যোহদ বা সংসারবিরাগের তাৎপর্য ও গুরুত্ব সম্পর্কিত আলোচনা

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ যোহদ বা সংসারবিরাগের তাৎপর্য ও গুরুত্ব সম্পর্কিত আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
যোহদ অর্থ বৈরাগ্য বা নিস্পৃহতা বা ঔদাসীন্য। ইসলামী পরিভাষায় সংসারবিরাগ বা দুনিয়ার প্রতি নিস্পৃহতাকে যোহদ বলে। আর সংসারবিরাগী বা দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিকে বলে "যাহিদ"। তবে দুনিয়ার প্রতি এই যে নিস্পৃহতা বা ঔদাসীন্য-তাহা অবশ্যই পারলৌকিক সৌভাগ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে অথবা খোদাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে হইতে হইবে। ইহা ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে দুনিয়া ত্যাগ করা বা দুনিয়াবিরাগী হওয়াকে যোহদ বলা যাইবে না।
যোহদের দুইটি অবস্থা বর্তমান। যথাঃ
★ পারলৌকিক সৌভাগ্য লাভের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ দোযখের শাস্তি থেকে মুক্তি এবং বেহেশতের সুখ-শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েস ত্যাগ করা অর্থাৎ সংসার বিরাগী হওয়া। ইহা নিতান্ত তুচ্ছ শ্রেণীর যোহদ।
বিজ্ঞাপন
★ একমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে তথা খোদাতায়ালার দীদার লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়া ত্যাগ করা এবং দুনিয়ার মত আখেরাতের চিন্তাও দেল থেকে মুছিয়া ফেলা, ইহাই যোহদের উন্নত অবস্থা। এক্ষেত্রে প্রথম অবস্থাকে যোহদের ছুরাত এবং দ্বিতীয় অবস্থাতে যোহদের হকিকত বলা যাইতে পারে। এ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা বক্ষমাণ নসিহতের শেষ অংশে করা হইতেছে।
যেহেতু দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত হওয়াকে যোহদ বলা হয়; তাই যোহদের আলোচনার সাথে দুনিয়ার আলোচনা আপনা থেকেই আসিয়া পড়ে।
অভিশপ্ত এ দুনিয়ার স্বরূপ বিশ্লেষণঃ
বিজ্ঞাপন
দুনিয়া কি? এক কথায়ঃ যাহা বান্দাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল রাখে-তাহাই দুনিয়া। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা গাফেল হবে; তাহারাই ক্ষতিগ্রস্থ।"
আল্লাহপাক আরও বলেন, "তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতো অনিষ্ঠকারী বৈ নহে। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহা পুরস্কার।"
দুনিয়াবী জীবনের পরিচয় দিতে গিয়া আল্লাহপাক কুরআন মজীদে এরশাদ করেন, "নিশ্চয় দুনিয়ার এই জীবন খেলা-ধুলা, চক্ষুর তৃপ্তি, পারস্পরিক ফখর, গৌরব এবং মাল-দৌলত ও সন্তান-সন্ততির আধিক্য ছাড়া কিছুই নহে।"
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালা কুরআন মজীদে আরও বলেন, "মানুষের জন্য স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি ভালবাসা, সোনা-চান্দি সঞ্চয়, আকর্ষণীয় ঘোড়া, জীব জানোয়ার, ক্ষেত-খামার ইত্যাদির মোহ চিত্তাকর্ষক করিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহাই তাহাদের পার্থিব জীবনের অবলম্বন।"
আল্লাহপাকের বাণী থেকে বুঝা যায় যে, স্ত্রী, পুত্র-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ, বাড়ী-গাড়ী, নারী, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সবই দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত। উল্লিখিত বিষয়াদির আকর্ষণ বা মোহেই মানুষ আল্লাহকে ভুলিয়া যায়; পাপ কর্মে লিপ্ত হয়, আল্লাহর আদেশ প্রতিপালন বা নিষেধ থেকে বিরত থাকা নিষ্প্রয়োজন মনে করে। এই জন্য সংসারাসক্তি বা দুনিয়ার মোহকে খোদাপ্রাপ্তির পথে অন্তরায় বলা হইয়াছে। তাই দুনিয়ার আকর্ষণকে মুছিয়া ফেলা বা সংসারাসক্তিকে দেল থেকে ঝারিয়া ফেলাই প্রকৃত যোহদ বা দুনিয়াত্যাগ। দুনিয়া ত্যাগের অর্থ এই নয় যে, বিবাহ না করা; সন্তান সন্ততি না নেওয়া; খাদ্য গ্রহণ না করিয়া মৃত্যুবরণ করা ইত্যাদি। একান্ত আবশ্যকীয় অংশ গ্রহণ করা দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত নহে।
একদা হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আঃ) তাহার কোন এক বন্ধুর নিকট কিছু ধার চাহিলে তৎক্ষণাৎ আল্লাহতায়ালার নিকট থেকে অহী আসিলঃ হে খলীল! আমিই তোমার প্রকৃত বন্ধু। তুমি আমার নিকট ধার চাহিলে না কেন? হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নিবেদন করিলেন, ইয়া আল্লাহ! আমি উত্তমরূপে অবগত আছি। তুমি দুনিয়াকে ঘৃণা কর। অতএব তোমার নিকট দুনিয়া প্রার্থনা করিতে আমার ভয় হইয়াছিল। পুনরায় অহী আসিলঃ হে ইব্রাহিম! জীবন ধারণের জন্য যাহা একান্ত আবশ্যকীয় তাহা মোহ উৎপাদক দুনিয়ার ভোগ বিলাসের মধ্যে গণ্য নহে।
বিজ্ঞাপন
সুতরাং একান্ত আবশ্যকীয় পরিমাণ গ্রহণ করা দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত নহে। যেমন দেহকে রক্ষার জন্য সামান্য খাদ্য গ্রহণ: শীত বা গ্রীষ্মে প্রয়োজনীয় পোশাক ব্যবহার ইত্যাদি।
আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার পরিচয় প্রদানের জন্য। তাহার পরিচয় গ্রহণ করা মানুষের একান্ত কর্তব্য। পরিচয় জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন ইবাদত। আর ইবাদত করিবার জন্য প্রয়োজন দৈহিক শক্তি। আর দৈহিক শক্তির জন্য প্রয়োজন খাদ্য গ্রহণ। কাজেই ইবাদত করিবার নিমিত্তে দেহকে টিকাইয়া রাখা দরকার। সেই জন্য একান্ত আবশ্যকীয় পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত নহে। তবে উদরপূর্তি করিয়া আহার করা দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তাই-ই নবী (আঃ) গণ জীবনে খুবই অল্প পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করিয়াছেন। দুইদিন, চারদিন, সাতদিন পর পর যৎকিঞ্চিত আহার করিতেন। উদ্দেশ্য-দেহকে টিকাইয়া রাখা, তৃপ্তিসহ উদরপূর্তি নহে। নবী (আঃ) গণের ওয়ারেছগণ অর্থাৎ ওলীয়ে কামেলসকলও খুবই অল্প পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করেন। খাদ্য গ্রহণের মত দুনিয়ার অন্যান্য ভোগ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রেও একই কথা। নিতান্ত যতটুকু প্রয়োজন-তাহা গ্রহণ করা দুনিয়া নহে। ইহার ব্যতিক্রমই দুনিয়া-যাহা বান্দাকে খোদাতায়ালার স্মরণ থেকে বিরত রাখে।
দুনিয়ার মোহ বা সংসার আসক্তি মানুষকে বিপথে নেয়; অন্যায় কর্মে প্রবৃত্ত করে। দুনিয়ার আকর্ষণ মানুষকে সদা বেহুদা কাজে ব্যস্ত রাখে, খোদাতায়ালার নাফরমানির অন্ধকার সমুদ্রে ডুবাইয়া দেয়। দুনিয়ার সাথে নাফসের গাঢ় সম্পর্ক আছে। নাফসে আম্মারা খোদাদ্রোহী। যাবতীয় কুচিন্তা, কু-কর্মের উৎপত্তিস্থল এই নাফস। সে খোদাতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করে না। যশ, খ্যাতি, কর্তৃত্ব বা ছদারি তাহার একান্ত কাম্য। সে চায় সকলের উপর ছদারি করিতে। নাফসের স্বভাব সম্পর্কে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, নাফসে আম্মারার স্বভাব সম্মান ও কর্তৃত্ব প্রত্যাশী এবং সর্বদাই স্বীয় সংগিগণ হইতে উচ্চ হওয়ার আশাবাদী। সে চায় যে, সৃষ্ট সকলেই তাহার মুখাপেক্ষী ও আজ্ঞাবহ হউক এবং সে যেন কাহারও অধীন না হয়। ইহা যে খোদায়ী দাবী ও লা-শরীক সমকক্ষবিহীন খোদাতায়ালার সহিত সমকক্ষতা করা বরং ঐ হতভাগা নাফস সমকক্ষ হইয়াও যেন সন্তুষ্ট হয় না। সে খোদাতায়ালার উপরেও কর্তৃত্ব করিতে চায়। (মকতুব নং ৫২, ১ম খন্ড) তাই মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব নাফসকে ফেরাউন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। খোদাতায়ালা তাই নাফসকে নিজ শত্রু বলিয়া হাদীসে কদসীতে উল্লেখ করিয়াছেন এবং আমাদেরকে বলিয়াছেন নাফসের সহিত শত্রুতা করিতে।
বিজ্ঞাপন
নাফসের যশ, খ্যাতি অর্জন এবং কর্তৃত্ব বা ছদারি করিতে নিকৃষ্ট এই দুনিয়া সহায়তা করে বিধায় দয়াল নবী (সাঃ) এই দুনিয়াকে অভিশপ্ত বলিয়াছেন। আর ইহা সর্বজন স্বীকৃত যে, অভিশপ্ত দুনিয়ার যাহারা অনুরাগী বা প্রেমিক, তাহারাও অভিশাপের উপযোগী।
দুনিয়ার পরিচয় প্রদান পর্বে দয়াল নবী (সাঃ) এর একাধিক হাদীস পরিলক্ষিত হয়। একদা রাসূলে পাক (সাঃ) কোন এক পথ অতিক্রম করিতে ছিলেন। অতিক্রম কালে পথিমধ্যে দেখিতে পাইলেনঃ একটি মৃত বকরী পড়িয়া আছে। সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করিয়া এরশাদ করিলেন, লক্ষ্য করিয়াছ কি? বকরীটির মালিক উহাকে কিরূপ মূল্যহীন বস্তু সাব্যস্ত করিয়াছে? সাহাবাগণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলে করীম (সাঃ) বলিতে লাগিলেন-ঐ জাতের শপথ যাহার কুদরতের আয়ত্বাধীনে আমার জান রহিয়াছে-এই বকরীর মালিকের নিকট ইহা যতখানী মূল্যহীন, ঠিক তদ্রুপ এই দুনিয়াও আল্লাহর নিকট ততখানী মূল্যহীন। যদি তাই না হইত, তবে কাফেররা এই দুনিয়ার এক ঢোক পানিও পান করিতে পারিত না।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন যে, দয়াল নবী (সাঃ) একদিন আমাকে বলিলেনঃ আমি তোমাকে দুনিয়া এবং দুনিয়াস্থিত বস্তুসমূহ দেখাইব। আমি আরজ করিলামঃ খুব ভাল কথা। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরিয়া মদীনার একটি জংগলে গমন করিলেন। সেখানে এক জায়গায় মৃত মানুষের মাথার খুলী, পায়খানা, হাড্ডি ও ছিন্ন বস্ত্র পতিত ছিল। তিনি বলিলেন, হে আবু হোরায়রা! এই সব খুলী তেমনি আকাংখা করিত যেমন তুমি কর এবং তেমনি আশা করিত যেমন তুমি কর; কিন্তু আজ এমন হইয়াছে যে, এই গুলোর উপর চর্ম পর্যন্ত নাই। কিছুদিনের মধ্যেই ভষ্ম হইয়া যাইবে। এই যে মল দেখিতেছ, এই গুলো তাহাদের খাদ্য ছিল। খোদা জানে, কোথা হইতে উপার্জন করিয়া তাহারা আহার করিয়াছিল। আজ এমন হইয়াছে যে, তোমার ঘৃণা হয়। আর এই ছিন্নবস্ত্র তাহাদের পোশাকের। বায়ু ইহাকে উড়াইতেছে। আর এই পায়ের হাড়গুলো দেখিতেছ; ইহা তাহাদের চতুষ্পদ জন্তুর। সেই গুলোর পিঠে চড়িয়া তাহারা এক শহর হইতে অন্য শহরে গমন করিত। ক্ষণভংগুর দুনিয়ার যখন ইহাই পরিণতি, তখন ইহা শিক্ষা গ্রহণেরই স্থান।
বিজ্ঞাপন
তাই দয়াল নবী (সাঃ) এবং সাহাবাগণ দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত ছিলেন, সংসারের প্রতি বিরাগ ছিলেন। দুনিয়ার ছুরাতও তাহারা দেখিতেন: দুনিয়ার সাথে কথাও বলিতেন। দুনিয়া দেখিতে কুৎসিত এক বৃদ্ধার মত। অন্তর দৃষ্টিতে ইহা দেখা যায়। মেরাজের রাত্রে দয়াল নবী (সাঃ) দুনিয়াকে বৃদ্ধার ছুরাতে দেখিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত মাঝে মাঝেই দুনিয়া বৃদ্ধার ছরাতে দয়াল নবী (সাঃ) এর নিকট আসিত কিন্তু তিনি তাহাকে (দুনিয়াকে) তাড়াইয়া দিতেন।
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, একবার আমরা হযরত সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। তিনি শরবত চাহিলেন। পানি এবং মধু আনিয়া নিকটে রাখিলে তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। উপস্থিত সকলেই ইহা দর্শনে কাঁদিতে শুরু করিলেন। কিছুক্ষণ পরে সকলেই শান্ত হইলেন বটে কিন্তু তিনি শান্ত হইলেন না। অনুভব করা সত্ত্বেও কেহ জিজ্ঞাসা করার সাহসও পাইলেন না। অতঃপর তিনি নিজেই চক্ষু মুছিলেন। তখন জিজ্ঞাসা করা হইল, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর খলিফা! আপনি কেন কাঁদিতেছিলেন? তদুত্তরে তিনি বলিলেন, একবার আমি হুজুর (সাঃ) এর খেদমতে হাজির ছিলাম, তিনি যেন তখন কাহাকেও তাহার নিকট হইতে তাড়াইয়া দিতেছিলেন। আমি দেখিলাম, তাঁহার নিকটে কেহ নাই। প্রশ্ন করিলাম, আপনি কাহাকে তাড়াইতেছেন? রাসূলে করীম (সাঃ) বলিলেন, দুনিয়াকে-যাহা আমার সামনে স্ব-আকারে হাজির হইয়াছে। আমি উহাকে বলিলাম-আমা হইতে দূর হও। সে চলিয়া গেল বটে, তবে পুনরায় ফিরিয়া আসিয়া আমাকে বলিতে লাগিল-আপনি যদিও আমা হইতে বাঁচিয়া গিয়াছেন কিন্তু আপনার পরে মানুষ আমার দিক হইতে মুখ ফিরাইবে না।"
পয়গম্বর হযরত ঈসা (আঃ) এর সম্মুখে একদা দুনিয়া এক বৃদ্ধার আকৃতিতে উপস্থিত হয়। বৃদ্ধার গায়ে সর্ব প্রকার অলংকার ও গহণাগাটি শোভা পাইতেছিল। হযরত ঈসা (আঃ) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই পর্যন্ত তুই কতজন স্বামী গ্রহণ করিয়াছিস? সে বলিল, সঠিক সংখ্যা আমার জানা নাই। তিনি প্রশ্ন করিলেন, তাহারা সকলে তোকে ত্যাগ করিয়াছে: না তুই তাদেরকে ত্যাগ করিয়াছিস? বৃদ্ধারূপী দুনিয়া বলিল; আমি তাহাদেরকে হত্যা করিয়াছি।
বিজ্ঞাপন
হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব তাই বলেন, তোমরা এমন মেধরানীর সহিত প্রেম করিও না-যে প্রতিদিন সকালে একজন করিয়া স্বামী গ্রহণ করে। এই কুহকিনী দুনিয়া তোমার দাদার শয্যাশায়িনী ছিল। তোমার দাদা বৃদ্ধ হইল, চামড়ায় ভাজ পড়িল, দন্ত পড়িয়া গেল; চুল দাড়ি শুভ্র হইল: তখন নষ্টা দনিয়া তোমার দাদাকে তালাক দিল। তোমার দাদা কবরে গেল। দাদার পরে সে ধরিল তোমার পিতাকে। চরিত্রভ্রষ্টা দনিয়া একইভাবে তাহাকেও ধ্বংস করিল। তারপর ধরিয়াছে তোমাকে। হে বৎস, সাবধান! সময় থাকিতে দুনিয়াকে ত্যাগ কর। দুনিয়ার প্রেম, দুনিয়ার মহব্বত ছিন্ন কর। তবেই কল্যাণ।
বর্ণিত আছে, হাশরের মাঠে সকল হাশরবাসীরা যখন স্ব স্ব পরিণতির চিন্তায় চিন্তাক্লিষ্ট থাকিবে, আপন বিচারের অপেক্ষায় থাকিবে; এমন সময় ফেরেশতাগণ শিকলে বাঁধিয়া বিশালাকৃতির কুৎসিত এক বৃদ্ধাকে উপস্থিত করিবেন-যাহার হুংকারে আতংকিত হইবেন সমস্ত হাশরবাসী। ভীত সন্ত্রস্ত হাশরবাসীগণ খোদাতায়ালার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিয়া বলিবেন, হে খোদা! এই ভয়ংকর বৃদ্ধা কে? আল্লাহপাক বলিবেন, এই বৃদ্ধা সেই দুনিয়া-যাহার প্রেমে, যাহার অনুরাগে তোমরা আমাকে ভুলিয়া ছিলে। অতঃপর আল্লাহতায়ালা দুনিয়াকে দোযখে নিক্ষেপ করিবার জন্য ফেরেশতাদের নির্দেশ প্রদান করিবেন। কিন্তু বৃদ্ধারূপী দুনিয়া তখন বলিবে, হে খোদা! আমি একা দোযখে যাইব না। তথায় আমার বহু বান্ধব ছিল। আমি তাহাদেরকে সংগে লইয়া দোযখে যাইব। আল্লাহপাক তখন দুনিয়াকে নির্দেশ দিবেন হাশরবাসীদের মধ্য হইতে তাহার আশেকদেরকে বাহির করিয়া দোযখে নেয়ার জন্য। দুনিয়া নির্দেশ পাইয়া এমনই এক হেচকা টান মারিবে-ফলে হাশরের মাঠ প্রায় শূন্য হইয়া যাইবে।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব দুনিয়ার স্বরূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে এবং দুনিয়াপ্রেমের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন যে, দুনিয়া নানারূপ সাজসজ্জামন্ডিত এবং বিচিত্র অলংকারে ভূষিত। ইহার বাহ্যিক আকৃতিকে কপোল কল্পিত কৃত্রিম তিলক, কাজল বেনী ইত্যাদি দ্বারা সুসজ্জিত করা হইয়াছে। দৃশ্যতঃ ইহা সুমিষ্ট, মনোরম ও তরু তাজা। বস্তুতঃ ময়লার কীট ও মক্ষিকাপূর্ণ নোংরা স্থান। ইহা মরীচিকার ন্যায় সলিল সদৃশ এবং শর্করা বেষ্টিত বিষতুল্য। ইহার অভ্যন্তরীণ অবস্থা অতি কদর্য ও নিকৃষ্ট। স্বীয় সংগীদিগের সহিত ইহার ব্যবহার যাহা কিছুই বল না কেন, তাহা হইতেও জঘন্য। ইহার প্রতি যে আকৃষ্ট, সে উন্মাত্ত ও মোহমুগ্ধ। ইহার প্রতি প্রলুব্ধ ব্যক্তি জ্ঞানহারা ও প্রবঞ্চিত। ইহার বাহ্যিক মিষ্টতার প্রতি যে দৃষ্টিপাত করিবে, সে চিরস্থায়ী অনুতাপে অনুতপ্ত অবস্থাতে যে মুগ্ধ হইবে, সে অনন্তকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হইবে: ইহার হইবে।
বিজ্ঞাপন
দনিয়া সম্পর্কীয় এতক্ষণের আলোচনায় ইহা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হইল যে, দুনিয়ার মোহ মানুষকে আল্লাহর জেকের থেকে গাফেল রাখে, সংসারাসক্তি মানুষের জীবনকে বরবাদ করে, সংসারানুরাগ নাফসের সাথে যুগপৎভাবে মানুষকে সত্য পথচ্যুত করিয়া চিরস্থায়ী শাস্তির আকর দোযখের উপযোগী করিয়া তোলে। তাই-ই দনিয়া আল্লাহর অভিশপ্ত।
সকল নবী রাসূল ও ওলীয়ে কামেল যোহদের গুণে গুণান্বিতঃ
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) দুনিয়ার স্বভাব, প্রকৃতি বা অপকারিতা সম্পর্কে পুংখানুপুংখভাবে জ্ঞাত ছিলেন বিধায় তিনি স্বেচ্ছায় দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েস ত্যাগ করিয়াছিলেন অর্থাৎ যোহদের গুণ অর্জন করিয়া শ্রেষ্ঠতম যাহিদ হওয়ার মর্যাদা লাভ করিয়াছিলেন। রাসূলে করীম (সাঃ) এর সাহচর্যে ও সান্নিধ্যে, তাঁহার পাক তাওয়াজ্জুহতে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যোহদের গুণ পূর্ণমাত্রায় ছিল। সাহাবাকেরামও দুনিয়াকে পরিত্যাগ করিয়া সংসারবিরাগী বা যাহিদ হইয়াছিলেন। দুনিয়ার ভোগ্য বস্তু সমূহের উপভোগের আমোঘ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাহারা তাহা পরিত্যাগ করিয়াছিলেন।
বিজ্ঞাপন
মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন তিনি। সসাগরাধরিত্রী তাহার হাতের মোঠায় ছিল। অথচ তিনি অত্যন্ত দরিদ্রাবস্থায় দিনাতিপাত করিতেন। কোনদিন হয়তো কিছু আহার করিতেন; আবার কোনদিন অনাহারে থাকিতেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্র থেকেই প্রচুর রাজস্ব ও গণিমতের মাল তাহার নিকট আসিত, অথচ তিনি সবই গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিতেন; নিজে কিছুই গ্রহণ করিতেন না।
একদা তাঁহার কন্যা উম্মুল মোমিনীন হযরত হাফছা (রাঃ) (যিনি রাসূলে করীম (সাঃ) এর অন্যতমা পত্নী ছিলেন।) পিতার দুঃখ-দুর্দশা দেখিয়া তাহাকে বলিলেন, বাবাজান! আপনি মুসলিম জগতের অধিপতি, বিভিন্ন দেশ হইতে প্রভূত রাজস্ব ও গণিমতের মাল আপনার হস্তে আসিয়া থাকে। আপনি সমস্ত ধনই গরীবদের মধ্যে বিতরণ করিয়া মদীনার দুঃখ-দৈন্য দূর করিয়া দিয়াছেন, অথচ আপনি স্বয়ং দরিদ্রতার কঠিন চাপে নিষ্পেষিত হইতেছেন। আপনি উক্ত ধনরাশী হইতে কিছু অর্থ গ্রহণ পূর্বক এই জীর্ণ, শীর্ণ ও ছিন্ন বস্ত্রের পরিবর্তে কিছু উত্তম পোশাক প্রস্তুত করিয়া পরিধান করুন। কিছু উৎকৃষ্ট খাদ্য সংগ্রহ করিয়া পরিবার পরিজনবর্গ ও বন্ধু বান্ধব লইয়া আহার করুন। কন্যার এহেন করুন অনুরোধ শ্রবণ করিয়া হযরত উমর ফারুক (রাঃ) একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, মা! স্বামীর অবস্থা পত্নী অপেক্ষা অধিক আর কেহ জানিতে পারে না। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর জীবন যাপনের অবস্থা তুমি খুব ভাল ভাবেই অবগত আছ। তোমাকে আল্লাহতায়ালার শপথ দিয়া বলিতেছিঃ বল দেখি, ইহা সত্য কিনা? হযরত নবী করীম (সাঃ) যে কয়েক বছর রাসূল রূপে পৃথিবীতে ছিলেন, ততদিন ধরিয়া তিনি এবং তাহার পরিবারবর্গ সকাল বেলা কিছু আহার করিতে পাইলে রাত্রি বেলা উপবাস থাকিতেন এবং রাত্রিবেলা কিছু আহার করিতে পাইলে পরদিন অনাহারে থাকিতেন। তোমাকে আল্লাহর শপথ দিয়া আরও জিজ্ঞাসা করিতেছি; খায়বর বিজয়ের দিন পর্যন্ত বহু বছর ধরিয়া তাঁহার গৃহে অগ্নি সংযোগে পাকান কোন খাদ্যই জোটে নাই। খোরমা, ছাতু প্রভৃতি ভক্ষণ পূর্বক জীবন যাপন করিয়াছেন। তাহাও পেট ভরিয়া আহার করিবার সুযোগ হয় নাই। বল দেখি, ইহা সত্য কিনা? তোমাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি কি ইহা অবগত আছ যে, একদিন কিছু আহার্য দ্রব্য সুন্দর খাঞ্চায় করিয়া তাঁহার সম্মুখে স্থাপন করা হইলে উহা তাহার নিকট এতই অপ্রিয় ও অপছন্দীয় হইয়াছিল যে তাঁহার পবিত্র মুখমন্ডলের বর্ণ পর্যন্ত পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল। অবশেষে তাঁহার নির্দেশ ক্রমে আহার্য দ্রব্য খাঞ্চা হইতে নামাইয়া জমিনের উপর রাখা হইয়াছিল। ইহা সত্য কি না? তোমাকে আরও জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি নিশ্চয়ই অবগত আছ, তিনি নিতান্ত সামান্য ও নগন্য বিছানায় শয়ন করিতেন। খেজুর পাতার চাটাই বিছাইয়া তদুপরি একখানা কম্বলকে দুই ভাজে পাতিয়া তাঁহার শয্যা রচনা হইত। এক রাত্রিতে কম্বলখানীকে চারি ভাজে পাতিয়া দেওয়ার কারণে বিছানা অপেক্ষাকৃত অধিক নরম হইয়াছিল। পরদিন প্রত্যুষে তিনি বলিয়াছিলেনঃ অদ্য রজনীতে বিছানার কোমলতা আমাকে রাত্রিকালীন নফল ইবাদত হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছে। অতঃপর তোমরা আমার বিছানা পূর্বের ন্যায় দুই ভাঁজে প্রস্তুত করিবে। দুই ভাঁজের চাইতে অধিক ভাজে আর কখনও বিছাইও না। তোমাকে পুনরায় শপথ দিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি, তমি নিশ্চয় জান, তাঁহার পরিধেয় বস্ত্র এক প্রস্থ ভিন্ন অধিক ছিল না। যে দিন কাপড় ধৌত করিতেন, সেদিন হযরত বেলাল (রাঃ) এর আযান শ্রবণ করিয়াও কাপড় না শুকানো পর্যন্ত হুজরা শরীফ হইতে বাহির করিতেছি, তুমি অবশ্যই জান, বনি জাফর গোত্রের জনৈকা রমণী হইতেন না। তোমাকে আল্লাহতায়ালার শপথ দিয়া আরও জিজ্ঞাসা রাসুলে পাক (সাঃ) এর বস্ত্র বয়ন করিয়া দিত। একবার রাসূলে পাক (সাঃ) তাহার নিকট একখানা তহবন্দ ও একখানা চাদর বয়ন করিয়া দেওয়ায় ফরমাইশ দিয়াছিলেন। বয়নকারিনী নামাজের পূর্বে একত্রে দইখানি কাপড় বয়ন করিয়া দিতে পারিবেন না অথচ রাসুলে পাক (সাঃ) এর কাপড়ের অভাব, এই বিবেচনায় সে একখানি বস্ত্র বয়নপূর্বক অগ্রে পাঠাইয়া দিল। হুজুরে পাক (সাঃ) সেই বস্ত্রের এক প্রান্ত কোমরে পেচ দিয়া পরিধান পূর্বক তাহা সুতা দ্বারা বাঁধিয়া অপর প্রান্ত চাদর স্বরূপ পিঠের উপর ফেলিয়া বাহিরে আসিয়াছিলেন: এতদ্ব্যতীত দ্বিতীয় কোন বস্ত্র তাঁহার নিকট ছিল না। ইহা কি সত্য? উম্মুল মোমেনীন হযরত হাফসা (রাঃ) বলিলেন, জী. আব্বাজান, এই সমুদয় ঘটনাই আমি অবগত আছি। সমস্ত ঘটনাই সত্য। রাসূলে পাক (সাঃ) এর এই কঠিন দুঃখকষ্টময় জীবন যাপনের কাহিনী স্মরণ পূর্বক তাঁহারা পিতা-কন্যা উভয়ে এমন গভীর শোকে রোদন করিতে আরম্ভ করেন যে, শেষ পর্যন্ত উভয়ে মূর্ছিত হইয়া পড়িলেন। সংজ্ঞা লাভের পর হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন, আমার পূর্ববর্তী দুই বন্ধু অর্থাৎ রাসূলে পাক (সাঃ) এবং হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) যেইরূপ দুঃখকষ্টময় জীবন যাপন করিয়া গিয়াছেন, তদ্রুপ চলিতে পারিলে আমি তাহাদের পদাংক অনুসরণ করিয়া তাঁহাদের সংগে যাইয়া মিলিত হইতে পারিব। অন্যথায় আমি পথ হারাইয়া অন্য দিকে চলিয়া যাইব। তাঁহাদের আদর্শ গ্রহণে কঠোর দরিদ্রতা সহকারে জীবন যাপন করিয়া যেন তাহাদের সহিত চিরস্থায়ী সুখশান্তি ভোগ করিতে পারি-তাহাই আমার কর্তব্য।
দয়াল নবী (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম যেমন সংসার ত্যাগ পূর্বক যোহদের মাকাম হাছিল করিয়াছিলেন। তেমনি যুগে যুগে আগত ওলীয়ে কামেলসকলও সংসার ত্যাগী পুরুষ ছিলেন।
যোহদের গুণ অর্জনের উপায়ঃ
সংসারত্যাগী না হইলে বা যোহদের গুণ অর্জন না করিলে খোদাতায়ালাকে পাওয়া যায় না: পূর্বেও কেহ পায় নাই। কিন্তু মানুষ ভোগ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দুনিয়াকে ত্যাগ করিবে কেমন করিয়া? তাছাড়া দুনিয়ার মধ্যে এক অভূতপূর্ব মোহিনী শক্তি বা যাদুকরী শক্তি বিদ্যমান। দুনিয়ার সেই যাদুকরী শক্তি বা চিত্তাকর্ষনী শক্তির প্রভাবেই মানুষ দুনিয়ার মোহমুগ্ধ হয়, দুনিয়ার আশেকে পরিণত হয়। সংসারের সেই যাদুর প্রভাব থেকে মানুষ কিভাবেইবা বাঁচিবে? সহজ কথায়-কিভাবে মানুষ সংসার বিরাগী যাহিদ হইবে?
যোহদের গুণ অর্জনের জন্য প্রয়োজন একজন আধ্যাত্বিক জ্ঞানে জ্ঞানী সাধকের, প্রয়োজন একজন ওলীয়ে কামেলের-যাহার সান্নিধ্য, সাহচর্য, খেদমত ও নেক দৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ যোহদের গুণ অর্জন করিতে, অর্থাৎ যোহদের মাকাম হাছিল করিয়া তথা সংসারবিরাগী হইতে সক্ষম হইবে। পীরে কামেলের তাঈদ-মদদ ব্যতীত যোহদের গুণ অর্জন করা একা একা কাহারো পক্ষে সম্ভব নহে।
একজন কামেলের আত্মিক প্রভাবে কিভাবে একজন মুরীদ খোদাপ্রাপ্তির পথে যোহদের গুণ বা দুনিয়া ত্যাগের গুণ অর্জন করে? সেই প্রসংগে হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব একটি রূপক কাহিনী তদীয় কিতাবে বর্ণনা করেন। নসিহতসমূহের ৫ম খন্ডে তথা "লতিফাসমূহের পরিচিতি” নামক পুস্তকে কাহিনীটির উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও প্রাসংগিক বিধায় সংক্ষিপ্তাকারে এখানেও বর্ণিত হইতেছে। কাহিনীটি হইলঃ একদা একজন জ্ঞানী ভদ্রলোকের একমাত্র পুত্র সন্তান নিখোঁজ হয়। বহু খোঁজাখুজি অন্তে পিতা ছেলেকে পান বটে; কিন্তু ছেলের মানষিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন দেখিয়া তিনি অবাক হন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, তাহার ছেলে একজন কুৎসিত বৃদ্ধার সম্মুখে বসিয়া বৃদ্ধার পানে পলকহীন নেত্রে তাকাইয়া আছে। অন্য কোন দিকেই ছেলের আর কোন লক্ষ্য নাই। ছেলের নিকট তিনি নিজের পরিচয় দিলেন বটে; কিন্তু ছেলে তাহাকে চিনিতে পারিল না। পিতা ছেলের বিচ্ছেদে মায়ের শয্যাগত হওয়ার কথাও উল্লেখ করিলেন, কিন্তু তাহাতে ছেলের চেতনা আসিল না। উপরন্তু ছেলে বলিল, "আমি তোমাকে চিনি না, আমার মাকেও আমি চিনি না। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন কেহই আমার নাই। আমার বলিতে এই একমাত্র বৃদ্ধাই-যাহার সামনে আমি বসিয়া আছি। বৃদ্ধাই আমার জীবন, বৃদ্ধাই আমার মরণ। পিতা বুঝিতে পারিলেন যে, ছেলেটি বৃদ্ধার যাদুর প্রভাবে এমন হইয়াছে। কাজেই তিনি যাদুর উপকরণ খুঁজিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণে পাইয়াও গেলেন। তিনি দেখিলেন, বৃদ্ধার পার্শ্বে দুইটি পাথর: একটির উপরে অপরটি বসানো। উপরের পাথরটিকে সরাইয়া তিনি দশটি গিরা বিশিষ্ট একটি লম্বা চুল পাইলেন। দ্বিতীয় গিরাটি খুলিলেন। পুত্রের হা-হুতাশ ইহাতে আরও বাডিয়া পিতা প্রথম গিরাটি খুলিলেন। তৎক্ষণাৎ পুত্র পিতাকে চিনিতে পারিল। গেল। মায়ের কথা, আবাসস্থলের কথা পুত্রের স্মরণে পড়িল। সে ক্রন্দন শুরু করিল। অতঃপর জ্ঞানী পিতা একে একে পাঁচটি গিরাকে উনাক্ত করিলেন। পুত্র তাহার উৎসে, তাহার আবাসস্থলে ফেরত যাওয়ার জন্য পিতাকে অনুনয়-বিনয় করিতে লাগিল। পিতা বলিলেন, বাবা, ছবুর কর। চুলের আরও পাঁচটি গিরা আছে। অস্ত্র ব্যতীত সেই গিরাগুলোকে কর্তন করা যাইবে না। ইহা অত্যন্ত শক্ত। পিতা ধীরে ধীরে শান পাথররূপী অস্ত্রের মাধ্যমে অবশিষ্ট পাঁচটি গ্রন্থিকে উন্মুক্ত করিলেন। ছেলে বৃদ্ধা কুহকিনীর হাত হইতে রক্ষা পাইল।
উল্লিখিত এই রূপক কাহিনীর বৃদ্ধা হইল অভিশপ্ত দুনিয়া, যাদুগ্রস্থ পুত্র হইল দুনিয়াসক্ত মানুষ, জ্ঞানী পিতা হইলেন যুগের মুজাদ্দেদ বা ওলীয়ে কামেল। আর চুলের দশটি গিরার প্রথম পাঁচটি হইল মানব দেহস্থিত পঞ্চ লতিফা (কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফা), যাহাদের সম্পর্ক আলমে আমর বা নূরময় জগতের সাথে। পরবর্তী পাঁচটি গিরাও (যথা আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফস) পাঁচটি লতিফা-যাহাদের সম্পর্ক আলমে খালক বা স্থূল জগতের সাথে। উপরের কাহিনী থেকে বুঝা গেল যে, মুরীদ বা খোদাঅন্বেষী দুনিয়ার যাদুর প্রভাব থেকে তখনই মুক্ত হইতে পারে; যখন পীরের নেক দৃষ্টি ঐ মুরীদের উপর পড়ে। পীরের নেকদৃষ্টি বা তাওয়াজ্জুহই কেবল পারে খোদাতালাশীকে যোহদ বা সংসার বৈরাগ্যের গুণে গুণান্বিত করিতে। ইহার কোন বিকল্প নাই।
আমার নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তোমাদের কিছু বলি। আমি এক ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। ছোট বেলার স্মৃতি আমার চোখে ভাসে। আমাদের সংসারে না ছিল অভাব; না ছিল দরিদ্রতা। শুধুমাত্র জমি-জমার ফসল এবং গবাদি পশু দেখাশুনার জন্যই শতাধিক রাখাল ছিল। কিন্তু সেই ধনৈশ্বর্য দ্রুতই আমাদের সংসার থেকে পলায়ন করিল। পীরের সান্নিধ্যে যাওয়ার পর হইতেই সংসারে অভাব দেখা দিল। ধীরে ধীরে অভাব বাড়িতে থাকে। আমরা ধনৈশ্বর্যের মধ্যে থাকি-পীর কেবলাজানের ইহা ইচ্ছা নহে। সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরাইয়া আনয়নের জন্য, দারিদ বিমোচনের জন্য আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত মাওলানা শাহসূফী আলতাফ হোসেন (রঃ) ছাহেব ব্যবসা করার চিন্তা করিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেনঃ নালিতাবাড়ী হইতে ধান ক্রয় করিয়া শেরপুরে আনিয়া বিক্রয় করিবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক কিছু লোকজনসহ নালিতাবাড়ী গেলেন, ধান ক্রয় করিয়া শেরপুরে আসিলেন। সেই সময়ে নালিতাবাড়ী হইতে শেরপুরে ধানের ব্যবসায় যথেষ্ট মুনাফা হইত। আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল-নালিতাবাড়ী হইতে শেরপুরে ধান আনিলে সকল ব্যবসায়ীরই ক্রয়কৃত পরিমাণাপেক্ষা কিছু ধান বাড়তি হইত। কিন্তু বড় ভাইয়ের ক্রয়কৃত ধানে বাড়তিতো হয়ই নাই, বরং আড়াই মন ধান ঘাটতি পড়িল। ব্যবসার প্রথম চালানেই কিছু লোকসান হইল।
ইহার কিছুদিন পরে বড় ভাই এনায়েতপুর দরবার শরীফে কেবলাজান হুজুরের সাহচর্যে গেলেন। একদা যোহর নামাজান্তে দয়াল নবী (সাঃ) এর খাছ হোব্ব এশক মহব্বতের ফয়েজ বাতানোর দায়িত্ব পড়িল তাহার (বড় ভাই মোঃ আলতাফ হোসেন) উপর। সেদিন প্রচুর ফয়েজ ওয়ারেদ হইল। উপস্থিত সকলেই অঝরে কাঁদিল। ফয়েজ বাতানো শেষে কেবলাজান হুজুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে নিকটে আহবানপূর্বক বলিলেন, বাবা আলতাফ! আল্লাহর দীন প্রচারই উত্তম, নাকি ব্যবসা করা উত্তম? বড় ভাই নিম্নস্বরে দীন প্রচারের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলিলেন। তৎক্ষণাৎ কেবলাজান হুজুর বলিলেন, "আলতাফ! আমার হাতে হাত রাখিয়া বল-আমি আর কখনও ব্যবসা করিব না।"
বড় ভাই মোঃ আলতাফ হোসেন (রঃ) পীর কেবলাজানের নির্দেশে ব্যবসা ত্যাগ করিলেন। দীন প্রচারে আত্মনিয়োগ করিলেন। ইহার পর হইতে আমাদের সংসারের অভাব চরমে পৌছাইল। একবেলা আহার করিলে, তিন বেলাই অনাহারে থাকিতাম। একদা পীর কেবলাজান আমাকে বলিলেন, বাবা, তুমি যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে ত্যাগী হও অর্থাৎ সংসার বিরাগী হও। এই উপদেশ শ্রবণে নিজ সম্পদ বলিতে যাহাছিল তাহা বিক্রয় করিয়া দীনের স্বার্থে পীরের কদমে প্রদান করিলে সকলের সামনে যদিও আমাকে বকা দিলেন, তিরস্কার করিলেন; তথাপিও গ্রহণ করিলেন। পরে গোপনে আমাকে বলিলেন, বাবা, পীরের হাতে যাহা দেওয়া হয়; তাহা খোদাতায়ালার নিকট আমানত থাকে।
ইহার পর থেকে দরিদ্রতার অস্বাভাবিক নিষ্পেষণে আমি নিষ্পেপিত হই। শেরপুরে পীর কেবলাজানের পক্ষ থেকে আমরাই তরিকা প্রচার করিতাম। আমাদের দুঃখ কষ্ট দর্শনে জাকের ভাইয়েরা একদা আমাদেরকে বলিলেন, ভাইজান! আমরা দিলে আপনারা গ্রহণ করিবেন-শুধু এতটুকুতে রাজী হউন। তাহা হইলে আপনাদের কোন অভাব থাকিবে না, দরিদ্রতা থাকিবে না। আমরাই গোলা (বড় ডোল) তৈরী করিব; আমরাই ধান দ্বারা সেই গোলা ভর্তি করিব। আপনাদের কিছুই করিতে হইবে না। কিন্তু সাধনা জীবনে পীরের নির্দেশ ছিল-
⇨ কাহারো নিকট হাত পাতিতে পারিবে না।
⇨ কেহ সেচ্ছায় দিলেও গ্রহণ করিতে পারিবে না।
তাই কঠোর দুঃখ-কষ্ট ভোগ করিয়াছি কিন্তু জাকেরানদের কিছু গ্রহণ করি নাই।
এমনিভাবে পীর কেবলাজানের সরাসরি নির্দেশে, তাঈদ ও মদদে দুনিয়ার আকর্ষণ মুক্ত হইতে, দুনিয়ার বন্ধন মুক্ত হইতে এই মিছকিন সক্ষম হইয়াছিল। তাই-ই পীর কেবলাজান দয়া করিয়া মারেফাতের ভান্ডার আমার জন্য খুলিয়া দিলেন।
তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার নৈকট্য অর্জন করিতে চাও, তবে অন্যান্য গুণাবলীর সাথে সংসার বৈরাগ্যের গুণও অর্জন কর অর্থাৎ ত্যাগী হও। আর ত্যাগের গুণ অর্জন করার জন্য পীরের খেদমত করিতে থাক। পীরের খেদমতে তদীয় নেক দৃষ্টি অর্জন করিতে পারিলে তোমরা যোহদের ছুরাত ও হকিকতের গুণে গুণান্বিত হইতে পারিবে। এখানে উল্লেখ্য যে, খোদাপ্রাপ্তির পথে দুনিয়ার আকর্ষণ মুক্ত হওয়া বা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েস ত্যাগ করা যোহদের প্রাথমিক অবস্থা-যাহা যোহদ বা বৈরাগ্যের ছুরাত বলিয়া পরিচিত।
এই অবস্থা প্রাপ্তির পরে মারেফাতের দরজা খোদাঅন্বেষীর জন্য উন্মুক্ত হয়, মুরীদের দেল পরিচ্ছন্ন ও প্রশস্ত হয়। খোদাতায়ালার আফ্যালিয়াত (ক্রিয়াকলাপ) এর নূরে দেল আলোকিত হয়। এই সময়ে খোদা অন্বেষীকে বেশ কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়। যেমনঃ
◇ সমুদয় সৃষ্টিজগত দেখিবার ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
◇ বাক্যসিদ্ধি দান করা হয়।
◇ কারামত প্রদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
◇ সমাজে জনপ্রিয়তাও দান করা হয়।
একজন কর্মব্যস্ত জননী যেমন ক্রন্দনরত শিশুকে কান্না থামাইবার জন্য কিছু খেলনা বা চকলেট প্রদান করেন-যাহাতে শিশুর কান্না থামিয়া যায়। শিশু খেলনা পাইয়া মায়ের কোলে উঠার কথা একেবারেই ভুলিয়া যায়, তেমনি যোহদের ছুরাত অর্জনকারী খোদাতালাশীকে পরীক্ষাচ্ছলে আল্লাহতায়ালা খেলনা স্বরূপ কিছু ক্ষমতা অর্পণ করেন।
যে সাধক উক্ত খেলাতেই মাতিয়া থাকে-তাহার পক্ষে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছানো আর সম্ভব হয় না। সাধকের মূল উদ্দেশ্য হইবে আল্লাহর জাতের সান্নিধ্য। পথিমধ্যে মূল্যবান যাহা কিছুই পাওয়া যাক না কেন; তাহাকে মূল্যহীন মনে করিয়া সেদিক হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া জাতমুখী অগ্রসর হইতে হইবে। ইহাই কর্তব্য। ইহাই যোহদের হকিকত। যে সাধকের পক্ষে ইহা সম্ভব হয়-সেই যোহদের হকিকতের গুণ অর্জন করিয়া খোদাতায়ালার জাত পর্যন্ত পৌঁছায়, কৈফিয়তশূন্য জাত দর্শনে অনাবিল তৃপ্তি পায়।
হে জাকেরগণ! তোমরা যাহারা খোদাকে পাইতে চাও, সংসারবিরাগী হও-যোহদের ছুরাত ও হকিকত অর্জনের চেষ্টা কর। আল্লাহতায়ালা তোমাদিগকে দয়া করুন। আমীন!








