়। যথাঃ
★ আল্লাহপাকের আদেশ প্রতিপালনে বা ফরয কার্যসমূহ আদায়ের ব্যাপারে ছবর করা।
বিজ্ঞাপন
★ নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ছবর করা।
★ অন্যলোক থেকে আগত দুঃখ-কষ্টে অর্থাৎ লোকনিন্দা বা কটুক্তি বা অন্য লোক থেকে আগত অত্যাচার বা নির্যাতনে ছবর করা।
★ বিপদে-আপদে, রোগ-শোক, বালা-মুছিবতে ছবর করা।
বিজ্ঞাপন
ছবর সম্পর্কে জানিতে হইলে উল্লিখিত চারটি পর্যায়ের বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন। এ নসিহতে উক্ত চারটি অবস্থারই যথাসম্ভব সংক্ষিপ্তাকারে বিশ্লেষণ করা হইতেছে।
মানবদেহে রূহ ও নাফসের বিবাদঃ
মানুষের এই দেহ একটি রাজ্য-যে রাজ্যে দুইটি বিবদমান গ্রুপ সদা যুদ্ধে লিপ্ত। একটি গ্রুপের নেতা অভিশপ্ত শয়তান। শয়তানের পক্ষে দেহ রাজ্যে আছে একজন সিপাহসালার (সেনাপতি) সহ একদল সুদক্ষ সৈন্য। শয়তানের পক্ষে দেহরাজ্যের সেনাপতি বা সিপাহসালার হইল ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ-মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া কামনা, বাসনা দুষ্ট নাফস এবং নাফসের অধীনে আছে একদল সৈন্য: যথাঃ কাম, ইত্যাদি।
বিজ্ঞাপন
অপরদিকে দেহস্থিত অন্য দলের নেতা হইল মানবরূহ বা পরমাত্মা এবং রূহের পক্ষে আছে একদল সৈন্য। যথাঃ- তওবা, যোহদ, তাকওয়া, ফকর, শোকর, রেজা, ছবর, তাওয়াক্কুল ইত্যাদি গুণাগুণ। আল্লাহতায়ালা কুন আদেশের আলোকে মানুষকে বিভিন্ন গুণাবলী সজ্জিত অবস্থায় রূহ প্রদান করেন। আলমে আরওয়াহতে এই রূহ নাফসের উপরে শক্তি প্রয়োগ করিয়া নাফসকে নিজের স্বভাবে স্বভাবিত করিতে সক্ষম। তাই আলমে আরওয়াহতে মানব নাফস রূহের গুণে গুণী। রূহ যেমন তথায় আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকে; তেমনি নাফসও তথায় আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকে; কিন্তু এই আদামাত অর্থাৎ দৈহিক (জড়) জগতে রূহ নাফসের উপর রূহানী জগতের অনুরূপ প্রভাব বা শক্তি প্রয়োগ করিতে সক্ষম নহে। এই জগতে রূহ এবং রূহের অধীনস্থ সৈন্যসামন্ত বড় দুর্বল। কারণ মানুষের এই জড় দেহের উপাদান হইল আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস। আর আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস থেকেই নাফস বা কু-প্রবৃত্তির উৎপত্তি। সেই কারণে প্রকারান্তরে দৈহিক উপাদানসমূহ নাফসকেই সহযোগিতা করে। ফলে জড় জগতে বা দৈহিক জগতে শয়তান, নাফস ও তাহার সৈন্য সামন্তের নিকটে দলবলসহ রূহ শৃংখলিত হয়। বন্দী হয়। ধীরে ধীরে রূহের চেতনা শক্তিও লোপ পায়। রুহ নাফসের দাসত্ব শুরু করে।
দয়াময় খোদাতায়ালা রূহকে বন্দীদশা থেকে মুক্তির জন্য, নাফসের শৃংখল থেকে উদ্ধারের জন্য নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন। নবী-রাসূল (আঃ) এর অবর্তমানে যুগে যুগে মুজাদ্দেদ প্রেরণ করিতেছেন। নবী-রাসূল বা ওলীয়ে কামেলগণ স্ব-স্ব আত্মিক শক্তি প্রয়োগ করিয়া মানব রূহকে নাফস, শয়তান বা দুনিয়ার প্রভাবমুক্ত করেন। ওলীয়ে কামেলের তাওয়াজ্জুহতে প্রাথমিক অবস্থায় রূহের চেতনা আসে এবং রূহ তদীয় সৈন্যসামন্ত অর্থাৎ ফকর, যোহদ, তাকওয়া, খওফ, ছবর ইত্যাদিকে জাগ্রত করাইতে প্রয়াস চালায়। রূহ এবং নাফসের টানাপড়েনের এই অবস্থায় মানুষ বড় পেরেশানীতে পড়ে। শয়তান, নাফস এবং তাহাদের পক্ষের সৈন্যসামন্ত মানুষকে পাপ ও গোনাহে লিপ্ত রাখিতে চেষ্টা করে। নাফস মানুষকে বলে, "তোমার ইবাদতের দরকার নাই। তুমি ভোগ-বিলাস করিবে। আরাম-আয়েশে মত্ত থাকিবে। তুমি আহার করিবে, নিদ্রা যাইবে, ফুর্তি করিবে। তোমার প্রয়োজন অর্থের। অর্থের প্রয়োজনে তুমি চুরি করিবে, ডাকাতি করিবে; হত্যা, রাহাজানি, ছিনতাই-যাহা ইচ্ছা, তাহাই করিবে। পাপ বা গোনাহ বলিয়া কিছুই নাই। তুমি কাহারো পরোয়া করিও না। খোদাকে মান্য করিও না।" এমনিভাবে নাফস মানুষকে কুপরামর্শ দেয়।
অন্যদিকে রূহ মানুষকে বুঝায়ঃ "হে মানব! তুমি দুইদিনের জন্য সৃষ্ট নও। তোমার পরকাল আছে, আখেরাত আছে। হাশরের ময়দানে তোমাকে উপস্থিত হইতে হইবে। যদি তুমি সেদিন লজ্জিত বা অপদস্থ হইতে না চাও, তবে নাফসকে পরিত্যাগ কর, নাফসের সাথে শত্রুতা কর, আল্লাহর আদেশ প্রতিপালন কর, নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত থাক। যদি তুমি নাফসকে অনুসরণ কর, তবে তুমি ক্ষতিগ্রস্থ হইবে, আল্লাহর কোপানলে পড়িবে” ইত্যাদি।
বিজ্ঞাপন
উপরের আলোচনায় বুঝা যায় যে, নাফস ও শয়তান মানুষকে বিপথগামী করিতে চেষ্টা করে, অন্ধকারের দিকে ঠেলিয়া দেয়। কিন্তু রূহ মানুষকে আলোর পথ দেখাইতে চেষ্টা করে, খোদামুখী করিতে প্রয়াস চালায়। দুই বিবাদমান দলের চাপে নিষ্পিষ্ট মানুষ কখনওবা নাফসের দিকে: আবার কখনও বা রূহের দিকে থাকে। মানুষের এই করুণ অবস্থাকে বুঝানোর জন্য একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। মানবদেহ যেন একটি খেলার মাঠ। এখানে এ-টিম এবং বি-টিম, দুইটি দল ফুটবল খেলিতেছি। এ-টিমের গোলরক্ষক হইলেন রাসূলে পাক (সাঃ) এবং বি-টিমের গোল রক্ষক হইল অভিশপ্ত শয়তান। এ-টিমের পক্ষে রক্ষণভাগের খেলোয়ার হইল মানব রুহ এবং অপরাপর খেলোয়ারগণ হইল- ফকর, যোহদ, তাকওয়া, ছবর, শোকর ইত্যাদি। এবং বি-টিমের রক্ষণভাগের খেলোয়ার হইল নাফস এবং অন্যান্য খেলোয়ারগণ হইল-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ-মাৎসর্য ইত্যাদি। মানুষ হইল সেই ফুটবল যাহা একবার এ-টিমের খেলোয়ারদের পায়ে; কখনো বা বি-টিমের খেলোয়ারদের পায়ে।
বুঝানোর জন্য উদাহরণ দেওয়া হইল; যদিও ইহা যথার্থ অবস্থা নহে। কারণ ফুটবল একটি নির্জীব পদার্থ। কিন্তু মানুষ নির্জীব নহে; তাহার চেতনা শক্তি আছে। এই চেতনা শক্তিই মানুষের একমাত্র রক্ষাকবজ।
তবে দেহগত অবস্থায়: নাফস ও শয়তানের প্ররোচনায় মানুষের সেই চেতনাশক্তি গুপ্ত বা সুপ্ত থাকে। কোন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের আত্মিক তাওয়াজ্জুহতে সেই শক্তি পুনরায় জাগ্রত হয়। তখন মানুষ রূহের পরামর্শমত নাফস ও শয়তানের সাথে শত্রুতা শুরু করে এবং শরীয়তের আদেশ-নিষেধের ভূষণে নিজেকে সজ্জিত করিতে প্রয়াস চালায়। এই সময় প্রয়োজন হয় এমন এক প্রকার শক্তি-যে শক্তিবলে মানুষ স্বীয় নাফসের বিরোধিতা করিয়া শরীয়তের উপর অবিচল থাকিতে সক্ষম হয়। এই শক্তিই "ছবর”। হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছবরের সংজ্ঞায় বলেন, যে শক্তির প্রভাবে মানুষ স্বীয় প্রবৃত্তির উত্তেজনাকে দমনপূর্বক হৃদয়ে সদ্ভাব ও ধর্মীয় মনোবৃত্তি প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে-তাহাকেই ছবর বলে। (কিমিয়ায়ে সাদাত)।
বিজ্ঞাপন
উল্লিখিত আলোচনা থেকে ছবরের চারটি শাখার মধ্যে প্রথম দুইটি শাখার মর্ম বা তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়। প্রথম শাখায় বলা হইয়াছে যে, আল্লাহতায়ালার আদেশ প্রতিপালনের ক্ষেত্রে ছবর করা এবং দ্বিতীয় শাখায় বলা হইয়াছে যে, নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ছবর করা। মূলতঃ আল্লাহর হুকুম পালন বা নিষেধ মান্য করা-উভয়ের মধ্যেই নাফসের বিরোধিতা আছে; আছে নাফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। আর সংগ্রামে বিজয়ের জন্য প্রয়োজন শক্তির। সেই শক্তিই হইল ছবর বা ধৈর্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন,
رَبُّ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ
অর্থাৎ-“তিনি নভোমন্ডল-ভূমন্ডল ও তন্মধ্যস্থ সবকিছুর প্রতিপালক। সুতরাং তাহারই ইবাদত বন্দেগী কর এবং ধৈর্যসহ আনুগত্য প্রকাশ কর। (সূরা মারইয়ামঃ ৬৫)
বিজ্ঞাপন
ছবরের তৃতীয় শাখায় বলা হইয়াছেঃ অন্য থেকে আগত দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা। ইহা খুবই প্রয়োজন। কথায় বলে, "ভাল কর্মে বাধা বেশী।” কথাটি বাস্তব। সমাজের দিকে চোখ ফিরাইলেই তাহা বুঝা যায়। যে কোন কল্যাণ ধর্মী কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। আর সেই কাজ যদি ধর্ম সম্পর্কীয় হয়, তবেতো কথাই নাই- বাধা আসে সর্বদিক থেকে।
বিভিন্ন ধারায় এই বাধা আসে। লোক নিন্দা বা কটূক্তি হিসেবে, কিংবা অত্যাচার-নির্যাতনের মাধ্যমে। তেমন ক্ষেত্রে ছবরের গুণ থাকা বিশেষ প্রয়োজন। অন্য থেকে আগত তেমন অত্যাচার-নির্যাতনে আল্লাহপাক মানুষকে ধৈর্য ধরার তাগিদ দিয়াছেন: প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া ক্ষমা প্রদর্শনের ইংগিত দিয়াছেন। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, "ভাল ও মন্দ-এক সমান নয়।
মন্দের প্রত্যুত্তর ভালোর দ্বারা দাও; তোমার সংগে যে দুশমনি করে-সে সত্বরই বন্ধুতে পরিণত হইবে; এবং এই কথা সেই পালন করে যে ছাবের বা ধৈর্যশীল এবং এই সুযোগ সেই লাভ করে যে সৌভাগ্যবান।"
বিজ্ঞাপন
প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করিয়া দেওয়া কিংবা সীমার মধ্যে থাকিয়া প্রতিশোধ লওয়া-উভয়তেই প্রয়োজন ছবর বা ধৈর্য গুণ।
আল্লাহতায়ালা রাসূলে পাক (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে তাই বলিয়াছেনঃ
وَاصْبِرُ عَلَى مَا يَقُوْلُوْنَ وَاهْجُرْ هُمْ هَجْرًا جَمِيلًا
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"[হে মুহাম্মদ! (সাঃ)] তাহারা আপনাকে যাহাকিছু বলিতেছে (নিন্দা বা কটুক্তি করিতেছে), আপনি তাহার উপর ছবর করুন এবং সম্ভাবের সহিত তাহাদিগকে ত্যাগ করুন।" (সূরা মুজাম্মিলঃ ১০)
আল্লাহতায়ালা আবার বলিয়াছেনঃ
وَلَقَدْ نَعْلَمُ إِنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُوْلُوْنَ - فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"হে মুহাম্মদ! (সাঃ)] আমি জানি, শত্রুদের কথায় আপনার হৃদয় সংকীর্ণ ও বিমর্ষ হইতেছে, আপনি [সেই চিন্তা বর্জন পূর্বক। আপনার প্রভুর প্রসংসার সহিত তাহার তাছবিহ পাঠ করিতে থাকুন।" (সূরা হিজরঃ ৯৭-৯৮)
ছবরের চতুর্থ শাখায় বলা হইয়াছেঃ বিপদে-আপদে, বালা-মুছিবতে, রোগ-শোকে ছবর করা বা ধৈর্য ধারণ করা।
মানুষের উপর আপতিত বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবত বা বিপর্যয়ের দ্বিবিধ কারণ কুরআন-হাদীসে পরিলক্ষিত হয়।
প্রথমতঃ পাপ বা গোনাহের কারণে বিপদ-আপদ বা মুছিবত আপতিত মানুষকে সতর্ক করিবার জন্য, মানুষের বোধোদয়ের জন্যে, আল্লাহতায়ালা হয়। মানুষ পাপ করে, গোনাহ করে, আল্লাহকে ভুলিয়া যায়-এমতাবস্থায় শাস্তির নমুনা স্বরূপ কিছু বিপদ-আপদ প্রয়োগ করেন-যাহাতে মানুষ পাপের পথ পরিত্যাগ করিয়া আল্লাহমুখী হয়। এই সমস্ত বিপদ-আপদ ব্যক্তি পর্যায়েও আসিতে পারে; আবার সমষ্টি পর্যায়েও হইতে পারে। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ঘোষণা করেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ
অর্থাৎ-"স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের জন্য বিপর্যয় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। আল্লাহ তাহাদেরকে (অপরাধীদেরকে) কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাইতে চান, যাহাতে তাহারা (আল্লাহর পথে) ফিরিয়া আসে।" (সূরা রূমঃ ৪১)
উল্লিখিত আয়াতে বুঝা যায়ঃ মানুষের কৃতপাপের ফলে দুনিয়াতে বিপর্যয় নামিয়া আসে। বিপর্যয় বলিতে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, সবকিছু থেকে আল্লাহর রহমত উঠিয়া যাওয়া ইত্যাদিকে বুঝায়। মানুষ আল্লাহকে ভুলিয়া গিয়াছে-তাই কোন জিনিসেই আজ বরকত নাই। পানিতে মাছ নাই, জমিনে ফসল নাই, গাছে ফল নাই, মানবতা নাই, শিষ্ঠতা নাই, ভদ্রতা নাই, কাহারো অন্তরে বা দেলে শান্তি নাই। কেন? ইহার কারণ একটাই। আর তাহা হইল-খোদাতায়ালার নাফরমানি করা; খোদাতায়ালাকে ভুলিয়া থাকা।
গোনাহগার ব্যক্তি তাহার গোনাহের কারণে যে একাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাহা নহে; কখনও কখনও একজনের গোনাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় গোটা জনপদ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কিছু লোকের পাপ বা গোনাহের কারণে যদি কোন জনপদে ভূমিকম্প হয়; তবে সেই এলাকার সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়; এমনকি এলাকাস্থিত পশু-পাখী, কীট-পতংগ সবকিছু। তাই হাশরের মাঠে একদল গোনাহগার থাকিবে-যাহাদের বিরুদ্ধে সেদিন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট-পতংগ পর্যন্ত অভিযোগ তুলিবে।
পাপের কারণে আপতিত উক্তরূপ বিপদ-আপদ বা বিপর্যয়ও খোদাতায়ালার দয়া বা অনুকম্পা হিসেবে আসে। আল্লাহপাক চানঃ মানুষ সতর্ক হউক, সচেতন হউক: মানুষ মিথ্যাকে ত্যাগ পূর্বক সত্যকে আড়াইয়া ধরুক। বুঝিবার সুবিধার্থে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়ঃ-
"মুকাশাফাতুল কুলুব" নামক কিতাবে দেখা যায়ঃ বনী-ইসরাইল গোত্রে জনৈক লম্পট ও ভবঘুরে লোক ছিল। নানারূপ আপরাধে সে লিপ্ত ছিল। তাহার অত্যাচারে নগরবাসী সকলেই অতিষ্ঠ ছিল। নগরবাসীদের কেহ কেহ তাহাকে সুপথে আনয়নের চেষ্টা করেন বটে; কিন্তু ব্যর্থ হন। লোকটির স্বেচ্ছাচারিতায় ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ নগরবাসী অতঃপর মহান খোদাতায়ালার নিকট মুক্তির জন্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহতায়ালা তাহাদের দু'আ কবুল করেন। হযরত মুসা (আঃ) এর নিকট আল্লাহ ওহীর মারফতে বলেন, "হে মুসা! বনী-ইসরাইল গোত্রে এক ভন্ড যুবক আছে, তাকে শহর থেকে বহিস্কার করে দাও; যাতে শুধুমাত্র এক ব্যক্তির পাপের কারণে সমগ্র নগর বাসীর উপর আমার গযব নাযিল না হয়।" হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক লোকটিকে শহর হইতে বহিস্কার করিলেন। লোকটি শহর হইতে বহিষ্কৃত হইয়া পার্শ্ববর্তী এক বস্তিতে আশ্রয় গ্রহণ করিল। আল্লাহতায়ালা হযরত মুসা (আঃ) এর প্রতি পুনরায় ওহী পাঠাইয়া যুবকটিকে বস্তি হইতে বহিস্কারের নির্দেশ দিলেন। হযরত মুসা (আঃ) তাহাই করিলেন। অবশেষে লোকটি কোন এক নির্জন প্রান্তরে আশ্রয় নিলো। সেখানে মানুষ বা পশুপাখী এমনকি তরুলতা বলিতে কিছুই ছিল না। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে লোকটি অসুস্থ হইয়া পড়ে। নির্জন প্রান্তরে অসুস্থ অবস্থায় লোকটি ভাবিতে থাকেঃ আজ আমার নিকটে পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন কেহই নাই। কে আমার সেবা শুশ্রুষা করবে? কে আমার জন্য আল্লাহর নিকট হাত তুলবে?
দৈহিক অসুস্থতার সাথে যোগ হয় একাকিত্বের যন্ত্রণা। লোকটি অঝরে কাঁদিতে থাকে। তাহার মনের গতি পরিবর্তিত হয়। পাপের অনুশোচনা আসে। সে খোদাতায়ালার নিকট অতীত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাসহ বলে, "হে খোদা! আপনি আমাকে আমার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও স্ত্রী থেকে সুদূর প্রান্তরে নিক্ষেপ করেছেন। জীবনের এই করুণ মুহূর্তে দয়া করে আপনার রহমত ও করুণা থেকে বঞ্চিত করবেন না। তাদের বিচ্ছেদে আপনি আমার অন্তর দগ্ধিভত করেছেন, মেহেরবানী করে আমার পাপের কারণে আমাকে দোযখের অগ্নিতে দগ্ধিভত করবেন না।"
লোকটির এই করুণ আর্তনাদ আল্লাহ কবুল করিলেন। আল্লাহতায়ালা লোকটির মা ও স্ত্রীর আকৃতিতে দুইজন হুর, সন্তান সন্ততির আকৃতিতে জান্নাতের কিছু শিশু-কিশোর এবং পিতার আকৃতি দিয়ে একজন ফেরেশতা পাঠাইয়া দিলেন। তাহারা সকলেই লোকটির কল্যাণে খোদাতায়ালার নিকট ক্রন্দন করিতে লাগিল। তাহাদের সকলের উপস্থিতিতে লোকটি আনন্দচিত্তে আল্লাহর সাথে মিলিত হইল এবং আল্লাহপাক তাহার সমস্ত গোনাহ মাফ করিয়া দিলেন। এই ভাবে পবিত্রাবস্থায় সে দুনিয়া ত্যাগ করিল।
অতঃপর আল্লাহতায়ালা হযরত মুসা (আঃ) এর নিকট ওহী পাঠাইলেনঃ হে মুসা! তুমি অমুক বিজন প্রান্তরে গিয়ে দেখ, আমার এক প্রিয় বান্দার ইন্তেকাল হয়েছে, তুমি তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা কর। আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুসা (আঃ) সেই বিজন প্রান্তরে গিয়ে সেই লোকটিকে দেখিলেন- যাহাকে তিনি খোদাতায়ালার নির্দেশেই কিছুদিন পূর্বে শহর থেকে বস্তিতে এবং বস্তি থেকে এই বিজন প্রান্তরে বিতাড়িত করিয়াছিলেন। তিনি আরও দেখিলেন, লোকটির আশে-পাশে কিছু বেহেশতী হুর-যাহারা তাহাকে বেষ্টন করিয়া আছে। ইহা দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া মুসা (আঃ) আল্লাহতায়ালাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে মহান প্রভু! এই লোকটিতো সে-ই, যাকে আমি আপনার হুকুমে শহর ও বস্তি থেকে বহিস্কার করেছি। আল্লাহতায়ালা বলিলেন, হে মুসা! আমি তার প্রতি দয়া করেছি। তাহার পাপরাশিকে ক্ষমা করেছি। কারণ সে এই বিজন প্রান্তরে স্বীয় জন্মভূমি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসহায় অবস্থায় কান্নাকাটি করেছে। আমি তার মা'র আকৃতিতে বেহেশতের হুর, তার পিতার সাদৃশ্যে বেহেশতের ফেরেশতা এবং তাহার স্ত্রীর আকৃতিতে অপর এক হুর পাঠিয়েছি। এরা সকলেই আমার কাছে তার এই দুঃখ-যাতনা ভরপুর মুসাফেরী অবস্থার প্রতি রহম ও করুণার জন্য প্রার্থনা করেছে। একজন আশ্রয়হীন মুসাফির যখন মারা যায়, তখন আসমান ও যমীনের সমগ্র মখলুক তার প্রতি দয়া ও রহমত বর্ষণের জন্য প্রার্থনা করতে থাকে; সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি তার প্রতি দয়া ও করুণা প্রদর্শন করব না? অথচ আমিই
একমাত্র অনন্ত মেহেরবান ও অসীম দয়ালু।" অতঃপর হযরত মুসা (আঃ) লোকটির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করিলেন।
উপরের কাহিনী থেকে বুঝা গেল যে, পাপের কারণেও আল্লাহতায়ালা মানুষের উপর যে বিপদ দেন-তাহা দেন দয়া বা অনুকম্পা হিসাবে। ইত্যাকার বিপদ-আপদেও কর্তব্য ধৈর্য ধারণ করা, পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বা আল্লাহমুখী হওয়া।
বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবত আসার দ্বিতীয় কারণঃ আল্লাহতায়ালা মানুষের উপর বিপদাপদ দেন। পরীক্ষা স্বরূপ বিপদ আসে ঈমানদারদের উপর, খোদাঅন্বেষীদের উপর, মোমিনদের উপর, ওলী-আল্লাহগণের উপর বা নবী ও রাসূল (আঃ) গণের উপর। বিপদের মাধ্যমে আল্লাহপাক ঈমানদারের ঈমান পরীক্ষা করেন, খোদাতালাশীর খোদা পাওয়ার আকাংখার মাত্রা যাচাই করেন, মোমিন, ওলী-আল্লাহ এবং নবী ও রাসূলগণের পারলৌকিক ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। সর্বোপরি সকলেরই ছবর বা ধৈর্যের নিরীক্ষা করেন। উক্ত রূপ পরীক্ষা মূলক আগত বিপদ-আপদে ছবরের একান্ত প্রয়োজন। ছবর বা ধৈর্য গুণের মাধ্যমেই পরীক্ষা স্বরূপ আগত বিপদে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَجِعُونَ
অর্থাৎ-“এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করিব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ছাবেরদের অর্থাৎ ছবরকারীদের। যখন তারা বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।” (সূরা বাকারাহঃ আয়াত নং ১৫৫ ও ১৫৬)।
আল্লাহতায়ালা যাহাকে যত বেশী মহব্বত করিতে চান, যাহাকে যত অধিক পারলৌকিক মর্যাদা দিতে চান-তাহাকে তত অধিক বিপদে আপদে ফেলেন।
হাদীসে বর্ণিত আছেঃ রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, আল্লাহতায়ালা যখন মানুষকে অতিমাত্রায় ভালবাসেন, তখন তাহাদের উপর নানাবিধ বিপদ-আপদ চাপাইয়া দেন। আর যাহাদিগকে পূর্ণমাত্রায় ভালবাসেন, তাহাদিগকে "একতেনা" করেন। ছাহাবীগণ এক্সেনা" শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিয়াছিলেন, কাহারও ধনসম্পদ সমূলে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া এবং পরিজনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করিয়া ফেলাকে "একতেনা" বলা হয়।
আধ্যাত্মিক জগতে সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হইলেন নবী ও রাসূলগণ। নবী রাসূল (আঃ) গণের উপরই বিপদ-আপদ তাই অধিক আসিয়াছে। নবী (আঃ) গণের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী আমাদের পয়গম্বর নবী করীম (সাঃ)। আর হয়তো সেই কারণেই আল্লাহতায়ালা তাহার উপর পরীক্ষার স্ট্রীম রোলার চালনা করিয়াছেন।
হাদীস শরীফে আছেঃ একদা এক সাহাবী দয়াল নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সবচেয়ে বেশী বিপদ ও মুছিবত কাহার উপর আপতিত হইয়াছে? ইরশাদ হইলঃ পয়গম্বরদের উপর। তাহার পর এমনিভাবে পর্যায় ক্রমে অন্যান্য লোকদের উপর। (সুনানে ইবনে মাযাহ)।
পয়গম্বরগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বিপদ আসিয়াছে দয়াল নবী (সাঃ) এর জীবনে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন ধীর, স্থির ও অবিচল।
জন্মের পূর্বেই তিনি পিতাকে হারান। অতি শৈশবে মাকে হারান। পিতৃমাতৃহীন শিশু নবীর লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ে দাদাজান আব্দুল মোত্তালিবের উপর। কিন্তু শিশু নবী (সাঃ) এর দুই বছর বয়সে তিনিও পরপারে চলিয়া যান। অতঃপর চাচা আবু তালেবের স্নেহে তিনি বড় হইতে থাকেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পরে প্রচার জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন কাফেরদের বৈরীতা ও দুশমনীতে মক্কায় অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়; ঠিক তেমন সময়ে চাচা আবু তালেব ইন্তেকাল করেন। অতঃপর তাহার জীবনের একাকিত্বের সংগিনী, বিপদে-আপদে সান্তনাদায়িনী হযরত খাদিজাতুল কোবরাও (রাঃ) দুনিয়াত্যাগ করেন। একে একে সকলেই চলিয়া যান।
রাসুলে পাক (সাঃ) এর দুই ছেলে ও চারজন মেয়ে ছিল। অন্য বর্ণনায় আট ছেলে ও চার মেয়ে ছিল। একমাত্র মা-ফাতেমাতুজ্জোহরা (রাঃ) ব্যতীত সকল ছেলে-মেয়েই শৈশবে বা পরিণত বয়সে তাঁহারই চোখের সামনে ইন্তেকাল করিয়াছেন। একের পর এক এতগুলো বিয়োগ যন্ত্রণা এক জীবনে অন্য কাহারো হৃদয়ে আঘাত হানে নাই। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অবিচল। মুহূর্তের জন্যও সামান্যতম বেছবর তিনি হন নাই।
দয়াল নবী (সাঃ) এর মত অন্যান্য পয়গম্বরগণও ছবরের উচ্চ পর্যায়ের গুণে গুণী ছিলেন। সকলেই ছিলেন ছবর গুণের এক একটি জলন্ত মশালসম। তাই হয়তো আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করিলেন,
فَاصْبِرْ كَمَ صَبَرَ أُولُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ
অর্থাৎ-"প্রজ্ঞাবান মর্যাদাশীল রাসূলগণ যেভাবে ছবর (ধৈর্যাবলম্বন) করিয়াছেন, তোমরা সেইভাবে ধৈর্যাবলম্বন কর।" (সূরা আহক্বাফঃ ৩৫)
হযরত আইয়্যুব (আঃ) এর উপর অজস্র মুছিবত আপতিত হইয়াছিল। তাহার ধন-সম্পদ সবই বিনষ্ট হইল। বিবিগণ একে একে তাহাকে পরিত্যাগ করিল। দেহ রোগাক্রান্ত হইল। তিনি ১৮ বছর অসুস্থ ছিলেন। তাহার শরীরস্থ ঘায়ে পোকা পর্যন্ত পড়িয়াছিল। কিন্তু বিন্দু পরিমান ধৈর্যচ্যুতিও তাঁহার ঘটে নাই। তাঁহার প্রশংসায় আল্লাহপাক তাই বলিলেন, অবশ্যই আমি আইয়্যুবকে ধৈর্যশীল হিসেবে পাইয়াছি, সে কত না উত্তম বান্দাহ এবং সে ছিল আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা সোয়াদঃ রুকু-৪)
সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কোরবানী করিবার জন্য মহান খোদাতায়ালা আদেশ করেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে। আদেশ প্রাপ্ত হযরত ইব্রাহিম (আঃ) একমাত্র পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কোরবানী করিবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে পিতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুত্র ইসমাইল (আঃ) জানিতে পান। কিন্তু একটুও বিচলিত হন নাই। কি অপরিসীম ছবর গুণে তিনি বিভূষিত ছিলেন? পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে জবাই করিতে উদ্যত হন; দৃঢ় চিত্তের অধিকারী পুত্র তখন পিতাকে বলিলেন,
قَالَ يَابَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ - سَتَجِدُنِي إِنْشَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّبِرِينَ
অর্থাৎ-"হে পিতা! যাহা তোমাকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, তাহা পালন কর: আল্লাহর ইচ্ছায় অবশ্যই আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাইবে।" (সূরা সাফ্ফাতঃ ১০২)। ছবর বা ধৈর্যগুণের কি অপূর্ব নমুনা!
এখানে প্রশ্ন থাকিয়া যায়- কিভাবে পয়গম্বর (আঃ) গণ এমন অপূর্ব ছবর গুণে বিভূষিত হইলেন? মূলতঃ মারেফাত জগতের গভীরে "মোরকাবায়ে শরহে ছদর" নামক একটি মাকাম আছে। এই মাকামের গুণ ও জ্ঞান যিনি অর্জন করিতে পারেন; যিনি এই মাকামে নির্বিঘ্নে ছায়ের করিতে পারেন, তাহার বক্ষ আল্লাহতায়ালার জাত মিশ্রিত সিফাতি নূরের প্রবাহে প্রশস্ত হয়।
মানব ছিনা নূরের এক মহাসমুদ্রঃ
মানব ছিনায় পাঁচটি নূরের সমুদ্র আছে-কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফা। মোরাকাবায়ে শরহে ছদরের মাকাম অর্জনকারী সাধকের বক্ষস্থিত পাঁচটি নূরের সমুদ্র একত্রিত হইয়া নূরের এক মহাসমুদ্র তৈরী করে। সাধকের বক্ষ প্রশস্ত হয়। খোদাতায়ালার পক্ষ থেকে আগত যে কোন বিপদ-আপদ বা মুছিবত এই স্তরের সাধক অবিচলচিত্তে বা হাসি মুখে গ্রহণ করিবার শক্তি রাখেন। সকল পয়গম্বরের ছিনা প্রশস্ত ছিল। পয়গম্বরগণের মধ্যে সর্বাধিক প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন রাসূলে পাক (সাঃ) -যাহার শানে আল্লাহপাক বলেন-
أَلَمْ نَشْرَحْلَكَ صَدْرَكَ
অর্থাৎ-"আমি কি আপনার ছিনাকে প্রশস্ত করি নাই?” (সূরা আলাম নাম্রাহঃ ১)
রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ ও অনুগমনের মাধ্যমে যে সকল উম্মত মূল মারেফাত কারখানার উক্ত মোরাকাবায়ে শরহে ছদরের মাকাম অর্জন করিয়াছেন, তিনিও ছবরের শ্রেষ্ঠতম অবস্থার গুণে গুণান্বিত হইতে পারিয়াছেন। যেমনঃ হযরত গউস পাক (রঃ), হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ), হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ), হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) প্রমুখ। সকলের জীবনে অসংখ্য বিপদ-আপদ আসিয়াছে: কিন্তু সকলেই প্রশান্ত ও স্থির চিত্তে সবই বরণ করিয়াছেন। ছবরের এই অবস্থাই হইল শ্রেষ্ঠতম অবস্থা। এই অবস্থাকে বলা হয় "ছবরে জামীল" অর্থাৎ সর্বাংগ সুন্দর ছবর।
একটি দৃষ্টান্ত এখানে তুলিয়া ধরিঃ হযরত আবু তালহা (রাঃ) এর পত্নী হযরত উম্মে সালিক রুমাইয়া (রাঃ) বলিয়াছেন, আমার স্বামী একদা কার্যোপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিলে আল্লাহতায়ালার ইচ্ছানুযায়ী আমাদের একটি অসুস্থ পুত্রের মৃত্যু হয়। আমি মৃত্যু পুত্রের আপদমস্তক চাদরে ঢাকিয়া রাখি। ক্ষণকাল পরে আমার স্বামী ঘরে ফিরিয়া পুত্রের অবস্থা জানিতে চাহিলে আমি বলিলাম-পুত্রের অবস্থা অন্যান্য রজনীর চেয়ে আজকে অনেকটা ভাল। তিনি চিন্তামুক্ত হইলেন। আমি তাহার খাবারের ব্যবস্থা করিলাম। তিনি তৃপ্তিসহ আহার গ্রহণ করিলেন। অতঃপর অন্যান্য রজনী অপেক্ষা সেই রাত্রে অধিক সুন্দর বেশভূষায় সুসজ্জিত হইলাম। আমার স্বামী নিশীকালীন সুখও উপভোগ করিলেন। অতঃপর আমি তাহাকে বলিতে লাগিলামঃ আমার কোন এক প্রতিবেশীকে আমি একটি দ্রব্য ধার দিয়াছিলাম। আমি যখন উহা ফেরত চাহিলাম, তখন সেই প্রতিবেশী শোকে-দুঃখে বড়ই আহাজারী করিতে লাগিল। স্বামী বলিলেন, ইহাতো বড়ই আশ্চর্যের কথা। মনে হয়, লোকটি নিতান্তই আহমক। তখন আমি বলিলাম, আপনার ঐ ক্ষুদ্র শিশুটিকে আল্লাহতায়ালা আপনার নিকট আমানত ও ধার স্বরূপ অর্পণ করিয়াছিলেন। এখন তিনি সেই ধার ফেরত লইয়াছেন। ইহা শুনিয়া আমার স্বামী বলিলেন,
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَجِعُوْنَ
অর্থাৎ-"নিশ্চয় আমরা সকলে আল্লাহতায়ালার জন্যই; এবং আমরা সকলে তাহারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা বাকারাঃ ১৫৬)
পরদিন সকালে আমার স্বামী রাসূলে করীম (সাঃ) নিকট উপস্থিত হইয়া পূর্ববর্তী রাত্রের সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করিলে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেনঃ আল্লাহ তোমাদের গত কল্যকার রাত্রি মঙ্গলময় করুন। অতঃপর রাসূলে করীম (সাঃ) বলিলেন-মেরাজ রজনীতে বেহেশতে গমন করিলে তথায় আমি আবু তালহার স্ত্রী রুমাইয়াকে দেখিতে পাইয়াছিলাম।
এতক্ষণ ছবর এবং ছবরের চারটি শাখার বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করা হইল। এই নসিহত অধ্যায়ণে যে কোন আগ্রহী পাঠক ছবর সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে পারিবে। কিন্তু কেবলমাত্র জ্ঞান অর্জন করিলেই ছাবের বা ধৈর্যশীল হইতে পারিবে না। ছাবের হইতে হইলে প্রয়োজন ছবরের উল্লিখিত চারটি শাখার গুণে গুণী হওয়া। যাহারা উক্ত চারটি শাখার গুণ অর্জন করিতে সক্ষম হইবে-তাহাদেরকেই ছাবের বলা যাইবে। ছবরের যথাযথ ছওয়াব তাহারাই পাইবে। হাশরের মাঠে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করিবেন, ধৈর্যধারণকারীগণ কোথায়? ইহা শুনামাত্র যাহারা উঠিয়া দাঁড়াইবেন-তাহারা সকলেই ছবরের সবগুলো অবস্থার গুণেই গুণান্বিত থাকিবেন। তাহাদেরকে বিনা হিসাবে বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইবে। উক্ত সব ধৈর্যধারণকারী বা ছবরকারী বান্দাদের উদ্দেশ্যেই আল্লাহপাক বলেন,
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّبِرُونَ أَجْرُهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থাৎ- "ধৈর্যশীলদেরকে তাহাদের বিনিময় বিনা হিসেবে প্রদান করা হইবে।" (সূরা যুমারঃ ১০) এই সমস্ত ছবরকারীদের উপর আল্লাহতায়ালার সিফাত ও জাতের কারেন্ট (জ্যোতি) অবিরাম প্রবাহিত থাকে। তাই আল্লাহপাক বলেন,
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ
অর্থাৎ-“নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা ছাবেরদের সংগে আছেন।" (সূরা বাক্কারাঃ ১৫৩)
খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার ক্ষেত্রে ছবরের একান্ত আবশ্যক। খোদাকে চেনা বা জানার পথে দুই ধরণের লোক আছে। এক প্রকারের লোক আছে-যাহারা স্বেচ্ছায় খোদাতায়ালার দিকে অগ্রসর হইতে চায়; যাহাদেরকে মুরীদ বা খোদাতালাশী বলা হয়। আর এক শ্রেণীর লোক আছে-খোদাতায়ালা যাহাদেরকে চান: খোদা স্বয়ং যাহাদেরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করেন। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোককে বলা হয় মোরাদ। খোদাপ্রাপ্তির পথে তুমি মুরীদ বা মোরাদ যাহাই হও না কেন; তোমার উপর বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবত পরীক্ষাস্বরূপ আসিবেই। তছবিহের দানার মত একের পর এক বিপদ আসিবে। বিপদই হইবে তোমাকে যাচাই-এর মানদন্ড। কথায় বলে;
বিপদে বন্ধুকে চেন,
রণাংগনে বীরে।
তুমি সত্যিকারে খোদাতায়ালাকে চাও কিনা, তাহা বিপদ ও মুছিবতের মাধ্যমেই খোদাতায়ালা যাচাই করিয়া নিবেন।
হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব মুরীদ বা খোদাঅন্বেষীকে বিপদ ও মুছিবতের 'বাহন' হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি তাহার "ফতুহুল গায়েবে" বলেন, "যদি তুমি মুরীদ বা আল্লাহতায়ালার প্রত্যাশী হও, তবে সাধনার পথে তুমি বাহনে পরিণত হইবে। রাজ্যের যত সব কঠিন ও কষ্টকর ভারসমূহ তোমাতে বোঝাই করা হইবে। কেননা, তুমি তো সাধনার পথে তালেব বা অনুসন্ধানকারী। আর অনুসন্ধানকারীকে তাহার ঈপ্সিত বা প্রার্থিত বস্তু লাভ না হওয়া পর্যন্ত, প্রিয় মিলনে সফল না হওয়া পর্যন্ত এবং উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত দুঃখ ও কষ্ট উঠাইতে হয়।"
আপতিত বিপদ-আপদে মুরীদকে ধীর, স্থির থাকিতে হয়; অবিচল থাকিতে হয়; ধৈর্যসহ সমস্ত পরীক্ষার পর্দাকে অতিক্রম করিতে হয়। যিনি ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করিতে পারেন; তিনিই মারেফাতে ভূষিত হন। তিনিই খোদাকে চিনিতে পারেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের ধৈর্য গুণ ছাড়া পীরে কামেলের খেদমত করা যায় না। আবার দীর্ঘসময় ব্যাপী পীরে কামেলের খেদমত ব্যতীত ছবর বা ধৈর্যের উচ্চ পর্যায়ের গুণ অর্জন করা যায় না। হযরত মুসা (আঃ) কে আল্লাহতায়ালা এলমে লাদুন্নী শিক্ষার জন্য হযরত খিজির (আঃ) এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। মুসা (আঃ) খোদাতায়ালার নির্দেশমত পথ চলিয়া খিজির (আঃ) কে পাইলেন; তাহার খেদমতে থাকিলেন; কিন্তু এলমে লাদুন্নীর জ্ঞান অর্জন করিতে পারিলেন না-কেবলমাত্র ধৈর্যের অভাবে। যাহার প্রমাণ আমরা পবিত্র কুরআনে পাই। সূরা কাহাফে দেখা যায়ঃ হযরত খিজির (আঃ) মুসা (আঃ) কে বলিতেছেন, "আপনি না, আর ঐ কথার উপর কিভাবে আমার সাথে ধৈর্য রাখিতে পারিবেন না, ধৈর্য ধারণ করিবেন, যাহার জ্ঞান আপনার নাই।" (সুরা কাহাফ)
অবশ্য আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহতায়ালা পরবর্তীতে হযরত মুসা (আঃ) কে এলমে লাদুন্নীর জ্ঞান দান করিয়াছিলেন। কারণ তিনি উলুল আজম পয়গম্বর ছিলেন। একজন উলুল আজম পয়গম্বর এলমে লাদুন্নীর জ্ঞানশূন্য থাকিতে পারেন না।
মূলতঃ খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের ক্ষেত্রে বা এলমে লাদুন্নী শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম শর্তই যে ছবর বা ধৈর্য-তাহাই "মুসা-খিজির" কাহিনীতে উন্মোচিত হইয়াছে।
পীরের সান্নিধ্যে থাকাবস্থায় ছবরের প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় টিকিয়া গেলে আপন পীর মুরীদকে তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন-যাহার ফলে মুরীদ বা খোদাঅন্বেষী নাফস ও শয়তানের শৃংখলমুক্ত হইয়া মারেফাত রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারে; সর্বাংগ সুন্দর ছবরের গুণে সজ্জিত হইতে পারে।
কাজেই হে জাকেরান সকল! তোমরা পীরের খেদমত করিতে থাক। ধৈর্যের বিভিন্ন শাখার গুণ অর্জনের চেষ্টা কর। আল্লাহপাক তোমাদেরকে দয়া করুন। আমীন!







