Logo

তওবা হইল কৃত পাপের জন্য লজ্জিত বা অনুতপ্ত হওয়া

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:২০
তওবা হইল কৃত পাপের জন্য লজ্জিত বা অনুতপ্ত হওয়া
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তওবার গুরুত্ব ও তাৎপর্যঃ

বিজ্ঞাপন

'তওবা' আরবী শব্দ। অভিধানে ইহার বিবিধ অর্থ দৃষ্ট হয়। যথাঃ অনুতাপ, অনুশোচনা, প্রত্যাবর্তন, বিরত থাকা ইত্যাদি।

দয়াল নবী (সাঃ) বলেন, "লজ্জিত হওয়াই তওবা।” (মুসতাদরাকে হাকিম)। তিনি আরও বলেন, "অনুশোচনাই তওবা।” সুতরাং তওবা হইল কৃত পাপের জন্য লজ্জিত বা অনুতপ্ত হওয়া। অন্য কথায়ঃ কৃত পাপ বা অপরাধের জন্য খোদার ভয়ে ভীত হওয়া, লজ্জিত হওয়া, অনুতপ্ত হওয়া, অনুতাপ অশ্রুসহ মহান খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা অর্থাৎ খোদার দিকে প্রত্যাবর্তন করাই তওবা।

তওবা 'তাবা' হইতে ব্যুৎপন্ন একটি ক্রিয়া বিশেষ। পাক কুরআনে ইহার ক্রিয়া ও ক্রিয়া বিশেষ্যের বহু ব্যবহার দৃষ্ট হয়।

বিজ্ঞাপন

হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব তওবার স্বরূপ সম্পর্কে বলেন, তিনটি ধারাবাহিক বিষয়ের সমন্বয়ে তওবা অস্তিত্ব লাভ করে। যথাঃ জ্ঞান, অনুতাপ বা অনুশোচনা এবং বর্তমানে ও ভবিষ্যতে গুনাহ বর্জন করা এবং অতীত দিনসমূহের ক্ষতি পূরণ করিয়া নেওয়া। এই বিষয়ত্রয়ের সমষ্টিকে পরিভাষায় তওবা বলা হয়। প্রায়শঃ কেবল অনুশোচনাকেই তওবা বলা হয় এবং জ্ঞানকে উহার ভূমিকা এবং গুনাহ বর্জনকে উহার ফলাফল অ্যাখ্যা দেওয়া হয়। এই দিক দিয়া নবী করীম (সাঃ) বলেন, 'অনুশোচনা হইতেছে তওবা' কেননা অনুশোচনার নিশ্চয়ই কোন কারণ থাকিবে এবং পরবর্তীতে উহার ফলাফলও কিছু প্রকাশ পাইবে। জনৈক বুযুর্গ তওবার সংজ্ঞায় বলেন, তওবা হইতেছে সাবেক গুনাহের জন্য অনুশোচনার অনলে অন্তর বিগলিত হওয়া। এই সংজ্ঞায় কেবল মর্মবেদনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেহ কেহ এই মর্মবেদনার পরিস্কার উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, তওবা একটি অগ্নি, যাহা অন্তরে প্রজ্জলিত হয় এবং একটি বেদনা, যাহা হৃদয় হইতে আলাদা হয় না। কেহ কেহ গুনাহ বর্জনের দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন যে, তওবা হইল অনাচারের পোশাক খুলিয়া সরলতা ও হৃদ্যতার শয্যা পাতা। সহল ইবনে আবদুল্লাহ তশতরী (রঃ) বলেন, নিন্দনীয় কর্মকান্ডকে প্রশংসনীয় কর্মকান্ডে রূপান্তরের নাম তওবা। তওবার প্রথম বিষয় জ্ঞান, আর জ্ঞানের উদ্দেশ্য হইল এই কথা জানা যে, পাপ বা গুনাহের ক্ষতি অসামান্য এবং অনেক গুনাহ মানুষ ও তাহার প্রেমাস্পদ আল্লাহর মধ্যে আড়াল হইয়া দাঁড়ায়। বলা বাহুল্য, এই জ্ঞানের ফলস্বরূপ অন্তরে অনুশোচনার উৎপত্তি হয়। (এহইয়াও উলুমদ্দীন- বাংলা সংস্করণ)

তওবা করিলে আল্লাহপাক কবুল করেন। তবে তওবার কতকগুলি শর্ত আছে। যথাঃ

  • কৃতপাপের জন্য খোদার ভয়ে ভীত হওয়া।

বিজ্ঞাপন

  • লজ্জা, অনুতাপ, অনুশোচনা ও চোখের পানি লইয়া খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা।

  • কৃত অপরাধ থেকে বর্তমানে ও ভবিষ্যতে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করা। এবং

  • আল্লাহর হক ও বান্দার হক যাহা নষ্ট হইয়াছে-তাহা আদায় করা।

  • বিজ্ঞাপন

    ছুনানে 'ইবনে মাজা'র টীকায় বলা হইয়াছে যে, অনুতাপ হইল তওবার বড় অংশ। অনুতাপ তওবার অন্যান্য অংশগুলিকে বাস্তবায়িত করে। কেননা অনুতপ্ত ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত গুনাহ হইতে পবিত্র হয় এবং ভবিষ্যতে গুনাহের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। মূলতঃ এই দুই কাজের দ্বারাই তওবা পূর্ণতা লাভ করে। তবে ফরজ কাজের ক্ষেত্রে উহা আদায় করা এবং হক্কুল এবাদের বেলায় বান্দার হক বান্দার নিকট পৌঁছানো প্রয়োজন। আর এই কথা সুস্পষ্ট যে, অনুতাপ এই কাজগুলিকে ত্বরান্বিত করে।

    অনুতপ্ত হৃদয়ে খোদার নিকট তওবা করিলে যত বড় গুনাহই হোক না কেন-আল্লাহপাক তাহা ক্ষমা করেন এবং বান্দার পাপরাশিকে পুণ্যে পরিণত করেন। আল্লাহপাক বলেন,

    مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلاً صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ لِيُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّاتِهِم حَسَنَتْ

    বিজ্ঞাপন

    অর্থাৎ- "যে তওবা করিবে এবং বিশ্বাস ও সৎকার্য করিবে: অনন্তর আল্লাহ তাহাদের গুনাহসমূহ সৎকার্যে পরিবর্তিত করিবেন।" (সূরা ফুরকানঃ ৭০)

    হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেন,

    'অনুতাপ নিপীড়িত ব্যথিত জনের,

    বিজ্ঞাপন

    শক্তি ধরে অস্ত্রধারী শত সিপাহের।'

    অর্থাৎ-'একশত সিপাহী ঢাল-তলোয়ারসহ যে ক্ষমতা না রাখে, অনুতাপের হাত তাহার চেয়েও বেশী ক্ষমতা রাখে।'

    হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, বান্দা গুনাহ করার পরে যদি এক মুহূর্ত অনুতাপ করে, তবে পলক মারারও পূর্বে সেই গুনাহ দূর হইয়া যায়। হযরত গউস পাক (রঃ) তদীয় 'গুনিয়াতুত্ব তালেবীন' কিতাবে বলেন যে, 'তওবা' অর্থ বিরত থাকা। যেমন, যদি বলা হয় যে, অমুক লোকটি এই কাজ হইতে তওবা করিয়াছে, তবে তাহার অর্থ বুঝিতে হইবে যে, লোকটি এই কাজ হইতে বিরত হইয়াছে। পরিভাষাগত অর্থে তওবা বলা হয়- শরীয়তের দৃষ্টিতে সমস্ত খারাপ কাজ হইতে বিরত হইয়া শরীয়ত সিদ্ধ উত্তম কার্যগুলিতে মশগুল হওয়াকে।

    বিজ্ঞাপন

    তওবার সাথে সম্পর্ক হইল পাপ বা গুনাহের। পাপ বা গুনাহ হইতে মুক্তি লাভের জন্যই তওবা প্রয়োজন। পাপ বা গুনাহ হইতে মুক্তি লাভনা করিলে পারলৌকিক মুক্তি সম্ভব নয়। তাই গুনাহ সম্পর্কেও দুই একটি কথা এখানে উল্লেখের দাবি রাখে।

    আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধাচারণ করা বা নাফরমানি করাই গুনাহ। শরীয়তের অবহেলা, শরীয়তের প্রতিকূলে চলা এবং শরীয়ত ও সুন্নতের আদেশ-নিষেধের খেলাফ করাই গুনাহ। গুনাহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান প্রয়োজন।

    গুনাহ দুই প্রকার। যথাঃ কবিরা গুনাহ ও ছগিরা গুনাহ।

    বিজ্ঞাপন

    আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন, যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়, তাহার মধ্য হইতে কবিরা (বড়) গুলো হইতে বাঁচিয়া থাক, তবে আমি তোমাদের মন্দকাজসমূহকে মিটাইয়া দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানিতস্থানে দাখিল করিব। (সূরা নেছা, রুকু-৫) অন্য এক আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, তোমরা বাঁচিয়া থাক কবিরা বা বড় গুনাহ হইতে এবং নির্লজ্জতা থেকে, ছোট ছোট মলিনতা বাদে। হাদীস শরীফে আছে, পাঞ্জেগানা নামাজ এবং জুমআ হইতে পরবর্তী জুমআ মধ্যবর্তী সকল গুনাহ দূর করিয়া দেয় যদি বড় গুনাহ হইতে আত্নরক্ষা করা যায়। অর্থাৎ নামাজ ছোট গুনাহ বা ছগিরা গুনাহের কাফফারা স্বরূপ কাজ করে।

    কিন্তু কবিরা গুনাহের সংজ্ঞা ও সংখ্যা সম্পর্কে শরীয়তে মতভেদ আছে। কেহ বলেন, কবিরা গুনাহের সংখ্যা চার, কেহ বলেন সাত, কেহ বলেন সত্তর ইত্যাদি। অর্থাৎ কুরআন-হাদীসে কবিরা গুনাহের সুনির্দিষ্ট কোন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় নাই। যেমন শবে কদরের রাত্র কোনটি-তাহা নির্ধারিত নাই, জুমআর দিনের দু'আ কবুল হওয়ায় সুনির্দিষ্ট সময়ও যেমন উল্লিখিত হয় নাই। ঠিক তেমনি, কবিরা গুনাহের সংখ্যাও শরীয়তে স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতার কারণ হয়তো এই হইবে যে, বান্দা যেন কবিরা গুনাহ ধারণায় সমস্ত গুনাহ হইতেই নিজেকে পরহেজ করিতে সক্ষম হয়। তবে গুনাহ কবিরাই হোক বা ছগিরাই হোক-উভয়ই থেকে তওবা করা ওয়াজেব। আল্লাহতায়ালা সকল ঈমানদারগণের উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন,

    وَتُوبُوا إِلَى اللهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

    বিজ্ঞাপন

    অর্থাৎ- “হে মোমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর সমীপে তওবা কর, যেন তোমরা সফলতা অর্জন করিতে পার।" (সূরা নূরঃ ৩১)

    আল্লাহতায়ালা আরও বলেন,

    يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرُ عَنْكُمْ سَيِّاتِكُمْ

    বিজ্ঞাপন

    অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আলাাহতায়ালার সমীপে খাঁটি তওবা কর, আশা রহিয়াছে যে, তোমাদের রব তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করিয়া দিবেন।" (সূরা তাহরীমঃ ৮)

    কুরআন পাকের উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা সকলকেই তওবা করার নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। তওবা করা ওয়াজেব বা ফরজে আইন।

    মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই কমবেশী ত্রুটি-বিচ্যুতি পূর্ণ। মানুষের হকিকত সিফাতে হাকীকীতে নিহিত। সিফাতে হাকীকী হইল আল্লাহতায়ালার আটটি বিশেষ গুণ। যথাঃ হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, বাছারাত, সামাওয়াত, কালাম ও তাকবীন। সিফাতে হাকীকীর দুইটা অবস্থা বর্তমান। একটি নিখুঁত অবস্থা, অপরটি খুঁতবিশিষ্ট অবস্থা। একদিকে নিখুঁত জ্ঞান, নিখুঁত ক্ষমতা, নিখুঁত শ্রবণ শক্তি, নিখুঁত দর্শন শক্তি ইত্যাদি। অন্যদিকে খুঁত বিশিষ্ট গুণাগুণ। সিফাতে হাকীকীর খুঁত বিশিষ্ট অবস্থাই হইল সৃষ্টির হকিকত। উক্ত ত্রুটিপূর্ণ অবস্থাকে উদ্দেশ্য করিয়াই আল্লাহতায়ালা 'কুন' আদেশ প্রয়োগ করিয়াছেন। ফলে সৃষ্টি তাহার নিরাকার হাকীকী অবস্থা থেকে নির্গত হইয়া প্রথমে সূক্ষ্ণ আকৃতিতে আলমে আরওয়াহ'-তে এবং পরবর্তীতে স্কুল আকৃতিতে আলমে খালক'এ অবতরণ করিয়াছে।

    সিফাতে হাকীকীর খুঁত বিশিষ্ট অবস্থার প্রথম প্রতিবিম্ব হইল আদম-যাহা আকরাবিয়াতের নিম্নে অবস্থিত এবং নিখুঁত অবস্থার প্রতিবিম্ব হইল অজুদ। এই অজুদ আল্লাহ নহে, তবে আল্লাহতায়ালার জাত ভিন্ন সমুদয় কামালাতের (পূর্ণতা) প্রতিবিম্ব। কাজেই আদম হইল অশুভের সমষ্টির প্রকাশ, আর অজুদ হইল শুভ সমষ্টির প্রকাশ। অজুদ আল্লাহর জন্যে এবং আদম সৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট। কেননা সমস্ত মঙ্গল আল্লাহর এবং সমস্ত অমঙ্গল সৃষ্টির জন্য নির্ধারিত।

    আল্লহতায়ালার 'কুন' আদেশে আদম প্রকাশিত হয়। আদমের উপর আল্লাহতায়ালা অজুদের প্রতিবিম্ব ফেলেন। ফলে আদমের মধ্যে গুণাগুণ আসিয়া যায়। এই গুণাগুণ আল্লাহতায়ালার আমানত হিসাবে আদমের মধ্যে প্রদত্ত হয়।

    তাই বলা হয়, মানুষের সমুদয় গুণাগুণ তথা কল্পন, দর্শন, শ্রবণ, চিন্তন, সৃজন, কথন-সবই আল্লাহতায়ালার দান। মানুষের হৃদয় বা কালব-তাহাও আল্লাহতায়ালার আমানত বা দান। এই আমানতের খেয়ানত যে করিবে, তাহার পরিণাম ভয়াবহ। বুযুর্গানে দ্বীন বলেন, আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক মানুষকে এলহামের মাধ্যমে দুইটি ভেদের কথা জানাইয়া দেন।

    ★ যখন মানুষ জননীর গর্ভ হইতে নির্গত হয়, তখন তাহাকে বলা হয়, হে বান্দা! আমি তোমাকে পাক-সাফ অবস্থায় দুনিয়াতে পাঠাইলাম। তোমার আয়ুষ্কাল তোমার কাছে আমানত। এখন আমি দেখিব, তুমি কিভাবে এই আমানতের হেফাযত কর এবং আমার সাথে কি অবস্থায় সাক্ষাৎ কর?

    ★ যখন মানুষের আত্না নির্গত হয়, তখন বলা হয়, হে বান্দা! আমি যে আমানত তোমার নিকট রাখিয়াছিলাম, তুমি এই সময় পর্যন্ত তাহার হেফাযত করিয়াছ কি? তুমি তোমার অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়া থাকিলে আমিও আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করিব। আর তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া থাকিলে আমি শাস্তি দিব। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলেন, তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করিব।

    আল্লাহ প্রদত্ত আমানতের হেফাযত করিবার একমাত্র উপায় শরীয়ত ও সুন্নতের সাজে নিজেকে সজ্জিত করা। জাহেরী শরীয়তের আদেশ-নিষেধের সাজে বহিরাঙ্গ এবং বাতেনী শরীয়তের সাজে অন্তরাঙ্গকে সজ্জিত করা। ইহার অন্যথা করাই আমানতের খেয়ানত করা। কিন্তু শরীয়তের (জাহেরী ও বাতেনী) আদেশ-নিষেধ সব সময় পালন করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণঃ

    • মানুষ সৃষ্টিগত ভাবেই ত্রুটিপূর্ণ।

  • মানুষের পশ্চাতে আছে শয়তান। সে সবসময়ই মানুষকে পথভ্রষ্ট করিবার কাজে নিয়োজিত।

  • শয়তানের পক্ষ হইতে মানব দেহে আছে নাফসে আম্মারা। নাফসে আম্মারা খোদাদ্রোহী। যাবতীয় কু-কর্ম ও কু-চিন্তার উৎস এই নাফস। সে খোদাকে স্বীকার করে না। খোদাতায়ালার আদেশ নিষেধ প্রতিপালনের কোন প্রয়োজনও বোধ করে না। খোদার বিরোধিতা ও নাফরমানি করাই তাহার স্বভাব। এই দুষ্ট নাফস মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে শিকড় গাড়িয়া আছে। তাহার এক শক্তিশালী বাহিনী আছে। কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্য, হিংসা-কিনা, রিয়া, কামনা-বাসনা ইত্যাদি নাফসের সৈন্য-সামন্ত। তাই দুষ্ট নাফসের বন্দীদশা হইতে মুক্ত হইয়া খোদার দিকে অগ্রসর হওয়া দুস্কর।

    • নশ্বর দুনিয়াও খোদাতায়ালার দিকে ধাবমান হইতে মানুষকে বাধা দেয়।

  • মানুষের এই ভৌতিক দেহ আলমে খালকের চার উপাদানে তৈরী। যথাঃ আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস। এই সমস্ত উপাদানেরও কিছু জাতি দোষ আছে-যাহা মানুষকে খোদাতায়ালার দিকে যাইতে বাধা প্রদান করে।

  • উল্লিখিত পঞ্চমুখী প্রতিবন্ধকতার কারণে মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত আমানতের হেফাজতের পথে অর্থাৎ জাহেরী ও বাতেনী শরীয়তের সাজে নিজের বাহির ও ভিতর সজ্জিত করিতে ত্রুটি-বিচ্যুতি করিয়া ফেলে, পাপ বা গোনাহ করিয়া ফেলে, আল্লাহর আদেশের খেলাফ করে, নিষেধ অমান্য করে। কিন্তু আল্লাহতায়ালা ইহার প্রতিকারের ব্যবস্থা করিয়াছেন। সেই ব্যবস্থাই হইল খাঁটি তওবা অর্থাৎ অনুতপ্ত হৃদয়ে খোদার দরবারে কান্নাকাটি করা, ক্ষমা চাওয়া।

    খাঁটি তওবা নিঃসন্দেহে কবুল হয়ঃ

    নাফস ও শয়তানের ধোকায় পড়িয়া যত অপরাধই মানুষের দ্বারা হউক না কেন, যত গোনাহই সে করুক না কেন, খাঁটি দেলে আল্লাহর নিকট তওবা করিলে আল্লাহতায়ালা তাহা কবুল করেন। আল্লাহতায়ালার সেই প্রতিশ্রুতির সংবাদ পাওয়া যায় পবিত্র কুরআন ও হাদীসে।

    আল্লাহ বলেন,

    قُلْ يُعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ ط إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ط إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

    অর্থাৎ "ঘোষণা কর এ বাণীঃ হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যাহারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করিয়াছ, তাহারা আল্লাহতায়ালার রহমত হইতে নিরাশ হইও না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ (অতীতের) সমস্ত গোনাহ মাফ করিবেন, নিশ্চয় তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা যুমারঃ ৫৩)

    আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন,

    وَلَا تَايْتَسُوا مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ طَ إِنَّهُ لَا يَايْنَسُ مِنْ روحِ اللَّهِ إِلَّا القَوْمُ الْكَفِرُونَ

    অর্থাৎ-"আর আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ হইও না, নিশ্চয় আল্লাহতায়ালার রহমত হইতে কেবল সেই সমস্ত লোকই নিরাশ হয়-যাহারা কাফের।" (সূরা ইউসুফঃ ৮৭)

    হাদীস শরীফে দেখা যায় যে, নবী করীম (সাঃ) বলেন যে, আল্লাহপাক বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমার নিকট দু'আ করিতে থাকিবে আমি তোমাকে ক্ষমা করিয়া দিব, তোমাদের গোনাহ যত বেশীই হউক না কেন, তাহাতে আমি কিছু মাত্র পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তোমার গোনাহ যদি আকাশের মেঘ পরিমাণও হয় তথাপিও তুমি আমার নিকট মাগফেরাত কামনা করিলে আমি তোমাকে ক্ষমা করিয়া দিব; আর তাহাতে আমি কিছুই পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তোমার গোনাহ যদি এত বিপুল পরিমাণও হয় যে উহা গোটা জমিন ভরিয়া যায়, ঐ অবস্থায়ও যদি তুমি আমার নিকট এমনভাবে হাজির হও যে আমার সহিত কাহাকেও তুমি শরীক কর নাই, তবে আমিও তোমাকে এত বিপুল পরিমাণ মাগফেরাত দ্বারা ধন্য করিব যে উহা দ্বারাও গোটা ভূ-পৃষ্ঠ পরিপূর্ণ হইয়া যাইবে। (তিরমিজী শরীফ) তাই বুযুর্গানে দ্বীন ফরমান যে, আল্লাহপাক বলেন,

    "যদিও ভাংগিয়া থাক তওবা শতবার

    তবুও রেখেছি খুলে তওবার দুয়ার;

    পাপী-তাপী যত সব এস ত্বরা করি,

    করিব তাদের ক্ষমা-এ আদেশ আমারই।"

    অর্থাৎ-তোমরা একশত বার তওবা করিয়া একশত বারই যদি ভাংগিয়া থাক-তবুও ভয় নাই; আবার তওবা কর। তওবার দরজা তোমাদের জন্য খোলাই রহিয়াছে।

    আল্লাহপাক তওবাকারীকে ভালবাসেন এবং তওবাকারীর গুনাহ-খাতা মাফ করিয়া দেন। আল্লাহপাক বলেন,

    إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ

    অর্থাৎ-"নিশ্চয়ই আল্লাহপাক তওবাকারীকে ও পরিচ্ছন্নতার অধিকারীকে ভালবাসেন।" (সূরা বাকারাঃ ২২২)

    নবী-করীম (সাঃ) বলেন,

    التَّائِبُ حَبِيبُ اللَّهِ

    অর্থাৎ-"তওবাকারী আল্লাহর বন্ধু।"

    স্তরভেদে মানুষের উপর তওবার প্রভাব, প্রতিক্রিয়া, ফলাফল বা কার্যকারিতা ভিন্ন ভিন্নঃ

    নাফসের পাঁচটি স্তর। যথাঃ

    • নাফসে আম্মারা,

  • নাফসে লাওমা,

  • নাফসে মোৎমাইন্ন্যা,

  • নাফসে মোলহেমা ও

  • নাফসে মোহাদ্দেসা।

  • নাফসে আম্মারার স্বভাব সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, এই নাফস সর্বদাই খোদাতায়ালার নাফরমানিতে লিপ্ত। খোদাতায়ালাকে অস্বীকার করা, তদীয় আদেশ-নিষেধ অমান্য করা, তাহার বিরোধিতা করা নাফসে আম্মারার জাত-স্বভাব। নাফসে আম্মারা স্তরের মানুষ নিকৃষ্ট স্বভাবের হয়। সে স্বীয় নাফসের দাসত্বে লিপ্ত থাকে। নাফসে আম্মারা যেমন খোদাতায়ালার বিরোধিতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত থাকে, তেমনি এই স্তরের মানুষ সর্বদাই আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, পাপ ও গোনাহের কাদায় কর্দমাক্ত থাকে, পাপ থেকে তওবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না, কখনও তওবা করিলে-তাহা কেবল মৌখিক তওবাই হয়, ইহার সাথে অন্তরের কোন যোগসূত্র থাকে না। তাহাদের তওবার মধ্যে থাকে কপটতা বা শঠতা। মৌখিক ভালবাসার যেমন কোন মূল্য নাই, কেবল মৌখিক তওবারও কোন দাম নাই। ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তওবার শর্তসমূহের একটিও ইহাতে পূর্ণ হয় না।

    আম্মারার উপরে নাফসে লাওমার স্তর। এই স্তরের বান্দা কখনও আল্লাহর দিকে, আবার কখনওবা নাফসের দিকে থাকে। কখনও ঊর্ধ্বদিকে বা নূরময় জগতের দিকে; আবার কখনোওবা নিম্নদিকে বা আম্মারার দিকে থাকে। যখন নিম্নদিকে বা আম্মারার দিকে থাকে, তখন এই স্তরের বান্দার দ্বারা বিভিন্ন পাপ বা গোনাহের কর্ম সংঘটিত হয়। পরক্ষণেই আবার বান্দার কালব ঊর্ধ্বদিকে বা আল্লাহর দিকে ধাবমান হয়; কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে বা খালেছ তওবা করে। এই স্তরের বান্দার তওবা আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্টচিত্তেই কবুল করেন। যতবারই তওবা ভঙ্গ হউক না কেন, আবারও তওবা করিলে নাফসে লাওমা স্তরের বান্দার তওবা আল্লাহ কবুল করিবেন-এমন ওয়াদা আল্লাহপাকের আছে। তওবার অধিকাংশ শর্তই এই স্তরের মানুষের তওবায় নিহিত থাকে।

    লাওমার ঊর্ধ্বে আছে নাফসে মোৎমাইন্ন্যা। নাফসে মোৎমাইন্ন্যা খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট; খোদাতায়ালাও এই নাফসের উপর সন্তুষ্ট। এই নাফস পবিত্র; আম্মারার দুষ্ট স্বভাবমুক্ত। ইহা নূরময় জগতের নাফস। এই স্তরের সাধককে খোদাতায়ালার ওলী বলা হয়। ইহা বেলায়েতে ছোগরার স্তর। এই স্তরের সাধক খোদাতায়ালার ইবাদতে মগ্ন থাকেন; ইবাদতেই শান্তি পান। স্বেচ্ছায় কখনও খোদাতায়ালার নাফরমানি করেন না।

    মোৎমাইন্ন্যা স্তরের সাধক নাফসের পবিত্রতা অর্জন করেন বটে; তবে তাহার দেহের উপাদান-চতুষ্টয়ের পবিত্রতা অর্জিত হয় না। দৈহিক জড় উপাদান সমূহের জাতি দোষসমূহ তখনও বর্তমান থাকে। তাই এই স্তরের সাধক থেকেও কিছু ভুল-ত্রুটি প্রকাশ পাইতে পারে। সেই ভুল-ত্রুটির জন্য মোৎমাইন্ন্যা স্তরের সাধকও তওবা করিয়া থাকেন।

    তওবার সবগুলি শর্তসহ তাহারা খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা চান। মোৎত্মাইন্যা স্তরের সাধকের তওবার আরও একটি রহস্য বর্তমান।

    আল্লাহপাক তাহার পরিচয় প্রদানের জন্যই আমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহপাকের পরিচয় অর্থই হইল তাহার জাত ও সিফাত এর পরিচয়। মোৎত্মাইন্যা স্তরের সাধক সিফাতের পরিচয় কিছুটা লাভ করিলেও জাতের পরিচয় প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত থাকেন। কিন্তু মূলতঃ জাতের পরিচয় অর্জন করাইতো সৃষ্ট হিসেবে মানুষের কর্তব্য। আর এই পরিচয় জ্ঞান অর্জনের ত্রুটির কারণেও তাহারা অধিক তওবা করিয়া থাকেন।

    মোৎমাইন্ন্যার উপরে নাফসের দুইটি স্তর আছে। নাফসে মোলহেমা ও নাফসে মোহাদ্দেসা। ইহাদের মধ্যে নাফসে মোহাদ্দেসা হইল নবী (আঃ) গণের নাফস। তবে মোলহেমা ও মোহাদ্দেসা-উভয় নাফস যাবতীয় কলুষতামুক্ত থাকে। উক্ত নাফসদ্বয়ের না থাকে আম্মারার দোষ; না থাকে দৈহিক উপাদান চতুষ্টয়ের দোষ। উভয়ই পাক-পবিত্র; যাবতীয় গোনাহ বা স্খলন থেকে মুক্ত। তাহা ছাড়া মোহাদ্দেসা নাফসের অধিকারী সকল নবী (আঃ) গণই নিষ্পাপ বা মাসুম বলিয়া শরীয়তে স্বীকৃত।

    নাফসে মোলহেমার অধিকারী সাধক বর্গই ওলীয়ে কামেল। তাহারাই নায়েবে নবী বলিয়া পরিচিত। নবী (আঃ) গণের অবর্তমানে তাহারাই হেদায়েতের কর্ম চালু রাখিয়াছেন।

    নাফসে মোলহেমা ও নাফসে মোহাদ্দেসা পর্বের সাধকবর্গ অর্থাৎ ওলীয়ে কামেল ও নবী (আঃ) গণ পাক-পবিত্র ও গোনাহের স্খলন থেকে মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অধিক হারে তওবা করিয়া থাকেন; ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মোহাদ্দেসা স্তরের সাধক তথা নবী (আঃ) গণের তওবা এস্তেগফার সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে বহু প্রমাণ রহিয়াছে। হাদীসে দেখা যায়, দয়াল নবী (সাঃ) প্রতিদিন ১০০ বার, মতান্তরে ২০০ বার তওবা করিতেন (মুসলিম), তেমনি অন্যান্য নবী (আঃ) গণও করিতেন। ইহার রহস্য বা কারণ কি?

    এ মিছকিনের মতে ইহার তিনটি কারণ পরিলক্ষিত হয়।

    প্রথমতঃ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

    আল্লাহতায়ালা নবী (আঃ) গণকে জাত-সিফাতের জ্ঞান দান করিয়াছেন। তাহাদেরকে মাসুম বা নিষ্পাপ বলিয়া স্বীকৃতি দান করিয়াছেন। ইহা তাহাদের প্রতি আল্লাহতায়ালার মহা দান। আর এই দানের শোকরিয়া আদায় করার জন্য তাহারা অধিক হারে তওবা করিতেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, একদা দয়াল নবীকে (সাঃ) কেহ জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি ইবাদতের মধ্যে এত কষ্ট করেন কেন, আল্লাহপাকতো আপনার পর্বাপর সমস্ত ত্রুটি ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। উত্তরে তিনি বলিলেন, 'আমি কি আল্লাহতায়ালার কৃতজ্ঞ বান্দা হইব না?' (বোখারী, মুসলিম)

    দ্বিতীয়তঃ

    আল্লাহতায়ালা তাহার জাত ও সিফাতের জ্ঞান সকল নবী (আঃ) কে সমপরিমাণে দান করেন নাই। সকলের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞান দান করিয়াছেন, দয়াল-নবীকে (সাঃ)। অথচ দয়াল-নবীও (সাঃ) সর্বশেষ মাকামদ্বয়ে অর্থাৎ হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরকায় পৌঁছানোর পর আল্লাহতায়ালা তাহাকে বলিলেন, 'হে মুহাম্মদ! আপনি থামুন।' যে দুর্বার গতিতে তিনি উরুজ' করিতেছিলেন; জাত সিফাতের জ্ঞান অর্জন করিতেছিলেন; হঠাৎ থামিয়া যাওয়ায় তাহার গতি যেমন ব্যাহত হয়, জাত সিফাত সম্পর্কীয় জ্ঞান অর্জনও তেমন ব্যাহত হয়। অবশ্য নজরিয়া ছায়েরের পথ যদিও খোলা থাকে; তবুও শরীরসহ ছায়েরের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়-নজরিয়া ছায়েরের মাধ্যমে ততখানি সম্ভব হয় না বিধায় এই স্তরে সাধকের মধ্যে পরিচয়ের অক্ষমতার অনুভূতি আসে। এই অক্ষমতার ত্রুটি ইচ্ছাকৃত নয় বটে, তবুও ত্রুটি ত্রুটিই। হয়তো এই অক্ষমতার কারণেও দয়াল নবী (সাঃ) ও অপরাপর পয়গম্বর (আঃ) অধিক রোনাজারীসহ তওবা করিতেন।

    তৃতীয়তঃ

    দয়াল নবী (সাঃ) এবং অপরাপর পয়গম্বরগণ যখন ঊর্ধ্বজগত হইতে নিম্নদিকে তাকাইতেন তখন দেখিতেন যে, আপন আপন উম্মতেরা পাপ ও গোনাহের সাগরে হাবুডুবু খাইতেছে। তাই আপন আপন উম্মতকুলের নাজাত বা মুক্তির কারণে পয়গম্বরগণেরা অধিক হারে তওবা করিতেন। পয়গম্বরগণের তওবার কারণত্রয়ের মধ্যে মূলতঃ এইটার অগ্রগণ্য। নাফসে মোলহেমা স্তরের সাধকবর্গের তওবার কারণও মোহাদ্দেসা পর্বের সাধকদের অনুরূপ।

    পয়গম্বর (আঃ)গণ নিষ্পাপ বা মাসুম ছিলেন; তবে ভুল-ত্রুটি থেকে একেবারে মুক্ত ছিলেন না। যেমন, আদিপিতা হযরত আদম (আঃ)। আল্লাহপাক হযরত আদমকে (আঃ) বিবি হাওয়াসহ জান্নাতে বসবাসের অনুমতি দিয়া বলিলেন, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বাস কর এবং ভক্ষণ কর, যথা ও যেথা ইচ্ছা: কিন্তু এই গাছের সন্নিকটে যাইও না। অন্যথা তোমরা হইবে ক্ষতিগ্রস্থ। (সূরা বাকারা-৩৫ নং আয়াত) কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তাহারা নিষিদ্ধ ফল খাইলেন। ফলে আল্লাহ তাহাদেরকে বেহেশত হইতে দুনিয়ায় নিক্ষেপ করিলেন। দুইজনকে দুই দেশে নিক্ষেপ করিলেন।

    হযরত আদম (আঃ) তাহার এই ভুলের জন্য একটানা ৩৪০ বছর অঝোরে কাঁদিলেন। ৩৪০ বছর পরে বিবি হাওয়ার সাথে হযরত আদম (আঃ) এর দেখা হইল। দুইজনে সাক্ষাতের পরে তাহারা এমনই কান্না শুরু করিলেন যে তাহাদের কান্নায় আকাশের ফেরেশতারা পর্যন্ত বাদী হইলেন। ফেরেশতারা আল্লাহতায়ালাকে বলিলেন, হে খোদা! আমরাতো পূর্বেই আদমকে সৃষ্টি করিতে 'না' করিয়াছিলাম। কেনইবা তুমি তাহাকে সৃষ্টি করিলে, আর কেনইবা তাহাকে এত কান্দাইতেছ? তুমি যদি তাহাকে ক্ষমা না কর, তবে আমরাও আসমান হইতে জমিনে নামিয়া আদম ও হাওয়ার সাথে সুর মিলাইয়া কাঁদিব। আল্লাহপাক ফেরেশতাগণকে বলিলেন যে, তোমরা আদমকে উপরের দিকে তাকাইতে বল। আদম (আঃ) উপরের দিকে তাকাইয়া দেখিলেন যে, আরশের গায়ে লেখা,-'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।' তৎক্ষণাৎ আদম (আঃ) বলিলেন, হে খোদা! তোমার নামের সাথে যে মহানের নাম দেখিতেছি-তাহার অছিলায় তুমি আমাকে মাফ কর। আল্লাহপাক দয়াল নবী (সাঃ) এর অছিলায় আদম (আঃ) কে ক্ষমা করিলেন।

    হযরত আদম (আঃ) ক্ষমা পাইলেন বটে, কিন্তু বেহেশত ফেরত পান নাই। কাজেই বুঝা যায় আদম (আঃ) এর মামলার কর্মকান্ড এখনও সমাপ্ত হয় নাই। এই মামলার সমাপ্তি হইবে শেষ বিচারের অনুষ্ঠানান্তে। সেদিন দয়াল নবী (সাঃ) নিজ হাতে বেহেশতের দরজা খুলিয়া হযরত আদমকে (আঃ) বেহেশতে প্রবেশ করাইবেন। হযরত আদম (আঃ) তাহার হারানো বাসস্থান ফেরত পাবেন।

    হযরত আদম (আঃ) যে ভুল করিয়াছিলেন, তাহার জীবদ্‌কালে তিনি সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছেন। বংশানুক্রমে বা পুরুষানুক্রমে সন্তান-সন্ততি হিসাবে আমরাও সেই ভুলের জন্য দুঃখ-কষ্ট ভোগ করিতেছি। বাবা আদম (আঃ) আমাদের জন্য দুঃখ-কষ্ট রাখিয়া গেলেন; তেমনি তওবার মিরাসও রাখিয়া গেলেন।

    হযরত আদম (আঃ) এর তওবা কবুল হওয়ার পর যখন ফেরেশতারা তাহাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া বলিলেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার জন্য সুসংবাদ! আল্লাহর দরবারে আপনার তওবা কবুল হইয়াছে। আদম (আঃ) ফেরেশতাদের সম্রাটকে বলিলেন, হে জিব্রাইল! আমার তওবা কবুল হওয়ার পরেও যদি আমি আল্লাহর দরবারে এই ভুলের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হই, না জানি তখন আমার উপায় কি হইবে!

    হযরত আদম (আঃ) এর এই মন্তব্যের পর আল্লাহর তরফ থেকে অহী আসিল, হে আদম! আদম! তুমি তোমার সন্তানদের জন্য তোমার নিজ হইতেই বিপদাপদ ও তওবার মিরাস রাখিয়া গেলে। অতঃপর তাহাদের যে কেহ তোমার মত বিপদাপন্ন হইয়া আবার ঠিক তোমারই মত আমার দরবারে তওবা করিবে। আমি তাহার ডাকে অবশ্যই সাড়া দিব।

    কাজেই ভুল ত্রুটি করা আদম সন্তান হিসেবে আমাদের জন্য স্বাভাবিক। তবে ভুল-ত্রুটি অন্তে যে তওবা করে না, খোদার নিকট ক্ষমা চায় না-সে অহংকারী বা দাম্ভিক। শয়তানের মত সেও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর যে তওবা করিবে, ভুল-ত্রুটি মাফ চাইবে, সে আদমের (আঃ) মত ক্ষমাও পাবে, আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করিবে।

    পূর্বেই বলিয়াছি, আল্লাহতায়ালা তাহার (জাত ও সিফাতের) পরিচয় প্রদানের জন্যই মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। সিফাতে হাকীকী বাদেও আল্লাহতায়ালার অসংখ্য এজাফি সিফাত আছে-যে সকল সিফাত বা গুণাবলীর সম্পর্ক সৃষ্টির সাথে। যেমন ক্ষমা, দয়া, রুজিদান ইত্যাদি গুণাবলী।

    মানুষ যদি পাপ বা গোনাহ না করে, তবে আল্লাতায়ালার গাফ্ফার বা ক্ষমাগুণের বিকাশ বা প্রকাশ হয় না। গাফ্ফারিয়াত বা ক্ষমাগুণ আল্লাহতায়ালার সিফাতসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি সিফাত। সিফাতের পরিচয় প্রদানও সৃষ্টির উদ্দেশ্য। সেক্ষেত্রে বান্দা যদি গোনাহ না করে, ক্ষমা না চায়, তবে আল্লাহতায়ালা কিভাবে তাহার ক্ষমাগুণের পরিচয় দিবেন?

    কাজেই মানুষ পাপও করিবে, আবার ক্ষমাও চাইবে। তবে ক্ষমা যাহারা চাইবে না-তাহারাই ক্ষতিগ্রস্থ হইবে।

    আবু হোরায়রা বর্ণিত এক হাদীসে দেখা যায়-নবী করীম (সাঃ) বলেন, ঐ পবিত্র জাতের কসম! যাহার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি গোনাহ না কর, তবে আল্লাহ পাক তোমাদিগকে এই দুনিয়া হইতে স্থানান্তর করিয়া অন্য এক কওমকে সৃষ্টি করিবেন-যাহারা গোনাহ করিয়া আল্লাহতায়ালার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করিবে, আর আল্লাহপাক তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া দিবেন। (মুসলিম)

    দয়াল নবী (সাঃ) আরও বলেন, বান্দা পাপ করে, সেই পাপ তাহাকে বেহেশতে লইয়া যায়। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! পাপ কিভাবে বেহেশতে লইয়া যায়? দয়াল-নবী (সাঃ) বলিলেন, বান্দা পাপ করিয়া লজ্জিত হয় এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া থাকে। পরিশেষে এই পাপই তাহার বেহেশতে প্রবেশের কারণ হয়। (গুনিয়াতুত্ব তালেবীন)

    কোন কোন বুযুর্গ বলিয়াছেন, বান্দা যখন তওবা করে, তখন তাহার পূর্ববর্তী পাপ সমূহ পুণ্যে পরিবর্তিত হইয়া যায়। এই জন্যই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, রোজ কেয়ামতে বহুলোক পরিতাপ করিবে, হায়! আমি যদি আরও পাপ করিতাম (তবে তাহাওতো এইরূপ পুণ্যে পরিণত হইত)। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা তাহার পাপ আমি পুণ্যে পরিবর্তন করিয়া দেই।

    হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা তওবার সংজ্ঞা, গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ইহার প্রয়োজনীয়তা এবং ফলাফল সম্পর্কে বুঝিতে পারিলে। তোমরা সকালে-সন্ধ্যায় তওবা করিবে। ফাতেহা শরীফে সাতবার তওবা পাঠের মাধ্যমে গোনাহ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা আছে। সকালে ও সন্ধ্যায় মোট চৌদ্দবার তওবা পড়িবার ব্যবস্থা আছে। ইহা ছাড়াও তওবা কবুলিয়াতের ফয়েয ওয়ারেদ হয় আসর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে। হযরত আদম (আঃ)-এর তওবা কবুল হইয়াছিল আসরের ওয়াক্তে; তিনি সংবাদ পাইয়াছিলেন মাগরিরের ওয়াক্তে।

    এই কারণেই আসর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়কে হকিকতে তওবা কবুলিয়তের সময় বলা হয়। কাজেই তোমরা তরিকতের নিয়মানুযায়ী আসর ও মাগরিবের ওয়াক্তে হকিকতে তওবা কবুলিয়তের ফয়েয খেয়াল করিবে। তাহা হইলে তওবার ফয়েযে তোমাদের দেল পরিচ্ছন্ন হইবে, ৭০ হাজার পর্দার অন্তরালে গোনাহের পাহাড়, গোনাহের তাছির, গোনাহের অন্ধকার, গোনাহের জুলমত, গোনাহ করার হাউস-সবই বিদূরীত হইবে। দেল ১৪-ই রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল হইবে। দেলে খোদাতায়ালার নূর আসিবে। নূরে দেল আলোকিত হইবে। ঊর্ধ্বজগত ভ্রমণের সৌভাগ্য তোমাদের জন্মিবে। নাফসে আম্মারার শৃংখল মুক্ত হইয়া তোমারা নাফসে লাওমাকে অতিক্রম করিয়া নাফসে মোৎমাইন্ন্যা বা মোলহেমায় যাইতে পারিবে। তখন শয়তান, নাফস বা দুনিয়া-কোন কিছুই আর তোমাদিগকে ধোকা দিতে পারিবে না। খোদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিয়া তোমরা অনাবিল শান্তির অধিকারী হইতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদের দয়া করুন। দু'আ। ইতি।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD