লতিফা জিন্দা করানোই মাকছুদ নয় মাকছুদ হইল আল্লাহ তায়ালাকে পাওয়া

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ফানা ও বাকা بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আধ্যাত্মিক জগতের বিভিন্ন মাকাম বা দায়েরাতে ছালেক ফানাফিল্লাহ বা আল্লাহতে বিলুপ্তির যে অনুভূতি লাভ করে সে সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
"ফানাফিল্লাহ" কথার শাব্দিক অর্থ হইল আল্লাহতায়ালার সহিত মিশিয়া যাওয়া। আল্লাহতায়ালার সহিত মিশিয়া যাওয়ার কথার যে ব্যাখ্যা পীরানে পীরগণ করেন তাহা হইল, আল্লাহতায়ালা ব্যতীত সমস্ত কিছু ভুলিয়া যাওয়া, তথা পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত হওয়া, অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর বাসনা দেল হইতে মুছিয়া ফেলা, দেলে অন্য কোন বস্তুর এলেম বা জ্ঞান না রাখা। আল্লাহতায়ালার সহিত মিলন বা ফানাই খোদা প্রাপ্তি সাধনার উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতশ, খাক, বাদ, লতিফায়ে কালেব তথা সর্ব শরীরের লতিফাসমূহ জিন্দা করানোর প্রয়াস। লতিফা জিন্দা করানোই মাকছুদ নয়। মাকছুদ হইল আল্লাহতায়ালাকে পাওয়া। কাজেই কোনো বিশেষ লতিফাতে আল্লাহতায়ালার সম্মিলন নয়, সমস্ত লতিফাসমূহ ভাংগিয়া সর্ব শরীর ব্যাপী আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বের অনুভূতিই ফানা।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, ফানা হইল কালবকে আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছুর আকর্ষণ হইতে মুক্ত রাখা। এই নেয়ামত তখনই লাভ হয়, যখন অন্তঃকরণে খোদা ভিন্ন অন্য কাহারও স্থান থাকে না। ইহা খোদা ভিন্ন সকল কিছু ভুলিয়া যাওয়ার অবস্থা। ইহা এমন অবস্থা যখন ইচ্ছাপূর্বক চেষ্টা করিলেও অন্যের চিন্তা অন্তরে আসে না। এই অবস্থা না আসা পর্যন্ত কালবের রোগমুক্তি সম্ভব নয়।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, 'দেলে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর আকর্ষণ থাকা পর্যন্ত মোমিন হওয়া যায় না। ফানাও লাভ করা যায় না।' আল্লাহপাক কুরআন মজীদে বলিতেছেন,
বিজ্ঞাপন
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ الهَهَ هُوهُ
অর্থাৎ- "আপনি কি ঐ ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন, যে ব্যক্তি নিজের আকাংখাসমূহকে উপাস্য করিয়া লইয়াছে?" (সূরা জ্বাসিয়াহঃ ২৩)
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) তদীয় মকতুবাত শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন, "মোমিনকে আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যই মূল আবাস ভূমি হিসেবে জানিতে হইবে। মানুষ আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যের জন্যই আলমে আমর বা আল্লাহতায়ালার হুকুমের জগৎ হইতে পৃথিবীতে আসিয়াছে। তাই আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যের ও হুকুমের জগৎই আমাদের মূল আবাস ভূমি বা আদি বাস স্থান। সেই স্থানে ফিরিয়া যাওয়াই আমাদের মাকছুদ হইতে হইবে। তাহাই কামনা করিতে হইবে। কারণ রাসূলে করীম (সঃ) ফরমান, "আবাস ভূমির প্রতি ভালবাসা ঈমানের অংগ।" অতঃপর কুরআনের আয়াত উদ্ধৃতি করিয়া বলিয়াছেন, আমরা কোথায় যাইব? আমাদের মস্তকের ঝুটি আল্লাহতায়ালারই হস্তে। তাই কোথায় পালাইব? একমাত্র পথ খোদাতায়ালার দিকে পলায়ন ও খোদাকে লইয়াই ব্যস্ত থাকা, তাহাই প্রকৃত ফানা।
বিজ্ঞাপন
হযরত জালাল উদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, যে কলসীর ভিতরে কিছু নাই বা শূন্য, তাহার মুখ বন্ধ করিয়া পানিতে ভাসাইয়া দিলে, সেই কলসী যেমন ডোবে না, তেমনি যে-মানুষের হৃদয় পার্থিব আকর্ষণ শূন্য, সেই ব্যক্তির কালব বা হৃদয়ও ভাসমান থাকিবে। তাহার দেল আল্লাহতায়ালার মহব্বতে পরিপূর্ণ থাকে। হযরত জালালউদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব আল্লাহতায়ালার পথের পথিকদের উদ্দেশ্যে বলিতেছেন, সূর্য যেমন তাহার কিরণ বিকিরণ করিয়া নিঃশেষ হয় না, তেমনি আল্লাহতায়ালার পথে ব্যয় করিয়াও কেহ নিঃস্ব হয় না। হযরত রূমী (রঃ) ছাহেব পবিত্র হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়া বলিতেছেন, হযরত রাসূলে করীম (সঃ) ফরমান, প্রতিদিন সকালে একজন ফেরেশতা জগতের বুকে নামিয়া আসিয়া আল্লাহতায়ালার দরবারে দু'আ করেন, "হে আল্লাহ! তোমার পথে ব্যয়কারীকে অবশ্যই বিনিময় প্রদান কর।" আর একজন ফেরেশতা বলেন, “যে ব্যক্তি তোমার পথে ব্যয় করিতে কৃপণতা করে তাহার জন্য ধ্বংস নামাইয়া দাও।"
হযরত রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন যে, এই হাদীসের তাৎপর্য শুধু মাত্র অর্থ ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যিনি আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে পার্থিব সকল আকর্ষণ পরিত্যাগ করেন, আল্লাহতায়ালা তাহার নৈকট্য ও প্রেম দ্বারা সেই বান্দাকে কবুল করেন। যিনি এই রূপে গোমরাহী হইতে মুক্ত হইতে সচেষ্ট হন, আল্লাহতায়ালা তখন ঐ বান্দাকে সান্নিধ্য দান করেন। আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যপ্রাপ্তিকেই ফানা বলে। তবে আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য ও নৈকট্যের নিবিড়তা ও ঘনিষ্ঠতা সকলের জন্য সমান নহে। ফানা বা সান্নিধ্যের অনেক মাকাম রহিয়াছে। যথাঃ
বেলায়েতে ছোগরা,
বিজ্ঞাপন
বেলায়েতে কোবরা বা আকরাবিয়াতের মাকাম,
কাওসের মাকাম,
কামালাতে নবুয়তের মাকাম ও তঊর্ধ্বের মাকামসমূহ।
বিজ্ঞাপন
ইহা ছাড়াও রহিয়াছে হকিকতে সালাত ও হকিকতে আহমদীর মাকাম, যে স্তরে স্রষ্টা ও বান্দার মধ্যে বিশেষ মিলন লাভ হয়।
বেলায়েতে ছোগরাঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "তুমি নিজেকে ছাড় এবং আস।" আল্লাহতায়ালার জন্য নিজেকে অতিক্রম করা যেমন ফরজ, তেমনি নিজের মধ্যে প্রবেশ করাও আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভের জন্য অতীব প্রয়োজন, যদিও তাহা অতি কঠিন। কারণ আল্লাহ বলেন, "আসমান জমিন কোথাও আমার সংকুলান হয় না, আমার মোমিন বান্দার কালব বা দেল ব্যতীত।” আপন কালবেই আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য সম্ভব হয় ছায়েরে আনফুছি অর্থাৎ আল্লাহতায়ালাকে চিনিবার বা জানিবার জন্য নিজের মধ্যে আত্মিক ভ্রমণ দ্বারা। আল্লাহতায়ালাকে "শহুদ" বা আত্মিক দর্শন এই মাকামেই হাসিল সম্ভব হয়। যদি মারেফাত বা পরিচয় লাভ হয়, তাহাও এই স্তরে। এই স্তরের বর্ণনা করিতে যাইয়া গউসপাক হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, তাহারা আল্লাহপাকের নাম, গুণ ও জাতপাকের নূরের মধ্যে রুহানী ছায়ের করিয়া কামালাত হাসিল করেন। তাহাদের কালব সর্বদা আল্লাহপাকেরই নিকট আবদ্ধ থাকে। তাহাদের শরীর শুধু পৃথিবীতে অবস্থান করে। তাই আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় তাহারা আমার নিকট শ্রেষ্ঠ বান্দাদের অন্তর্গত।" মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, এই কথার অর্থে কেহ যেন মনে না করেন, ইহার অর্থ খোদার সহিত এক হইয়া যাওয়া। নিজেকে খোদার সহিত এক হওয়ার ধারণা করা শরীয়ত অনুযায়ী কুফর। উক্ত মাকামে উপনীত হওয়ার পূর্বে ঐ বিষয়ে চিন্তা করা নিষেধ।
বিজ্ঞাপন
বেলায়েতে ছোগরা মূলতঃ ফানা ফির রাসূলের মাকাম, তথাপি এই দায়েরাকে মা'ইয়াতের' মাকামও বলা হয়। কারণ এই স্তরে সাধক আল্লাহতায়ালার জাতের ক্রিয়াকলাপের জ্যোতির সহিত ফানা প্রাপ্ত হন। এই মাকামে আসিলে ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তি মোরাকাবায় অনুভব করিতে পারেন যে, আল্লাহতায়ালার যে জাত সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর সহিতই যুক্ত, সেই জাত পাক হইতে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের প্রতিবিম্বের নূর ছালেকের সর্ব দেহে তথা অণু-পরমাণুতে আসিতেছে। এই দায়েরাতে আল্লাহতায়ালার আসমা অর্থাৎ নাম, সিফাত বা গুণ সমূহের প্রতিবিম্বের নূর রাসূলে করীম (সঃ) এর দেল মোবারক হইয়া ছালেকের রূহের উপর পড়ে ও তথা হইতে নাফস ও অন্যান্য লতিফায় পতিত হয়। ধীরে ধীরে লতিফাসমূহ পবিত্র হয়। তাই এই দায়েরাতে প্রকৃত মা'ইয়াত বা আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য জ্যোতির বা নূরের মাধ্যমে হয়। এই স্থানে আসিয়া ছালেক কালবের মূলের মূল বা মহাকালবের সন্ধান লাভ করে। মহাকালব হইতে তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের নূর লাভ করিয়া ছালেক "লা ফায়েলা ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ভিন্ন অন্য কেহই কার্যের প্রকৃত কর্তা নাই, এই ধারণা অর্জন করে। এই মাকামে রাসূলে করীম (সঃ) এর অস্তিত্বে বিলুপ্ত ছালেকের রূহের উপর নূর এতই প্রবল বেগে পড়িতে থাকে যে, ছালেক দেখিতে পায় ছয় বা দশ দিক হইতে নূরের তুফান বেগে প্রবাহিত হইয়া সমগ্র সৃষ্টিকে ঢাকিয়া ফেলিয়াছে। আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরের প্লাবনে মুরীদের ৭০ হাজার লতিফা বিশিষ্ট লতিফায়ে কালেবসহ সকল লতিফা জারী হইয়া যায়। মুরীদ তখন নিজেকে ও সমগ্র সৃষ্টি জগৎকে আল্লাহতায়ালার নূরের মধ্যে নিমজ্জিত দেখিতে পায়। মুরীদ তখন নূরের সাগরে এমনই তন্ময় হইয়া থাকে যে, দুনিয়ার দিকে, পোষাকের দিকে, খাওয়া-দাওয়ার দিকে তখন আর খেয়াল থাকে না। মুরীদ তখন নূর ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পায় না। সমুদ্রগর্ভে যেমন শৈবাল, পাহাড়, পর্বত বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দর্শকের চোখে পানি বিশিষ্ট সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। ঐ স্তরে মুরীদ সমগ্র সৃষ্টিকে নূরের মধ্যে বিলীন দেখিতে পায়। 'আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতে ওয়াল আরদ' অর্থাৎ- "আল্লাহতায়ালা আসমান ও জমিনের নূর" ও "অহুয়া মায়াকুম আয়নামা কুনতুম" অর্থাৎ 'তিনি তোমাদের সংগে আছেন, তোমরা যেখানেই থাক' ছালেক এই সত্য তখন
উপলব্ধি করিতে পারে। ছালেক তখন কলেমা শরীফের হকিকত সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করিতে পারে। এই মাকামে আসিলে মুরীদের অবস্থা কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হওয়ার কারণ থাকে। আল্লাহতায়ালার নূরের জেল্লী দর্শন তখন ছালেকের নেশা হইয়া দাঁড়ায়, নিজের খাওয়া-দাওয়া, কাপড় চোপড়ের হাল ঠিক থাকে না।
আমার দয়াল পীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব এই দায়েরাতে ছবক দিবার সময়ে আমাকে বলিয়াছিলেন, "বাবা, এই দায়েরাতে আসিলে কিছুটা মতিভ্রম হয়। এমন কি নিজের খাওয়া-দাওয়া, কাপড় চোপড়ের দিকেও খেয়াল থাকে না। আমি আল্লাহপাকের নিকট দু'আ করি, এই মাকামে ফয়েজ হাসিল করিতে তোমার যেন কোন অসুবিধা না হয়।" নিজেকে আল্লাহতায়ালার নূর সমুদ্রে নিমজ্জিত দেখিয়া এই মাকামেই হযরত মনসুর হাল্লাজ বলিয়াছেন, "আনাল হক" অর্থাৎ আমি সত্য। মূলতঃ আল্লাহতায়ালার নূর হইতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিতে না পারিয়া তিনি 'আনাল হক' বলিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
বিজ্ঞাপন
কালব ও রূহের যোগাযোগের মাধ্যমে এই স্তরে সমগ্র সৃষ্টি জগতের জ্ঞান ও মর্তবা ছালেক পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুহ দ্বারা লাভকরে। এই স্তরে ছালেকের কালবে তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল, তাজাল্লীয়াতে জাত ও তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূর আসে তাহা দ্বারা ছালেক ঘরে বসিয়া আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, সাত তলা আসমান, সাত তলা জমিনের নীচে তাহাতাস সারা পর্যন্ত দেখিতে পায়। তখন তাহার নিকট সময় ও স্থানের দুরত্ব থাকে না। সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূরের মাধ্যমে মহাকালব হইতে সমগ্র সৃষ্টি জগতের জ্ঞান তাহার কালবে আসিয়া জমা হয়। তখন ছালেক বা সাধক ত্রিকাল বা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। পাক কুরআনের বাণী-
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْء هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
অর্থাৎ-"তাঁহার (আল্লাহর) তুল্য কোন বস্তুই নাই এবং তিনি প্রকৃত শ্রবনকারী ও দর্শক।" (সূরা শুরা: ১১) এই আয়াতপাকের জ্ঞানও ছালেক যথাযথ অনুভব করিতে পারে। ছালেকের নাফস বা দেহগত প্রবৃত্তি তখন শান্তি প্রাপ্ত হয়। ইহাকে নাফসে মোৎমাইন্নার স্তর বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
বেলায়েতে কোবরায় ফানাঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফরমান, এই দায়েরাতে না আসিলে কোর্বে এলাহী লাভ হয় না। এই দায়েরাতে আসিলেই কেবল ছালেক আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের আসলের সহিত পরিচিত হয়। ইহার পূর্বে ছালেক যাহা লাভকরে, তাহা হইল গুণের প্রতিবিম্ব। আল্লাহপাক ফরমান, তিনটি জগৎ পার হইয়া আমার আকরাবিয়াতের মাকামে বা প্রেমের সিংহদ্বারে আস। এই তিনটি মাকাম হইল জড় জগৎ, নূরের জগৎ ও সিফাতের জগৎ। এই আকরাবিয়াতের মাকামই আল্লাহতায়ালার প্রেমের সিংহদ্বার, এই মাকামে আল্লাহতায়ালার মারেফাতের সহিত মুরীদ পরিচিত হইতে পারে। বেলায়েতে কোবরায় সাড়ে তিনটি মাকাম রহিয়াছে। যথাঃ
আকরাবিয়াত বা আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের সমষ্টির স্থান।
বিজ্ঞাপন
মহব্বতে আউয়াল-নাম, গুণ ও শানের আসলের স্থান।
মহব্বতে ছানী-আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের আসলের আসল স্থান।
এবং অর্ধ দায়েরা কাওছ-আল্লাহপাকের নাম, গুণ ও শানের আসলের মূলের মূল স্থান। বাকী অর্ধেক আল্লাহপাকের জাতের স্থান, যাহা জাত মোজাররাদা।
বিজ্ঞাপন
এই আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী ও কাওছ অতিক্রম করিতে পারিলে মুরীদ সাধারণ অর্থে মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহপাকের জাতের সহিত ফানা প্রাপ্ত হইতে পারে। তবে এই স্তরে আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত সান্নিধ্য সুনির্দিষ্ট ভাবে হইবে না। হযরত গউসপাক ফরমান, এই মাকামে যে সাধক উন্নীত হন, আল্লাহপাক তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি তোমাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করিয়া লইয়াছি।"
বেলায়েতে কোবরার মাকামে মুরীদ আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহে আত্মিক ভ্রমণ করে যাহাকে ছায়েরে ফিল্লাহ বলে। বেলায়েতে ছোগরায় যে ছায়ের হয় তাহা হইল আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহের প্রতিবিম্বের মধ্যে ছায়ের। বেলায়েতে কোবরায় গুণাবলীর ভিতরে ভ্রমণ করিবার সময়ে ছালেক অনুভব করিবে যে আল্লাহপাকের পবিত্র জাতপাক ছালেকের প্রতি তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে বিস্তারিত "নাহ্নু আকরাবো ইলাইহে মিন হাবলিল ওয়ারিদ" অর্থাৎ 'আমি তোমাদের জানরগ হইতেও নিকটবর্তী'-আল্লাহপাকের এই উক্তির মর্ম ছালেক তখন অনুভব করিতে পারে। ছালেক সর্ব শরীরে তখন আল্লাহপাকের নূরের স্রোত পতন অনুভব করিতে পারে, শুধুই তাহা নহে সমগ্র সৃষ্টিই যে আল্লাহতায়ালার জাত পাকের মধ্যে নিমজ্জিত, মুরীদ তাহা বুঝিতে পারে। বেলায়েতে ছোগরার মাকামেও ছালেক বুঝিতে পারে যে আল্লাহতায়ালার জাতপাক সমগ্র সৃষ্টির রেণুতে রেণুতে বিস্তারিত, তবে তাহা সে অনুভব করে আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরের দ্বারা। এই স্তরে ছালেক ইহা প্রত্যক্ষভাবে বুঝিতে পারে।
মহব্বতে আউয়ালের মাকামে যাইয়া আল্লাহতায়ালার সহিত নৈকট্য এতই বৃদ্ধি পায় যে, ছালেক আল্লাহতায়ালার জাতের সমুদ্রে বিলীন হইয়া যায়। তখন নূর পতন বন্ধ হইয়া যায়। "আল্লাহর ভেদ মানুষ, মানুষের ভেদ আল্লাহ'-এই কথার মারেফাত তখন তাহার নিকট পরিস্কার হয়। তবে এখানেও উল্লেখযোগ্য যে, মহব্বতে আউয়ালের দায়েরাতে যে ঘনিষ্ঠতা তাহার চেয়েও নিবিড় নৈকট্যের সংবাদ রহিয়াছে তাইনে আউয়ালের মধ্যে। তাহার উপরে আর উরুজ সম্ভব হয় না। আল্লাহতায়ালার সহিত ইহার চেয়েও আর ঘনিষ্ট নিবিড় সান্নিধ্য মাটির দেহের জন্য সম্ভব হয় না।
যাই হোক, আকরাবিয়াতের মাকামে নবী করীম (সঃ) এর রূহ মোবারকের সহিত পীরের রূহে বিলুপ্ত মুরীদের রূহ বিলীন হইয়া একাকার হইয়া যায়। তখন নদীর স্রোতের মধ্যে কোনো কিছু পতিত হইলে তাহা যেমন স্রোতের ধাক্কায় সমুদ্রের দিকে যায়; তেমনি রাসূলে করীম (সঃ), মুর্শিদে কামেল ও মুরীদ একই সাথে আল্লাহতায়ালার জাত পাকে ফানা হইয়া যায়। মুরীদের চোখে তখন আর রাসূলে করীম (সঃ) এর তাছাউর, পীরে কামেলের তাছাউর কিছুই দেখা যায় না। শুধু আল্লাহই আল্লাহ দৃষ্ট হয়। অর্থাৎ আল্লাহর সহিত মুরীদের ফানা প্রাপ্ত হয়। তবে এই ফানাও প্রকৃত ফানা নয়। এই স্তরে আসিয়া রাসূলে করীম (সঃ), পীর ও মুরীদ একই সাথে আল্লাহতায়ালার প্রেমের সূধা পান করেন। আল্লাহতায়ালার সহিত প্রকৃত ফানা লাভ হয় কাওছের মাকামে। তখন মুরীদ আল্লাহপাকের জাত মোজাররাদার সহিত ওজুদ মাওহুব লাহু বা খোদাপ্রদত্ত শরীর দ্বারা পরিচিত হয়।
মহব্বতে আউয়ালের স্তর হইতে মুরীদ যাহা দেখে তাহা হইল মুরীদের আত্মার কায়া বা রূহে বেমেছালীর ছুরাত যাহা পূর্বেই রাসূলে করীম (সঃ) ও আপন পীরের রূহে বেমেছালীর সহিত ফানা প্রাপ্ত থাকে। এই রূহে বেমেছালীর ছুরাতই সৃষ্টির সময়ে আল্লাহপাক মানুষের জন্য এরাদা করিয়াছিলেন। সেই ছুরাতই তখন আল্লাহপাকের সহিত কাওছের মাকামে যাইয়া ফানা লাভ করে। মুরীদ তাহা মোরাকাবায় অনুভব করে। এই স্তরে মোরাকাবা করিতে যাইয়া ছালেকের উপর অতিশয় সূক্ষ্ম, তেজস্কর ও আনন্দদায়ক নূর পতন হয়। এই নূরের ফয়েজান এত অধিক যে, পূর্বের সকল নূর পতনের ফয়েজান তাহার নিকট অতি সাধারণ ও নগন্য বলিয়া বোধ হয়। তবে এই ফয়েজান বেলায়েতে ছোগরার মত নেশাযুক্ত নয়। এই মাকামের মোরাকাবায় ছোগরার মাকামে যে বুদ্ধি বৈকল্য দেখা যায়, তাহা কাটিয়া যায়, তাহার বুদ্ধি ফিরিয়া আসে।
কাওছের মাকামে আল্লাহতায়ালার এরাদাস্থ ছালেকের কায়া বিদ্যুতের বেগে আল্লাহতায়ালার জাতে লুপ্ত হয়। এই মাকামে বান্দার সহিত প্রভুর মিলন এমনই নিবিড় ও নিকটতর হয় যে, তখন আর কোনো নজুল বা নূর পতন থাকে না। এক প্রগাঢ় মিলন অনুভূতি ছালেকের অন্তরাত্মা ভরিয়া দেয়। যদিও ছালেকের এরাদাস্থ আত্মা এই মাকামে আল্লাহপাকের জাতে লুপ্ত হয়, তবুও ছালেকের মধ্যে এই চৈতন্য থাকে যে সে সৃষ্টির অন্তর্গত। এই সময় নূর দৃষ্টি গোচর না হইলেও নূরের ঊর্ধ্বগমন বা অধঃগমনের খেয়াল ছালেকের থাকে। উহাই প্রকৃত জাত আহাদিয়াত। এই মাকামে ছালেক নিজের শরীরের মতন একটি কায়া আল্লাহতায়ালার নূরে নিমগ্ন দেখে, ঐ কায়াকে নিজের শরীরের মতন মালুম হইয়া থাকে। ঐ ওজুদ বা শরীরকে 'ওজুদ মাওহুব লাহু' বা খোদাপ্রদত্ত শরীর বলে। ঐ শরীরের গতি বিদ্যুতের গতির চেয়ে বহু গুণ বেশী।
হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব এই মাকামের বর্ণনা দিতে গিয়া আপন পুত্রের উদ্দেশ্যে বলিতেছেন, "এই মাকামে তুমি যখন পৌছাইবে, তখন রোজে আজল বা আদি সৃষ্টি দিবসের বায়ু প্রবাহ তোমার উপর জারী দেখিবে। অর্থাৎ তুমি আল্লাহতায়ালার রংগে পুরাপুরি রংগীন হইয়া যাইবে। সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর তোমার তাছাররফ' বিস্তারিত হইবে। ছালেকের আমিত্ব বা হামচুনি দিগার নিস্তের মনোভাব দুরীভূত হইবে। আর 'ওজুদ মাওহুব লাহু' দ্বারা এলমে আজলীতে তোমার যাহা প্রাপ্য তাহা লাভ করিবে।" এই স্তরে ছালেকের কামনা বাসনা বিশুদ্ধ হইয়া যাইবে। কালব সদা সর্বদা আল্লাহতায়ালার সহিত থাকিবে।
কামালাতে নবুয়তঃ
কামালাতে নবুয়ত ও তৎপূর্ববর্তী বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে আসিয়া এসমোজ জাহের ও এছমোল বাতেন অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার নাম সমূহের ও গুণ মিশ্রিত নাম সমূহের নূরের সহিত ছালেক পরিচিত হয়। এই নূর দ্বারা ছালেকের আগুন, পানি ও বাতাস লতিফা পরিস্কার হইয়া যায়। কামালাতে নবুয়তে আসিয়া আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা ছালেকের দেহের মাটীর অংশও পবিত্র হইয়া যায়। তখন সাধকের সর্ব দেহ আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা প্রাপ্ত হয়।
আল্লাহতায়ালা মাটীর দেহধারী সৃষ্ট জীব মানুষকে নবুয়তের বা হেদায়েতের সম্মান প্রদান করিয়াছেন। এই মাকামে আসিলে যেহেতু সাধকের সর্ব দেহ আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা প্রাপ্ত হয়, তাই এই সাধক সর্ব প্রকার গোনাহ হইতে পাক হন, তাই এই স্তরের ও তঊর্ধ্ব মাকামের সাধকগণই কেবল হেদায়েতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।
সাধক এই স্তরে আসিলে সর্ব সময় আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়ে দায়েমী জাতি লাভ করিতে থাকেন। আল্লাহতায়ালার জাতি ফয়েজ অতিশয় সূক্ষ্ম হইবার কারণে ছালেক ইহা প্রথমে অবলোকন করিতে পারে না। সাধক এই নূর অবলোকন ও ধারণ করিতে অভ্যস্ত হইলে নিজেকে "ফাকানা কাবা কাওছাইনে আও আদনা"-এই মাকামে অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাতের ইতেবারের নিকটতম সান্নিধ্যে দেখিতে পাইবে। এই স্তরের সাধকগণের সব দেহ পাক হওয়ায় তাঁহারা সকল সময়েই আল্লাহপাকের এলহাম দ্বারা পরিচালিত হন।
কামালাতে নবুয়ত ও তদ্ঊর্ধ্ব মাকামের সাধকগণ আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ করিবার ফলে আল্লাহতায়ালার এতই নিকটবর্তী হন যে, আল্লাহতায়ালা সেই অবস্থা প্রাপ্ত সাধকদের সম্পর্কে বলেন,
"নফল ইবাদত করিতে করিতে বান্দা আমার এতই নৈকট্য লাভ করে যে তাহাকে আমি বন্ধু বলিয়া গ্রহণ করি; তখন আমি তাহার হস্ত হই যদ্বারা সে ধরে, চক্ষু হই যদ্বারা সে দেখে, তাহার কর্ণ হই যদ্বারা সে শ্রবণ করে ইত্যাদি। (হাদীসে কুদসী) ঐ স্তরে পৌছাইলে সাধক, "আল্লাহর ভেদ মানুষ, মানুষের ভেদ আল্লাহ"-এই হাদীস শরীফের পূর্ণ তাৎপর্য অনুভব করিতে পারে।
এতক্ষণ ফানার তিনটি স্তর সম্পর্কে আলোচিত হইল। এই আলোচনার মূল কথা হইল মানুষ কোথা হইতে এই পৃথিবীতে আসিয়াছে, কোথায় তাহার গন্তব্য এবং গন্তব্যে যাইবার পথে বিভিন্ন স্তর সমূহ কি কি ও সেই স্তরে গন্তব্যের যাত্রী কি অনুভূতি লাভ করেন ও অন্তর্চোখে কি অবলোকন করেন তাহা।
মানুষ আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে এই পৃথিবীতে আসিয়াছে। মানুষ এই পৃথিবীতে থাকিয়াই আল্লাহতায়ালার সেই নৈকট্য লাভ করিতে পারে, যে নৈকট্য আদি সৃষ্টির প্রথম দিনেই মানুষ লাভ করিয়াছিল। ঐ স্তরই পৃথিবী হইতে মানুষের গন্তব্য। তাহাই মানুষের প্রকৃত ও স্থায়ী ঘর-বাড়ী। সেই উৎপত্তি স্থলে পৌঁছানোতেই মানব জীবনের স্বার্থকতা, এই গুণ যখন মানুষ পৃথিবীতে বসিয়া লাভ করে তখনই মানুষ হয় আল্লাহতায়ালার খলিফা
উৎপত্তি স্থলে ফিরিয়া যাইবার জন্য মানুষের হৃদয়ের যে আকুতি তাহা হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মসনবী গ্রন্থে বাশের বাঁশীর রূপক কাহিনীতে তুলিয়া ধরিয়াছেন। বাঁশের বাশীর যে সুর তাহা তাহার উৎপত্তি স্থল বাঁশ বনে ফিরিয়া যাইবারই আকুতি; যাহার দেলের কান আছে, তিনি তাহা শুনিতে পান। তেমনি সমুদ্রের পানি বাষ্প হইয়া উপরে উঠে। তাহার পর শৈত্য সংষ্পর্শে মেঘ হয়। সেই মেঘই বৃষ্টি হইয়া পাহাড় প্রান্তর নদীতে পড়ে অথবা বরফ হইয়া পর্বত শীর্ষে অবস্থান করে। অতঃপর বরফ গলা ঝর্ণা ও বৃষ্টির পানি মিশিয়া নদী রূপ লাভ করিয়া একুল ভাংগিয়া ওকুল গড়িয়া কুলু কুলু রবে আর্তনাদ করিতে করিতে তাহা সাগরে মেশে। ঝর্ণাও নদী রূপে সাগরে পতিত হইয়া তাহার উৎপত্তি স্থলের সহিত মেশে বা ফানা লাভ করে। এই ভাবে দুনিয়াতে বিভিন্ন নিদর্শন দ্বারা আল্লাহ তাহার বান্দা দিগকে উৎপত্তি স্থলের সহিত মিশিতে বা ফানা হইতে শিক্ষা দিতেছেন।
আল্লাহতায়ালা মানুষের অস্তিত্ব প্রথমে কল্পনা করিয়াছিলেন আপন প্রেম ও মহিমা প্রকাশের জন্য। এই জন্য তাহার কল্পনায় তিনি মানুষ সম্পর্কে প্রথমে তাহার গুণাবলীর কথা আনিয়াছিলেন যাহা আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি পরিকল্পনার গুণ ও নকশা নমুনার জগত। ইহার পর মানুষের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের সম্মিলনের জগৎ। তাহার পর আদমের দেহে আত্মা ও রূহ প্রবেশের জগৎ এবং কুন আদেশ দ্বারা সৃষ্টি জগত প্রকাশিত হইবার স্তর। ইহার পরে আলমে আরওয়াহ বা আত্মার জগত যে স্থানে নূরে মুহাম্মদী সৃষ্টিকে ধারণ করে, সেই স্তর হইতে সৃষ্টি জগতে মানুষ তাহার দেহ লইয়া বিদ্যমান হয়। আল্লাহতায়ালা বিশ্ব জগৎ সৃষ্টির দুইটি উদ্দেশ্য ঘোষণা করিয়াছেন। যথাঃ এক, আপন প্রেম প্রকাশ ও দুই, নিজেকে প্রকাশ করা। মানুষই তাহার প্রেমের ধারক ও প্রকাশ স্থল। ইহা মাটীর মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার এক বিশেষ রহমত। আল্লাহতায়ালা তাহার প্রেম ধারণ করিবার ও প্রকাশ স্থল হইবার যে সকল পূর্ণ গুণাবলী কল্পনা করিয়াছিলেন, তাহা দ্বারাই তিনি মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন।
আল্লাহতায়ালা ঐ গুণাবলী ও প্রেম প্রকাশের পথে তাহার নিজস্ব যে গুণের জগৎ মানুষকে ছায়ের করান তাহা হইল আকরাবিয়াতের স্তর। এই গুণাগুণের পূর্ণতা প্রাপ্তির স্তর বা সম্পূর্ণ আয়ত্বে আনিবার, বিশুদ্ধতা অর্জন করিবার স্তর হইল কামালাতে নবুয়ত। ঐ সকল গুণাবলী অর্জন করিবার প্রথম শর্ত হইল নিজেকে পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত করা। হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মসনবী শরীফে বলেন, "এমন ভাবে নিজেকে খালি হইতে হইবে যে, ছালেকের নিজস্ব বা পার্থিব কোন ধারণা, চিন্তা, গুণ, জ্ঞান ও পার্থিব সম্পর্ক থাকিবে না। উপমা দ্বারা তিনি বোঝাইয়াছেন, আরবী আলিফ অক্ষর যেমন খালি তেমন খালি হইতে হইবে। ইহার সহিত অন্যান্য অক্ষরের বড় অমিল হইল অন্য অক্ষরের মত ইহার কোন নোকতা নাই, ইহার গায়ে অন্যান্য অক্ষরের মত কোন প্যাচ মোচড়ও নাই। অর্থাৎ ইহা সকলের সংগে থাকিয়াও নাই। মানুষ যখন সকলের সংগে সমাজে থাকিয়াও কোনো কিছুরই আকর্ষণ বোধ করে না বা পার্থিব সকল আকর্ষণ, জ্ঞান ও মহব্বত হইতে মুক্ত হয়, তখনই তাহার আত্মা শান্তি প্রাপ্ত হয়, তখন সে আলমে আরওয়াহ স্তরের গুণ ফিরিয়া পায়, তখন তাহার অবস্থা হয় মাতৃগর্ভে আত্মার সহিত দেহ সম্মিলনের যে অবস্থা সেই অবস্থা।
সর্ব নিম্ন স্তর হইল আলমে খালকের স্তর যে স্তরে মানুষ পার্থিব আকর্ষণ, মহব্বত ও জ্ঞানে পরিপূর্ণ থাকে। আদমের যে ছুরাত বা গুণ আল্লাহতায়ালার কল্পনা করিয়াছিলেন তাহা ছিল নিরাকার। সেই নিরাকার গুণকে প্রকাশ করিবার জন্যই আদমের এই আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের শরীর। আগুণ, পানি, মাটি ও বাতাস আলমে খালক অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের উপাদান। এই সকল উপাদানে সৃষ্টিজগতের দোষ-ত্রুটি রহিয়াছে। মূল গন্তব্যে যাইবার জন্য তাই আলমে খালকের দোষসমূহ পরিত্যাগ করিয়া আল্লাহতায়ালার নৈকট্যের উদ্দেশ্যে পথ যাত্রা করিতে হয়। সৃষ্টি জগতের দোষসমূহ পরিত্যাগ করিবার পর যাহা মানুষের মধ্যে থাকে তাহা হইল আল্লাহতায়ালা সিফাত সমূহের সমষ্টিগত কামালতের প্রতিবিম্ব। এই প্রতিবিম্ব সমূহ সিফাতে হাকীকীস্থিত নিখুঁত অবস্থার প্রতিবিম্ব। এই রূপ অবস্থায় প্রতিবিম্বসহ অজুদ আকৃতি ধারী মানুষ বা দুনিয়ার আকর্ষণ ও মহব্বত বিমুক্ত মানুষ বস্তুতঃ পার্থিব আকর্ষণধারী মানুষের অস্তিত্বের মধ্যেই বিরাজমান ছিল। আদামত বা সৃষ্টি জগতের দোষ, পার্থিব প্রবণতা ও রিপুসমূহ ছিল তাহার বাহিরের আবরণ, এই স্তরে সেই বাহ্যিক জগতের বাহিরের আবরণ অপসারিত হয়। এই স্তরে নাফস আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব পূর্ণভাবে মানিয়া লয়। আল্লাহতায়ালা তাহাদের নৈকট্য দান করেন। তাহাদের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ বলেন,
يَايَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلى رَبِّكَ رَاضِيَةً مَرْضِيَّة
অর্থাৎ-“হে শান্তি প্রাপ্ত আত্মা! তোমার প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন কর, সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন অবস্থায়।" (সূরা ফাজরঃ ২৭-২৮)
আল্লাহতায়ালাই তাহাদের পথ দেখাইয়া থাকেন। ইহা আকরাবিয়াতের মাকাম। এই স্তরে ছালেককে আল্লাহতায়ালা তাহার সান্নিধ্য আরও নিবিড় করিয়া দান করেন। আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান ও শয়ুনাতের জেল্লীর বা প্রতিবিম্বের বদলে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের আসল ও আসলের নূর তখন ছালেক ছায়েরে এসমোজ জাহের ও ছায়েরে এসমোল বাতেনের মাধ্যমে লাভ করিতে থাকে। আল্লাহতায়ালার জাতপাক যেমন সৃষ্টির প্রতি তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বিস্তারিত, তেমনি ছালেকের হৃদয় গ্রন্থি বা জানরগ হইতেও নিকটে; এমনকি ছালেকের দেহের প্রতি অণু পরমাণুতে বিস্তারিত-ছালেক তাহা অনুভব করে।
ছালেক তখন তাহার নিজ সত্ত্বার উপর "আমি" শব্দের প্রয়োগ করিতে ভয় পায়। আল্লাহতায়ালা যে সর্ববিস্তৃত বা সর্বত্র বিরাজিত ছালেক তাহা অনুভব করিতে পারে। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ ও মহব্বত দ্বারা আকর্ষণ অনুভব করিয়া এই স্তরে ছালেক আরও অগ্রসর হইতে থাকে। তাই তাহাদের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে,
يُرِيدُونَ وَجْهَهُ
অর্থাৎ-'(নেকবান্দাগণ) আল্লাহতায়ালার জাত পাককে অন্বেষণ করেন।' (সূরা কাহাফঃ ২৮) এই স্তরে ছালেকের যে অস্তিত্ব তাহা হইল আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের কামালতের প্রকাশ স্থল।
এই স্তরে পৌঁছাইবার শর্ত হইল আল্লাহতায়ালাকে প্রাণাধিক ভালবাসা, যাহা মহব্বতে জাতি। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, ঐ রূপ মহব্বতে জাতি ভিন্ন ঐ স্তরে উন্নীত হওয়া যায় না। মহব্বতে জাতী বা প্রকৃত প্রেমই ফানার চিহ্ন। যে পর্যন্ত না অন্য সকল বস্তু হইতে অনুভূতি ও জ্ঞান মুক্ত হয়, সে পর্যন্ত ফানা সিদ্ধ হয় না। তাই সকল বাহ্যিক এলেমও দূর করিতে হয়।
এই স্তরে আসিয়া নবী করীম (সঃ) এর রূহ মোবারক, মুর্শিদে কামেলের রূহ মোবারক ও মুরীদের রূহ একাকার হইয়া যায় এবং আল্লাহপাকের জাত পাকের সহিত ফানা প্রাপ্ত হয়। তাই ছালেক তাহার আমি সত্ত্বা যে কেবলমাত্র পার্থিব দৈহিক সত্ত্বাই নয়, সে চির হায়াত প্রাপ্ত এক সত্ত্বা, তাহা সে বুঝিতে পারে। আল্লাহপাক এই স্তরে উন্নীত সাধকদের উদ্দেশ্যই বলিয়াছেন, তাহারা হায়াতে আবাদী' লাভ করেন। তাহাদের আর মৃত্যু নাই, লয় নাই বা ক্ষয় নাই। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এই স্তরের সাধকদের উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا يَمُوْتُ
অর্থাৎ-সাবধান! নিশ্চয়ই ওলী আল্লাহগণের মৃত্যু নাই।
ইহা মানুষের জন্য এক শ্রেষ্ঠ নেয়ামত ও সুসংবাদ। ছালেক যদি এই স্তরে সব দিক বিবেচনা করিয়া অগ্রসর হন, তাহা হইলে এই আসমা ও সিফাত বা নাম বা গুণ রাজ্য সমূহের মধ্য দিয়া এমন এক সুমহান স্থানে পৌঁছাইয়া যান যে স্থানে সিফাত সমূহের কামালাতও আর প্রকাশ পায় না। বহু দিন এই রূপ চলার পরে কামেল আরেফকে শেষ ফানার পর শেষ ও পূর্ণ 'বাকা' অবস্থা দান করা হয়। তাহাকে তখন আল্লাহতায়ালার জাত মোকাদ্দাস বা পবিত্র জাতের সব চেয়ে নিগূঢ় অবস্থার সহিত পরিচিতি করানো হয়। পবিত্র জাতের এই সর্বোচ্চ নিদর্শন কোনো রকমেই বোঝা যায় না। ঐ কামেল ব্যক্তির সহিত পূর্বে সিফাতের যে সম্পর্ক ছিল সেই সম্পর্ক ও পূর্বের অবস্থা এই শেষের অবস্থার সহিত একত্রিত হইয়া এক নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়। ইহাই হকিকতে আহমদীর স্তর। এই স্তরে পৌঁছাইলে মানবীয় সমস্ত অবস্থা, গুণ ও স্বভাব ধ্বংস হইয়া যাইয়া এক অপূর্ব অবস্থা আসিয়া যায়। এখানে আরেফ যে সম্পদ প্রাপ্ত হন, তাহার সহিত আল্লাহতায়ালার তাজাল্লীয়ে দায়েমী ও আসমা ও সিফাতের নূর সমূহ একই সাথে সাধকের সহিত সংমিশ্রন হইয়া যায়। তখন সেই সাধক সর্বদা আল্লাহতায়ালার জাতপাক হইতে দায়েমী বা সর্বক্ষণিক প্রবাহিত নূরের দ্বারা যেমন আল্লাহতায়রার জাত পাকের সহিত নিবিড় নৈকট্যে আবদ্ধ থাকেন; তেমনি ওজুদ মাওহুব লাহুর দ্বারা আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের সহিতও সন্নিবেশিত থাকেন। আর আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের নূর দ্বারা যেহেতু সকল কিছুরই সৃষ্টি তাই তিনি সকল বস্তু ও স্থানের সহিত ওজুদ মাওহুব লাহুর নূর দ্বারা সংশ্লিষ্ট থাকেন। তাই সকল কিছুর জ্ঞান ও সকল মানুষের তথা সমগ্র সৃষ্টির অনুভূতি তিনি জানিতে পারেন। এমন অবস্থা কামালাতে নবুয়ত ও তঊর্ধ্বের মাকামসমূহে অর্জিত হয়। এই অবস্থায় সাধক আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিতে পান। এই স্তর ফেরেশতাগণের স্তর হইতেও উচ্চ। এই অবস্থা প্রাপ্ত সাধককেই আল্লাহতায়ালা খাস করিয়া লইয়া সমগ্র মানব জাতিকে হেদায়েত করিবার অসিলা করিয়া দেন। এই রূপ সাধকদের সম্বন্ধেই আল্লাহ বলেন,
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা প্রেরণ করিব।' (সূরা বাকারাহঃ ৩০)
তাহাদেরকেই জামানার মোরাদ ফকীর বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। আল্লাহতায়ালার জাত আকদাসের কামালাত ও জাত আকদাসের সহিত সার্বক্ষণিক নৈকট্য তখন ঐ কামেল ব্যক্তি লাভ করেন। তিনিই হন জামানার মোর্শেদে কামেল বা হেদায়েতের জন্য আল্লাহতায়ালার মনোনীত খলীফা যিনি সকল সময়েই আল্লাহতায়ালার জাতপাক হইতে প্রবাহিত
দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা সকল স্খলন হইতে সুরক্ষিত থাকেন।
এই অতি উচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া বা আকরাবিয়াত বা মা'ইয়াতের মাকামে আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ করা-যাহাই হউক না কেন, তাহা একমাত্র সম্ভব জামানার মোর্শেদে মোকাম্মেল দ্বারা। কারণ তিনিই আল্লাহতায়ালার মনোনীত হেদায়েতকারী। অন্য কাহারও দ্বারা তাই হেদায়েত সম্ভব হয় না। আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত পরিচয় করানোও সম্ভব হয় না। আর আল্লাহতায়ালার জাত পাকের সহিত পরিচয় লাভ না হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব জ্ঞান অর্জন সম্ভব হয় না। অর্থাৎ মানব জন্ম বৃথা হয়। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) তদীয় মসনবী শরীফে বিভিন্ন রূপক গল্পের মাধ্যমে প্রকৃত মোর্শেদে মোকাম্মেলের শিক্ষা ও সাহচর্যের গুণাগুণ বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাত শরীফে ও হযরত গউসপাক (রাঃ) ছাহেব তদীয় বিভিন্ন কিতাবে প্রকৃত মোর্শেদে মোকাম্মেল বা আল্লাহতায়ালার মনোনীত হেদায়েতকারীর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
মানুষের নাফস মানবদেহে খোদাদ্রোহী ফেরাউন। হযরত মুসা (আঃ) ফেরাউনকে সাগরের পানিতে ডুবাইয়া মারিয়াছিলেন, কুরআন মজীদের এই ঐতিহাসিক ঘটনার এক রূপক গল্প হিসেবে হযরত রূমী (রঃ) ছাহেব খরগোশ ও সিংহের গল্প তদীয় মসনবী নামক কিতাবে বর্ণনা করিয়াছেন। ঐ গল্পের বর্ণনায় দেখা যায় এক জ্ঞানী খরগোশের জ্ঞান ও বুদ্ধি দ্বারা জংগলের সকল পশুর উপর অত্যাচারকারী সিংহকেও কুপে ডুবাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। খোদাদ্রোহী ফেরাউনকে যেমন আল্লাহতায়ালার পয়গম্বর বা নবী হযরত মুসা (আঃ) হত্যা করিয়াছিলেন, অত্যাচারী সিংহকে যেমন জ্ঞানী খরগোশ পানিতে ডুবাইয়া মারিয়াছিল, তেমনি মানব দেহের ফেরাউন নাফসকেও ধ্বংস করিয়া দেন মোর্শেদে কামেল।
মোর্শেদে কামেল কিভাবে মানুষের অন্তরের খবর রাখেন?
মোর্শেদে কামেল আল্লাহর গুণে পূর্ণ গুণান্বিত হইয়া "ওজুদ মাওহুব লাহু” দ্বারা প্রতি মানুষের অন্তবের খবর জানিতে পারেন ও দুনিয়ায় কাহার কোন জিনিষের প্রতি আকর্ষণ তাহা জানিয়া থাকেন। তারপর একে একে দুনিয়ার সকল আকর্ষণ গ্রন্থি হইতে তিনি তদীয় মুরীদ সন্তানকে বিমুক্ত করিয়া আল্লাহতায়ালার গন্তব্যের পথে লইয়া আল্লাহতায়ালার জাতপাকের সহিত বিভিন্ন স্তরে ফানা লাভের উচ্চ মরতবা দান করেন।
হযরত রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন আল্লাহতায়ালার পথের জ্ঞান লাভঅর্থাৎ অন্তর চক্ষু লাভ করিতে হইলে খাটী পীর বা হেদায়েতের প্রকৃত যোগ্যতা সম্পন্ন সাধকের নিকটই গমন করিতে হইবে। কারণ তিনিই মানুষের অন্তরের রোগ নির্ণয় করিতে পারেন। মানুষের অন্তর সম্পর্কে জ্ঞাত সাধকই মানুষের অন্তর রোগ চিকিৎসা করিতে পারেন।
মানুষের অন্তর সম্পর্কে জ্ঞাত উচ্চ স্তরের সাধক ছিলেন আমার দয়াল পীর কেবল কেবলাজান হুজুর, জামানার শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দেদ, হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। তিনি যে অন্তরের খবর রাখিতেন তাহার একটি নকল তোমাদের বলিতেছি। আসাম হইতে আগত বেশ কয়েক জন জাকেরান এনায়েতপুর পাক দরবার শরীফে একদিন বসিয়া নিজেদের মধ্যে আলাপ করিতেছিলেন। তাহাদের মধ্যে একজন বলিলেন, "আমরা দীর্ঘ দিন ধরিয়া দরবার শরীফে আসা যাওয়া করিতেছি, কিন্তু হুজুর কেবলাজনের কোনো কারামতি দেখিলাম না।" তাহারা এই রূপ আলোচনা করিবার কিছু সময়ের মধ্যেই হুজুর কেবলাজান হুজরা শরীফে উপস্থিত হইলেন। যাহারা ঐ রূপ আলোচনা করিতেছিল, তাহাদের উদ্দেশ্যে পীর কেবলাজান হুজুর বলিলেন, "বাবা, তোমরা কি তোমাদের কালবের জেকের শুনিতে পাও?" তাহারা উত্তরে বলিল, জ্বী, পাই। ইহার পর পীর কেবলাজান হুজুর জিজ্ঞাসা করিলেন, "আগে কি কালবের জেকের অনুভব করিতে?" তাহারা 'না' সূচক উত্তর দিলেন। ইহার পর হুজুর কেবলাজান বলিলেন, "যদি নিজের দেহের মধ্যে তোমাদের মৃত কালব জিন্দা হইয়া জেকের করিতে দেখ, তাহার চেয়ে বড় কি কারামতি আর দেখিতে চাও?" পীর কেবলাজানের এই কথা শুনিয়া উপস্থিত সমস্ত মুরীদান চিৎকার দিয়া জজবার হাল প্রাপ্ত হইলেন-ফয়েযে বেকারার' হইয়া গেলেন।
হযরত পীর কেবলাজানের এই উক্তি ইহাই প্রমাণ করে যে, তিনি মানুষের অন্তরের খবর জানিতেন। আল্লাহু আলেমুম্ বেজাতিছ ছুদুর। আল্লাহপাক মানুষের ছিনার খবর রাখেন। যিনি তাহার পক্ষে হেদায়েতকারী, তাহাকেও তিনি সকল মানুষের ছিনার খবর জানান। আমার পীর কেবলাজান হুজুর ছিলেন জামানার জন্য ঐ দরজা প্রাপ্ত হেদায়েতকারী, যাহার সম্পর্কে আশেকগণ বলেনঃ
"এ্যয়সা ওলী না হইয়াছে
কভু আর হবে না,
জানিতে পারিবে শেষে
করলে সেই পদ ভজনা।"
তাই তোমরা যদি আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ করিবার কামনা-বাসনা রাখ, তাহা হইলে হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের মহব্বত দেলে পয়দা কর। তাহার কদমের ধুলি হইয়া যাও।







