Logo

খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার পথে খওফ ও তাকওয়া আবশ্যক

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০:২৪
খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার পথে খওফ ও তাকওয়া আবশ্যক
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ খওফ এবং তাকওয়াঃ

বিজ্ঞাপন

খোদাতায়ালাকে চেনা বা জানার পথে খওফ ও তাকওয়ার গুণ অর্জন করা একান্ত আবশ্যক। 'খওফ' অর্থ ভয়; এবং তাকওয়া অর্থ খোদাভীতি, পরহেজগারী, পরিহার করা, দূরে থাকা ইত্যাদি। খওফ ও তাকওয়ার মধ্যে সম্পর্ক বড় নিবিড়।

কাহারো দেলে খোদাতায়ালার ভয় সৃষ্টি হইলে তাহার মধ্যে এমন এক অবস্থার পয়দা হয় যে, সে ভাল ও মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করিয়া ভালকে গ্রহণ এবং মন্দকে বর্জন করে অর্থাৎ খোদাতায়ালার আদেশ-নিষেধের সাজে নিজেকে সজ্জিত করে। দেলের এই অবস্থা বা গুণকেই তাকওয়া বলে। খওফ (ভয়) থেকেই দেলে তাকওয়া বা পরহেজগারীর উৎপন্ন হয়। তাকওয়া সম্পর্কে আল্লামা শিবলী নো'মানী (রঃ) তদীয় "সিরাতুন্নবী" পুস্তকে বলেন, আল কুরআনের ব্যবহারিক ভাষায় তাকওয়া বলিতে অন্তরের সেই অবস্থা ও পরিবেশকে বুঝায় যাহা আল্লাহতায়ালাকে সদা হাজের ও নাজের হওয়ার বিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং অন্তরে ভাল ও মন্দের তারতম্য নির্ণয়ের সাথে সাথে ভালর প্রতি আকর্ষণ বর্ধিত হয় এবং মন্দের প্রতি বিতৃষ্ণা ও ঘৃণাকে প্রকট করে। অপর কথায় তাকওয়া হইতেছে অন্তরের সেই অনুভূতি ও অন্বেষার নাম-যাহার প্রতিফলনের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করার তীব্র বাসনা পয়দা হয়।"

খোদাতায়ালাকে চেনার পথে উভয় গুণ অর্জনই একান্ত প্রয়োজন। শুধু খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের ক্ষেত্রেই নহে, পারলৌকিক মুক্তির ক্ষেত্রেও উল্লিখিত দুই গুণের আবশ্যক। খোদাতায়ালা তদীয় পরিচয় প্রদানের জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করিয়া এই আদামাতে প্রেরণ করিয়াছেন। নবী রাসূলের মাধ্যমে আমাদেরকে তদীয় আদেশ-নিষেধ সম্বলিত জীবন বিধান বা শরীয়ত প্রদান করিয়াছেন। খোদাপ্রদত্ত জীবন-বিধান বা শরীয়তের অর্থাৎ জাহেরী ও বাতেনী শরীয়তের অনুশীলনের মাধ্যমে খোদাতায়ালাকে চেনা যায়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত খোদাতায়ালার ভয় দেলে পয়দা না হইবে: ততক্ষণ পর্যন্ত শরীয়তের প্রতি আগ্রহ কাহারো আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সাজে সজ্জিত হইতে বাধা দেয় নাফস ও দেলে পয়দা হওয়া সম্ভব নহে। কারণ শরীয়ত প্রতিপালনে অর্থাৎ শয়তান। নাফসের আকাংখা ও শয়তানের প্ররোচনা দক্ষিভূত করা যায় খোদাভীতির অগ্নি দ্বারা। সে-ই কেবল নাফসের শংখল বা শয়তানের মন্ত্রণা থেকে মুক্ত হইয়া শরীয়ত (জাহেরী-বাতেনী)-এর সাজে সজ্জিত হইতে পারে, যাহার দেলে খওফ ও তাকওয়ার অগ্নি উৎপন্ন হইয়াছে।

বিজ্ঞাপন

পাক কুরআনে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন-

يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ

অর্থাৎ-'হে ঈমানদার ব্যক্তিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।' (সূরা মায়েদা, আয়াত-৩৫)।

বিজ্ঞাপন

আল্লাপাক আরও বলেন,

وَاتَّقُوا اللَّهَ طَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيْرُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ

অর্থাৎ-'এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করিতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।' (সূরা হাশর, আয়াত-১৮)

বিজ্ঞাপন

সূরা মায়েদাতে আল্লাহ আরও এরশাদ করেন,

فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ

অর্থাৎ-'অতঃপর তোমরা লোকদেরকে ভয় করিও না; ভয় আমাকেই কর।' (আয়াত নং-৪৪)

বিজ্ঞাপন

পাক কুরআনের উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে ইহা সহজেই বোধগম্য হয় যে, খোদাতায়ালার ভয় দেলে উৎপন্ন করা সকলের জন্যই জুরুরী বা ফরজ। খোদাভীতি ঢাল সরূপ কাজ করে। শয়তান ও নাফসে আম্মারার পক্ষ হইতে যত তীর বান্দার দিকে আসে, খোদাঅন্বেষী সহজেই খোদাভীতি বা তাকওয়ার ঢালের মাধ্যমে তাহা প্রতিহত করে। দেলে খোদার ভয় না থাকিলে পাপ বা গোনাহ থেকে বাঁচা কাহারো

পক্ষেই সম্ভব নয়। তাকওয়াই মানুষকে পাপ বা গোনাহ থেকে বিরত রাখে।

একদা আমীরুল মু'মেনীন হযরত উমর (রাঃ) ছাহেব অপর এক সাহাবী হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাকওয়া কি? হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাঃ) বলিলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন, আপনি কি কখনও এমন কোন পথ অতিক্রম করিয়াছেন, যাহা পরিপূর্ণভাবে কণ্টকাকীর্ণ? তিনি বলিলেন, কয়েক বারই এমন পথ অতিক্রম করিয়াছি। হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাঃ) বলিলেন, এমন ক্ষেত্রে আপনি কি করিয়াছেন? হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন, আচল গুটাইয়া একান্ত সাবধানতার সাথে চলিয়াছি। হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাঃ) বলিলেন, ব্যস, তাকওয়া ইহারই নাম। এই হইল একটি কাঁটাবন; পাপের কাঁটায় পরিপূর্ণ। কাজেই দুনিয়ায় দুনিয়া হই এমনভাবে চলা এবং জীবন-যাপন করা উচিৎ, যাহাতে পাপের কাঁটায় আচল ফাসিয়া না যায়। ইহার নাম তাকওয়া-যাহা সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ

বিজ্ঞাপন

তাকওয়া অবলম্বনকারীকে বা তাকওয়ার গুণ অর্জনকারীকে বলা হয় মুত্তাকী বা খোদাভীরু বা পরহেজগার। প্রকৃত মুত্তাকী খোদাতায়ালার ভয়ে সর্বদাই ভীত থাকেন; নাজানি কখন কোন কারণে পদস্খলন হয়-সেই চিন্তায় নির্জনে অশ্রুপাত করেন। পাপ বা গোনাহ থেকে প্রকৃত মুক্তাকী সর্বদাই দূরে থাকেন। একমাত্র তাকওয়ার গুণ বিবর্জিত ব্যক্তিই খোদাতায়ালার নাফরমানি করে; পাপ বা গোনাহের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে।

তাকওয়ার বিভিন্ন স্তরঃ তাকওয়া বা খোদাভীতির তিনটি স্তর আছে।

◇ তাকওয়াউল আওয়াম বা সাধারণ পর্যায়ের তাকওয়া।

বিজ্ঞাপন

◇ তাকওয়াউল খাওয়াছ বা বিশেষ পর্যায়ের তাকওয়া।

◇ তাকওয়াউল আখাছিল খাওয়াছ বা বিশেষের বিশেষ পর্যায়ের বা শ্রেষ্ঠতম পর্যায়ের তাকওয়া বা খোদাভীতি।

তাকওয়ার উল্লিখিত তিনটি পর্যায়ের বিশ্লেষণের সাথে নাফসের কিছু আলোচনা প্রয়োজন। স্তরভেদে নাফসের সাথে তাকওয়ার সম্পর্ক আছে। নাফসে আম্মারা স্তরের মানুষ তাকওয়ার গুণ বিবর্জিত বা খোদাভীতিশূন্য। এই স্তরের মানুষের প্রভু তাহার নাফস স্বয়ং: তাই তাহারা সদা আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত থাকিয়া নাফসে আম্মারার পায়রবী করিতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

নাফসে আম্মারার উপরের স্তরকে নাফসে লাওমা বলা হয়। নাফসে লাওমা স্তরের মানুষের দেলে কখনও কখনও খোদাভীতি উৎপন্ন হয়: খোদার ভয়ে নির্জনে ক্রন্দন করে; আবার পরক্ষণেই তাহার দেল থেকে খোদাভীতি চলিয়া যায়, সে পাপ বা গোনাহ করিতে থাকে। লাওমা স্তরের খোদা অন্বেষীর দেলের মুখ যখন ঊর্ধ্বদিকে বা খোদার দিকে থাকে; তখনই তাহার মধ্যে তাকওয়া বা খোদাভীতি পয়দা হয়। আবার তাহার দেল যখনই নিম্ন দিকে হয়, তখনই দেলে উৎপন্ন খোদাতায়ালার ভয় বা খোদাভীতি উড়িয়া যায়; দুনিয়ায় আকর্ষণ বা নাফসের বাসনা দেলে আসিয়া জমা হয়। ইহাই তাকওয়ার প্রাথমিক স্তর। খোদাঅন্বেষীদের মধ্যে অধিকাংশই এই স্তরের মুত্তাকী বা পরহেজগার। বাতেনী শরীয়তের জ্ঞানবিবর্জিত আলেম সমাজের প্রায় সকলেই এই স্তরের তাকওয়া অবলম্বনকারী। এই শ্রেণীর তাকওয়ার গুরুত্ব উচ্চ না হইলেও একেবারে মূল্যহীন নহে। তাকওয়ার এই স্তরকেই তাকওয়াউল আওয়াম বলা হয়।

তাকওয়াউল খাওয়াছঃ

ইহা তাকওয়ার উন্নত স্তর। আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং আত্মিক ভ্রমণ ব্যতীত তাকওয়ার এই স্তরে পৌঁছানো সম্ভব নহে। খোদাঅন্বেষী যখন আধ্যাত্মিক জগতের দায়েরায়ে এমকান অতিক্রম করিয়া বেলায়েতে ছোগরার শেষ প্রান্তে পৌঁছায়; তখন আল্লাহতায়ালার আয়ালের বা ক্রিয়াকলাপের নূর তাহার সিদ্ধ হয়। আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা সম্পর্কীয় ব্যাপক জ্ঞান তাহার অর্জিত হয়। সে বুঝিতে পারেঃ এই নিখিল বিশ্বের সবকিছুই এক খোদাতায়ালার ইচ্ছায় সংঘটিত হইতেছে। গ্রহ-উপগ্রহের ঘূর্ণন যেমন খোদাতায়ালার ইচ্ছায় হইতেছে; তৃণ-লতার পত্রের আন্দোলনও তেমনি খোদার ইচ্ছাতেই হইতেছে। নিখিল বিশ্বের সবকিছুর উপরই খোদাতায়ালার একচ্ছত্র ক্ষমতা ও আধিপত্য দৃষ্টে এবং তদসংগে নিজের অক্ষমতা ও অসহায়তা উপলব্ধি করায় এই স্তরের সাধকের দেল তাকওয়া বা খোদাভীতিতে উদ্বেলিত হয়; খোদাতায়ালার ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। পাপ বা গোনাহের প্রতি বিন্দু পরিমাণও আকর্ষণ তাহার থাকে না। সে খোদাতায়ালার ইবাদতে নিয়োজিত থাকে। অর্থাৎ সে স্বেচ্ছায় পাপ বা গোনাহকে

বিজ্ঞাপন

বর্জন করিয়া নেক কাজে আত্মনিয়োগ করে। ফলে খোদাতায়ালা তাহার উপর সন্তষ্ট হয়; সেও খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট হয়। "তাকওয়াউল খাওয়াছ" বা বিশেষ তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত এই শ্রেণীর মুত্তাকীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেনঃ

رضى الله عنهم وَرَضُوا عَنْهُ ط ذلك لمَن خَشَى رَبَّهُ

অর্থাৎ- 'আল্লাহ তাহাদের প্রতি প্রসন্ন, তাহারও আল্লাহতায়ালার প্রতি প্রসন্ন, এই রূপ অবস্থা সেই ব্যক্তির জন্য-যে ব্যক্তি তাহার প্রভুকে ভয় করে।' (সূরা বাইয়্যেনাহঃ ৮)

বিজ্ঞাপন

"নাফসে মোৎমাইন্ন্যা” স্তরের খোদাঅন্বেষীবর্গ তাকওয়ার এই উন্নত অবস্থার গুণে গুণী। খোদাভীতি তাহাদের দেলে সদা জাগ্রত থাকে।

এখানে উমাইয়া বংশীয় খলিফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীযের কথা উল্লেখ করা যায়। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিপতি হইয়াও তিনি ফকীরী জীবন যাপন করিতেন; সাত্ত্বিক আদর্শের অনুসারী ছিলেন। ইমাম জয়নাল আবেদীন (রঃ) ছাহেবের পবিত্র সাহচর্যে তাহার নাফস লাওমাকে অতিক্রম করিয়া মোৎমাইন্ন্যায় পৌঁছাইয়াছিল। তিনি তাকওয়াউল খাওয়াছ-এর গুণে গুণবান ছিলেন। তাই খোদাতায়ালার ভয়ে তাহার দেল পূর্ণ থাকিত।

একদা তাহার এক দাসী ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া তাঁহাকে নিবেদন করিলঃ হে আমীরুল মো'মেনীন! আমি এক বিচিত্র স্বপ্ন দেখিলাম। খলীফা বলিলেনঃ বর্ণনা কর। দাসী বলিতে লাগিলঃ আমি দেখিলাম, দোযখের অগ্নি প্রজ্জলিত করা হইয়াছে এবং উহার উপর পুলছুরাত স্থাপন করা হইয়াছে। ফেরেশতাগণ একে একে খলিফাগণকে বিচারস্থলে আনয়ন করিতেছেন। প্রথমে দেখিলাম, ফেরেশতাগণ খলিফা আব্দুল মালেক ইবনে মারোয়ানকে পুলছুরাতের উপর অনয়ন করিয়া বলিলেন, এই পুলের উপর দিয়া হাঁটিয়া যাও, তিনি চলিতে আরম্ভ করিয়া সামান্য মাত্র অগ্রসর হইতেই দোযখের মধ্যে পড়িয়া গেলেন। খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয বলিলেনঃ শীঘ্র বল, অতঃপর কি দেখিলেন? দাসী বলিলঃ তৎপর তাহার পুত্র অলীদকে আনা হইল, তিনিও তাহার পিতার ন্যায় দোযখে পড়িয়া গেলেন। খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয বলিলেন, শীঘ্র বল, অতঃপর কি দেখিলে? দাসী বলিতে লাগিলঃ অতঃপর দেখিলাম, সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালেককে আনয়ন করা হইয়াছে। তিনিও আব্দুল মালেকের ন্যায় দোযখে পড়িয়া গেলেন। বলিতে আরম্ভ করিল, অতঃপর দেখিলাম, আপনাকে আনয়ন করা খলিফা উমর বলিলেন, ইহার পরে কি দেখিলে, তাড়াতাড়ি বল। দাসী হইয়াছে। দাসী এই পর্যন্ত বলিতেই খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয দেখিয়া দাসী খুব চেচাইয়া বলিতে লাগিলঃ আমি আল্লাহর শপথ এক বিকট চিৎকার দিয়া মূর্ছিত হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন। ইহা করিয়া বলিতেছি যে, আপনি নিরাপদে পুল অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেলেন। এই কথাটি দাসী খুব চিৎকার করিয়া ও চেচাইয়া বার বার বলিতে লাগিল; কিন্তু খলিফার সেদিকে লক্ষ্যই নাই। তিনি অজ্ঞান লাগিলেন। তাকওয়া বা খোদাভীতি তাহার মধ্যে এতই প্রকট ছিল যে, অবস্থায় ভূতলে পড়িয়া গড়াগড়ি দিতে লাগিলেন এবং হাত পা আছড়াইতে দাসীর এত চিৎকারেও তাহার মূর্ছা ভংগ হইল না।

তাকওয়াউল আখাছিল খাওয়াছঃ

তাকওয়াউল খাওয়াছ-এর ঊর্ধ্বে তাকওয়ার আরও একটি অবস্থা আছে-যাহাকে "তাকওয়াউল আখখাছিল খাওয়াছ" বলা হয়। ইহাই তাকওয়ার শ্রেষ্ঠতম অবস্থা। তাকওয়ার শ্রেষ্ঠতম স্তরের গুণ অর্জিত হয় মারেফাতের মূল দফতরের শেষের শেষ মাকামে তথা “হকিকতে আহমদী" থেকে। আসল মারেফাত রাজ্য শুরু হয় আকরাবিয়াত বা খোদাতায়ালার হেরেম থেকে। আকরাবিয়াত হইতে শুরু হইয়া মহব্বত, শান, শয়ুনাত এবং ইতেবারকে অতিক্রম করিয়া নিছক জাত পর্যন্ত মূল মারেফাত কারখানার সীমা। মারেফাত সমুদ্রের গভীরের এক দফতর-হকিকতে আহমদী। হকিকতে আহমদীতে উন্নীত ছালেক খোদাতায়ালার অসীম ক্ষমতা, দোর্দন্ড প্রতাপ, নির্ভীকতা, মুখাপেক্ষীহীনতা, কাহারো পরোয়া না করা ইত্যাদি গুণের যেমন পূর্ণ পরিচয় লাভ করে; তেমনি নিজের অক্ষমতা, দুর্বলতা, অসহায়তা, নীচতা, মূর্খতা, হীনতা ইত্যাদি দোষ ত্রুটি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করে। নিজের পরিচয় এবং খোদার পরিচয়-উভয়ই এই মাকামে উপনীত সাধকের হাছিল হয়। ফলে আপনা থেকেই খোদাভীতি বা তাকওয়ায় সাধকের দেল উদ্বেলিত হয়। অর্থাৎ হকিকতে আহমদী মাকামের সাধক তাকওয়ার হাকীকী গুণে গুণান্বিত হন। এই স্তরের সাধককে নাফসে মোলহেমা বা মোহাদ্দেসা পর্বের সাধক বলা হয়।

পয়গম্বর (আঃ) গণ নিষ্পাপ ছিলেন; তথাপিও তাহারাই খোদার ভয়ে অধিক সন্ত্রস্ত থাকিতেন: কেন? কারণ তাহারাই খোদাতায়ালার অপ্রতিহত ক্ষমতা ও অসীম প্রতাপ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। খোদাতায়ালার বেপরোয়া গুণ সম্পর্কেও তাহারাই অধিক জ্ঞান রাখিতেন। তাহারা জানিতেনঃ খোদাতায়ালা যখন যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারেন। তাহার ক্ষমতার কোন পারাপার নাই। তিনি যদি ইচ্ছা করেন, মুহর্তেই নিখিল বিশ্বকে ধ্বংস করিয়া দোযখে নিক্ষেপ করিতে পারেন। এই জন্য কাহারো নিকট তাহার কোন কৈফিয়তও দিতে হইবে না। এ সম্পর্কে পয়গম্বরগণই ভাল জানিতেন। তাই তাহারা খোদাতায়ালার ভয়ে অঝরে কাঁদিতেন: খোদাভীতিতে তাহাদের দেল উথলিত থাকিত। পয়গম্বরশ্রেষ্ঠ রাসূলে পাক (সাঃ) খোদাতায়ালার উক্ত গুণাবলী অর্থাৎ সিফাত এবং জাত সম্পর্কে সকলের চেয়ে বেশী জ্ঞাত ছিলেন। তাই তিনিই খোদাকে সর্বাধিক বেশী ভয় করিতেন। এই প্রসংগে তিনি বলিতেন, আল্লাহতায়ালার স্বভাব, গুণাবলী (সিফাত) ও ক্ষমা সম্পর্কে আমার জ্ঞান তোমাদের সকলের চেয়ে বেশী; তাহার প্রতি আমার ভয়ও তোমাদের সকলের চেয়ে অধিক।" তিনি মাঝে মাঝে এত অধিক কাঁদিতেন, তাহার বক্ষ হইতে ডেগের ফুটন্ত পানির মত ক্রন্দনের শব্দ বাহির হইত।

অপরাপর পয়গম্বরগণ সকলেই তাকওয়ার হাকীকী গুণে গুণান্বিত ছিলেন। যেমন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন স্বীয় পদস্খলনের কথা স্মরণ করিতেন, তখনই অজ্ঞান হইয়া পড়িতেন এবং দূর হইতে তাহার বুকের ধড়ফড় আওয়ায শোনা যাইত। এমনি এক অবস্থার সময় একদা আল্লাহতায়ালা হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে প্রেরণ করিলেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে বলিলেন-মহা পরাক্রমশালী আল্লাহতায়ালা আপনাকে সালাম জানাইয়াছেন এবং জিজ্ঞাসা করিয়াছেন যে, আপনি কি এমন কোন লোক দেখিয়াছেন, যে তাঁহার বন্ধুকে ভয় করে? হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, হে জিব্রাইল! আমার পদস্খলনের কথা যখন স্মরণ হয়, তখন শেষ পরিণামের কথা চিন্তা করিয়া আমি বিভোর হইয়া যাই; আল্লাহর সাথে গভীর বন্ধুত্বের কথা তখন আমার স্মরণ থাকে না।" ইহা ছিল পয়গম্বরগণের খোদাভীতি বা তাকওয়ার নমুনা।

পয়গম্বরগণের পরিপূর্ণ অনুসরণ, অনুগমন ও তোফায়েলের মাধ্যমে মারেফাতের শেষের শেষ মাকামে পৌঁছাইয়া কিছু কিছু উম্মতেরা তাকওয়ার হাকীকী গুণ অর্জন করিয়াছেন; তাহারাও পয়গম্বরগণের মতই সর্বদাই খোদাভীতিতে উদ্বেলিত থাকিতেন। যেমনঃ

থাকিতেন। মাঝে মাঝেই বলিতেন, "হায়! আমি যদি কোন বৃক্ষ হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব-যিনি খোদার ভয়ে সর্বদাই ভীত হইতাম, তবে কতই না ভাল হইত। আমাকে হিসাব নিকাশের দায়ে পড়িতে হইত না।"

হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব পবিত্র কুরআন শরীফের কোন আয়াত শ্রবণ করিলে মর্ছিত হইয়া পড়িতেন এবং কোন কোন সময় তাহার মূর্ছা এমন গুরুতর হইত যে, কয়েকদিন পর্যন্ত শয্যাশায়ী হইয়া থাকিতেন। লোকজন তাহাকে দেখিতে আসিত। আল্লাহতায়ালার ভয়ে তিনি এত অধিক ক্রন্দন করিতেন যে, অবিরাম ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হওয়ার কারণে তাঁহার গন্ডদ্বয়ের উপর দুইটি কৃষ্ণবর্ণ রেখা পড়িয়া গিয়াছিল। তিনি প্রায়ই বলিতেন, "হায়! কতই ভাল হইত, যদি উমর মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ না হইত।" একদা তিনি উটে আরোহন পূর্বক কোথাও যাইতেছিলেন, পথিপার্শ্বস্থ কোন এক গৃহে এক ব্যক্তি কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করিতেছিল। তিনি যখন সেই পথ অতিক্রম করিতেছিলেন, ঠিক সেই সময় পাঠক তেলাওয়াত করিল,

إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِع

অর্থাৎ-'নিশ্চয় তোমার প্রভুর আযাব ঘটিবেই ঘটিবে।' (সূরা তুরঃ৭) আয়াতটি শ্রবণ মাত্র হযরত উমর (রাঃ) এর দেলে ভীষণ ভয় সঞ্চারিত হয়। ভয়ে অবসন্ন হইয়া পড়িবার উপক্রম হইলে তিনি উষ্ট্র হইতে নামিয়া নিকটস্থ একটি দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়া বসিয়া পড়েন। শক্তি লোপ পাইয়া যাওয়ায় লোকজন আসিয়া তাহাকে ধরাধরি করিয়া গৃহে লইয়া গেল। এই ঘটনায় এক মাস যাবৎ তিনি পীড়িত ছিলেন। অথচ পীড়ার কারণ কেহই বুঝিতে পারেন নাই।

উচ্চস্তরের ওলী আল্লাহসকল তাকওয়ার হাকীকী গুণসমৃদ্ধ ছিলেন। উচ্চতম পর্যায়ের তাকওয়া বা খোদাভীতি বা পরহেজগারীর গুণ তাহারা অর্জন করিতে পারিয়াছিলেন। তাই শেষ নিঃশ্বাসের চিন্তায় তাহারা সদা চিন্তিত থাকিতেন। যদি শেষ নিঃশ্বাস আল্লাহর ইয়াদের সহিত বাহির না হয়-তাহা হইলে সারা জীবনের ইবাদতই যে পন্ড হইবে; এই ভয়ে তাহারা সারা জীবন ক্রন্দন করিতেন। তাকওয়ার হাকীকী গুণে গুণান্বিত সাধকবর্গ অধিক চিন্তাযুক্ত হওয়ার আরও এক কারণ এই যে, তাহারা জানেনঃ খোদাতায়ালা "খায়রুল মাকেরীন" অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ রহস্যময়। তাহার ক্ষমতার যেমন পারাপার নাই, তেমনি তাহার রহস্যেরও শেষ নাই।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছেঃ একদা দয়াল নবী (সাঃ) এবং হযরত জিব্রাইল (আঃ) উভয়ে আল্লাহতায়ালার ভয়ে রোদন করিতে ছিলেন। আমি তোমাদিগকে নির্ভয় করিয়াছি, তথাপি তোমরা কেন রোদন এমন সময় আল্লাহতায়ালা তাহাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ করিতেছ? তাহারা উত্তরে বলিলেন, প্রভু হে! আমরা উভয়ে তোমার রহস্যময় অভিপ্রায়ের গুঢ়তত্ত্ব বুঝিতে অক্ষম হইয়া ভয়ে জড়সড় হইয়া পড়িয়াছি।

পয়গম্বর (আঃ) গণ এবং ওলীয়ে কামেলবর্গ-সকলেই উচ্চ পর্যায়ের মুত্তাকী ছিলেন। তাই তাহাদের উপর আল্লাহর রহমত ও মহব্বতের স্রোত অবিরাম প্রবাহিত হইত।

আল্লাহপাক এরশাদ করেন, "যাহারা স্বীয় খোদাকে ভয় করে তাহাদের জন্য হেদায়েত ও রহমত।” (সূরা আরাফ)

পূর্বেই বলা হইলঃ যথার্থ তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জিত হয় হকিকতে আহমদীর মাকামে। এই মাকাম খোদাতায়ালার জাতি নূরের সমুদ্রের গভীরে অবস্থিত। এই মাকামকে মাহবুবিয়াতের মাকাম বলা হয়। এই মাকামে উন্নীত ছালেকের উপর খোদাতায়ালার প্রেমের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়। আল্লাহপাক কুরআন শরীফে তাই বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ

অর্থাৎ-'অবশ্যই আল্লাহপাক মুত্তাকীদের ভালবাসেন।' (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৭৬)।

সূরা তওবার মধ্যেও আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই আল্লাহপাক তাকওয়ার অধিকারী ব্যক্তিগণকে ভালবাসেন।' (আয়াত নং-৪)

তাকওয়ার গুরুত্ব ও ফজীলতঃ

দুনিয়ায় মানুষের মান মর্যাদা নিরুপিত হয় অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি হইবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। যাহার দেলে যতটুকু তাকওয়া পরিলক্ষিত হইবে, তাহাকে সেই অনুপাতে মর্যাদা প্রদান করা হইবে। যাহার দেল খোদাভীতিশুন্য থাকিবে: পারলৌকিক মুক্তিই সে লাভ করিতে সক্ষম হইবে না। অন্যদিকে তাকওয়ার শ্রেষ্ঠতম অবস্থায় যিনি সজ্জিত হইবেন অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম অবস্থার গুণ যিনি অর্জন করিতে পারিবেন, তিনি মর্যাদা ও কৌলিন্য প্রাপ্তিতেও শ্রেষ্ঠতম স্তরেই থাকিবেন।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছেঃ কিয়ামতের ময়দানে জগতের সমস্ত মানবকুলকে একত্রিত করিয়া এমন গুরু গম্ভীর ও উচ্চ রবে ঘোষণা করা হইবে যে, নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সকলেই তাহা সমভাবে শুনিতে পাইবে। বলা হইবেঃ হে মনুষ্যগণ! তোমাদের সৃষ্টিকাল হইতে অদ্যাবধি আমি তোমাদের কথা শুনিয়া আসিতেছি। আজ তোমরা আমার কথা মনোযোগ সহকারে শুন। এখন আমি তোমাদের কৃতকার্য সমূহ তোমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করিব। তোমরা তোমাদের সম্মান ও মর্যাদা কুলীন বংশের উপর স্থাপন করিয়াছিলে, আমিও তোমাদের মর্যাদা এবং কৌলিন্য কিসে তাহা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিলাম। কিন্তু তোমাদেরই স্থাপিত মর্যাদা ও কৌলিন্যকে তোমরা উন্নত রাখিয়াছ এবং আমার নির্ধারিত সম্মান ও কৌলিন্যকে তুচ্ছজ্ঞানে দমাইয়া রাখিয়াছ। আমি তোমাদের মর্যাদা সম্পর্কে বলিয়াছিলাম,

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَكُمْ

অর্থাৎ-"নিশ্চয় সেই ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে মর্যাদায় ও গৌরবে সর্বশ্রেষ্ঠ যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক খোদাভীরু বা পরহেজগার। (সূরা হুজুরাতঃ১৩)

আমার এই ঘোষণার বিরুদ্ধে তোমরা বলিয়াছিলেঃ অমুকের পুত্র অমুকই বংশ মর্যাদায় সর্বাপেক্ষা কুলীন এবং সর্বাধিক সম্মানী। আজ আমি আমার স্থাপিত ও নির্ধারিত কৌলিন্যের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তোমাদের নির্ধারিত কৌলিন্যের হীনতা ও অসারতা প্রমাণ করিতেছি, এই বলিয়া তিনি সম্বোধন করিবেন, হে মোত্তাকীগণ! তোমরা কোথায়? তাড়াতাড়ি আস। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ একটি পতাকা উত্তোলন করিয়া অগ্রে অগ্রে চলিতে থাকিবেন এবং খোদাভীরু মোত্তাকীগণ বা পরহেজগারগণ উহার পাছে পাছে চলিতে থাকিবেন। এই প্রকার শোভাযাত্রা সহকারে পরহেজগারগণ বিনা হিসেবে বেহেশতে প্রবেশ করিবেন।

উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) ছাহেবা বলিয়াছেনঃ একদা উপস্থিত লোকগণ দয়াল নবী (সাঃ) এর নিকট আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! আপনার উম্মতগণের মধ্যে কোন ব্যক্তি বিনা হিসেবে বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি প্রাপ্ত হইবে কি? দয়াল নবী (সাঃ) বলিলেন, যে ব্যক্তি তাকওয়া বা খোদাভীতিতে নিজের পাপ স্মরণপূর্বক রোদন করিবে, সে ব্যক্তি বিনা হিসেবে বেহেশতে প্রবেশ করিবে।"

তাকওয়াকে পোশাকের সাথে তুলনা করা হইয়াছে। পোশাক বা লেবাস মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। শুধু তাহাই নহে, লেবাস পরিধান করিলে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়; ধুলা-বালি, ময়লা, থেকে দেহকে হেফাযত করা যায়; তেমনি তাকওয়া বা খোদাভীতির গুণ অর্জন করিলে দেলকে পাপের বা গোনাহের দুর্গন্ধময় ময়লা থেকে হেফাযত করা যায়; শয়তান ও নাফসের ভয়ংকর আক্রমণ থেকেও নিজেকে রক্ষা করা যায়। তাই তাকওয়াকে আল্লাহপাক লেবাসের সহিত তুলনা করিয়া ঘোষণা করিয়াছেন,

وَلِبَاسُ التَّقْوى لَا ذَلِكَ خَيْرٌ

অর্থাৎ-'এবং তাকওয়ার লেবাস, এটাই সবচেয়ে উত্তম।' (সূরা আরাফঃ ২৬)

তাকওয়ার তিনটি স্তরের আলোচনার ক্ষেত্রে বলা হইয়াছেঃ তাকওয়ার প্রথম স্তর অর্থাৎ তাকওয়াউল আউয়াম অর্জিত হয় নাফসে লাওমার স্তরে। তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তর অর্জিত হয় নাফসে মোৎমাইন্ন্যার জগতে খোদাতায়ালার তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল বা ক্রিয়াকলাপের নূরে। কিন্তু তাকওয়ার তৃতীয় ও শ্রেষ্ঠতম স্তর অর্জিত হয় মারেফাত রাজ্যের শেষের শেষ মাকাম হকিকতে আহমদীতে-তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরের অবিরাম প্রবাহে।

তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূরে সাধকের নাফস পবিত্র হয়, লতিফাসমূহ জাগ্রত হয়, দেহস্থিত ৩৩ কোটি লতিফাতে আল্লাহর ৯৯ নামের ঝলক বা জ্যোতির প্রবাহ কার্যকর থাকে। ফলে এই স্তরের সাধক দুনিয়াে শান্তি তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তরের গুণ অর্থাৎ "তাকওয়াউল খাওয়াড"- এর এক বেহেশতি শান্তি লাভ করে। এখানে উল্লেখ্য যে, উপরে বর্ণিত গুণ অর্জন করিলেই প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু তাকওয়ায় আরও এক উন্নত অবস্থা আছে যাহা মারেফাতের কারখানার গভীরে গেলে অর্জিত হয়। বলা হইয়াছেঃ হকিকতে আহমদীতে তাকওয়ার সেরা গুণ অর্থাৎ "তাকওয়াউল আখাছিল খাওয়াছ" এর গুণ অর্জিত হয়। হকিকতে আহমদীতে উন্নীত সাধকের উপর তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরের কারেন্ট সদা প্রবাহমান থাকে। সাধক 'ওজুদ মাওহুব লাহু'-এর কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে খোদাতায়ালার জাতের কৈফিয়তশূন্য দর্শন লাভ করিয়া অনাবিল শান্তি পান।

বেহেশতে মু'মীনদেরকে যে সকল নেয়ামত আল্লাহপাক দান করিবেন তাহার মধ্যে খোদাদর্শনই শ্রেষ্ঠতম। সেই খোদাদর্শন সাধক তাহার দুনিয়াবী জীবনেই সাধনা মাধ্যমে তাকওয়ার হাকীকী গুণে গুণান্বিত হইয়া হকিকতে আহমদী বা হোব্বে ছেরফার মাকাম থেকে প্রাপ্ত হন। তবে এই দর্শন বর্ণনাতীত। তাকওয়ার হাকীকী গুণার্জনকারী মুত্তাকী এই দুনিয়াবী জীবনেই খোদাদর্শনের বর্ণনাতীত শান্তি লাভ করিয়া থাকেন। এই শান্তিকে আল্লাহতায়ালা বেহেশত হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন,

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّةَ جَنَّتَنِ

অর্থাৎ-'যে ব্যক্তি তাহার প্রভুর সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে; তাহার জন্য দুইটি বেহেশত।' (সূরা আর রাহমানঃ৪৬)

যাহার ভাবার্থ দাঁড়ায়ঃ মুত্তাকীগণকে পরকালে আল্লাহপাক বেহেশত দান করিবেন; ইহার বহু সংবাদ পাক কুরআনে আছে। কিন্তু দুনিয়াতেও মুত্তাকীগণকে বেহেশতি শান্তি দান করিবেন- যাহার ইশারা উল্লিখিত আয়াতে বিদ্যমান।

তাকওয়া অবলম্বনকারী মুত্তাকীগণদের উপর আল্লাহপাক সন্তুষ্ট হন। পরকালে তাহাদের পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন,

والْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ

অর্থর্থাৎ- 'এবং মত্তাকীদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট আখেরাতের কল্যাণ রহিয়াছে।' (সূরা যুখরুফঃ ৩৫)

إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامِ أَمِينِ

অর্থাৎ- 'মুত্তাকীগণ থাকিবে নিরাপদস্থানে।' (সূরা দুখানঃ ৫২)

إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَعُيُونٍ

অর্থাৎ- 'মুত্তাকীগণ থাকিবে ঝর্ণাবহুল জান্নাতে।' (সূরা হিজরঃ ৪৫)

খোদার ভয়ে ক্রন্দন বা তাকওয়ার প্রভাবে অশ্রুবিসর্জনের ফজীলতও প্রচুর। দয়াল নবী (সাঃ) বলেন, আল্লাহর ভয়ে যখন বান্দার শরীর কম্পমান হয়, তখন তাহার পাপরাশি এই রূপে ঝরিয়া পড়ে যেমন বৃক্ষ হইতে শুষ্ক পত্র ঝড়িয়া পড়ে। তিনি আরও বলেন, কোন বান্দার চক্ষু হইতে আল্লাহর ভয়ে যদি অন্ততঃপক্ষে মাছির মাথার সমপরিমাণ অশ্রু নির্গত হইয়া তাহার মুখমন্ডলকে উষ্ণ করে, তাহা হইলে তাহার জন্য দোযখের অগ্নি হারাম হইবে। খোদার ভয়ে বা তাকওয়ার প্রভাবে নির্গত অশ্রুই পারে দোযখের উত্তাপকে প্রশমিত করিতে।

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) রচিত "মুকাশাফাতুল কুলুব" কিতাবে আছেঃ কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে সকলের সম্মুখে উপস্থিত করা হইবে। তখন ভয় ও আতঙ্কের আতিশয্যে হাশরের ময়দানে উপস্থিত সকলেই হাটু গাড়িয়া ভূতলে বসিয়া পড়িবে। যেমন পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে- "আপনি প্রত্যেক উম্মতকে দেখিবেন নতজানু অবস্থায়। প্রত্যেক উম্মতকে তাহাদের আমলনামা দেখিতে বলা হইবে। তোমরা যাহা করিতে অদ্য তোমাদেরকে তাহার প্রতিফল দেওয়া হইবে। (সূরা জাসিয়াহঃ আয়াত-২৮)

জাহান্নামকে উপস্থিত করা হইলে সমবেত সকলেই জাহান্নামের ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার শুনিবে। এই চিৎকার এবং গর্জন পাঁচশত বছরের পথ পরিমাণ দুরত্ব হইতেও শোনা যাইবে। এহেন ভয়াবহ অবস্থায় প্রত্যেকেই এমনকি আম্বিয়া কেরাম পর্যন্ত কেবল নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকিবেন এবং নাফসী, নাফসী বলিয়া চিৎকার করিবেন। একমাত্র প্রিয়নবী (সাঃ) উম্মতের জন্য চিন্তা করিবেন এবং "উম্মতী, উম্মতী" বলিয়া চিৎকার করিতে থাকিবেন। এই সময় জাহান্নাম হইতে পর্বতসম উচু হইয়া অগ্নিশিখা বাহির হইতে থাকিবে। উম্মতে মুহাম্মদী এই ভয়াবহ অবস্থা অগ্নি! নামাজী ব্যক্তিদের অছিলায়, দান-খয়রাতকারীগণের অছিলায়, দূর করার জন্য প্রয়াস চালাইবে এবং এই বলিয়া দু'আ করিবে-মে নিষ্ঠাবান ও রোজাদারদের তোফায়েলে তুমি তোমার এই ভয়াবহতাসহ আমাদের থেকে দূরে সরিয়া যাও। এই দিকে হযরত জিব্রাইল (আঃ) সজোরে চিৎকার করিয়া বলিবেনঃ ঐ যে সেই ভয়াবহ অগ্নি যাহা রাসূলে করীম (সাঃ) এর উম্মতগণের দিকে অগ্রসর হইতেছে। এই কথা বলিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) পরিপূর্ণ একটি পানির পাত্র আনিয়া হুজুরে পাক (সাঃ) এর হস্ত মোবারকে দিয়া বলিবেন, এই ধরুন পানির পেয়ালা; অগ্নির উপর ছিটাইয়া দেন। রাসূলে পাক (সাঃ) সেই পানি দোযখের অগ্নির উপর ছিটাইয়া দিবেন। ফলে, সেই ভয়াবহ অগ্নি মুহূর্তে নির্বাপিত হইবে। অতঃপর রাসূলে পাক (সাঃ) হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিবেন- হে জিব্রাইল! বলুন, ইহা কিসের পানি? হযরত জিব্রাইল (আঃ) জবাবে বলিবেন, ইহা আপনার উম্মতের চোখের জল- যাহা খোদার ভয়ে অর্থাৎ তাকওয়ার প্রভাবে তাহাদের চোখ হইতে নির্গত হইয়াছে; অদ্যকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দোযখের অগ্নি নিবারণের জন্য এই পানি আপনাকে দিতে আমাকে হুকুম করা হইয়াছে এবং গোনাহগার লোকদের এই চোখের পানির অছিলাতেই আল্লাহতায়ালা দোযখের ভয়াবহ অগ্নিকে নির্বাপিত করিয়া দিয়াছেন।

হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা খওফ ও তাকওয়া সম্পর্কে কিছু বুঝিতে পারিলে। আরও বুঝিলে যে, খোদাপ্রাপ্তির পথে এই দুই গুণে নিজেকে গুণান্বিত করা খুবই প্রয়োজন। কিভাবে তাকওয়া অর্জন করা যায়? এই প্রসংগে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন,

يأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ

قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ

অর্থাৎ-“হে লোকসকল! তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের ইবাদত কর। যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের পয়দা করিয়াছেন। যেন, তোমরা তাকওয়া অর্জন করিতে পার।" (সূরা বাকারাঃ আয়াত-২১)

উল্লিখিত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, তাকওয়া অর্জন করিতে হইলে ইবাদত প্রয়োজন অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেক আমল করিতে হইবে: পুংখানুপুংখভাবে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ পালন করিতে হইবে। কিন্তু নাফস ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত শরীয়ত (জাহেরী ও বাতেনী) এর উপর পূর্ণ আমল করা কাহারো পক্ষেই সম্ভব নহে। ফলে, তাকওয়ার গুণ অর্জনও সম্ভব নয়। আর নাফস ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজন কোন পীরে কামেলের সান্নিধ্যে ও সাহচর্যে থাকিয়া খেদমত করা। কারণ নাফস ও শয়তানের প্রভুত্ব করা হইতে মুরীদকে মুক্ত করিয়া খোদাতায়ালার দাসে পরিণত করার ক্ষমতা পীরে কামেলের আছে। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তাই বলেন,

"হিস্না কুশাদ মারে রাজো জাল্লে পীর

দামনে আ নারে কোগ্রা সাগীর।"

অর্থাৎ-"তুমি যদি নাফসরূপী কাল সাপের ছোবল হইতে বাঁচিতে চাও, তবে নাফস হন্তা মোর্শেদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর।" পীরে কামেল তোমাকে নাফসরূপী কাল সাপের হাত হইতে বাঁচাইয়া আত্মিক জগতে ভ্রমণের সুযোগ করিয়া দিবেন। তুমি ধাপে ধাপে তাকওয়া বা খোদাভীতির তিনটি পর্যায়ের জ্ঞান ও গুণ অর্জন করিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদের দয়া করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD