Logo

আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৮ আগস্ট, ২০২৬, ২০:০৯
আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের আলোচনা
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ফানা ও বাকা’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন চারটি মূল নীতির উপর দন্ডায়মান। যথা-আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস।

আদবঃ-

পীরের হাতে মুরীদকে এমন ভাবে থাকিতে হয় যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। ধৌতকারীর নিকটে মুর্দা বা শবদেহের যেমন কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে না, ধৌতকারী মুর্দাকে যেমন ভাবে নাড়ায়, মুর্দা বা শবদেহ সেই ভাবেই নড়ে; তোমরা যাহারা খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, পীরের হাতে তেমনি শবদেহ বা মুর্দার মতই থাক। ইহাই আদব।

বিজ্ঞাপন

পীরের ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করিতে হয়। পীর যখন যাহা নির্দেশ দান করেন, কাল বিলম্ব না করিয়া তাহা পালন করিতে হয়। পীরকে ভক্তি শ্রদ্ধা সবচেয়ে বেশী করিতে হয়। কারণ দুনিয়ার সমস্ত ঋণ পরিশোধ করা গেলেও পীরের ঋণকে পরিশোধ করা যায় না। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলেই মুরীদের দেলের কালিমা দূর হয়, সেখানে এসমে জাত 'আল্লাহ' 'আল্লাহ' জেকের জারী হয়। পীরের দয়াতেই মানুষ তাহার চিরশত্রু, অদম্য জানোয়ার, নাফসে আম্মারাকে মজবুত শৃংখলে আবদ্ধ করিতে পারে। পীরের দয়াতেই মুরীদের দেল হইতে দুনিয়ার মহব্বত দূর হয়। হযরত হাছান বসরী (রঃ) ছাহেব বলেন, "মুহূর্তকালের জন্য দুনিয়ার প্রতি বিরাগ বা বিতৃষ্ণা হাজার বছরের রোজা-নামাজের চাইতে উত্তম।" দুনিয়াকে অবহেলা করার ক্ষমতা অর্জন পীরের দয়া ভিন্ন সম্ভব হয় না। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীতে মুরীদ শয়তানের কু-প্ররোচনার হাত হইতে বাঁচিতে পারে। পীরের দয়াতেই মুরীদ চিরস্থায়ী জীবনের সন্ধান পায়, অদৃশ্য জগত অবলোকন করে। পীরের নেকদৃষ্টিতেই মুরীদ জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত পার হইয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন করে।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় 'মাবদা ওয়া মা'আদ' নামক কিতাবে বলেন যে, "মহান খোদাতায়ালার রেযা বা সন্তুষ্টিকে পীরের রেযা বা সন্তুষ্টির পশ্চাতে রাখা হইয়াছে। যতক্ষণ না মুরীদ নিজেকে স্বীয় পীরের সন্তুষ্টির মধ্যে বিলীন করিয়া দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মহান খোদাতায়ালার রেযামন্দী বা সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয় না।

মুরীদের সবচেয়ে বড় বিপদ হইল পীরের অসন্তুষ্টি। সব রকমের ত্রুটি বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ সম্ভব। কিন্তু পীরের অসন্তুষ্টির কারণে যে ক্ষতি হয়, তাহা পূরণ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। পীরের অসন্তুষ্টি মুরীদের জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ। পীরের অসন্তুষ্টিতে মুরীদের দীনি আকিদায় ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং শরীয়তের হুকুম-আহকাম প্রতিপালনে অলসতা আসে; বাতেনী হাল বা উচ্চ মাকাম সমূহে উত্তীর্ণের কোন প্রশ্নই আসে না। পীরের অন্তরে কষ্ট দেওয়ার পরেও যদি মুরীদের মধ্যে কোন প্রকার হালের প্রভাব থাকে, তবে ইহাকে ছলনা মনে করিতে হইবে। কেননা শেষ পর্যন্ত ইহার প্রতিফল খারাপই হয় এবং তাহার পরিণতি ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই নয়।"

বিজ্ঞাপন

কাজেই খোদাপ্রাপ্তির পথে মুরীদকে সর্বদাই পীরের আদব ও সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখিতে হয়। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন যে, "বেয়াদব মারূমে গা আজ ফাজলে রাব।" অর্থাৎ বেয়াদব আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।

পীরই যেহেতু খোদাপ্রাপ্তির অছিলা, চির হায়াত প্রাপ্তির মাধ্যম, পীরের হক তাই সকলের উপরে রাখিতে হয়; পীরের প্রতি চরম আদব প্রদর্শন করিতে হয়। হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব তদীয় তাছনিফাতে বলেন,

التَّصَوُّفُ هُوَ الْأَدَبُ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-'আদব রক্ষা করার নামই তাছাউফ।' আর রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

الأَدَبُ خَيْرٌ مِّنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ

অর্থাৎ-'আদব বা শিষ্টাচার স্বর্ণ ও রৌপ্য হইতেও অধিক মূল্যবান ও শ্রেয়।' উল্লেখ্য যে, পীরের প্রতি মুরীদের আদব প্রসংগে বিস্তারিত লেখা আছে নসিহতসমূহের প্রথম খন্ড 'আদাবুল মুরীদ' নামক পুস্তকে।

বিজ্ঞাপন

বুদ্ধিঃ- খোদা প্রাপ্তির পথে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রয়োজন। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি

ছাড়া পীরের ইশারাকে বুঝা যায় না। পীরের ইশারাকে না বুঝিলে খোদাপ্রাপ্তির আশা বৃথা। মারেফাতের ভাষা ইশারাপূর্ণ। কাজেই পীরে কামেল যাহাই বলুন না কেন তাহাই ইশারাপূর্ণ থাকে। ইশারার মর্ম উপলব্ধি করিবার জন্য চাই সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রখর মেধা। আমার পীর কেবলাজান ছাহেব বলেন, "পীরের ইশারা যে বুঝে না, দীন ও দুনিয়া উভয়ই সে খোলা দিয়া খায় অর্থাৎ ইহকাল পরকাল উভয়ই বরবাদ করে।"

এক কামেল পীরের বহু সংখ্যক মুরীদান ছিল। তন্মধ্যে দুই সহোদর ভ্রাতা একত্রে উক্ত পীরের খেদমতে রত ছিল। ভ্রাতাদ্বয়ের মধ্যে ছোট ভাইয়ের প্রতি পীরের স্নেহের দৃষ্টি অন্যান্যদের চেয়ে একটু বেশীই ছিল। ইহা দৃষ্টে হিংসার বশবর্তী হইয়া বড় ভ্রাতা কিছু সংখ্যক পীরভাইকে সংগে করিয়া একদিন পীরের নিকট অভিযোগ করিল। সে বলিল যে, হুজুর তাহার ছোট ভাইকেই বেশী আদর করে, স্নেহ করে। সেদিন পীর ছাহেব অভিযোগকারীদের অভিযোগের কোন জবাব দিলেন না। পরবর্তী দিনে পীর ছাহেব, সহোদর দুই ভাইয়ের জ্যেষ্ঠকে আহবান পূর্বক বলিলেন, "বাবা, আমার উটশালার বড় উটটিকে ছাদের উপরে লইয়া যাও।” জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পীরের ইশারা না বুঝিয়া পীর ছাহেবকে বরং বলিল, "হুজুর, উট কিভাবে ছাদের উপর উঠিবে?" ইহা শ্রবণে পীর ছাহেব বলিলেন, "বাবা, তাইতো, উটতো ছাদে উঠিতে পারে না। তবে তুমি তোমার ছোট ভাইকে ডাক।" ছোট ভাই আসিলে পীর ছাহেব তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "বাবা, আমার ঐ উটটিকে তুমি সিড়ি দিয়া বিল্ডিং-এর ছাদে লইয়া যাও।” কনিষ্ঠ ভ্রাতা নির্দেশ পাওয়া মাত্র কাল বিলম্ব না করিয়া উটটিকে রশি ধরিয়া টানিয়া ছাদের উপরে নেওয়ার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু উটতো আর ছাদে উঠে না। মুরীদ উটটিকে উপরে নেওয়ার জন্য টানিতে থাকে। আর উট পিছু হটিবার চেষ্টা করে। এই টানাটানির ভিতর বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরে পীর ছাহেব সেই মুরীদকে ডাকিয়া বলিলেন, "বাবা, উট ছাদে উঠিবে না। তুমি আর চেষ্টা করিও না। তৎপর অভিযোগকারী জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমার কনিষ্ঠ ভাইকে অধিক স্নেহ বা আদর করার ইহাই কারণ।" পরবর্তীতে ভ্রাতাদ্বয়ের কনিষ্ঠ জন আল্লাহর ওলী হইলেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পীরের ইশারা না বুঝিয়া বেয়াদবী করিবার কারণে উন্মাদ হইল, ইহকাল পরকাল উভয়ই হারাইল।

বিজ্ঞাপন

মহব্বতঃ-

খোদাপ্রাপ্তির এই রাস্তায় পীরকে ভালবাসিতে হয় সবচেয়ে বেশী। নিজের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, পুত্র-পরিজন, ধন-সম্পদ, এমন কি নিজের জীবনের চেয়েও পীরকে বেশী মহব্বত করিতে হয়। পীরের মহব্বত দেলে পয়দা হইলে, আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত দেলে পয়দা হয়। আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত অর্জনের প্রধান শর্তই হইল পীরের মহব্বত অর্জন করা।

সাহসঃ-

বিজ্ঞাপন

খোদাপ্রাপ্তির পথে সাহসের একান্ত প্রয়োজন। অদম্য সাহস ব্যতীত পীরের কঠিন কঠিন আদেশ প্রতিপালন সম্ভব নয়। পীর হয়তো তোমাকে নির্দেশ দিলেন, "তুমি অমুক রাস্তা দিয়া যাও। তোমাকে বিদায় দেওয়া হইল।" তুমি রওয়ানা দিলে। কিছুদূর যাইতে না যাইতেই দেখিতে পাইলে যে রাস্তার উপর বসা আছে, বিরাটাকৃতির এক ক্ষুধার্ত বাঘ। তখন তুমি কি করিবে? পীরের নির্দেশমত তুমি যদি সেই পথ দিয়া সম্মুখপানে অগ্রসর হও, তাহা হইলে ইহা নিশ্চিত যে তুমি বাঘের আহারে পরিণত হইবে অর্থাৎ তোমাকে মরিতে হইবে। আর যদি ফেরত আস, তাহা হইলে পীরের নির্দেশকে অমান্য করা হবে। ফলে পীরের তরফ থেকে আগত পরীক্ষায় তুমি অকৃতকার্য হইবে। উদ্দিষ্ট কর্মে তুমি সফলকাম হইতে পারিবে না। এখানে প্রয়োজন সাহস, অসীম সাহসের। মৃত্যুকে নিশ্চিত জানিয়াও সেই পথে অগ্রসর হইতে হইবে। ইহাতে পীরের সন্তুষ্টি অর্জন করিতে পারিবে। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীতে পথিমধ্যেই বাঘও তোমাকে পথ ছাড়িয়া দিবে। তোমার জীবন রক্ষা পাইবে। আর পীরের সন্তুষ্টির পশ্চাতে থাকে মহান খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি। ফলে খোদাতায়ালাও তোমার উপর রাজী ও খুশী হবেন।

আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-এই চার নীতির উপর খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব অর্জন নির্ভর করে। চার নীতির মধ্যে মহব্বতের গুরুত্ব সর্বাপেক্ষা বেশী। মহব্বত দুই প্রকার-মহব্বতে সিফাতি ও মহব্বতে জাতি। প্রাথমিক পর্যায়ে মুরীদ পীরকে যে ভালবাসে তাহা মহব্বতে সিফাতি পর্যায়ের ভালবাসা। পীরের উত্তম চরিত্র, সৎগুণাবলী, অমায়িক ব্যবহার; তদুপরি নিশীথে মুরীদের ব্যাথামোচনে খোদাতায়ালার নিকট ক্রন্দন ইত্যাদি দর্শনে মুরীদ পীরকে ভালবাসে, মহব্বত করে। ইহা সিফাতি পর্যায়ের মহব্বত।

কিন্তু মহব্বতে জাতি তাহা নয়। পীরের সুনাম-সুখ্যাতি, গুণাগুণ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মধুর বা নিষ্ঠুর আচরণ কোন দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়া মুরীদ পীরকে যে মহব্বত করে, তাহাই মহব্বতে জাতি। পীরের প্রতি যে মহব্বত-তাহা যদি জাতি পর্যায়ে না পৌঁছায়, তাহা হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন মুরীদের পক্ষে সম্ভব নয়। পীরের প্রতি মহব্বত বা প্রেম জাতি পর্যায়ের হইলে খোদাপ্রাপ্তির পথের সকল কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব হয়। পীর ও মুরীদের খেলা অত্যন্ত কঠিন। মুরীদকে বিপদ সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়া পীর সাগরপারে বসিয়া থাকেন। বিপদের এক ঢেউ-এ মুরীদ তলাইয়া যায়, আর এক ঢেউ-এ ভাসিয়া উঠে। আর তদীয় পীর পারে বসিয়া ইহা অবলোকন করেন। যে মুরীদ ইহা সত্ত্বেও পীরকে ভালবাসে, সেইতো মহব্বতে জাতির অধিকারী। পীর তাহার উপর সন্তুষ্ট হইয়া তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন। ফলে মুরীদের রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিল হয় যাহা ফানা-ফিশ-শেখের প্রাথমিক পর্যায়। রাবেতা সম্পর্কে নসিহত সমূহের ২য় খন্ড 'তরিকতের পাঁচ রোকন' নামক পুস্তকে বিস্তারিত বলা হইয়াছে। রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিল হইলে মুরীদ পীরের ছুরাতে মেছালীকে সব সময়ই সম্মুখে পায়। পীরের ছুরাতে মেছালীকে যে মুরীদ ধরিতে পারে, সে না চাইতেই পীরকে সর্বদাই নিকটে পায়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই সে অবস্থান করুক না কেন, পীরকে সে তেমনি নিকটে পায় যেমন তোমরা আমার সাথে আমার হুজরায় সাক্ষাত কর। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সবসময়ই সে পীরের তাঈদ-মদদ পায়। আল্লাহ প্রাপ্তিও তাহার জন্য সহজ হয়। তরিকতের রাস্তায় প্রধানতম দুই শত্রু-শয়তান ও নাফস তাহার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। কারণ রাস্তায় প্রতি কদমে সে পীরের তাছাউর বা রাবেতা বা ছুরাতে মেছালীর মাধ্যমে নির্দেশ পায়। শয়তান বা নাফস সেই পথিককে পথচ্যুত করিবার কোন ফাঁকফোকড়ই আর খুঁজিয়া পায় না। ফলে মুরীদের দেল থেকে যেমন দুনিয়ার মহব্বত দূর হয়, তেমনি নাফস ও শয়তানের প্ররোচনা বা ফেরেব থেকেও সে রক্ষা পায়। ধীরে ধীরে মুরীদের কালবসহ অন্যান্য লতিফা জাগ্রত হয়। মুরীদের লতিফায়ে কালেবও জারী হয়। ৭০,০০০ লতিফা বিশিষ্ট লতিফায়ে কালেবের মাধ্যমে সে সদা আল্লাহর জেকের করিতে থাকে। তৎপর মুরীদ সুলতানুল আজকারের মর্যাদা প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ তেত্রিশ কোটি লতিফার সাহায্যে মহাধুমধামে সে জেকের করিতে থাকে। মুরীদের লতিফা সমূহের সহিত আল্লাহতায়ালার নূরের কানেকশনও সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

ফানার মূল তিনটি স্তরের আলোচনাঃ

পীরের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর প্রয়োগে মুরীদের রূহ তদীয় দৈহিক খাঁচা হইতে বাহির হইয়া ঊর্ধ্বদিকে গমন করে। তৎপর ফানার মূল তিনটি স্তর অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার জাতের সান্নিধ্য লাভ করে। স্তর তিনটি হইলঃ-

  • ফানা-ফিশ-শেখ।

বিজ্ঞাপন

  • ফানা-ফির-রাসূল ও

  • ফানাফিল্লাহ্।

  • ফানা-ফিশ-শেখঃ-

    বিজ্ঞাপন

    ইহা রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখের চূড়ান্ত পর্যায়। ফানা আরবী শব্দ-যাহার অর্থ বিলুপ্ত বা লয় হওয়া। ফানা-ফিশ-শেখের অর্থ আপন পীরের সত্তায় বিলুপ্ত হওয়া। ফানার জন্য মহব্বতে জাতি অত্যাবশ্যক। মহব্বতে জাতি পয়দা হইলে মুরীদ পীরের যে ছুরাতে মেছালীকে সর্বত্রই দেখিতে পায়, পীরের সেই ছুরাত বা রাবেতা তাহাকে পথ প্রদর্শন করিয়া জড় জগত পার করাইয়া নূরের জগতে পৌঁছায়। মুরীদের রূহ সিফাতে এরাদতের পর্দার নিকটে আসিয়া এরাদতের পর্দার মাধ্যমে জাত আহাদিয়াতের' ফয়েজ লাভ করে। আহাদিয়াতের ফয়েজ জাত হইতে সিফাতের পর্দা দিয়া রাসূলে পাক (সাঃ) এর দেলের যোগাযোগে পীরের দেল হইয়া মুরীদের দেলে আসে এবং দেল হইতে সমস্ত শরীরের উপর পড়ে। এই মাকামকে জাত আহাদিয়াতের মাকাম বলা হয়। যদিও এই আহাদিয়াত প্রকৃত নয়। প্রকৃত আহাদিয়াত মুরীদ শেষোক্ত মাকামে প্রাপ্ত হয়। এই জাত আহাদিয়াতের মাকামে ছালেক বা মুরীদের ফানা-ফিশ-শেখ সম্পূর্ণ রূপে সিদ্ধ হয় যাহা শুরু হইয়াছিল রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখের মাধ্যমে। এখানে আসিলে মুরীদের কালব পীরের কালবে, মুরীদের লতিফায়ে রূহ পীরের লতিফায়ে রূহে, মুরীদের লতিফায়ে ছের পীরের ছেরে মিলিত হয়। এইরূপ মুরীদের দশ লতিফাই পীরের দশ লতিফার সহিত মিলিত হয়।

    মুরীদের লতিফায়ে কালেব, পীরের লতিফায়ে কালেবের সহিত; মুরীদের ৩৩ কোটি লতিফাই পীরের ৩৩ কোটি লতিফায় বিলুপ্ত হয়। ইহা ছাড়াও মুরীদের রূহের ছয় ছুরাত-ছুরাতে অছলী, ছুরাতে মেছালী, ছুরাতে রূহানী, ছুরাতে জেছমানী, ছুরাতে জাহেরী, ছুরাতে বাতেনী পীরের ছয় ছুরাতে বিলুপ্ত হয়। মুরীদের হায়াতে ওহাদানী, হকিকতে ওহাদানী, খেয়াল খেয়ালে, নজর, বরজখ, সবই পীরের হায়াতে ওহাদানী, হকিকতে ওহাদানী, খেয়াল খেয়ালে, নজর ও বরজখের সহিত বিলুপ্ত বা ফানা হয়। মুরীদ নিজেকে সম্পূর্ণ ভুলিয়া যায়। পীরের রূহকে মুরীদ আপন রূহ মনে করে। ইহাই ফানা-ফিশ-শেখের মাকাম।

    ফানা-ফির-রাসূলঃ-

    ইহার পরে আসে ফানা-ফির-রাসূলের পর্যায়। এই অবস্থায় জাত আহাদিয়াতের ফয়েজ লইতে হইলে মাঝখানে থাকে শুধু রাসূলে-পাক (সাঃ)। এই অবস্থায় আহাদিয়াতের ফয়েজ বা নূর পবিত্র জাত হইতে রাসূলে পাক (সাঃ) এর দেল হইয়া পীরের সত্ত্বায় বিলুপ্ত মুরীদের দেলে আসিয়া পড়ে। ধীরে ধীরে নূরের পতন বৃদ্ধি পাইতে থাকে। এক পর্যায়ে নূর এত বেশী পরিমানে পড়িতে থাকে যে মুরীদ রাসূলে-পাক (সাঃ) ভিন্ন নিজের বলিয়া জানা পীরের রূহকেও ভুলিয়া যায়। ধীরে ধীরে বেলায়েতে ছোগরা বা মা'ইয়াতের মাকামে প্রবেশ করে। বেলায়েতে ছোগরা আল্লাহপাকের আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের দায়েরা। এখানে সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূর একত্রিত হইয়া নূরের এমনই এক মহাসমুদ্র তৈরী করে; যাহার কোন কুল কিনারা নাই। বেলায়েতে ছোগরার দায়েরাই ফানা-ফির-রাসূলের মাকাম। এখানে পীরের রূহ রাসূলে পাক (সাঃ) এর রূহে বিলুপ্ত হয়। মুরীদ পূর্বেই পীরের রূহে বিলুপ্ত থাকে। ফলে সমুদয় নূরই রাসূলে করীম (সাঃ) এর রূহের উপর পড়ে। রাসূলে পাক (সাঃ) এর আত্মায় বিলুপ্ত হইলেও মুরীদের এক প্রকার চৈতন্য গুণ থাকে, সেই গুণের মাধ্যমে এই মোকামে সে এক অনাবিল শান্তি অনুভব করে। ইহার পরে আসে ফানা-ফিল্লাহর দায়েরা।

    'ফানাফিল্লাহ'-এর বিভিন্ন স্তরের আলোচনাঃ

    ফানা-ফিল্লাহঃ-

    ফানা-ফিল্লাহর আভিধানিক অর্থ আল্লাহতে বিলুপ্তি। ইহার ভাবগত অর্থ হইল নিজ সত্ত্বার প্রতি অণু-পরমাণুতে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা। ফানাফিল্লাহর বেশ কয়েকটি স্তর আছে।

    • বেলায়েতে ছোগরার স্তরে ফানা।

  • আকরাবিয়াতের স্তরে ফানা।

  • কাওছের দায়েরা বা স্তরে ফানা।

  • বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে ফানা।

  • কামালাতে নবুওতের স্তরে ফানা। এবং

  • সর্বশেষে আসমা, সিফাত, শান, শয়ুনাত ও ইতেবারে সমুদয় পর্দা উন্মোচিত অবস্থায় আল্লাহর জাতে ফানা।

  • উরুজ ও ছায়েরের মূল উদ্দেশ্যই খোদাতায়ালার মারেফাত বা পরিচয় বা নৈকট্য লাভ করা। ফানার বিভিন্ন স্তর থাকায় মারেফাত বা খোদাতায়ালার সান্নিধ্যেরও বিভিন্ন স্তর আছে। যিনি ফানার সর্বশেষ স্তরে পৌছাইতে পারেন, যদিও তথায় পৌঁছানো অতিশয় কঠিন, তিনি খোদাতায়ালার পরিপূর্ণ পরিচয় লাভ করেন।

    বেলায়েতে ছোগরার স্তরে ফানাঃ-

    ইহা আল্লাহপাকের আসমা ও

    সিফাতের প্রতিবিম্বের মাকাম। মূল নূরের চেয়ে প্রতিবিম্বের তীব্রতা বেশী হওয়ায় এই দায়েরাতে ছালেকের হুশ জ্ঞান থাকে না। স্বাভাবিক জ্ঞান-বিবেক নূরের প্রখরতায় লোপ পায়। এই দায়েরাতে নবী করীম (সাঃ) এর রূহে বিলুপ্ত ছালেকের উপর ছয় দিক বা দশ দিক হইতে নূরের এমনি প্রবাহ আসিতে থাকে যে, মুরীদ সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে সেই নূরে নিমজ্জিত দেখে, এমন কি নিজেকেও সেই নূরে হারাইয়া ফেলে। ছালেকের নিকট শুধু নূরই নূর দৃষ্ট হয়। এই অবস্থাতে ছালেক শরীয়ত বিরোধী বহু কথাই বলিয়া ফেলে, যাহাকে কুদ্রে তরিকত বলে। এই অবস্থাতে ছালেকের না থাকে আহার-বিহারের খেয়াল, না থাকে পোশাক-পরিচ্ছদের খেয়াল। এই ফানা মূলতঃ আল্লাহর আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরে ফানা। এই ফানায় যে মারেফাত বা খোদাতায়ালার পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা ফানার উচ্চ স্তরসমূহের মারেফাতের নিকট ধর্তব্যই নয়। এই দায়েরায় প্রাপ্ত মারেফাতকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব, "মতরূহ ফিত্ তরীক"-অর্থাৎ মারেফাতের রাস্তায় ফেলিয়া দেওয়া খড়কুটা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।

    আকরাবিয়াতের স্তরে ফানাঃ- আকরাবিয়াত বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা। ইহা আসমা ও সিফাত সমূহের স্থান। আল্লাহ বলিতে জাত ও সিফাতের সম্মিলিত অবস্থাকে বুঝায়। সিফাত ও জাতের মাঝখানে আরও দুইটি অবস্থা আছে। তাহা হইল শান' ও ইতেবার'। জাত যেমন পৃথক অস্তিত্বধারী, সিফাতে হাকীকীও তেমন পৃথক অস্তিত্বধারী। কিন্তু শান বা ইতেবারের পৃথক কোন অস্তিত্ব নাই। ইহা জাতেরই অন্তভুক্ত। আকরাবিয়াত সিফাতে হাকীকীর দায়েরা। সিফাতে হাকীকী হইল হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারাত, কালাম ও তাকবীন। প্রত্যেকটি সিফাতই পৃথক পৃথকভাবে অস্তিত্বধারী। সিফাতের এই আটটি বিশাল বিশাল জগত অতিক্রম না করিলে খোদাতায়ালার জাতের সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব নয়। এই দায়েরাতে ছালেকের নিকট মনে হয় যে, আকরাবিয়াতের ফয়েজ খোদাতায়ালার যে জাত ছালেকের জান রগ হইতেও নিকটবর্তী, সেই জাত হইতে বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা আসমা ও সিফাত দিয়া ছালেকের রূহ হইয়া নাফস ও তথা হইতে সারা শরীরে পড়ে। এই দায়েরায় ছালেকের মনে হয় যে, আকরাবিয়াতের ফয়েজান ইষৎ নীলিম পর্দা হইতে বাহির হইয়া সমুদয় জগতকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতেছে। ছালেকের রূহ সিফাতে এরাদতে বিলীন হয়। ছালেকের জীবন সিফাতে হায়াতে, জ্ঞান-বিবেক সিফাতে এলেমে, ছালেকের ক্ষমতা সিফাতে কুদরতে, শ্রবণ শক্তি সিফাতে সামাওয়াতে, দর্শন শক্তি সিফাতে বাছারাতে, কথন শক্তি সিফাতে কালামে এবং সৃজন শক্তি সিফাতে তাকবীনে বিলীন হয়। অর্থাৎ প্রতিবিম্বজাত যে গুণসমূহ আমানত স্বরূপ ছালেককে দেওয়া হইয়াছে, তাহা স্ব-স্ব মূলে বিলুপ্ত হয়। খোদাপ্রদত্ত আমানত যাহা ছালেক নিজের বলিয়া মনে করিত, তাহা ফেরত দেওয়া এই দায়েরাতে সংঘটিত হয়। ছালেকের নিজস্ব বলিয়া আর কিছুই থাকে না। সে শূন্য হয়। এই দায়েরাতে নূরের পতন অত্যন্ত অধিক হয়। এখানে না থাকে পীরের রাবেতা বা তাছাউর, না থাকে রাসূলে পাক (সাঃ) এর তাছাউর; চতুর্দিকে শুধু খোদাই খোদা দৃষ্ট হয়। এই ফানাও প্রকৃত ফানা ফিল্লাহ নয়। ইহা আসমা ও সিফাতের নূরে ফানা। প্রকৃত ফানা হয় কাওছের দায়েরাতে।

    কাওছের দায়েরাতে ফানাঃ- আকরাবিয়াত হইতে কাওছের দায়েরার মধ্যবর্তী মহব্বতে আওয়াল ও মহব্বতে ছানী নামক বিশাল বিশাল দুইটি দায়েরা আছে। ছালেকের রূহ সিফাতে এরাদতে (আকরাবিয়াতের মাকামে) বিলুপ্ত হওয়ায় সেখান হইতে ঊর্ধ্বে মুরীদের আত্মার কায়া বা রূহে বেমেছালীর ছুরাত অগ্রসর হয়। এই রূহে বেমেছালীর ছুরাত পূর্বে উল্লিখিত নীলিম পর্দাকে ভেদ করিয়া উপরে গমন করে এবং এক অনাদী অনন্ত জ্যোতির্ময় প্রান্তরে প্রবেশ করে। প্রান্তরের প্রথম ভাগ মহব্বতে আওয়াল এবং দ্বিতীয় ভাগ মহব্বতে ছানী। এই দুই দায়েরাকে মহব্বতের দায়েরা বলা হয়। এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিচ্ছন্ন নূর ছালেকের নাফসের উপর পতিত হয় এবং ছালেকের নাফস খোদা প্রেমে এমনই মাতোয়ারা হয় যে নিজের উপর 'আমি' শব্দ প্রয়োগ করিতেও সে লজ্জাবোধ করে। এখান হইতে ছালেকের রূহে বেমেছালীর ছুরাত বা আত্মার কায়া কাওছে আসিয়া উপনীত হয়। এই দায়েরা মূলতঃ নাম, গুণ ও শানাদির আসলের মূলের মূল স্থান। এই কাওছকে অর্ধ দায়েরা ধরা হয়। বাকী অর্ধেক মূল জাতকে ধরা হয়। ফলে দুই কাওছ বা ধনু লইয়া এক দায়েরা পূর্ণ হয়। কাওছের মাকামে ছালেকের আত্মার কায়া বিদ্যুতের চেয়ে অধিক বেগে জাতে বিলুপ্ত হয়। এখানে আসিয়া ছালেকের আমানত ফেরত প্রদান পূরাপুরিভাবে সম্পন্ন হয়। এখানে না থাকে প্রেম, না থাকে প্রেমিক; না থাকে উপাস্য, না থাকে উপাসক; সবই একেতে (আল্লাহতে) লয় হয়। ইহাই প্রকৃত ফানা-ফিল্লাহ বা আল্লাহতে বিলুপ্তি।

    বাকা বিল্লাহঃ

    উল্লিখিত ফানার পরে আল্লাহপাক ছালেককে এক প্রকার চৈতন্য গুণ প্রদান করেন। এই চেতন গুণের সাহায্যে ছালেক নিজেকে সৃষ্ট হিসাবে বুঝিতে পারে। পরক্ষণেই তাইনে আওয়ালে আসিয়া খোদাতায়ালার প্রকার বিহীন এক প্রকার সূক্ষ্মজ্যোতি দেখিতে পায়, যাহা সমুদয় সৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিয়া আছে। এই জ্যোতিকেই জাতি নূর হিসাবে ছালেক বুঝিতে পারে। এই দায়েরাতে ছালেক স্রষ্টাকে স্রষ্টা, সৃষ্টিকে সৃষ্ট হিসাবে পার্থক্য করিবার মত জ্ঞান প্রাপ্ত হয়। ইহাই বাকাবিল্লাহ। কাওছের মাকামে যে ফানা উল্লেখ করা হইল তাহা সাধারণ অর্থে প্রকৃত ফানা। বিশেষ অর্থে প্রকৃত ফানা সংঘটিত হয় সর্বশেষ মাকাম হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফার দায়েরায়। যেখানে না থাকে সিফাতের পর্দা, না থাকে শান, শয়নাত বা ইতেবারের পর্দা। কাওছের মাকাম হইতে ঊর্ধ্বে যাহা গমন করে তাহা হইল ছালেকের 'ওজুদ মাওহুব লাহু' নামক এক খোদাপ্রদত্ত শরীর।

    বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে ফানাঃ-

    এই দায়েরাতে ছালেকের উপর জাত মিশ্রিত সিফাতি ফয়েজ পতিত হয়। এই ফয়েজে ছালেকের দেহের আগুন, পানি ও বায়ুর স্তর পাক হয়। দেহের উল্লিখিত তিন লতিফা খোদাতায়ালার জাত মিশ্রিত সিফাতি নূরে ফানা প্রাপ্ত হয়।

    কামালাতে নবুয়তের দায়েরাতে ফানাঃ-

    এই দায়েরাতে খোদাতায়ালার জাতি নূরের দায়েমী তাজাল্লীতে ছালেকের দেহের মাটির স্তর পাক হয়। এই স্তরে আসিলে ছালেকের সমুদয় সত্ত্বাই পবিত্র হয়। খোদাতায়ালার জাতি নূরের দায়েমী তাজাল্লীতে দেহের আগুণ, পানি, বায়ু ও মাটির স্তর ফানা প্রাপ্ত হয়।

    জাতে ফানাঃ-

    এখান হইতে ছালেকের "ওজুদ মাওহুব লাহু' কামালাতের অবশিষ্ট দুই দায়েরা, হকিকতে এলাহিয়া ও হকিকতে আম্বিয়ার দায়েরাসমূহ অতিক্রম করিয়া, সর্বশেষ দায়েরা হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফায় ফায় উপনীত হইয়া তথা হইতে ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে খোদাতায়ালার প্রকার বিহীন জাতে বিলুপ্ত হয়। এখান থেকে আর উপরে অগ্রসর হইতে পারে না। জাত অভিমুখে তাকাইয়া থাকিয়া এক অনাবিল শান্তি প্রাপ্ত হয়, যে শান্তি বর্ণনাতীত। ইহাই প্রকৃত ফানা ফিল্লাহ। এখান হইতে আল্লাহপাক যাহাদেরকে ইচ্ছা করেন, হেদায়েতের দায়িত্ব প্রদান পূর্বক দুনিয়ায় পাঠাইয়া দেন। এই সাধক বর্গই ওলীয়ে কামেল হিসাবে পরিচিত। ইহারা বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের সম্পদে সম্পদশালী। এই সকল সাধক বর্গের দেল এবং দেহ উভয়ই পাক। দেহের প্রত্যেক অণু-পরমাণুতে খোদাতায়ালার পবিত্র জাতি নূরের ফয়েজ অবিরাম প্রবাহিত হয়। ফলে এমন সাধকের সমগ্র অজুদ বা অস্তিত্বই যেন খোদাতায়ালার জাতি নূরের এক মনোমুগ্ধকর পিন্ডে পরিণত হয়। অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন যে কোন ব্যক্তির নিকট উল্লিখিত সাধক বা ওলীয়ে কামেলকে তুর পাহাড়ে দৃষ্ট হযরত মুসা (আঃ) এর নূর প্রজ্জলিত বৃক্ষের মত মনে হয়। ফলে তাহাকে দেখা মাত্রই খোদাতায়ালার কথা স্মরণ হবে। এই কারণেই ওলীয়ে কামেলের সংগ এবং রাবেতা-উভয়ই ইবাদত তুল্য। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব মকতুবাদ শরীফের প্রথম খন্ডের (৮৭ নং) মকতুবে বলেন, "ঐ ব্যক্তির কত যে সৌভাগ্য যাহাকে ওলীয়ে কামেলগণ কবুল করেন। তদুপরি যদি ভালবাসেন এবং নৈকট্য প্রদান করেন, তাহা যে কতই উচ্চ মর্তবা তাহা-বলাই বাহুল্য। যেহেতু ইহারা ঐ সম্প্রদায় যাহাদের সংগে উপবেশনকারীগণ বদব্য হয় না।"

    রাবেতার যোগ্য পীরের পরিচয়ঃ

    যে সাধক বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের নেয়ামত প্রাপ্ত, তিনিই রাবেতার যোগ্য পীর। কারণ তাহার দেল এবং দেহে সর্বদাই জাতি নূরের ফয়েজ প্রবাহিত। তদীয় দেহের প্রত্যেক অণু-পরমাণুই খোদাতায়ালার নূরে নূরময় থাকে। তিনি তখন খোদাতায়ালা কর্তৃক পরিচালিত হন। এই মর্তবায় উন্নীত সাধক প্রসংগে হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন, "আমার বান্দা আমার ফরজ সমূহ আদায় করা পূর্বক আমার নৈকট্য লাভে ধন্য হইয়া নফল ইবাদত সমূহ দ্বারাও অধিক নৈকট্য লাভ করিতে থাকে, এমন কি আমি তাহাকে নিজের বন্ধু বানাইয়া লই; যাহার ফলে আমি তাহার কর্ণ হইয়া যাই, যাহার দ্বারা সে শুনিতে পায়; তাহার চোখ হইয়া যাই, যাহার দ্বারা সে দেখিতে পায়; তাহার হাত হইয়া যাই, যাহার দ্বারা সে ধরিয়া থাকে ইত্যাদি।" তাই হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মছনবীতে বলেন,

    "মোৎলকাঁ আওয়াযে খোদ আয শাহবুয়াদ,

    গার্চে আয হল্কুমে আবদুল্লাহ বুয়াদ।"

    অর্থাৎ-ওলীয়ে কামেলসকল যাহা কিছু বলেন না কেন, তাহা সম্পূর্ণরূপে স্বয়ং বাদশাহগণের বাদশাহ মহান খোদাতায়ালার তরফ হইতে হইয়া থাকে; যদিও উহা বাহির হয় আল্লাহর বান্দার কন্ঠনালী হইতে।” এই কারণেই বলা হয়, ওলীর মুখ স্বয়ং আল্লাহর মুখ। এমন ওলীয়ে কামেলের রাবেতার মাধ্যমে সাধারণ মুরীদ সকল বর্ণনাতীত ফায়েদা হাছিল করে। হযরত মাওলানা মকিমউদ্দিন (রঃ) সাহেব তদীয় গঞ্জে আছরার পুস্তকে রাবেতা প্রসংগে একটি চমৎকার উদাহরণ তুলিয়া ধরিয়াছেন। তিনি বলেন যে, "সূর্যের প্রখর তেজ সর্বত্র বিদ্যমান আছে, তথাপি তাহার তেজেতে কোন পদার্থ জ্বলে না। কিন্তু একখানি আতশী কাঁচকে সূর্যের দিকে ধরিয়া তাহার নীচে একখন্ড সাদা বা কাল কাগজ ধরিলে উহাতে তখনই আগুন লাগিয়া যায়। এইরূপ আল্লাহর জালাল সর্বত্র বিদ্যমান হওয়া সত্ত্বেও কাহারও দেলে সে তাছির ধরে না। কিন্তু পীরে কামেলের রাবেতা বা তাছাউর সম্মুখে রাখিয়া আল্লাহর দিকে মোতাওয়াজ্জোহ হইলে অমনি আল্লাহর জালালের অগ্নি দেলে জ্বলিয়া উঠে। দেলে এক অপূর্ব তাছির হয়।" মূলতঃ ব্যাপারটিও তাই। রাবেতা চোষ কাগজ তুল্য। চোষ কাগজ যেমন কালিকে শুষিয়া লয়,

    তেমনি কামেল পীরের উপর জাতি নূরের যে ফয়েজ বিরামহীনভাবে পতিত হয়, মুরীদ রাবেতার মাধ্যমে সেই ফয়েজের অংশ নিজের উপর টানিয়া লয়; যে ফয়েজে মুরীদের দেলের গোনাহের পাহাড়, গোনাহের তাছির, গোনাহের অন্ধকার, গোনাহের যুলমত সবই বিদুরিত হয়। মুরীদের দেল খোদামুখী হয়। নাফসে আম্মারা পাপ ও অন্যায় ত্যাগ করিয়া লাওমা হইয়া মোৎমাইন্নার স্তরে উপনীত হয়।

    হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, ফানা-ফিশ-শেখ, ফানা-ফির রাসূল, ফানা-ফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহ-এর জ্ঞান যদি অর্জন করিতে চাও, তাহা হইলে আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের সাথে পীরের খেদমত কর।

    পীরকে ভালবাস সকলের চেয়ে বেশী। পীরের প্রতি তোমার মহব্বত যদি জাতি পর্যায়ে না হয়, তুমি যদি তোমার প্রাণাপেক্ষা পীরকে বেশী ভালবাসিতে না পার, তাহা হইলে কেমনে তুমি খোদাতালাকে পাওয়ার আশা রাখ? আজ পর্যন্ত যত সাধক, যত ওলী পৃথিবীতে আসিয়াছেন, তাহারা আপন আপন পীরকে নিজ প্রাণাপেক্ষা বেশী মহব্বত করিয়াই খোদাতায়ালাকে বাধ্য করিয়াছেন। তাহাদের প্রত্যেকেরই মহব্বত ছিল জাতি পর্যায়ের, তাই তাহারা খোদাতায়ালাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন।

    হযরত ওয়ায়েছ করনী (রাঃ) ছাহেব চর্মচক্ষে না দেখিয়াও রাসূলে পাক (সাঃ) কে এতই মহব্বত করিতেন যে, ওহুদের যুদ্ধে রাসূলের দন্ত মোবারক শহীদ হইয়াছে-এই সংবাদ পাইয়া একে একে নিজের বত্রিশটি দাঁতই তিনি ভাংগিয়া ফেলিয়াছিলেন। ইহাই মহব্বতের চূড়ান্ত পর্যায়।

    তোমরা ওলী আল্লাহর জীবনী পড়িয়া দেখ, তাহা হইলে, আপন আপন পীরের প্রতি তাহাদের গভীর মহব্বতের পরিচয় তোমরা পাইবে। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় পীরকে কি গভীর ভাবেই না ভালবাসিতেন। তদীয় পীর পরীক্ষাচ্ছলে একবার তাহাকে নির্দেশ দিলেন, "বাবা, আমার দুই বোতল মদের প্রয়োজন। তুমি সংগ্রহ করিয়া আন।” মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব নির্দেশ পাওয়ামাত্রই দ্রুত প্রস্থান করিয়া দোকান থেকে দুই বোতল মদ সংগ্রহ করিয়া পীরের সম্মুখে আনিয়া রাখিলেন। তৎপর তদীয় পীর তাহাকে খুব ছুরাত দুইজন যুবতীকে আনয়নের নির্দেশ দিলেন। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) নিজ ঔরসজাত দুই সাবালিকা কন্যাকে পীরের সামনে আনিয়া দিলেন। অতঃপর পীর ছাহেব মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেবকে খুব ছুরাত দুইজন যুবককে আনিতে নির্দেশ দিলেন। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব নিজের দুই যুবক ছেলেকে আনিয়া পীরের নিকটে হাজির করিলেন। ইহা দৃষ্টে হযরত শামছে তিবরেজী (রঃ) ছাহেব তদীয় যোগ্য মুরীদ হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেবকে আদর করিয়া বলিলেন, "বাবা, এসব কোন কিছুরই আমার দরকার নেই। পীরের প্রতি তোমার মহব্বত কতখানি তাহাই শুধু দেখিলাম।"

    উল্লিখিত এ ঘটনা থেকে চিন্তা করিয়া দেখ, হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় পীর ছাহেবকে কি পরিমান ভালবাসিতেন। আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব তদীয় পীর হযরত ওয়াজেদ আলী (রঃ) ছাহেবের হাতের লাঠির কত যে আঘাত সহ্য করিয়াছেন তাহার অন্ত নাই। তথাপিও পীরের প্রতি বিন্দু পরিমান অভিযোগ তাহার ছিল না। পীরকে তিনি এতই ভালবাসিতেন যে, পীরের তরফ থেকে আগত ইষ্ট বা কষ্ট উভয়ই তাহার নিকট সমান মনে হইত। পীরের প্রতি তাহার এই মহব্বত ছিল জাতি পর্যায়ের।

    পীরের প্রতি প্রেম, ভক্তি বা মহব্বত জাতি পর্যায়ে উন্নীত করিতে না পারিলে, পীরের সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়। আর পীরকে রাজী করাইতে না পারিলে খোদাতায়ালার রেযা বা সন্তুষ্টি কেমন করিয়া লাভ করিবে?

    তোমরা গভীর ভাবে চিন্তা করিয়া দেখ, পীরের প্রতি তোমাদের প্রেম বা মহব্বত সিফাতি, না জাতি পর্যায়ের। তোমরা প্রত্যেকেই কম-বেশী খেদমত করিতেছ। কেউবা ১০ বছর, কেউবা ২০ বছর, কেউবা ততোধিক সময় যাবৎ; তোমাদের দেলে পীরের প্রতি মহব্বত পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু ইহা সিফাতি পর্যায়ের মহব্বত, জাতি পর্যায়ের নয়। কিন্তু প্রেম বা মহব্বত জাতি পর্যায়ের না হইলে কিভাবে তোমরা খোদাতায়ালাকে পাওয়ার আশা রাখ?

    কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, চিরস্থায়ী শান্তির অধিকারী যদি হইতে চাও, তবে পীরের কদমে জান-মাল বিসর্জন দাও। পীরের যে কোন হুকুমে কাতেল থাক। দেখ, হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ), যিনি এই তরিকার প্রথম পুরুষ, তিনি রাসূলে পাক (সাঃ) কে কত যে ভালবাসিতেন, তাহার তুলনা নাই। একবার এক যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূলে করীম (সাঃ) সাহাবীগণকে সামর্থানুযায়ী অর্থ সম্পদ জেহাদের প্রয়োজনে ব্যায়ের নির্দেশ প্রদান করিলে, হযরত সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) তাহার নিকট যাহা কিছু ছিল সমুদয়ই রাসূলে

    পাক (সাঃ) এর কদমে আনিয়া হাজির করিলেন। দয়াল নবী (সাঃ) সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) ছাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আপনি আপনার সংসারের জন্য কি রাখিয়া আসিয়াছেন?" তিনি উত্তরে বলিলেন, "আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে।" ইহাই মহব্বতে জাতির নিদর্শন। এমনিভাবে পীরকে যদি তোমরা ভালবাসিতে পার, তাহা হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব তোমরা লাভ করিতে পারিবে। জীবন তোমাদের সার্থক হইবে। অনাবিল শান্তির অধিকারী তোমরা হইতে পারিবে। দু'আ। ইতি!

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD