Logo

তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের পরিচয়

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১:৪৯
তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের পরিচয়
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের পরিচয়, বৈশিষ্ট্য এবং পবিত্র জাতের সান্নিধ্যের পথে এই তাজাল্লাত্রয়ের ভূমিকা সম্পর্কীয় আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

হকিকতে মুহাম্মদীর আলোচনায় বলা হইয়াছে যে, হকিকতে মুহাম্মদী হইল পবিত্র জাতে উদ্ভূত প্রেমের প্রথম বিকাশ। পবিত্র জাতে প্রথম পরিচয় বাসনা জাগ্রত হয়, ফলে প্রেমের উদ্ভব হয়। সেই প্রেম লা-তাইনের নিম্নে হোব্বে সেরফায় রাখিয়া দেওয়া হয়। হোব্বে সেরফা হইতে সেই প্রেম হকিকতে আহমদী হইয়া হকিকতে মুহাম্মদীতে স্থিত হয়। এই হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে সমুদয় সৃষ্টির হকিকত নিহিত। সুতরাং সমস্ত মানব জাতির হকিকতও হকিকতে মুহাম্মদীতে বর্তমান। তথা হইতে সৃষ্টির (মানুষের) হকিকত ধীরে ধীরে নিম্নে অবতরণ করিতে করিতে আকরাবিয়াত বা সিফাতে হাকীকীতে স্থিত হয়।

আকরাবিয়াতস্থিত সৃষ্টির (মানুষের) এই হকিকত নিরাকার ও অবোধগম্য। এই অবস্থা বুঝিবার সুবিধার্থে বলা যায় যে, আকরাবিয়াতে আটটি হাকীকী সিফাত আছে; যথাঃ (১) হায়াত (জীবন), (২) এলেম (জ্ঞান) (৩) কুদরত (ক্ষমতা), (৪) এরাদত (ইচ্ছাশক্তি), (৫) ছামাওয়াত (শ্রবণশক্তি), (৬) বাছারাত (দর্শন শক্তি), (৭) কালাম (কথন শক্তি) ও (৮) তাকবীন (সৃষ্টিকরণ শক্তি)। প্রত্যেকটি হাকীকী সিফাতে পরস্পর বিপরীত ধর্মী অবস্থা বর্তমান। যেমন, সিফাতে এলেমে একদিকে আছে আল্লাহর নিখুঁত জ্ঞান, অন্যদিকে আছে সৃষ্টি তথা মানুষের অজ্ঞতা বা মুর্খতা।

সিফাতে কুদরতে একদিকে আছে আল্লাহপাকের ত্রুটিমুক্ত ক্ষমতা, অন্যদিকে আছে মানুষের অক্ষমতা। তেমনি একদিকে আছে খোদাতায়ালার নিখুঁত শ্রবণশক্তি, দর্শনশক্তি, কথনশক্তি ও সৃষ্টিকরণ শক্তি, অপরদিকে আছে খুঁত বিশিষ্ট বা অসম্পূর্ণ শক্তি সমূহ। সুতরাং বুঝা যায় যে সিফাতে হাকীকীর দুইটি অবস্থাঃ একটি পজিটিভ, অন্যটি নেগেটিভ। আকরাবিয়াত বা সিফাতে হাকীকীর পজিটিভ বা নিখুঁত অবস্থার প্রতিবিম্ব হইল অজুদ, বিপরীত খুঁত বিশিষ্ট নেগেটিভ অবস্থার প্রতিবিম্ব হইল আদম। এই আদমই নাফস, যাহা যাবতীয় অশুভের উৎপত্তিস্থল। অজুদ হইল যাবতীয় শুভ বা মংগলের উৎস। আর আদম হইল যাবতীয় অশুভের উৎস। আদম হইল সিফাতস্থিত সৃষ্টির হকিকতের প্রতিবিম্ব।

বিজ্ঞাপন

সৃষ্টি কিভাবে প্রকাশিত হইল? আল্লাহপাক সিফাতস্থিত সৃষ্টির হকিকত বা নিরাকার সত্ত্বা সমূহকে উদ্দেশ্য করিয়া 'কুন' আদেশ প্রয়োগ করিলেন। সেই কুন আদেশের প্রভাবে আলমে আরওয়াহ জগত সৃষ্টি হইল। তৎপর নূরে মুহাম্মদী সেই আলমে আরওয়াহ জগতকে আলোকিত করিল। কুন আদেশ শ্রবণে যাহা সৃষ্টি হইল, তাহা সৃষ্টিই। সৃষ্টি তাহার হকিকত হইতে সূক্ষ্ম আকার জগত তথা আলমে আরওয়াহ জগতে প্রকাশিত হইল।

যাহা প্রকাশিত হইল তাহা হইল মানুষের নাফস বা আদম। ইহা নাফসে মোৎমাইন্ন্যা নামে পরিচিত। এই নাফস আকরাবিয়াতস্থিত সৃষ্টি তথা মানুষের নিরাকার হকিকতের প্রতিবিম্ব-যাহা 'কুন' আদেশ শুনিয়া সূক্ষ্ম আকার জগতে আসিয়াছে। আকরাবিয়াতস্থিত মানুষের নিরাকার হকিকতকে নাফসে মোলহেমা বলা হয়। 'কুন' আদেশ শুনিয়া এই নাফস আলমে আরওয়াহতে আসিয়া নাফসে মোৎমাইন্ন্যা নাম ধারণ করিয়াছে। তৎপর এখান হইতে আলমে আমর হইয়া এই সূক্ষ্ম নাফস আলমে খালকে আসিয়া নাফসে আম্মারা নাম ধারণ করিয়াছে। সুতরাং মানুষের জাত হইল এই নাফস। যাহা স্কুল জগতে নাফসে আম্মারা, দায়েরায়ে এমকানে নাফসে লাওমা, আরওয়াহ জগত বা বেলায়েতে ছোগরায় নাফসে মোৎমাইন্ন্যা, আকরাবিয়াত হইতে কাওছের দায়েরা পর্যন্ত নাফসে মোলহেমা এবং তঊর্ধ্ব হইতে লা-তাইনস্থিত জাত পর্যন্ত নাফসে মোহাদ্দেসা নামে পরিচিত।

মানুষের আগমন ও প্রত্যাবর্তনঃ

বিজ্ঞাপন

সৃষ্টির অবতরণ বা আগমন পথকে চিন্তা করিলে যাহা পাওয়া যায় তাহা হইলঃ লা-তাইনস্থিত পবিত্র জাত হইতে হোব্বে ছেরফা ও হকিকতে আহমদী হইয়া সৃষ্টি হকিকতে মুহাম্মদীতে আসে। তথা হইতে বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়া আকরাবিয়াত বা সিফাতে হাকীকীতে স্থিত হয়। জাত হইতে আকরাবিয়াত পর্যন্ত সৃষ্টির হকিকত থাকে নিরাকার, অবর্ণনীয় ও অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞানের বোঝাবুঝির বাহিরে। সেখান হইতে বেলায়েতে ছোগরাস্থিত আলমে আরওয়াহতে সূক্ষ্ম আকার অবস্থায় এবং তথা হইতে বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়া এই পৃথিবীতে স্কুল আকারে মানুষের আগমন। ঊর্ধ্ব থেকে নিম্নে, সৃষ্টির ইহাই শেষ আগমনস্থল। ইহাই শেষ ঘাটি। এখান হইতে তাহাকে আবার উৎসমূলে ফেরত যাইতে হইবে, প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে খোদাতায়ালার পরিচয় গ্রহণের জন্য।

আমাদিগকে যে ফিরিয়া যাইতে হইবে, খোদাতায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে, সেই প্রসংগে পবিত্র কুরআন মজীদের বহু আয়াতে তাগিদ দেওয়া হইয়াছে। সূরা আরাফে ১২৫ আয়াতে প্রকাশ,

إِنَّا إِلَى رَبَّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"নিশ্চয়ই আমরা আমাদের পালন কর্তার দিকে ফিরিয়া যাইব।" সূরা আনফালে ৪৪ আয়াতে বর্ণিত আছে,

وَإِلَى اللَّهِ تُرْجَعُ الْأُمُورُ

অর্থাৎ-"সমস্ত বিষয় আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হইবে।" সূরা হুদের ৩৪ আয়াতে আল্লাহপাক বলেন,

বিজ্ঞাপন

هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ

অর্থাৎ-'তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তাহারই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তন করিবে।' সূরা বাকারা-এর ১৫৬ আয়াতে বর্ণিত আছে,

وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"যাহারা বিপদকালে বলে যে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর এবং আমরা তাহারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।" প্রত্যাবর্তন বা ফিরিয়া যাওয়ার তাগিদসহ বহু আয়াত কুরআন মজীদে সন্নিবেশিত আছে।

ফেরত যাইবে কে? নাফস, না রূহ? মূলতঃ ফেরত যাইতে হইবে নাফসকে; রূহকে নয়। রূহ হইল প্রত্যাবর্তনের পথে নাফসের সাহায্যকারী। রূহ হইল আল্লাহতায়ালার আদেশ। আল্লাহতায়ালা তদীয় আদেশ-রূহের আবরণ বা পোশাক নাফস বা আদমকে পডাইয়াছেন। ব্যাপারটি পরিষ্কার হওয়ার জন্য অজুদ ও আদমের আরও কিছু আলোচনা প্রয়োজন। অজুদ প্রসংগে বলা হইয়াছে যে ইহা সমস্ত সিফাতের সমষ্টিগত অবস্থার প্রতিবিম্ব। মূলতঃ সিফাতের মধ্যে আল্লাহতায়ালার নিখুঁত ও পরিপূর্ণ অবস্থার অবতরণ হইল অজুদ-যাহা যাবতীয় শুভের সমষ্টি, যাবতীয় মংগলের উৎপত্তিস্থল। আদম বা অনস্তিত্ব হইল অজুদের বিপরীত। আদম যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির কেন্দ্র। আদমে কোন গুণ নাই; কোন মংগল নাই, শুভ নাই। আদমের উপরে আল্লাহপাক অজুদের প্রতিবিম্ব ফেলিলেন। ফলে আদমের মধ্যে কিছু ভাল আসিয়া গেল। এই ভাল অবস্থাই আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণসমূহের প্রতিবিম্ব। আদম বা নাফসের নিজস্ব কোন ভাল বৈশিষ্ট্য বা গুণ নাই। আদমের এই ভাল অবস্থা আল্লাহতায়ালার "কুন" আদেশের বা রূহের প্রভাব। রূহের চরিত্র আল্লাহর চরিত্রের অনুরুপ। রূহের প্রভাব ও অজুদের প্রতিবিম্ব পাইয়া নাফস বা আদম কিছু কামালাত পায়। এই কামালাত সবই আল্লাহতায়ালার আমানত।

উপরের আলোচনায় বুঝা গেল যে, মানুষ হইল নাফস, রূহ নয়। এই নাফসকেই প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে। স্কুল জগতের এই নাফসকে নাফসে আম্মারা বলা হয়। স্থূল জগতে মানুষ এই নাফসে আম্মারার স্তরে সদা বর্তমান।

বিজ্ঞাপন

নাফসের প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে অর্থাৎ নাফসকে আম্মারার স্তর হইতে উরুজ করিয়া মোৎমাইন্ন্যা হইয়া মোলহেমায় পৌঁছাইতে হইবে। মোলহেমা হইতে এই নাফসকে মোহাদ্দেছার পর্যায় হইয়া মূল জাতে পৌছাইতে হইবে। অজুদ ও আদমের স্বভাব সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে অজুদে আছে ভাল, আদমে আছে মন্দ। অজুদে আছে কল্যাণ, মংগল। আদমে আছে অকল্যাণ, অমংগল।

নাফসে আম্মারার প্লাটফর্মে অর্থাৎ স্কুল জগতে মানুষের উপর অজুদের চেয়ে আদমের প্রভাব বেশী। ফলে স্কুল জগতের মানুষ সর্বদাই অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত। নাফসে আম্মারার স্বভাব হইল আল্লাহর বিরোধিতা করা, আল্লাহর প্রভুত্বকে অস্বীকার করা। স্কুল জগতে মানুষ তাই আল্লাহর আদেশ পালন বা ইবাদতে এত অমনোযোগী। মানুষকে যে জ্ঞান দেওয়া হইয়াছে, তাহা আল্লাহপাকের সিফাতে এলেমের প্রতিবিম্ব। যে ক্ষমতা মানুষকে দেওয়া হইয়াছে, তাহা সিফাতে কুদরতের প্রতিবিম্ব। এমনি ভাবে চিন্তা করিলে দেখা যাইবে যে মানুষের সমুদয় গুণাগুণই আল্লাহতায়ালার দান। ইহাই আল্লাহ প্রদত্ত আমানাত যাহা ফেরত দিতে হইবে। কিন্তু স্কুল জগতে মানুষ বা মানুষের নাফস আল্লাহ প্রদত্ত গুণাবলীকে নিজের সম্পদ মনে করে। সে মনে করে যে, সে নিজে নিজেই জ্ঞানী, নিজে নিজেই ক্ষমতাশালী। ইহাই নাফসের মুর্খতার কারণ। সে যে মূলতঃ মুর্খ, অজ্ঞ, বধির, অন্ধ ও যাবতীয় অশুভের সমষ্টি-তাহা সে বেমালুম ভুলিয়া পরের সম্পদকেই নিজের ধন মনে করে। আল্লাহর গুণাবলীর প্রতিবিম্বকে নিজ গুণ বা উত্তম স্বভাব মনে করিয়া অহংকার বা দাম্ভিকতাসহ বুক ফুলাইয়া চলে। ইহাই আল্লাহর সাথে নাফসের শুত্রুতা। তাই আল্লাহ বলেন, তোমরা নাফসের সাথে যুদ্ধ কর, কারণ নাফস আমার শত্রু। নাফসের কু-স্বভাবের সাথে যুদ্ধ করাকে জেহাদে আকবর বলা হইয়াছে। নাফসের এই হীন স্বভাবের সাথে যুদ্ধ করিয়া নাফসে আম্মারাকে পরাজিত করিতে হইবে। এই যুদ্ধে জয়ের জন্য প্রয়োজন পীরে কামেলের মদদ বা তাওয়াজ্জুহ। এই যুদ্ধে বিজয়ী হইতে পারিলেই খোদাতায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব, নতুবা নয়।

তিন প্রকার তাজাল্লীর পরিচয়ঃ

বিজ্ঞাপন

প্রত্যাগমনের পথে খোদাতায়ালার তিন প্রকারের তাজাল্লীর সহিত ছালেক পরিচিত হয়। যথাঃ-

  • তাজাল্লীয়াতে আফয়াল

  • তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও

  • বিজ্ঞাপন

  • তাজাল্লীয়াতে জাত।

  • তাজাল্লীয়াতে আফয়াল অর্থ আল্লাহর ক্রিয়াকলাপের বিকাশ। তাজাল্লীয়াতে সিফাত অর্থ আল্লাহতায়ালার গুণাবলীর বিকাশ এবং তাজাল্লীয়াতে জাত অর্থ পবিত্র জাতের বিকাশ। আল্লাহতায়ালার উক্ত তিন প্রকার তাজাল্লার নূর বা কারেন্টে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সুশৃংখল ভাবে চলিতেছে। সৃষ্ট জগতের প্রত্যেক অণু-পরমাণুর মধ্যে উক্ত তিন তাজাল্লীর কারেন্ট সদা প্রবাহমান। প্রত্যাবর্তনের পথে প্রথমে ছালেকের সিদ্ধ হয় তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তৎপর তাজাল্লীয়াতে সিফাত এবং ইহার পর সাথে ছালেক পরিচিত হয়। তাজাল্লীত্রয়ের আলোচনার শুরুতে তাই সিদ্ধ হয় তাজালীয়াতে জাত। সর্ব প্রথমে তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল হইতেই আলোচনা শুরু করা উত্তম।

    তাজ্জাল্লীয়াতে আফয়ালঃ

    বিজ্ঞাপন

    তাজাল্লীয়াতে আফয়াল-এর অর্থ হইল আল্লাহর ক্রিয়াকলাপের বিকাশ। তাজাল্লীয়াতে আফয়াল সিদ্ধ হয় বেলায়েতে ছোগরায়। এই তাজাল্লীয়াতের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ছালেকের মনে হয় যে, সৃষ্টির সমুদয় কার্যকলাপ আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াকলাপের প্রতিবিম্ব। পরবর্তীতে এই তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূর যখন পুরামাত্রায় ছালেকের উপর পতিত হইতে থাকে, তখন তাহার দষ্টি হইতে প্রতিবিম্ব বা প্রতিচ্ছায়া অন্তর্হিত হয়। প্রতিবিম্ব মূলের সহিত মিলিত হয়। অর্থাৎ ছালেকের নিকট ইহা প্রকাশ পায় যে, সমুদয় সৃষ্টি অচেতন জড় পদার্থের মত এবং সমস্ত সৃষ্টির কার্যকলাপই মূলতঃ আল্লাহতায়ালার কার্যকলাপ। তাজাল্লীয়াতে আয়ালের এই দায়েরায় আসিয়াই কিছু কিছু সাধক সৃষ্টিকে স্রষ্টার যথাযথ বলিয়া ফেলিয়াছেন। মূলতঃ এই দায়েরায় তাজাল্লীয়াতে আয়ালের নূরের সাথে আছে সিফাতে এজাফিয়ার নূর, আছে নূরে মুহাম্মদীর নূর, আছে আলমে আরওয়াহের নূর। বিভিন্ন প্রকার নূরের প্রাবাল্যে বা প্রখরতায় ছালেকের দৃষ্টি হইতে সৃষ্টির কার্যকলাপ তিরোহিত হয়। সৃষ্টির কর্মকান্ডকে খোদাতায়ালার কর্মকান্ড মনে করে। অর্থাৎ সমুদয় কাজের স্রষ্টা ও কর্তা এক খোদাতায়ালাকেই মনে করে। মূলতঃ সমস্ত কাজের স্রষ্টা এক আল্লাহতায়ালা, কিন্তু কর্তা বা সংকল্পকারী আল্লাহ নয়। তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের বা ক্রিয়াকলাপের বিকাশের পরিপূর্ণতায় ছালেকের দৃষ্টি পথে বিভিন্ন কর্তা বা সংকল্পকারী অন্তর্হিত হয়, সমুদয় কাজের কর্তা এক খোদাতায়ালাকেই মনে করে। ফলে শরীয়ত খেলাফী অনেক কথাই অনেক সময় ছালেক বলিয়া ফেলেন। তৌহিদে অজুদীবাদীরা শরীয়ত বিরোধী যাহা কিছুই ব্যক্ত করিয়াছেন, তাহা এই বেলায়েতে ছোগরায়, তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের নূরের তীব্রতায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় বা জ্ঞান নিঃশেষিত অবস্থায় তেমন মন্তব্য করিয়াছেন।

    তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূর পূর্ণমাত্রায় ছালেকের উপর প্রকাশিত হইলে, ছালেক বুঝিতে পারে যে, এই তাজাল্লীর কারেন্টেই গ্রহ-নক্ষত্র আপন আপন কক্ষপথে ঘুরিতেছে। দিন-রাত্রির পরিবর্তন হইতেছে। ঋতুর পরিবর্তন হইতেছে। বিভিন্ন ঋতুতে গাছ-পালা বিচিত্র ফুলে-ফলে সুশোভিত হইতেছে। প্রাণীজগতে নব নব প্রাণীর সৃষ্টি হইতেছে। সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ড যে এক খোদাতায়ালার ইচ্ছায় পরিচালিত হইতেছে তাহা ছালেক এই মাকামে তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের প্রভাবে বুঝিতে পারে।

    স্থূল জগতে ছালেকের নাফস তাহার কার্যকলাপের স্রষ্টা ও কর্তা নিজেকেই মনে করিত। কিন্তু বেলায়েতে ছোগরা বা সূক্ষ্ম জগতে ছালেকের নাফসের সেই ভুল ধারণা ভাংগিয়া যায় এই তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূরে। তাহার কর্মক্ষমতা যে খোদাতায়ালার দান, তাহার ক্রিয়াকলাপ যে খোদাতায়ালার ক্রিয়াকলাপের প্রতিবিম্ব-তাহা সে বুঝিতে পারিয়া খোদাতায়ালার দাসত্ব স্বীকার করিয়া খোদাতায়ালার আদেশ-নিষেধ পালনে ব্যস্ত হয়। খোদাতায়ালা তাহার উপর রাজী হন, সেও খোদাতায়ালার উপর রাজী হয়। তাই এই অবস্থায় এই নাফসকে "নাফসে মোৎমাইন্ন্যা" বলে। নাফসে আম্মারার মধ্যে যে কু-খাছলত বা কুপ্রবৃত্তি ছিল, তাহা তাজাল্লীয়াতে আফ্যালের কারেন্টে দূর হয়। যে গোনাহের পাহাড়, গোনাহের তাছির, গোনাহের অন্ধকার, গোনাহ করিবার হাউস নাফসে আম্মারার মধ্যে বিদ্যমান, তাজাল্লীয়াতে আয়ালের নূরে সেই সমস্ত অপবিত্র অবস্থা বিদুরীত হইয়া নাফস পরিচ্ছন্ন হয়, ছালেকের আদামাত পর্যুদস্ত হয়। জেহাদে আকবরে ছালেক বিজয়ী হয়। এই কারণেই খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিয়া ছালেকের নাফস সন্তুষ্টচিত্ত আত্মা বা নাফসে মোৎমাইন্ন্যা উপাধিতে ভূষিত হয়।

    তাজাল্লীয়াতে সিফাত-

    অর্থ গুণাবলীর বিকাশ। ছালেক বেলায়েতে ছোগরা হইতে তঊর্ধ্বের মাকাম আকরাবিয়াতে প্রবেশ করিলে সিফাতি তাজাল্লীয়াতের নূর বা কারেন্ট লাভ করে। বেলায়েতে কোবরা ও বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে ছালেকের তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূর সিদ্ধ হয়। তাজাল্লীয়াতে সিফাত বা গুণাবলীর বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ছালেক বুঝিতে পারে যে তাহার যাবতীয় গুণাবলী তথা জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, দর্শন, চিন্তন, বর্ণন, শ্রবণ-সবই খোদাতায়ালার গুণাবলীর প্রতিবিম্ব। পূর্বে ছালেক খোদাপ্রদত্ত এই গুণাবলীসমূহকে নিজের বলিয়া মনে করিত। কিন্তু তাজাল্লীয়াতে সিফাতের কারেন্টের প্রভাবে ছালেকের নাফসের সেই ভুল ভাংগিয়া যায় এবং আপন গুণ সমূহকে খোদাতায়ালার গুণাবলীর প্রতিবিম্ব বলিয়া বুঝিতে পারে। ছালেক বেলায়েতে কোবরায় প্রবেশ করিলে তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূর বা কারেন্ট তাহার উপর প্রবল বেগে পড়িতে থাকে। ফলে প্রতিবিম্বজাত গুণাবলী সমূহ মূলে গিয়া মিশিয়া যায়। অর্থাৎ ছালেকের জ্ঞান সিফাতে এলেমে, ছালেকের ক্ষমতা সিফাতে কুদরতে মিলিত হয়।

    এমনি ভাবে ছালেকের অন্যান্য গুণাবলী আপন আপন মূলে মিশিয়া যায়। অন্যদিকে ছালেকের পরাজিত নাফসের (বেলায়েতে ছোগরা) আদামাত অর্থাৎ অবশিষ্ট কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, অহংকার সবই ঝরিয়া পড়ে। একদিকে গুণাবলী সমূহ স্ব-স্ব মূলে মিশিয়া যায়, অন্যদিকে আদামাত সম্পূর্ণ ঝরিয়া যায়। ফলে বেলায়েতে কোবরার এই দায়েরায় ছালেকের নাফস তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূরে পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ হয়। পরিশুদ্ধ এই নাফসই নাফসে মোলহেমা নামে পরিচিত। এই নাফসের উপরে এলহাম হয়। তাজাল্লীয়াতে সিফাতী নূরের কারেন্ট ছালেকের এই নাফসের উপর এমনই ভাবে পড়িতে থাকে যে, নাফস নিজেই খোদাতায়ালার জন্য পাগল হয়। যে আমানত আল্লাহপাক প্রদান করিয়াছিলেন, সেই আমানত বা গুণাবলী ছালেক স্ব স্ব মূলে ফেরত দেয়। ফলে ছালেকের কি আর অবশিষ্ট থাকে? ছালেকের না থাকে গুণাবলী, না থাকে আদামাতের প্রভাব। ছালেক তাজাল্লীয়াতে সিফাতী নূরের কারেন্টে খোদাতায়ালার জাতে ফানা প্রাপ্ত হয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "এই অবস্থায় ছালেকের কোন নাম নিশানা বা চিহ্ন নিদর্শনও থাকে না।" অবশ্য এই অবস্থার ক্ষণিক পরে তাহার ভিতর এক চেতনগুণ আসে, যে গুণের প্রভাবে নিজেকে সৃষ্ট হিসেবে বুঝিতে পারে।

    তাজাল্লীয়াতে সিফাতের শেষ স্তরে ছালেকের যে ফানার কথা বলা হইল; হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, এই ফানা মূলতঃ তাজাল্লীয়াতে জাতের কিরণ কর্তৃক লাভ হয়। যাহার অর্থ দাঁড়ায়-এই ফানার সৌভাগ্য লাভ হওয়ার পর মূল তাজাল্লীয়াতে জাত লাভ হয়। তিনি আরও বলেন, "যে পর্যন্ত মুক্ত হইবে না, সে পর্যন্ত প্রাপ্ত হইবে না।” তাজাল্লীয়াতে জাতের কিরণ ও মূল তাজাল্লীয়াতে জাতের মধ্যে পার্থক্য হইল ঐরূপ যেমন প্রভাতের আলো ও সূর্য উদয় হওয়ার মধ্যে পার্থক্য। প্রভাত হওয়ার সময় সূর্যের কিরণের আবির্ভাব হয় এবং সূর্য উদয়ের পর স্বয়ং সূর্য আবির্ভূত হয়।"

    তাজাল্লীয়াতে সিফাতের শেষ প্রান্তে অর্থাৎ কাওছের মাকামে যে ফানার কথা বলা হইল-তাহা মূলতঃ তাজাল্লীয়াতে জাতের কিরণে ফানা, মূল তাজাল্লীয়াতে জাতে নয়।

    কাওছের ঊর্ধ্বে বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা। বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা কি? আকরাবিয়াতের যে আটটি হাকীকী সিফাতের কথা বলা হইয়াছে, (যথা হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারাত, কালাম ও তাকবীন) সেই সিফাত সমূহ জাতের সহিত মিলিত হইয়া জাতকে ঐ সমস্ত সিফাতের নামে নামীয় করে। সিফাতে হায়াত জাতের সহিত মিলিত হইলে জাত 'হাই' হয়, সিফাতে এলেম জাতের সহিত মিলিত হইলে জাত 'আলীম' হয়, সিফাতে কুদরত জাতের সহিত মিলিত হইলে জাত "কাদীর" হয়। এমনিভাবে অন্যান্য সিফাতকে চিন্তা করিতে হইবে। সিফাতে হাকীকী জাতের সহিত মিলিত হইয়া যে এক বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি করে, সেই অবস্থার প্রকাশক হইল বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা। এই দায়েরাতে জাত মিশ্রিত সিফাতী তাজাল্লীয়াতের কারেন্ট আসিয়া ছালেকের দেহের আগুন, পানি ও বায়ুর স্তরকে পবিত্র করে। তাজাল্লীয়াতে সিফাতের শেষ স্তরে ছালেকের নাফসের যে ফানার কথা বলা হইয়াছে যাহা তাজাল্লীয়াতে জাতের কিরণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। তাজাল্লীয়াতে জাতের সেই কিরণই বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে ছালেক প্রাপ্ত হয়। প্রভাতের কিরণ বা আলো দর্শনের পরেই স্বয়ং সূর্যের দর্শন মিলে। তেমনি জাত মিশ্রিত সিফাতি নূরের দর্শনের পরেই কামালাতে নবুয়তের দায়েরা হইতে তাজাল্লীয়াতে জাতের দরশন মিলে।

    তাজাল্লীয়াতে জাত-

    তাজাল্লীয়াতে জাতের অর্থ হইল ছালেকের প্রতি পবিত্র জাতের বিকাশ। এই বিকাশ বা প্রকাশ শুরু হয় কামালাতে নবুয়তের দায়েরা হইতে। কামালাতে নবুয়তের দায়েরাতে তাজাল্লীয়াতে জাতের কারেন্টের বিরামহীন পতনের ফলে ছালেকের দেহের মাটির স্তর পবিত্র হয়। ফলে এখানে আসিয়াই দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানী বা একক সত্ত্বা ছালেক প্রাপ্ত হয়। কামালাতে নবুয়ত হইতে তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রের গভীরতম প্রদেশ হোব্বে সেরফা পর্যন্ত সবগুলো দায়েরাতেই অবিরাম তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের প্রবাহ ছালেকের অজুদ মাওহুব লাহু হইয়া হায়াতে ওহাদানীর উপরে পতিত হইতে থাকে। তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের মহা সমুদ্রের মধ্যে কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালাত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত, মাবুদিয়াতে সেরফা, হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুসবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে ছেরফা দায়েরাসমূহ নোংগরকেন্দ্র স্বরূপ একের পর এক সাজানো রহিয়াছে। প্রত্যেক দায়েরাই পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এক

    দায়েরা হইতে পরবর্তী দায়েরাতে ছালেক উপস্থিত হইলে তাহার উপর যেমন জাতী তাজাল্লীয়াতের কারেন্ট অবিরাম আসিতে থাকে, তেমনি সেই দায়েরার নির্ধারিত জ্ঞানে ছালেক জ্ঞানী হয়। এমনি ভাবে ছালেকের জ্ঞানের পরিধিও বিস্তত হইতে থাকে। যতই সম্মুখের দায়েরায় অগ্রসর হয়, ততই সে জাতের নিকটবর্তী হয় এবং খোদাতায়ালার চরিত্রে চরিত্রবান হয়। এমনিভাবে হোব্বে সেরফা (যাহা তাইনে আউয়ালের গভীরতম প্রদেশ) পর্যন্ত তাঁহার উপর তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের বিকাশ হইতে থাকে এবং এই হোব্বে সেরফাতে আসিয়া জাতি তাজাল্লীয়াতের বিকাশ তাহার উপর সম্পন্ন হয়।

    হোব্বে ছেরফার উপরে আছে লাতাইন। লাতাইনে বা লাতাইনের ঊর্ধ্বে তাজাল্লীয়াতের কোন বিকাশ নাই। সেখানে আছে নিছক নূর। এই নূরকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) পবিত্র জাতের আলোকময় পর্দা হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। পবিত্র জাতকে কেন্দ্র করিয়া এই রকম বহু নূরের পর্দা বর্তমান। এই সকল পর্দাকে উদ্দেশ্য করিয়াই রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, "নূরই তাহার পর্দা।" "খোদাতায়ালার পবিত্র জাত লাতাইনস্থিত এই সকল পর্দারও অন্তরালে। হযরত মুজাদ্দেদ আল্ফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, তাইয়্যুন ছাড়া তাজাল্লীকে ধারণা করা যায় না। এই কারণেই প্রথম তাইয়্যুন বা তাইনে আউয়ালের শেষ প্রান্ত হোব্বে সেরফা থেকে তাজাল্লীয়াতে জাতের প্রবাহ শুরু হয় এবং নিম্নদিকে কামালাতে নবুয়ত পর্যন্ত এই তাজাল্লীয়াতের প্রবাহ অবিরাম চলিতে থাকে। লা-তাইনস্থিত ঐ নিছক নূরের পর্দা হইল তাজাল্লীয়াতে জাতের উৎপত্তিস্থল। পবিত্র জাত ইহারও উপরে।

    পবিত্র জাত হইতে পরিচয় গ্রহীতা হিসেবে আমরা স্থূল জগতে আসিয়াছি। পবিত্র জাত পর্যন্ত আমাদিগকে পৌঁছাইতে হইবে। তাই তাজাল্লীয়াতে জাতী নূরের কারেন্ট পাইয়া সন্তুষ্ট হইলে চলিবে না। হোব্বে ছেরফার মাকাম হইতে কুওতে নজরীয়ার ছায়েরের মাধ্যমে একে একে লা-তাইনস্থিত নিছক নূরের প্রত্যেক পর্দাতে ফানা বা বাকা লাভ করিয়া সর্বশেষে সমুদয় পর্দার অন্তরালে মূল জাতে ফানা ও বাকা লাভ করিতে হয়। অবশ্য খুবই অল্প সংখ্যক সাধক এই নেয়ামত লাভ করিয়াছেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "হাজার হাজার সাধক বা ওলীয়ে কামেলের মধ্যে দুই একজনের ভাগ্যে এই উচ্চ নেয়ামত লাভ হয়।” যে প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হইয়াছে, তাহা এমনিভাবে ছালেকের সম্পন্ন হয়।

    তিন তাজাল্লী তথা তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের প্রসংগে কিছু আলোচনা করা হইল। কিন্তু ছালেকের উদ্দেশ্য এই তাজাল্লী নয়। উদ্দেশ্য হইল পবিত্র জাতের সান্নিধ্য। পবিত্র জাতে পৌছাইতে তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের কারেন্ট ছালেককে যোগ্য করিয়া তোলে এবং খোদাতায়ালার চরিত্রে চরিত্রবান করে। এমনি ভাবে ছালেকের মারেফাতের পূর্ণতা হাছিল হয়।

    পরিপূর্ণ এই মারেফাত অর্জন করিতে হইলে এজতেবার রাস্তায় অগ্রসর হইতে হইবে; এনাবতের রাস্তায় নয়। এখানে জানা প্রয়োজন যে এজতেবা ও এনাবত কি?

    এজতেবা ও এনাবতের পরিচয়ঃ

    আল্লাহপাক ফরমান,

    اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَ يَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيبُ

    আর্থাৎ- 'আল্লাহতায়ালা যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে মনোনীত করিয়া লন। আর যে ব্যক্তি তাহার দিকে প্রত্যাবর্তনোন্মুখ ও গমনে ইচ্ছুক হয়, তাহাকেও তিনি পথ প্রদর্শন করেন।' (সূরা শূরাঃ ১৩) উল্লিখিত এই আয়াতে দুই দলের পরিচয় মিলে। প্রথম দল হইল মনোনীত বা নির্বাচিত। আর দ্বিতীয় দল, যাহারা সেচ্ছায় খোদাতায়ালার পরিচয় গ্রহণে আগ্রহী। প্রথম দল যে পথে অগ্রসর হন, সেই পথের নাম হইল এজতেবা। আর দ্বিতীয় দল যে পথে অগ্রসর হন, তাহার নাম এনাবত। প্রথম পথে লইয়া যাওয়া হয়। দ্বিতীয় পথে নিজে অগ্রসর হইতে হয়। প্রথম পথে যাহারা অগ্রসর হন, তাহাদেরকে "মোরাদ" বলা হয়। দ্বিতীয় পথে যাহারা অগ্রসর হন, তাহাদেরকে "মুরীদ” বলা হয়। লইয়া যাওয়া আর নিজে অগ্রসর হওয়া-দুইয়ের মধ্যে বিরাট তফাৎ। এজতেবার পথকে নবুয়তের পথ, আর এনাবতের পথকে বেলায়েতের পথ বলা হয়। উভয় পথেই শ্রম আছে। তবে এজতেবার পথের শ্রম, এনাবতের পথের শ্রমের তুলনায় অনেক কম। এনাবতের পথে কঠিন শ্রম ও অমানুষিক খাটুনি প্রয়োজন। এজতেবার পথে ততটা খাটনির প্রয়োজন হয় না। এজতেবার পথে সাধনা শুরু হয় লতিফায়ে কালব হইতে। এনাবতের পথে সাধনা শুরু হয় লতিফায়ে নাফস থেকে। এজতেবার পথে প্রথমেই কালব জারীর ব্যবস্থা থাকে। লতিফায়ে কালবে পীরের তাওয়াজ্জয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে জেকের জারী হয় ও নরের দরশন মেলে। ফলে কালবের প্রভাবে নাফস ধীরে ধীরে সংশোধনের পথে আসে। এজতেবার পথে কালবের সাফাই বা পরিস্কার হউন ও নাফসের সংশোধন একই সাথে হয়। এজতেবার পথে শেষ বস্তু প্রথমেই প্রবেশ করানো হয়।

    এনাবতের পথে সাধনা শুরু হয় লতিফায়ে নাফস হইতে। দুষ্ট নাফসে আম্মারাকে পথে আনিতে যেমন কঠিন তপস্যার প্রয়োজন, তেমনি দীর্ঘ সময়েরও প্রয়োজন। বহু বছর কঠিন তপস্যার মাধ্যমে এই পথে কালব জারী হয়। কালবের মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়ালে তথা বেলায়েতে ছোগরার স্তরে এনাবতের পথে খোদাতালাশী সাধনা শেষ করেন। বেলায়েতে ছোগরার শেষ প্রান্তে আকরাবিয়াতের শুরুতে তাজাল্লীয়াতে বরকীর দর্শনে তাহারা মারেফাতের সাধনা শেষ করেন।

    তাজাল্লীয়াতে বরকী কি?

    বেলায়েতে ছোগরায় অসংখ্য সিফাতে এজাফিয়া বর্তমান-যাহা সিফাতে হাকীকীর প্রতিবিম্ব। বেলায়েতে ছোগরাস্থিত ছালেককে খোদাতায়ালা যখন একটি সিফাতে এজাফিয়া থেকে আর একটি সিফাতে এজাফিয়াতে ছায়ের করাইতে চান, তখন বিদ্যুৎ চমকানোর মত মুহূর্তের জন্য তাজাল্লীয়াতে জাতীর দরশন তাহাকে দান করেন। পর মুহূর্তেই আবার অন্য সিফাতে এজাফিয়াতে ছালেকের ছায়ের শুরু হয়। যাহারা এনাবতের পথে অগ্রসর হয়, এই তাজাল্লীয়াতে বরকীই তাহাদের শেষ প্রাপ্তি। তাজাল্লীয়াতে সিফাত বা তাজাল্লীয়াতে জাতের বিরামহীন দরশন তাহাদের কল্পনাতীত। তাজাল্লীয়াতে সিফাত বা তাজাল্লীয়াতে জাতের দর্শনই যেখানে তাঁহারা পান না, সেখানে নিছক নূর বা নিছক জাতের সান্নিধ্য তাহাদের জন্য কি করিয়া সম্ভব?

    চিশতিয়া, কাদেরিয়া তরিকার পথ হইল এনাবতের পথ। ঐ সকল তরিকার মাধ্যমে সাধনা করিয়া বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া তাজাল্লীয়াতে বর্কী প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়ার পথ হইল এজতেবার পথ। এই পথে সাধনা করিয়া তাজাল্লীয়াতে আফয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাত যেমন লাভ করা যায়, তেমনি নিছক জাতেরও সান্নিধ্য মিলে।

    হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নষ্কন্দ (রঃ) ছাহেব বলেন, "হকের মারেফত বাহাউদ্দিনের জন্য হারাম, যদি আমার প্রারম্ভ হযরত বায়েজীদের শেষ অবস্থার মত না হয়।" মাওলানা আব্দুর রহমান জামী (রঃ) ছাহেব এই তরিকার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বলেন,

    "বোখারায় নক্শা আঁকে শাহে নক্শবন্দ

    কে আছে আশেক তাঁর নসীব বুলন্দ?

    শুরুতেই শেষ মিলে তাঁর তরিকায়

    শেষ তার কি বাহার বলা নাহি যায়।"

    এজতেবা বা এনাবত-যে পথেই প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যাগমন করা হউক না কেন, সাধনার শুরুতে উভয় পথেই কঠিন শ্রম প্রয়োজন। তবে এজতেবার পথে যাহা পাওয়া যায়, এনাবতের পথে সেই তুলনায় খুবই সামান্য মারেফাত মিলে। তাহা ছাড়া এনাবতের পথে তুলনামুলকভাবে সাধনার কঠোরতা অনেক বেশী।

    খোদাপ্রাপ্তির পথে করণীয় কি?

    তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে জাতের কারেন্টে নিজেকে পরিশুদ্ধ করিয়া খোদাতায়ালায় জাতে পৌঁছাইতে চাও, তবে পীরের কদমে নিজেদের জান-মাল নেছার কর।

    পীরের কদমে কেমন খেদমত করিতে হয় সেই প্রসংগে তোমাদেরকে একটি কাহিনী বলি। এক লোক কিতাব অধ্যায়ন কালে দেখিতে পাইল যে কেহ যদি তাহার জানমাল দিয়া ওলীয়ে কমেলের খেদমত করে, তবে হয় সে বাদশাহ হয়, না হয় ফকীর হয়। লোকটি ভাবিল, তাহার যে সম্পত্তি আছে তাহা বিক্রয় করিয়া সমুদয় টাকা লইয়া কোন পীরে কামেলের কদমে প্রদান পূর্বক তাঁহার খেদমতে আত্মনিয়োগ করিবে। যদি কামেল তাহাকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি চাও? তাহা হইলে উত্তরে সে বাদশাহ হওয়ার কথাই উল্লেখ করিবে। বই পড়িবার সময় তাহার এই কল্পনা হৃদয়ে উদয় হইল। লোকটি তাই ধীরে ধীরে সমুদয় সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া প্রাপ্ত সমুদয় টাকা লইয়া মোর্শেদে কামেলের খোঁজে বাহির হইল। যে লোক ওলীয়ে কামেলের খোঁজে বাহির হয়, আল্লাহও তাহাকে ওলীয়ে কামেলের দরজায় পৌছাইয়া দেন।

    খুঁজিতে খুঁজিতে লোকটি অবশেষে একজন কামেলের সন্ধান পাইয়া তাঁহার কদমে সমুদয় অর্থ প্রদান করিল। কামেল জিজ্ঞাসা করিলেন, 'কি জন্য এত অর্থ প্রদান করিতেছ?" উত্তরে লোকটি বলিল, "হুজুর, কিতাব অধ্যায়ন কালে দেখিলাম যে, কেহ যদি জানমাল দিয়া পীরে কামেলের খেদমত করে-তাহা হইলে হয় সে বাদশাহ হয়, না হয় ফকীর হয়। তাই আমি আমার সমুদয় সম্পদ বিক্রয় করিয়া আপনার কদমে হাজির হইয়াছি। আপনি দয়া করিয়া কবুল করেন। পীরে কামেল জিজ্ঞাসা করিলেন, "তাহা হইলে তুমি কি হইতে চাও?" লোকটি প্রথমে লজ্জায় কিছু বলিতে পারিল না। পুনরায় কামেল জিজ্ঞাসা করায় লোকটি বলিল যে, সে বাদশাহ হইতে চায়। তৎপর কামেল তাহাকে একটি শর্তারোপ করিয়া দরবারে থাকিবার অনুমতি দিলেন। তিনি বলিলেন, "যতদিন আমি তোমাকে বিদায় না দিব, ততদিন তুমি আমার নিকট বিদায় চাইতে পারিবে না।"

    লোকটি তাহার পীরের দরবারে খেদমত করিতে লাগিল। একদিন দুইদিন করিতে করিতে মাস গেল, বছর গেল। কিন্তু তাহার পীর তাহার সাথে কথা বলেন না। এক এক করিয়া বার (১২) বছর অতিবাহিত হইল। এই বার (১২) বছরের মধ্যে একবারও পীর কেবলা তাহার সহিত কথা বলিলেন না। একদা লোকটি বসিয়া কাঁদিতে লাগিল; আর ভাবিতে লাগিল যে, কত লোক প্রতিদিন আসে, পীর ছাহেব তাহাদের সাথে কত কথা বলেন, কত আদর-আপ্যায়ন তাহাদেরকে করেন অথচ এক যুগ চলিয়া গেল, পীর ছাহেব তাহার দিকে ফিরিয়াও তাকাইলেন না। এইদিকে অনাহারে তাহার শরীর শুকাইয়া গেল। এই দুর্বল শরীরেই সে পীরের খেদমত করিতে লাগিল। পুনরায় এক এক বছর করিয়া আরও বার (১২) বছর চলিয়া গেল। কিন্তু পীর কেবলা তাহার সাথে এতদিনে একটি কথা পর্যন্তও বলিলেন না। এদিকে লোকটির শরীর একেবারেই দুর্বল হইয়া গেল। চুল, দাড়ি পাকিয়া গেল। মনে মনে ভাবিতে লাগিল, "বাদশাহ হইতে আসিয়াছিলাম। কিন্তু বাদশাহ হওয়াতো দূরের কথা, আজ মুক্তি পাইলেই যেন বাঁচি।”

    কিন্তু মুক্তি কি ভাবে লোকটি পাইবে? পীর ছাহেব তো তাহার সাথে কথাই বলেন না। তাই নির্জনে বসিয়া সে শুধু অশ্রুপাত করে। এইভাবে দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল। এক এক করিয়া আরও বার (১২) বছর পার হইল। মোট ছত্রিশ বছর (৩৬) চলিয়া গেল। ছত্রিশ বছরের মাথায় লোকটি একদিন নির্জনে বসিয়া অঝর নয়নে কাঁদিতেছে আর ভাবিতেছে এতগুলো বছর চলিয়া গেল, অথচ তদীয় পীর তাহার দিকে ফিরিয়াও তাকাইলেন না। আজ চুল, দাড়ি, ভ্রু, সবই শুভ্র বর্ণ ধারণ করিয়াছে। শরীর অতিশয় দুর্বল; দৃষ্টিশক্তিও হ্রাস পাইয়াছে। বাদশাহ হওয়ার বাসনা ছিল। অথচ আজ এমনি অবস্থা তাহার, কবরে যে সে কি লইয়া যাইবে সেই সম্বলই হাতে নাই। তাই ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নির্জনে বসিয়া শুধুই অশ্রুপাত করিতেছে। এমন সময়ে তাহার পীর তথায় উপস্থিত হইয়া ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। একবার, দুইবার, তিনবার। প্রথম দুইবারে ক্রন্দনের ভারে লোকটি কথাই বলিতে পারিল না। তৃতীয়বার প্রশ্নের জবাবে বলিল, আমি কাঁদি এই কারণে যে, "কিতাবে দেখিয়াছিলাম কি? আর বাস্তবে দেখিতেছি কি? কিতাবে দেখিয়াছিলাম যে, কেহ যদি জানমাল দিয়া পীরে কামেলের খেদমত করে; তাহা হইলে হয় সে বাদশাহ হয়, না হয় দরবেশ হয়। কিন্তু বাদশাহ হওয়াতো দূরের কথা, আমি যে কবরে কি লইয়া যাইব সেই সম্বলই আমার হাতে নাই।" ইহা শুনিয়া পীর ছাহেব পকেট হইতে একমুষ্ঠি তরমুজের বীজ বাহির করিয়া লোকটির হাতে দিয়া বলিলেন, "যাও, তোমাকে বিদায়। এখনি আমার দরবার থেকে চলিয়া যাইবে এবং আরও বলিলেন, এই তরমুজের বীচিগুলো লইয়া কোন পরিত্যাক্ত নদীর চরায় যাইয়া তথায় বপন করিবে। তৎপর সেই ক্ষেতে যে তরমুজ হইবে, সেই তরমুজ বিক্রয় করিয়া আটা ক্রয় করিয়া খাইবে। আর আল্লাহর জেকের করিবে।" এই আদেশ প্রদানপূর্বক তাহাকে বিদায় দিলেন। লোকটি কাঁদিতে কাঁদিতে পীরের দরবার ত্যাগ করিল। হাঁটিতে হাঁটিতে অবশেষে এক নদীর চরায় উপস্থিত হইল। চরায় বীজগুলো বপন করিল। দেখিতে দেখিতে তরমুজ গাছে সারা ক্ষেত ছাইয়া গেল। অতি চমৎকার তরমুজ ধরিল। লোকটি তরমুজ বিক্রয় করিয়া আটা ক্রয় পূর্বক কখনও রুটি তৈরী করিয়া খায়, কখনও বা শুধু পানিতে মন্থন করিয়া আহার করে। আর আল্লাহর জেকেরে রত থাকে। এইভাবে দিন অতিক্রান্ত হইতে লাগিল।

    এই দিকে সেই দেশের বাদশাহের মনে এক অদ্ভূত খেয়াল জাগিল। বাদশাহ প্রধান মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিল, হে মন্ত্রী ছাহেব। জীবনে আমি সমস্ত কাজই করিয়াছি কিন্তু চুরি করি নাই। আমার চুরি করিবার বাসনা জাগিয়াছে। তুমি ব্যবস্থা কর। মন্ত্রীবর তিনদিনের সময় চাহিলেন। তৎপর খুঁজিতে খুঁজিতে মন্ত্রী সেই তরমুজের ক্ষেতের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে একজন অতিশয় বৃদ্ধ লোক তরমুজ ক্ষেত পাহারা দিতেছে। এখান থেকে তরমুজ চুরি করা নিরাপদ মনে করিয়া মন্ত্রী ফিরিয়া গিয়া বাদশাহকে সমস্ত খুলিয়া বলিলেন। সেই রাত্রে বাদশাহ মন্ত্রীর সংগে চুরি করিতে বাহির হইল। বাদশাহী পোশাক ছাড়িয়া অতি সাদাসিধা পোশাক পড়িয়া বাদশাহ চুরি করিতে বাহির হইলেন।

    অপর দিকে সেই তরমুজওয়ালার উপর সেই রাত্রিতে জালালী ফয়েজ পড়িতেছিল। সে যখনই মোরাকাবার উদ্দেশ্যে চক্ষু বন্ধ করে, তখনই সে দেখিতে পায় যে, কে যেন তাহার তরমুজ চুরি করিতে আসিতেছে। ইহা দেখিয়া লোকটি একটি শক্ত লাঠি হাতে করিয়া বসিয়া রহিল এবং মনে মনে ভাবিল, যে তরমুজের ক্ষেত দীর্ঘ ছত্রিশ (৩৬) বছর খেদমত করিয়া সে পাইয়াছে, আজ সেই তরমুজ অন্যে চুরি করিয়া লইয়া যাইবে, ইহা অসম্ভব।

    তরমুজ চুরি করিতে বাদশাহ তরমুজ ক্ষেতে প্রবেশ করিল। যাইতে যাইতে তরমুজওয়ালার নিকটে যাইয়া একটা তরমুজ ছিন্ন পূর্বক যেইমাত্র আর একটি তরমুজের দিকে হাত বাড়াইয়াছেন, অমনি লোকটি বাদশাহের মাথায় এক ঘা বসাইয়া দিল। এক আঘাতেই বাদশাহ মৃত্যুমুখে পতিত হইল। অবস্থা দৃষ্টে মন্ত্রী কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সে তরমুজওয়ালাকে বলিল, "তুমি সর্বনাশ করিয়াছ। দেশের বাদশাহকে মারিয়া ফেলিয়াছ।"

    মন্ত্রীবর অতঃপর লোকটিকে লইয়া রাজদরবারে উপস্থিত হইয়া তাহাকে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করিয়া রাখিলেন। সারাদেশে ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, বাদশাহের মস্তিস্ক বিকৃত হইয়াছে। একটি কক্ষে তাহাকে তালাবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে। একমাত্র প্রধান মন্ত্রী ছাড়া অন্য কাহারও সাথে এক বছর কাল তিনি দেখা করিবেন না। এই এক বছর মন্ত্রী রাজ্য পরিচালনা করিবেন।

    প্রতিদিন মন্ত্রীবর আতর, গোলাপ দিয়া সেই তরমুজওয়ালাকে গোসল করান। এইভাবে এক বছর শেষে আল্লাহপাকের ইচ্ছায় ঐ বৃদ্ধ তরমুজ ব্যাপারী এক সুদর্শন পুরুষের রূপ ধারণ করিল। তাহার চেহারা হইতে যেন নূর বিচ্ছুরিত হইতে লাগিল। মন্ত্রী বাদশাহের বিবিকে বলিলেন,

    এক বছর পর্যন্ত আপনার সাথে বাদশাহের দেখা সাক্ষাত নাই। কাজেই পুনরায় বিবাহ পড়াইতে হইবে। মন্ত্রী নিজেই বিবাহ পড়াইলেন। তৎপর সেই সুদর্শন লোকটি অন্দরমহলে প্রবেশ করিল। রানী দেখিয়াই আশ্চর্য হইলেন কারণ এই লোক যে তাহার স্বামী নয়। লোকটির সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হইলেন বটে কিন্তু তিনি তো তাহার স্বামী নহেন। তাই রানী মন্ত্রীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করায় মন্ত্রী আদ্যোপান্ত সমস্তই খুলিয়া বলিয়া রানীকে নীরব থাকিতে বলিলেন। কেননা দেশবাসী এই ঘটনা জানিলে দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি হইবে। রানী চুপ রহিলেন এবং নতুন সুদর্শন লোকটিকেই স্বামী হিসেবে গ্রহণ করিলেন। তৎপর মন্ত্রী লোকটিকে সিংহাসনে বসাইয়া দিলেন। তরমুজ ব্যাপারী বাদশাহ হইল, যাহা তাহার পীর ছাহেবের নিকট পাওনা ছিল। বাদশাহ রাজকার্য চালাইতে লাগিলেন কিন্তু কাজ কর্ম সবই নিয়মবহির্ভূত করেন। যত মামলা আসে, বাদশাহ সাক্ষীপ্রমাণ না লইয়া আসামীকে ছাড়িয়া দেয়, ফরিয়াদীকে জেলে ঢুকায়। এই ভাবে দেশে বিশৃংখলা দেখা দিল। মন্ত্রী ভাবিতে লাগিল, কি করিলাম! এক তরমুজ ব্যাপারীকে ধরিয়া আনিয়া বাদশাহ বানাইলাম। আজ সমস্ত কাজকর্ম সে উল্টা করে। মন্ত্রী ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একদিন নদীর পার দিয়া ভ্রমণ করিবার সময় একটি অতিশয় সুন্দর ফুল পানিতে ভাসিয়া আসিতে দেখিলেন। এমন সুন্দর ফুল তিনি জীবনে আর দেখেন নাই। মনে মনে ভাবিলেন যে, এই ফুলটি বাদশাহকে নজরানা দিবেন। ফুলটি নদী হইতে তুলিয়া রাজ কার্যালয়ে আসিয়া বাদশাহকে উপহার দিলেন। বাদশাহ খুবই খুশী হইলেন। কিন্তু মন্ত্রীকে বলিলেন, "আগামী কাল্যের ভিতরে যদি এই রকম পাঁচটি ফুল না দিতে পার, তাহা হইলে তোমাকে গর্দান দিতে হইবে। আর যদি দিতে পার তাহা হইলে বাদশাহী তোমাকে দিয়ে দেওয়া হইবে।" মন্ত্রী যেন বাকশক্তি হারাইয়া ফেলিলেন। ঐ রকম পাঁচটি ফুল তিনি কোথায় পাইবেন? চিন্তাক্লিষ্ট অবস্থায় বাড়ীতে গেলেন। চেহারা মলিন দেখিয়া তাহার মেয়ে তাহাকে কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, "নদীর স্রোতে ভাসিয়া আসা একটা সুন্দর ফুল বাদশাহকে উপহার দিয়াছিলাম। সেই ফুল পাইয়া বাদশাহ আমাকে বলিল যে, আগামী কল্যের ভিতর আরও পাঁচটি ফুল দিতে না পারিলে আমার গর্দান কাটা যাইবে।" ইহা শুনিয়া মেয়ে বাবাকে বলিল, "বাবা, চিন্তা করিও না। নদীর পার দিয়া হাঁটিতে থাক। আল্লাহর ইচ্ছায় পাঁচটি ফুল তুমি পাইতে পার।" মেয়ের পরমার্শে বাবা নদীর পার দিয়া হাঁটিতে লাগিলেন। হঠাৎ একটি ফুল ভাসিয়া আসিতে দেখিয়া মন্ত্রী দৌড়াইয়া গিয়া ফুলটি আনয়ন করিলেন। কিছুক্ষণ পর আরও একটি ফুল তিনি পাইলেন। মন্ত্রী তখন কাঁদিয়া কাঁদিয়া খোদার দরবারে মোনাজাত করিলেন, "হে খোদা! আরও তিনটি ফুল দয়া করিয়া আমাকে দাও।" অবশেষে হাঁটিতে হাঁটিতে আরও তিনটি ফুল পাইলেন। মন্ত্রীর মন ঠান্ডা হইল। ফুল লইয়া ফিরিয়া আসিতেই আবার ভাবিলেন, বাদশাহ যে কুটবুদ্ধির মানুষ, হয়তো আবার জিজ্ঞাসা করিবে, ফুলগুলো কোথা হইতে আসিয়াছে, তাহা দেখিয়া আসিয়াছ কি?” তাই মন্ত্রী আরও সামনে অগ্রসর হইয়া দেখিলেন যে একটি বড় গাছের একটা ডাল নদীর দিকে বিস্তৃত। সেই ডালে একজন লোক, যাহার পা ডালের সহিত বাঁধা, মাথা নীচের দিকে ঝুলানো। তেমন অবস্থায় জেকের করিতেছে। সারা দিন জেকের করিয়া দিন শেষে তাহার কলিজা ফাটিয়া এক ফোটা রক্ত নদীতে পড়ে, আর সংগে সংগে সুন্দর ফুলে পরিণত হয়। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখিয়া তিনি অতিশয় আশ্চর্য হইলেন। আরও অগ্রসর হইয়া লোকটিকে দেখিবার চেষ্টা করিলেন। নিকটে গিয়া যাহা দেখিলেন তাহাতে হতবাক হইলেন। লোকটি যেন তাহাদেরই বাদশাহ। চোখ, মুখ, নাক, হাত-পা সবই বাদশাহের মত। লোকটিকে দেখিয়া ফুলগুলো লইয়া তিনি ফেরত আসিলেন। (উল্লেখ্য যে, একদিনে একটি ফুল তৈরী হয়। পাঁচটি ফুলের জন্য পাঁচ দিনের প্রয়োজন। আল্লাহর কুদরতে মন্ত্রী একদিনেই পাঁচটি ফুল পাইলেন।) ফুলগুলো বাদশাহ হাতে পাওয়ার পরে মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, ফুলগুলো কোথা হইতে আসিয়াছে, তাহা দেখিয়াছ কি? মন্ত্রী যাহা দেখিয়াছেন তাহা বর্ণনা করিলেন। তৎপর জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকটিকে চিনিতে পারিয়াছ কি? মন্ত্রী বলিলেন, বলিতে ভয় হয়। বাদশাহ সাহস দিলে তিনি বলিলেন যে, "লোকটি দেখিতে ঠিক আপনার মত, মনে হয় আপনিই।" ইহা শুনিয়া বাদশাহ কাঁদিয়া ফেলিলেন। বাদশাহ তাহার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত ঘটনা মন্ত্রীর নিকট উল্লেখপূর্বক বলিলেন, তোমরা আমার কাজ কর্মে যে সন্তুষ্ট হইতে পার নাই, তাহা আমি জানি। কিন্তু আমি কি করিব! খোদাতায়ালার সাক্ষ্যই গ্রহণ করিব? না কি মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করিব? আল্লাহপাক আমাকে জানাইয়া দিতেন যে আসামী নির্দোষ, বরং ফরিয়াদী দোষী। তাই আমি আসামীকে ছাড়িয়া দিয়া ফরিয়াদীকে জেলে ঢুকাইতাম। যাহাই হোক, আমি আর বাদশাহী করিব না। তোমাকে এই আসনে বসাইয়া দেই। মন্ত্রী বুঝিলেন, ইনি একজন মস্ত বড় ওলী। তাই তিনি বাদশাহকে বলিলেন, "হুজুর, আমি বাদশাহী চাই না। আমাকে দয়া করিয়া আপনার কদমের নীচে জায়গা দেন।" অবশেষে বাদশাহ মন্ত্রীকে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিয়া ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দিলেন।

    ইহাই হইল মুরীদের সাথে পীরের খেলা। এমনই কঠিন রেয়াযত করিয়া দীর্ঘ ৩৬ বছর খেদমত করিয়া লোকটি এই অমূল্য নেয়ামত লাভ করিলেন।

    কাজেই, তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে তরিকার নিয়মকানুন ঠিক ঠিক মত পালন কর। তোমাদের জন্য একটি সুসংবাদ এই যে, তোমরা যদি একাধারে আটদিন লতিফায়ে কালবের জন্য প্রদত্ত ওজিফা মত চল, তাহা হইলে আটদিনে তোমরা তোমাদের কালবের জেকের বা স্পন্দন বুঝিতে পারিবে। ইহা আমার পীর কেবলাজানের অছিলায় এই জামানার মানুষের জন্য আল্লাহপাকের বিশেষ দান।

    কাজেই, তোমরা পীরকে মহব্বত কর। উল্লিখিত নেয়ামত সমূহ অর্জন করিবার জন্য জোর চেষ্টা চালাও। আল্লাহপাক তোমাদের কামিয়াবী বখশিস করুন। দু'আ, ইতি।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD