Logo

ছায়ের ও ছুলুক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এবং তাজাল্লীত্রয়ের আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০:২৭
ছায়ের ও ছুলুক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এবং তাজাল্লীত্রয়ের আলোচনা
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ছায়ের ও ছুলুক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এবং তাজাল্লীত্রয়ের আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

খোদাপ্রাপ্তির পথে ছালেককে ছায়ের' ও ছুলুক' শিক্ষা করিতে হয়। ছায়ের এবং ছুলুক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হইল নিম্নলিখিত পনেরটি মাকাম বা গুণাবলী লাভ করা। গুণাবলী গুলো হইলঃ

  • তওবা (অনুতাপ, অনুশোচনা, প্রত্যাবর্তন, পাপে নিবৃত্ত ইত্যাদি),

  • যোহদ (দুনিয়াবিরাগ বা বাসনাত্যাগ),

  • বিজ্ঞাপন

  • তাকওয়া (খোদাভীতি বা পরহেযগারী),

  • রেয়াজত (কঠোর ব্রত),

  • ফকর (দরিদ্রতা),

  • বিজ্ঞাপন

  • ছবর (সহিষ্ণুতা),

  • শোকর (কৃতজ্ঞতা),

  • তাওয়াক্কুল (নির্ভর),

  • বিজ্ঞাপন

  • খওফ (ভয়),

  • রেজা (আশা),

  • ইয়াকীন (অটল বিশ্বাস),

  • বিজ্ঞাপন

  • এখলাস (উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা),

  • তসলিম (আপনাকে ন্যস্ত করা),

  • রেযা (খোদাতায়ালা যখন যে অবস্থায় রাখেন তাহাতেই রাজী থাকা) এবং

  • বিজ্ঞাপন

  • তাকমিলোল ইয়াকীন (পরিপূর্ণ বিশ্বাস)।

  • ছুলুকরত অবস্থায় ছালেক তিন রকম তাজাল্লীর সাথে পরিচিত হয়। যথাঃ

    • তাজাল্লীয়াতে আফয়াল

    বিজ্ঞাপন

  • তাজাল্লীয়াতে সিফাত এবং

  • তাজাল্লীয়াতে জাত'।

  • এই তিন প্রকারের তাজাল্লী অর্থাৎ তাজাল্লীয়াতে আ্যাল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত এবং তাজাল্লীয়াতে জাত সিদ্ধ হওয়ার মধ্যেই উক্ত পনের (১৫) টি গুণাবলী অর্জন করা সম্ভব।

    বিজ্ঞাপন

    তাজাল্লীয়াতে আফয়ালঃ-

    তাজাল্লীয়াতে আফয়াল বেলায়েতে ছোগরার মাকামে সিদ্ধ হয়। ছালেক যখন তাজাল্লীয়াতে আফয়াল হাছিল করে তখন সে আল্লাহপাকের অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করিতে পারে। সে তখন বুঝিতে পারে যে সৃষ্টি জগতের সমস্ত কিছুই অসীম ক্ষমতাবান খোদাতায়ালার ক্রিয়াতেই সংঘঠিত হইতেছে। দিন রাত্রির পরিবর্তন, ঋতুর পরিবর্তন, এক এক ঋতুতে প্রকৃতির এক এক রকম রূপধারণ, সবই এক খোদাতায়ালার ইচ্ছাতেই সংঘঠিত হইতেছে। খোদাতায়ালার এই অপরিসীম ক্ষমতার নূর দর্শন করিয়া ছালেক পাপ কর্মে লজ্জিত হয় এবং তওবার মাকাম লাভ করে। খোদার ভয়ে ছালেক ভীত হয় এবং নাফসে আম্মারার সাথে জেহাদে লিপ্ত হয়। তৎপর যোহদ, তাকওয়া এবং রেয়াজতের মাকাম হাছিল করে। এই তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের মনোমুগ্ধকর জ্যোতি দর্শন করিয়া ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে ছালেক তুচ্ছ মনে করে এবং ফকীরী অবলম্বন করে। এই ভাবে এই তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল-এর মাধ্যমে ছালেক পাঁচটি গুণাবলী যথা তওবা, যোহদ, তাকওয়া, রেয়াযত এবং ফকর লাভ করে।

    তাজাল্লীয়াতে সিফাতঃ-

    বিজ্ঞাপন

    তাজাল্লীয়াতে সিফাত বেলায়েতে কোবরা এবং বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে সিদ্ধ হয়। তাজাল্লীয়াতে সিফাত সিদ্ধ হইলে ছালেক "খোদাতায়ালা যে অসীম দয়ালু এবং দাতা" তাহা উপলব্ধি করিতে পারে। এই অবস্থাতে ছালেক পূর্বোদ্ধৃত পনেরটি (১৫) গুণের মধ্যে পাঁচটি গুণাবলী যথা ছবর, শোকর, তাওয়াক্কুল, খওফ এবং রেজা লাভ করে। ছালেক বেলায়েতে কোবরার দায়েরাতে সিফাতি নূর দর্শন করে এবং বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে জাত মিশ্রিত সিফাতি নূর দর্শন করে।

    তাজাল্লীয়াতে জাতঃ-

    তাজাল্লীয়াতে জাতি নূর সিদ্ধ হইলে ছালেক আল্লাহর 'হুজরী' হাছিল করে। এখানে খোদাতায়ালার জাতি প্রেমে ছালেকের দেল ভরিয়া যায়। এই তাজাল্লীয়াতে জাতি নূর সিদ্ধ হয় দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়ত হইতে হোব্বে ছেরফা পর্যন্ত সবগুলো মাকাম থেকে। তাজাল্লীয়াতে জাত প্রাপ্ত হইলে ছালেক সর্বশেষ পাঁচটি গুণাবলী যথা ইয়াকীন, এখলাস, তছলিম, রেজা এবং তাকমিলোেল ইয়াকীন লাভ করে। ছালেক তাজাল্লীয়াতে আফয়াল এবং তাজাল্লীয়াতে সিফাতের মধ্যে যে সকল দশ (১০) টি গুণাবলী লাভ করে সেগুলোও এই তাজাল্লীয়াতে জাতে পরিপক্কতা হাছিল করে।

    বিজ্ঞাপন

    তাজাল্লীয়াতে আয়াল, তাজাল্লীয়াতে সিফাত, তাজাল্লীয়াতে জাত এবং বর্ণিত গুণাবলী সমূহ হাছিল করিবার একমাত্র মাধ্যম পীরে কামেল। মোর্শেদে কামেল ছালেককে যখন যে নির্দেশ দান করেন তাহা বিনা দ্বিধায় পালন করিতে হইবে। সেই নির্দেশ পালনরত অবস্থায় মৃত্যুকে নিশ্চিত মনে হইলেও তাহা পুংখানুপুংখভাবে পালন করিতে হইবে। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। "ইন্নাশশায়ত্বানা লিল ইনসানে আদুব্বু মুবীন"। শয়তান ছালেককে খোদাতায়ালার দিক থেকে ফিরাইয়া রাখিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। আর শয়তানের হাত হইতে বাঁচিবার একমাত্র পথ পীরের হুকুম যথাযথ পালন করা। এখানে জানা দরকার যে, শয়তান ছালেককে এই দুনিয়ার বুকে যে পরিমান ধোকা দেয়, তার চাইতে হাজারগুণ বেশী ধোকা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বাতেনী জগতে। কাজেই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিলের পথে যে কোন মাকামেই হউক না কেন, যে কোন দায়েরাতেই হউক না কেন, ছায়ের এবং ছুলুকরত অবস্থায় পীরের নির্দেশ ঠিক ঠিক মত পালন করিতে হইবে। ইহার কোন বিকল্প নাই।

    হে জাকেরগণ! তোমরা শুনিয়াছ, হযরত শেখ ফরিদ (রঃ) খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিলের জন্য জীবনের বেশীর ভাগ সময় বনে জংগলে কাটাইয়াছেন। কত শ্মশানে-মশানে পড়িয়া কাঁদিলেন। নিজের চক্ষু কাককে খাওয়াইলেন। একটা কাঠের রুটি তৈরী করিয়া আপন নাকে তিনি বার (১২) বছর ভাড়াইয়া রাখিলেন। একটা কুয়ার মধ্যে উপরের দিকে পা বাঁধিয়া মাথা নীচের দিকে রাখিয়া বার (১২) বছর আল্লাহর জেকেরে রত রহিলেন। তথাপিও তিনি মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌছাইতে পারিলেন না। অবশেষে নিরাশ হইয়া সেই জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ তাপস হযরত শাহ কুতুবুদ্দিন (রঃ) ছাহেবের নিকট মুরীদ হইলেন। হযরত শাহ কুতুবুদ্দিন (রঃ) ছাহেব ফরিদকে ডাকিয়া তাহার হাতে একটা পানির হাড়ি (পানি জ্বাল করার পাত্র) দিয়া বলিলেন, "তুমি সাত (৭) বছর এই হাড়িতে পানি গরম করিয়া শেষরাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজের অজু বানাইবার জন্য আমাকে দিবে। কিন্তু বাবা মনে রাখিও, সাত (৭) বছর পর এই হাড়ি আমাকে ফেরত দিতে হইবে, হাড়ি যেন ভাংগে না।” শেখ ফরিদ (রঃ) পীরে কামেলের হুকুম মোতাবেক শেষ রাত্রিতে পানি গরম করিয়া লইয়া পীরের হুজরার দরজাতে দাঁড়াইয়া থাকিতেন এবং পীর সাহেব কেবলা যখন পানি চাহিতেন, তখন অতি বিনীতভাবে পীরের নিকট পানি হাজির করিতেন।"

    এই ভাবে পানি জ্বাল করিয়া এক বছর গত হইল, দুই বছর গেল, আস্তে আস্তে সময় শেষ হইয়া আসিল; সাত বছরের শেষ দিন পানি জ্বাল করিবার জন্য হাড়ি যখন উনুনের উপর বসানো হইল, অদৃষ্টের ফেরে হাড়ি অকস্যাৎ ফাটিয়া গেল।

    ঐ দিকে তাহাজ্জুদের নামাজের সময় আসন্ন। শেখ ফরিদ (রঃ) ভাবিতে লাগিলেন যে, তার কষ্টের জীবন কষ্টেই গেল। তিনি আর একটা হাড়ি যোগার করিয়া তাহাতে পানি জ্বাল করিয়া পীরের নিকট উপস্থিত হইলেন। শাহ কুতুবুদ্দিন (রঃ) ছাহেব অজু করিয়া তাহাজ্জুদের নামাজ পড়িয়া ফজরের পূর্ব পর্যন্ত ইবাদতে মশগুল রহিলেন। তৎপর ফজরের নামাজ শেষ করিয়া ফরিদকে কাছে ডাকিয়া বলিলেন, "বাবা ফরিদ, তোমাকে একটা হাড়ি দেওয়া হইয়াছিল সাত (৭) বছর পানি জ্বাল করিবার জন্য। আজ সাত (৭) বছর শেষ হইল, হাড়িটা আমাকে ফেরত দাও।” ফরিদ কাঁদিতে কাঁদিতে পীরের নিকট বলিলেন, "হুজুর, গত রাত্রিতে পানি গরম করিবার সময় হাড়িটা ফাটিয়া যায়। পরে অন্য একটা হাড়িতে পানি জ্বাল করিয়া হুজুরের নিকট হাজির হইয়াছি।" তাপসকুল শিরোমণী হযরত শাহ কুতুবদ্দিন (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "তুমি যে দীর্ঘ সাত (৭) বছর অজুর পানি জ্বাল করিলে, সেই খেদমত আল্লাহতায়ালার দরবারে কবুল হয় নাই। তাই তোমাকে আরও সাত (৭) বছর পানি জ্বাল করিতে হইবে।"

    শেখ ফরিদ (রঃ) দ্বিতীয় সাত (৭) বছরের খেদমত শুরু করিলেন। আবার নতুন করিয়া তিনি পানি জ্বাল করা শুরু করিলেন। একদিন, দুই দিন করিতে করিতে সেও সাত (৭) বছর শেষ হইয়া আসিল। এদিকে শাহ কুতুবুদ্দিন (রঃ) ছাহেব প্রার্থনা করিলেন, “হে খোদা! আজ যেন ফরিদ আগুনের অভাবে পানি জ্বাল করিতে না পারে।" সেই রাত্রিতে এত প্রচন্ড ঝড় হইল যে শহরের আগুন নিভিয়া গেল। তাহাজ্জুদের নামাজের সময় আসন্ন। শেখ ফরিদ (রঃ) পানি জ্বাল করিবেন কিন্তু আগুন কোথাও নাই। এই সাত বছরও নষ্ট হয় আগুনের অভাবে পানি জ্বাল করিতে না পারিয়া। ইহা ভাবিয়া শেখ ফরিদ (রঃ) বেহুশের হালাতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করিলেন কিন্তু কোথাও আগুন পাইলেন না। চতুর্দিকে দৌড়াদৌড়ি করিতে করিতে নিকটস্থ একটা মাঠে গেলেন এবং কোথাও আগুন দেখা যায় কিনা তাহা লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখিলেন যে দূরে কোথাও একটা দীপ জ্বলিতেছে। তিনি আগুনের জন্য সেই দীপ লক্ষ্য করিয়া দৌড়াইতে লাগিলেন। কিন্তু সম্মুখে বাধিল বিরাট এক দরিয়া। সেই দরিয়া পার হওয়ার কোন বন্দোবস্ত ছিল না। শেখ ফরিদ (রঃ) মনে মনে ভাবিলেন, "সাপে খাইলেও সর্বনাশ, বাঘে খাইলেও সর্বনাশ,” আর আমার বাঁচিয়া কি হইবে! আগুন আনিতেই হইবে। কাজেই আমি সাঁতার দিয়া ঐ পারে যাইব। তিনি দরিয়ায় সাঁতার দিলেন। হাতে কলাগাছের মত কি যেন বাধিল। কলার ভেলা মনে করিয়া তিনি সেটাকে ধরিলেন এবং আস্তে আস্তে সাঁতার কাটিতে লাগিলেন।

    আসলে হাতে যাহা বাধিয়াছিল, তাহা কলার ভেলা নয়, একটা মুর্দা বা মরা মানুষ। সেই মরা মানুষের পচা দুর্গন্ধে তাহার শরীর গন্ধময় হইয়া গেল। সেই অবস্থায় তিনি নদী পার হইলেন। নদী পার হইয়া যে ঘরে দীপ জ্বলিতেছিল সেই ঘরের কাছে গেলেন। নিকটে গিয়া দেখিলেন যে, একটি বারবনিতা মেয়েলোক ঘরের মধ্যে বসিয়া আছে। শেখ ফরিদ (রঃ) কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, "মা, আমাকে একটু আগুন দেন। আজ আমার চৌদ্দ বছর নষ্ট হয় এই আগুনের জন্য। আমাকে একটু আগুন দেন।” বার বার এ কথা বলিয়া কাঁদিতে লাগিলেন।

    সেই মেয়েলোকটি শেখ ফরিদের উজ্জল চেহারা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া গেল এবং ক্ষুব্ধ হইয়া বলিল, "তুমি আমাকে মা বলিলে কেন? আমি একটা অসতি মেয়েলোক।" কিন্তু শেখ ফরিদ (রঃ) সে দিকে কর্ণপাত না করিয়া বার বার একই ভাবে মা বলিয়া সম্বোধন করিয়া আগুন চাহিলেন। পরিশেষে মেয়ে লোকটি রাগিয়া বলিল, "তোমাকে আমি আগুন দিতে পারি একটি শর্তে। আর শর্তটি হইল তুমি তোমার দক্ষিণ চক্ষুটি আমাকে দিবে।” ফরিদ কোন দ্বিরুক্তি করিলেন না। নিজের

    অংগুলী দিয়া দক্ষিণ চক্ষু উঠাইয়া বারবনিতা মেয়ে লোকটির হাতে দিলেন। এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখিয়া বারাঙ্গনা মেয়ে লোকটি অধির হইয়া আগুন দিয়া ফরিদকে বিদায় করিল। শেখ ফরিদ (রঃ) নিজের মাথায় পাগড়ী দিয়া চক্ষু বেন্ডেস করিলেন এবং আগুন লইয়া দরবার অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। সেই লাশ ধরিয়া তিনি নদী পার হইলেন। আল্লাহর অপার মহিমায় সেই আগুন আর নিভিল না। আগুন লইয়া যথা সময়ে দরবারে আসিয়া পানি গরম করিয়া হুজরার দরজায় তিনি দাঁড়াইয়া রহিলেন এবং সময়মত পীরের খেদমতে হাজির করিলেন।

    শাহ কুতুবুদ্দিন (রঃ) ছাহেব অজু সমাপনান্তে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়িলেন এবং ফজরের পূর্ব পর্যন্ত হুজরাতেই রহিলেন। এদিকে ফরিদ চোখের ব্যথায় অস্থির হইয়া হুজরার দরজায় পড়িয়া রহিলেন। শেখ ফরিদ (রঃ) মনে মনে ভাবিলেন, "হয় মন্ত্রের সাধন, নয় শরীর পতন।" উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে, না হয় মরণ হইবে। ফজরের নামাজ শেষ করিয়া হুজরা হইতে শাহ কুতুবদ্দিন (রঃ) ছাহেব ফরিদকে ডাকিলেন, "ফরিদ! তুমি এখানে আস।" শেখ ফরিদ (রঃ) সেই ডাকে সাড়া দিয়া অতি বিনীতভাবে পীরের নিকটে গিয়া দন্ডায়মান হইয়া রহিলেন। পীর ছাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, "বাবা, তোমার চক্ষু কাপড় দিয়া বেন্ডেস করা কেন?" ফরিদ বলিলেন, "আমার চক্ষুতে অসুখ করিয়াছে। তাই বেন্ডেস করিয়া রাখিয়াছি।" তখন পীর ছাহেব ফরিদের চোখের বেন্ডেস নিজেই টান দিয়া খুলিলেন। খুলিয়াই বলিলেন, "বাবা, তোমার চক্ষু কোথায়? তোমার চক্ষুইতো দেখিতেছি না।" পীর ছাহেব কাঁদিতে লাগিলেন। মুরীদও কাঁদিতে লাগিলেন। এই কান্নাকাটির ভিতর দিয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব ফরিদের হাছিল হইল। হযরত শাহ কুতুবুদ্দিন (রঃ) ছাহেব খোদাতায়ালার দরবারে হাত তুলিয়া বলিলেন, "হে খোদা! ফরিদকে তুমি কবুল কর এবং নতুন চক্ষু দান কর।" শেখ ফরিদ (রঃ) নতুন চক্ষু পাইলেন, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য এবং রেজামন্দি লাভ করিলেন। তাই মহাকবি হযরত জালালউদ্দিন রূমী (রঃ) বলিয়াছেন,

    'চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল

    হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।'

    'তুমি যেই মুহূর্তে পীরের জাতকে কবুল করিলে, আল্লাহ তখনই তোমাকে বান্দা হিসাবে কবুল করিলেন এবং রাসূলে পাক (সঃ) তোমাকে উম্মতের মধ্যে হাকিমুল উম্মত বলিয়া কবুল করিলেন। আল্লাহ এবং রাসূলে পাক (সঃ) এর তরফ থেকে তুমি সেই মুহর্তেই স্বীকৃতি পাইলে যে মুহূর্তে তুমি তোমার পীরের তরফ থেকে স্বীকৃতি পাইলে।'

    হে জাকেরগণ! তোমরা জানিয়া রাখ, "খোদাপ্রাপ্তির পথে এই রকম মহব্বত যদি অর্জন করিতে পার, তাহা হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব তোমরা লাভ করিতে পারিবে, সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। বুযুর্গগণ ফরমাইয়াছেন, "খোদাপ্রাপ্তির পথে চারটি জিনিস একান্ত প্রয়োজন। আদব, বুদ্ধি, মহব্বত এবং সাহস।" এই চারটি গুণ তোমরা অর্জন করিবার চেষ্টা কর।

    আদবঃ-

    তুমি তোমার পীরের নিকট এই রকম থাক যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। এটাই হইল আদব।

    বুদ্ধিঃ-

    খোদাপ্রাপ্তির পথে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রয়োজন। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি দ্বারা পীরের ইশারাকে উপলদ্ধি কর।

    মহব্বতঃ-

    তোমার পীরকে তুমি তোমার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিজন, বাবা-মায়ের চেয়ে অধিক মহব্বত কর।

    সাহসঃ-

    পীরের তরফ থেকে যত রকমই হুকুম আসুক না কেন, সাহসের সংগে তুমি তাহা পালন কর। পীরের তরফ হইতে স্বীকৃতি পাইলে, সেই মুহূর্তেই আল্লাহর তরফ থেকে স্বীকৃতি পাইবে। তোমার আত্নশুদ্ধি লাভ হইবে এবং নসিহতের শুরুতে উল্লিখিত গুণাবলীসহ তাজাল্লীত্রয় হাছিল করিতে সক্ষম হইবে। আমীন!

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD