Logo

আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, আমাকে দেখ না কেন?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৮:৫৩
আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, আমাকে দেখ না কেন?
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ফানা ও বাকা بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ফানাফিল্লাহ সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

ফানার উচ্চতর মাকাম সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, ছালেক আল্লাহ ব্যতীত সকল কিছুই ভুলিয়া যখন জেকের ও মোরাকাবায় আল্লাহতে বিলীন হয়, আল্লাহতেই তাহার দেহ ও মন নিবিষ্ট হয়, তখন আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের অর্থাৎ নাম, গুণ ও শানের নূর বা এলেমী সুরাত তাহার মধ্যে আসিতে থাকে ও ক্রমেই এ এলেমী ছুরাত বিকাশমান হয়। এই রূপে এই এলেমী ছুরাত পূর্ণরূপে বিকাশমান হইলে, ছালেক আল্লাহতায়ালার গুণে গুণান্বিত হয়। অর্থাৎ সাধকের দৃষ্টি তখন আল্লাহতায়ালার সিফাতের উপর নিবদ্ধ হয়। তখন ছালেক নিজের মধ্যেই সিফাত সমূহ ও জাতের পরিচয় লাভ করিতে শুরু করে। আল্লাহ বলেন,

وَفِي أَنْفُسِكُمْ طَ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

অর্থাৎ-"আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, আমাকে দেখ না কেন"? (সূরা জারিয়াতঃ২১) এই স্তরে ছালেক পৌঁছায় তাহার আদামাতের স্তর ঝরিয়া যাওয়ার পর-ছায়েরে এল্লাল্লাহ বা আল্লাহতায়ালার অভিমুখে ভ্রমণ করিবার পর।

বিজ্ঞাপন

এই স্তরের অবস্থা বর্ণনা দিতে গিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, তখন আদামাত বা দেহগত প্রবণতা ধীরে ধীরে গোপন হইয়া যায়, ছালেকের দৃষ্টিতে আর দেহগত প্রবণতা আসে না। ছালেক তখন আত্মিক দৃষ্টিতে নিজের হাকীকী রূপ বা আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহের প্রতিবিম্ব ছাড়া আর কিছুই দেখে না।

ইহার পরবর্তী স্তরে ছালেক ঐ প্রতিবিম্বিত সিফাতের রূপও আর দেখে না। ইহাই মাকামে ফানা। ইহার পর আল্লাহ যাহাকে অনুগ্রহ করিয়া বাকা দান করেন, তিনি তাহার পূর্ব অবস্থা হইতে নিজেকে একটি পৃথক অবস্থার মানুষ মনে করেন। তিনি নিজেকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট মনে করেন। তখন তাহার মনে হয়, আদামাতের সহিত তাহার কোনো সম্পর্ক নাই। ছালেকের ছুরাতই তখন তাহার হকিকত হইতে পৃথক হইয়া যায়।

দায়েরায়ে জেলালের এই অবস্থায় ছালেক তাহার আত্মিক দর্শনে নিজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের প্রতিবিম্ব দেখিতে পায়। সে বুঝিতে পারে, আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহ হইতে সে পৃথক নয়। তাহার সত্ত্বা পরম সত্ত্বার সহিত বিলীন ও অবিভাজ্য হইয়া গিয়াছে। পূর্বে নিজের দেহগত যে সত্ত্বা ছিল সেই সত্ত্বা সে পরিত্যাগ করিয়াছে। পরিত্যাক্ত দেহ বা সত্ত্বা ক্ষণস্থায়ী, পরিত্যাজ্য ও নাস্তি-ইহা তাহার বোধে আসে। ঐ পরিত্যাজ্য দেহ ও সত্ত্বা যে একটি কারাগার বা জেলখানা বিশেষ, ইহাও তাহার মনে হয়। সে দেখিতে পায় যে, যে পরম সত্ত্বার সহিত সে নিজে বিলীন, সেই পরম সত্ত্বা সর্বভূতে বিরাজিত। সেই পরম সত্ত্বায় বিলীন প্রাপ্ত নিজ দেহের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসকে তখন ছালেক সৃষ্টি জগতের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সহিত অবিভাজ্য মনে করে। সকল বস্তুতে আল্লাহ বিরাজমান ও সকল বস্তুই আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা বা কুদরতের বহিঃপ্রকাশ, ছালেক তাহা বুঝিতে পারে। "ইন্নাল্লাহা আ'লা কুল্লে শাইয়ীন কাদীর"-নিশ্চয় সকল বস্তুই আল্লাহতায়ালার ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ-ছালেক তাহা বুঝিতে পারে। ছালেক তখন ইহাও বুঝিতে পারে যে, আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াগুণ দ্বারাই সৃষ্টি জগতের সকল ক্রিয়া কর্ম সংঘঠিত হইতেছে। "লা ফায়েলা ইল্লাল্লাহ-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-এই নাফী এজবাত জেকেরের মর্ম সে তখন বুঝিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ছালেক তাহার নিজের মধ্যে যে আল্লাহতায়ালাতে লীন অবস্থায় আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের (গুণাবলীর মূল) এলেমী ছুরাত বিকশিত হইতে দেখে, তাহাকে ছায়েরে ফিল্লাহ বলে। ছায়েরে ফিল্লাহর দুইটি স্তর। ইহার একটি এসমোজ্জাহের, অন্যটি এসমোল বাতেন। কাওছের মাকামেই এসমোজ্জাহের শুরু হয়। এসমোল বাতেন সম্পন্ন হয় বেলায়েতে উলিয়ার মাকামে। ইহার পর যিনি কামালাতে নবুয়ত ও তদ্‌ঊর্ধ্বের মাকামে উন্নীত হন, তিনি আল্লাহতায়ালার দয়া দ্বারাই উন্নীত হন। কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত ও কামালাতে উলুল আজমের মাকাম সমূহে আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী সমূহ ছালেকের সর্ব দেহে পড়িতে থাকে। তাই এই স্তরে সর্ব দেহের ফানা লাভ হয়। ছালেক কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত ও কামালাতে উলুল আজমের স্তরে উন্নীত হইয়া "কাবা কাওছাইনে আও আদনা" এর জ্ঞান লাভ করে।

ছালেকের এই উচ্চ অবস্থা প্রাপ্তির ব্যাখ্যা দিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "বেলায়েতে কোবরা হইতে বেলায়েতে উলিয়া পর্যন্ত ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তি এছমোজ্জাহের ও এসমোল বাতেনের ছায়ের সম্পন্ন করে। তখন তাহার মধ্যে আল্লাহতায়ালার সিফাত ও গুণ সমূহের এলেমী রূপ বিকশিত হয়। ছালেক যখন ঐ ছায়ের শেষ করেন, তখন তিনি আল্লাহতায়ালার স্বভাবে বা গুণে গুণান্বিত হইয়া যান। তখন প্রেমিক ছালেক জেল্লিয়াতের আমেজ ও হাল সমূহের অনুভূতি হইতে মুক্ত হইলে, তাহার মধ্যে মাহবুব প্রকাশিত হন। মাহবুবে জাতি অধ্যায় তাহার সিফাত হইতে মুক্ত নয়। সেই জন্য আশেকের দৃষ্টিতে জাতের সহিত সিফাতও প্রকাশিত হইবে। এই জন্য কাওছে জাত ও কাওছে সিফাত-এই দুই কাওছই তখন লাভ হয়। পরবর্তীতে ছালেক (আশেক) মাশুকের জাতের সহিত এমন রূপে মিশিয়া যায় যে, তখন এসেম ও সিফাত হইতে মুক্ত জাত ভিন্ন আর কিছুরই প্রকাশ থাকে না। যদি সিফাত বর্তমানও থাকে তাহা ছালেকের নিকটে আর প্রকাশিত হয় না।"

এইরূপে কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত ও কামালাত উলুল আজমে ছালেকের এই স্তর লাভ হয়। ইহার পর রহিয়াছে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কা'বা, হকিকতে সালাতের মাকাম। এই সকল মাকামে উন্নীত হইবার পূর্বে কামালাতের দায়েরা সমূহে ছালেকের দেহ সত্ত্বা দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা আল্লাহপাক পরিপূর্ণ রূপে পাক, ছাফ করিয়া আদামাত, পার্থিব প্রবণতা ও অন্ধকার হইতে মুক্ত করিয়া লন। অতঃপর প্রকৃত ইনসানে কামেলের রূপ প্রকাশ করিয়া দেন।

বিজ্ঞাপন

মানুষের মধ্যে আরশের মূল আছে যাহা বেলায়েতে ছোগরার স্তর, যে স্তর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, "কুলুবুল মোমিনীনা আরশুল্লাহ"।-মোমেনের দেল আল্লাহর আরশ। বেলায়েতে ছোগরা স্তরের সাধকের দেল যেমন আরশের নমুনা, তেমনি হকিকতে এলাহিয়ার মাকাম হাসিলকারীর দেল কাবার নমুনা। হকিকতে কাবা ডান, বাম বা স্থান নিদের্শক নহে। হকিকতে কাবা হইল জাতের ইতেবার'। সমস্ত সৃষ্টির হকিকত হকিকতে কাবার দিকে মুখ করিয়া আছে। যে সাধকের দেল হকিকতে কাবার গুণে গুণী; সে সাধকও সমুদয় সৃষ্টির হকিকতের কেন্দ্র বিন্দু হন। আত্মিক উন্নতির জন্য তাই তেমন সাধকের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ হইয়া তরিকতের আমল বা ওজিফা কালাম করিতে হয়। মাকামে হকিকতে কাবার অধিকারী হইলেন নবী (আঃ) গণ। উম্মতগণের মধ্যে কেহ কেহ নবী করীম (সঃ) বা বুজর্গগণের অনুসরণের দ্বারা এই মাকাম প্রাপ্ত হন। আসহাবে কেরামগণের সংগলাভের কারণে এই মাকাম অতীতে অনেকে হাছিল করিয়াছেন। আসহাবগণের যুগ চলিয়া যাওয়াতে এই সম্পদ কমিয়া গিয়াছে। এই সম্পদ বর্তমানে কেবলমাত্র ওলী আল্লাহগণের অনুসরণ ও মহব্বতের মাধ্যমেই লাভ করা যায়। এই সম্পদের লোক সোজা রাস্তায় আছেন; যাহারা মতলুবের নিকট পৌঁছাইবার জন্য সহজ রাস্তা অনুসরণ করিতেছেন।

বেলায়েতে কোবরা হইতে কামালাতে উলুল আজম পর্যন্ত গউসপাক বর্ণিত তেফলুল মায়ানী বা আল্লাহপ্রেমের নবজাত শিশু হকিকতে কাবায় উপনীত হইয়া কাবার নমুনা প্রাপ্ত হয়। ঐ রূপ এনসানে হাকীকী যাহার হাছিল হইয়াছে, তিনি তখন হকিকতে কাবার গুণ হাসিল করেন। ঐ রূপ আরেফের তাছাউর' বা রাবেতার মাধ্যম ছাড়া কোনো জেকের-আজকার বা তরিকতের আমলে উন্নতি করা যায় না-যেমন কাবার দিকে না ফিরিলে নামাজ হয় না। এই জন্যই মুর্শিদে কমেল যিনি হন, কাবা ও কেবলা নামের যোগ্যতা তিনি লাভ করেন।

এই মাকাম হইতে আল্লাহতায়ালার দয়ায় আরও ঊর্ধ্বে উন্নীত হইলে, ছালেক মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে ছেরফার মাকামে পৌঁছায়। এই দুইটি মাকামের মধ্যে "মাবুদিয়াতে ছেরফা" হইল ইবাদতের পথ। আর "হোব্বে ছেরফা" হইল মহব্বতের পথ। মহব্বত ও ইবাদত-এই দুই গুণের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার যথাযথ পরিচয় লাভ হয়। হোব্বে ছেরফা বা মাবুদিয়াতে ছেরফা হইতে আল্লাহতায়ালার জাত লাতাইন বা জাত মোজাররাদার দর্শন খোদাপ্রদত্ত শরীর 'ওজুদ মাওহুব লাহু' দ্বারা আরেফ লাভ করেন।

বিজ্ঞাপন

"তায়ুন" অর্থাৎ নির্দিষ্ট বিভাগ বা স্তর। লাতাইন অর্থ যাহা নির্দিষ্ট করা যায় না; বা যাহা সম্পর্কে বা যে অবস্থা সম্পর্কে কিছুই বোঝা যায় না বা যে অবস্থা বর্ণনা করা যায় না।

এই "লাতাইন” সম্পর্কে তরিকতের পীরানে পীরগণ বলিতেছেন, ইহা অতি উচ্চের মাকাম। এই মাকাম আল্লাহতায়ালার নাম, সিফাত ও শান হইতে উচ্চে। শুধু এই টুকুই বলা যায়, ইহা নূরের পর্দা দ্বারা আবৃত। এই রূপে নূরের পর্দার পর পর্দা দ্বারা এই লাতাইন আবৃত। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই পর্দা সমূহকে ইতেবারের রের পর্দা বলিয়াছেন। তরিকতের পীরানে পীরগণ এই মাকামকে মারিফতের উচ্চতম মাকাম বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছেন।

এই জাত লাতাইনে হোব্ব বা প্রেম জাগ্রত হইলে, আল্লাহপাক সেই হোব্ব বা প্রেমকে তাইয়ুন-ই-আউয়াল অর্থাৎ হকিকত জগতের প্রথম নির্দিষ্টকৃত অবস্থায় বা ইতেবারে জাতি যার মধ্যে হোব্বে ছেরফা (বা নিছক প্রেমের অনাবিল প্রেমরাজ্য) সেই স্থানে নিজের ভেদ ও নিশানা স্বরূপ রাখিয়া দিলেন। এই অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা মনুষ্য ভাষায় দেয়া অসম্ভব। আল্লাহপাক নিজেই তাহার জাতপাককে নূরের পর্দা ও সিফাতের পর্দা দিয়া ঢাকিয়া রাখিয়াছেন। তাহার জাতকে বোঝা এবং ভাষা দিয়া প্রকাশ করা তাই অসাধ্য। তবে অনুভূতি ও দর্শন যে নাই তাহা নহে। দর্শন ইহাই যে নূরের পর্দার পর নূরের পর্দা রহিয়াছে। আর নূরের পর্দার অন্ত নাই। আল্লাহতায়ালা নিজের সম্পর্কে নিজেই বলিতেছেন,

বিজ্ঞাপন

لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ

অর্থাৎ-'সৃষ্টি তাহাকে বুঝিতে পারিবে না।' (সূরা আন'আমঃ ১০৩)

সৃষ্টি তাহাকে বুঝিতে পারিবে না একথা যেমন আল্লাহপাক বলিতেছেন, তেমনি আল্লাহপাক বলিতেছেন তিনি নিজেকে প্রকাশ করিবার জন্যই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। যিনি নিজেকে বোধের অগম্য বলিয়াছেন তাহার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ কি রূপে সম্ভব?

বিজ্ঞাপন

এই অবস্থা সম্পর্কে বলা যায় যে আল্লাহপাক যে মুহূর্তে পরিচয় দাতার কথা বলিয়াছেন, সেই মুহূর্তেই তাহার মধ্যে দুইটি অবস্থা আসিয়া যায়। একটি পরিচয় দাতার, আর একটি পরিচয়-গ্রহীতার। পরিচয় দানের জন্য পরিচয় গ্রহীতার ইতেবার বা কামালাতকে তখন আল্লাহপাক নিজের ভিতর হইতে বাহির করিয়া দিলেন। এই যে পরিচয় গ্রহীতার ইতেবার বা কামালাত তাহাই তাহার প্রথম সৃষ্টি। ইহাকে তিনি প্রথমে যেখানে রাখিয়া দিলেন, তাহাই তাইয়ুনে আউয়াল। ইহাই হোব্বে ছেরফা। ইহাই আল্লাহতায়ালার জাত পাকের নিকটতম মাকাম। এখানে ছালেকের খোদাপ্রদত্ত শরীর দর্শক হিসেবে দাঁড়াইয়া থাকে এবং কুওতে নজরীয়া দ্বারা জাতপাকের দর্শন লাভ করে; জাতপাকে প্রবেশ করিতে পারে না।

আল্লাহপাক যখন হযরত রাসূলে করীম (সঃ) কে নিজের দিকে আহ্বান করিয়াছিলেন, তখন হযরত (সঃ) শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জীব্রাইল আমিন (আঃ) কে পেছনে ফেলিয়া সম্মুখে অগ্রসর হন। অতঃপর জাত পাকের দর্শনে যখন তিনি তাইনে আউয়ালের দিকে গমন করেন, তখন আল্লাহপাকের তরফ হইতে বাণী হইল,

قف يَا مُحَمَّدُ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-'হে মুহাম্মদ! আপনি আর অগ্রসর হইবেন না।' কারণ ইহার উপরে আর কাহারো প্রবেশাধিকার নাই। আল্লাহতায়ালা মহব্বতের কারণে এই ক্ষেত্রে রাসূলে করীম (সঃ) এর কুওতে নজরীয়া বা দর্শন শক্তি দান করিয়াছেন, ইহার মধ্যে প্রবেশ অধিকার দান করেন নাই। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর পূর্ণ অনুগমনকারী-খোদাতালাশী ব্যক্তিও ঐ রূপে রাসূলে করীম (সঃ) এর অনুসরণের ফজিলত ও আল্লাহতায়ালার তায়ীদ মদদ দ্বারা জাতপাকের কৈফিয়তশূন্য দর্শন লাভ করেন। এই স্তরে যাইয়া নূরের পর্দার তাজাল্লী বা তেজের প্রখরতা খোদা তালাশী ব্যক্তির সর্ব প্রকার বোঝাবুঝিকে ধ্বংস করিয়া দেয়। অথবা বলা যায় ছেরেফ নূরের পর্দা বর্তমান থাকায় আল্লাহতায়ালার জাত পাক আড়ালে থাকিয়া যায়। জাত পাকের ইতেবার বা ধারণা বা নৈকট্য এই স্তরে ছালেকের লাভ হয়। কিন্তু সেই ধারণা ভাষা দ্বারা প্রকাশ যোগ্য নয়, ইহার শেষ অবস্থা সম্পর্কে রাসূলে করীম (সঃ) বলিয়াছেন, আমার পূর্বে আল্লাহতায়ালার এত অধিক নৈকট্য অন্য কোনো পরগম্বর বা ফেরেশতা লাভ করেন নাই।

আল্লাহতায়ালা নিজে মোহেব বা প্রেমিক হইয়া রাসূলে করীম (সঃ) কে এই স্তর দান করিয়াছিলেন, মানুষের যেটুকু প্রেম যাহা বিবর্ণ ছেঁড়া ছাতার মত অজস্র ছিদ্র ও খুঁতে ভরা, সেই প্রেমের সম্পদ দিয়া আল্লাহকে বোঝা যায় না। গ্রহীতা কোনো ভাবেই দাতার সমকক্ষ বা মর্যাদা লাভ করিতে পারে না। তবুও এই প্রেমের গ্রহীতাই আল্লাহপাকের প্রেমিক। সেই প্রেমের আকর্ষণে তদীয় জাতপাকের ইতেবার পর্যন্ত অগ্রসর হয়। আল্লাহতায়ালার প্রেম এত শক্তিশালী যে, সেই শক্তিশালী প্রেমের মধ্যে ডুব দিয়া প্রেমাস্পদ আর কোনো ক্রমেই অগ্রসর হইতে পারে না। তাই আল্লাহপাক সৃষ্টির সকল বোধের ও জ্ঞানের অতীত থাকিয়া যান। এই অবস্থায় হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) বলিয়াছেন, "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহতায়ালার যিনি সৃষ্টিকে জ্ঞানের দিক দিয়া অক্ষম করিয়া দিয়াছেন।" তিনি এই অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিয়া আল্লাহতায়ালার নিকট দয়া চাহিয়াছেন, "হে আল্লাহ! তুমি আমাদিগকে তোমার সম্পর্কে জ্ঞান লাভের অক্ষমতার মারেফাত দান কর।" হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিয়াছেন, আল্লাহকে বোঝা যাইবে না সত্য, কিন্তু দেখা যাইবে না, তাহা নহে। মারেফাত জগতে আল্লাহকে দর্শন করিবার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অনেক সাধক ও আরেফ অনেক প্রকার মতামত ব্যক্ত করিয়াছেন। কেহ বলিয়াছেন আল্লাহকে দেলের চক্ষু দ্বারা দর্শন করা সম্ভব। তবে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই দর্শন সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়া বলিয়াছেন-আল্লাহতায়ালার জাত ছাড়া তাহার সমস্ত কামালত আলমে মেছালে বা রূপক জগতে দেখা যায়।

জাত মোজাররাদায় ছালেক কি দর্শন করে, ইহার উত্তরে পূর্বেই বলা হইয়াছে, ছালেক দেখে পবিত্র জাতের হাস্যমুখী তাজাল্লা। আল্লাহতায়ালার ওলীগণ যাহা দেখিতে পান, তাহাতে ভুল নাই। তিনি যাহা দেখেন, তাহার নিগুঢ় অর্থ অনুধাবন করার উপরেই প্রকৃত অবস্থা নির্ভর করে। আল্লাহতায়ালার জাত ছাড়া তাহার কামালতের সকল কিছুই আল্লাহপাক তদীয় আলমে মেছালের রূপক জগতে ছালেককে দর্শন করান। জাতের দর্শন হয় হাকীকী জগতে-হোব্বে ছেরফা ও মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকামে। সে দর্শন কৈফিয়তশূন্য ও অবর্ণনীয়। আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ ছালেকের ঐকান্তিক বাসনা। হযরত মুসা (আঃ), হযরত রাসূলে করীম (সঃ)-উভয়েই আল্লাহতায়ালার দর্শন প্রত্যাশী ছিলেন। রাসূলে করীম (সঃ) কে আল্লাহপাক সশরীরে ঊর্ধ্ব জগতে লইয়া দর্শন দান করিয়াছিলেন। আর হযরত মুসা (আঃ) কে এই মাটির পৃথিবীতে তুর পাহাড়ের উপর এক নূর প্রজ্জ্বলিত বৃক্ষের রূপকে দর্শন দান করিয়াছিলেন। আল্লাহতায়ালার জাতের ছুরাত নাই। তাই তাহার মেছাল নাই। তবে কুরআন মজীদের উদ্ধৃত করিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন-আল্লাহপাকের জন্য অতি উচ্চ মাছাল রহিয়াছে এবং সেই মাছাল সম্পর্কে শেষ কথা নাই। এই মাছাল বা মেছাল হইল আল্লাহতায়ালার জাতের নূরের পর্দা যাহা লাতাইনের ভিতরকার অবস্থা। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, কোন মাছালই নিছক জাত হইতে পারে না। আল্লাহ সম্পর্কে ইহাই শেষ কথা নয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলিতেছেন, মাছালের অবস্থা জাতের দিকে যাইবার একটি পথ মাত্র। কাবায়ে রাব্বানীর হকিকতের জ্ঞান এই ক্ষেত্রে আবশ্যক। জাত মোজাররাদায় যে নূরের পর্দা দেখা যায়, সে সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, ইহা আল্লাহাতায়ালার জাতের ইতেবারের পর্দা বা মাছাল সমূহের কোনো একটি মাছাল। ইহা জাতের সম্পূর্ণ মাছাল নয়। কারণ আল্লাহতায়ালা কোনো সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। তাই জাত মোজাররাদার নূরের সহস্র সহস্র পর্দা দেখিলেও তাহা আল্লাহতায়ালার জাতের সমষ্টিগত মাছাল বলিয়া ধারণা করা সঠিক হইবে না। তাই জাত মোজাররাদায় কুওতে নজরীয়ার দ্বারা ছালেকের 'ওজুদ মাওহুব লাহু' যাহা দর্শন করে তাহা অসমাপ্ত দর্শন ও আল্লাহতায়ালার সম্পর্কে যে জ্ঞান লাভ করে, তাহা আল্লাহতায়ালা সম্পর্কে অপরিপূর্ণ ও অসমাপ্ত জ্ঞান। তবে জাতের ইতেবার যে নূরের পর্দা সেই নূরের পর্দা ও তাহার মালিকও আল্লাহ, তাই দর্শক আরেফ আল্লাহর কাছে মকবুল থাকিয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার জাত আলমে মেছালে দেখা যায় না এই জন্য যে আলমে মেছালে যাহা দেখা হয় তাহা রূপক ছুরাত। আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহের রূপক আলমে মেছালে দেখা যায়। কিন্তু তাহাকে জাতের ছুরাত বলা সিদ্ধ হইবে না। কারণ আল্লাহতায়ালা অসীম, তাহার ছুরাত কল্পনা করিলে তাহাকে সীমায় আবদ্ধ করা হয়। আল্লাহতায়ালার কামালাত ও সিফাত সমূহের ছুরাত আলমে মেছালে দেখিবার অনেক যুক্তি আছে। ইহা আল্লাহতায়ালার কামালাত ও সিফাত সম্পর্কে ছালেকের বিশ্বাসের ধারণা। ইহা মধ্যপথের ঘটনা।

কিন্তু হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ الْقَمَرَ لَيْلَةَ الْبَدْرِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ- 'তোমরা শীঘ্রই আল্লাহতায়ালাকে পূর্ণিমার চন্দ্রের মত দেখিবার সৌভাগ্য লাভ করিবে।' শরীয়তে ইহাও বলা আছে;

وَ لِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ قِ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ

অর্থাৎ- 'পূর্ব-পশ্চিম আল্লাহর; সুতরাং যে দিকে তাকাও সেই দিকেই পরম প্রভু আল্লাহতায়ালার মুখ দেখিতে পাইবে।' (সূরা বাকারা, আয়াত-১১৫) আল্লাহতায়ালার দরশনের কথা ছালেককে আশ্চর্য করে। সে তাই আল্লাহকে দেখিবার জন্য অগ্রসর হয়।

হোব্বে ছেরফা বা লাতাইন মাকাম সম্পর্কে বলা হইয়াছে ইহা আল্লাহতায়ালার প্রেমের উৎপত্তিস্থল। আর তাইনে আউয়ালের গভীর কেন্দ্রে আল্লাহতায়ালার নিজের ভেদ ও নিশানা রক্ষিত। এই তাইয়ুনকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালার 'ওজুদ' নামক এক বিশিষ্ট কামালাত দ্বারা নিজের জাত ছাড়া সমস্ত কামালতকে প্রকাশ করিয়াছেন। এই স্থানে ওজুদ বলিতে বোঝানো হইতেছে, আল্লাহতায়ালার সমস্ত প্রকাশযোগ্য ক্ষমতা, গুণ ও শক্তি। এই তাইয়ূন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উৎপত্তি স্থল। আর এই তাইয়ূনকে বৃত্ত ধারণা করিলে সেই বৃত্তের কেন্দ্র হইবে হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর উৎপত্তি স্থল। এই কেন্দ্রকে আল্লাহতায়ালার ভেদ ও নিশানার আমানতের মূল বলা হয়। আল্লাহতায়ালার জাত ছাড়া প্রকাশযোগ্য আর যাহা কিছু তাহা এই কেন্দ্র হইতেই প্রকাশিত।

আল্লাহতায়ালা সমস্ত গুণ ও সৌন্দর্যের উৎপত্তি স্থল। তাহার 'হোসুন ও জামাল' অর্থাৎ গুণ ও সৌন্দর্য ছাড়া আরও এক মহান অবস্থা আছে যেখানে এই 'হোসুন ও জামাল' পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও পৌঁছাইতে পারে না। তাইয়ুনে আউয়াল সেই পবিত্র কামালাতের ও জামালের প্রকাশ স্থল। সেই মহান অবস্থা কোনো তাইয়ূনের দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায় না। ইহাই আল্লাহতায়ালার জাতের ভেদপূর্ণ এক ইতেবার। আল্লাহপাকের এক গোপন নিশানা। ইহাই আল্লাহপাকের পরিচিতি গ্রহণের ইতেবার; যাহা জাত পাকে উদ্ভূত হইয়া ছিল।

আল্লাহতায়ালা এই মাটির মানুষকে তাহার অনুগ্রহ ও করুণায় নিজের সিফাতের আয়না ও কামালাতের বাহন করিয়াছেন। ইহা ধ্বংসী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালার কামালাতের বাহন হিসেবে; তাহার হকিকতে পৌঁছাইবার যোগ্য সেতু বা মাধ্যম। এই ওজুদ আল্লাহতায়ালার ওজুদের প্রতিবিম্ব বা জেলাল। এই জেলাল আসলকে চিনিবার বা সামনের দিকে যাইবার সেতু বা সোজা পথ। এই অবস্থা বিবেচনা করিয়াই হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বলিয়াছেন,

مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ

অর্থাৎ-'যে নিজেকে চিনিল, সে খোদাকে চিনিল।' তাই এই জেলাল বা ওজুদ আসলকে বুঝিবার একটি অসিলা। জেলাল যখন বুঝিতে পারে সে প্রতিচ্ছবি মাত্র, তখন সে তাহার আসলের দিকে ফিরিয়া যায়। মানুষকে যখন ঐ আসলের দিকে আল্লাহপাক উন্নীত করেন, তখন আল্লাহতায়ালা তাহার পার্থিব জ্ঞান বুদ্ধি ধ্বংস করিয়া দেন। অর্থাৎ খোদাতালাশী ব্যক্তির নিকট হইতে এই সৃষ্ট জগৎ যখন তাহার জ্ঞান ও অস্তিত্ব লইয়া ধ্বংস হইয়া গেল, তখন মানুষ তাহার আসল ও অবিনাশী সত্ত্বা ফিরিয়া পায়। ইহারই একটি হকিকত তখন ছালেক বা খোদা তালাশীর নিকট উদ্‌ভাসিত হয়। আরেফের এই হকিকতই কালবের অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে বোধগম্য হইয়া যায়। এই রূপে ছালেক আসমা ও সিফাত রাজ্যের মধ্য দিয়া চলিতে চলিতে এমন স্থানে পৌছাইয়া যায় যেখানে সিফাত সমূহের কামালাত পৌছাইতে পারে না। তখন ছালেককে আল্লাহতায়ালা তাহার জাত মোকাদ্দাস-এর সর্বোচ্চ নিদর্শন দান করেন; যাহা কোনো ক্রমেই বোঝা যায় না। এই স্থানে পৌঁছাইলে মানবীয় সমস্ত অবস্থা ও সত্ত্বা ধ্বংস হইয়া যায়। 'ওজুদ মাওহুব লাহু'র মাধ্যমে আসমা ও সিফাতের নূরের সহিত যুক্ত সমস্ত সৃষ্টি বস্তুর সহিত তখন তাহার সম্বন্ধ লাভ হয়। ছালেক তখন সকল ব্যক্তি ও বস্তুর হাকীকী রূপ দেখিতে পারেন। এই রূপ একজন সাধককে আল্লাহতায়ালার খাস করিয়া তাহাকে অসিলা নির্বাচিত করিয়া মানব জাতির মুক্তি ও ত্রাণের ব্যবস্থা করেন। তাহাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً

অর্থাৎ-'নিশ্চয়ই আমি দুনিয়াতে খলীফা প্রেরণ করিব।' (সূরা বাকারাঃ ৩০)

আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ ও ফানা লাভের পর আত্মিক দর্শন বিভিন্ন সাধক বিভিন্ন প্রকারে বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব তাহার এক ওয়াজে হযরত ইব্রাহিম খাওয়াস (রঃ) এর একটি ঘটনা উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি (ইব্রাহিম খাওয়াস) বলিয়াছেন, আমি একটি জংগলে থাকিতাম। যে স্থানে বহুদিন পর্যন্ত কোনো লোকের সাক্ষাৎ পাই নাই। তারপর একদিন এমন স্থানে উপস্থিত হইলাম, যেখানে আমার ভয় করিতে লাগিল। এমন সময় সেই ভয়ংকর স্থানে একটি যুবককে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, "তুমি কে?" যুবক উত্তর করিল "তিনিই তিনি।" আমি তখন বলিলাম, 'তুমি যদি ঐ রূপ ফানার স্তরে পৌঁছাও, তাহা হইলে তোমার জীবন উৎসর্গ করিয়া দাও।' এই কথা বলিবার সংগে সংগে যুবক মাটিতে পড়িয়া গেল। আমি নিকটে যাইয়া দেখিলাম তাহার প্রাণ বায়ু বাহির হইয়া গিয়াছে। তাহাকে দাফন করিবার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করিতে গেলাম। ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম লাশ অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে।

হঠাৎ আমি গায়েবী আওয়াজ শুনিতে পাইলাম যে, যুবক ইব্রাহিম এমন এক ব্যক্তি ছিল মালেকুল মউত যাহাকে খুঁজিয়া পায় নাই। বেহেশত যাহাকে সন্ধান করিয়াও পায় নাই। দোযখ তাহাকে খুঁজিয়া ব্যর্থ হইয়াছে।" আমি তখন জিজ্ঞাসা করিলাম, 'তাহা হইলে সে গেল কোথায়?' তখন আবার গায়েবী আওয়াজ হইল; সত্যিকার স্থানে।

হযরত গউস পাক (রঃ) ফানা প্রাপ্ত বুজর্গদের সম্বন্ধে বলেন, "তাহারা শাহী দরবারের মেহমান। সকাল সন্ধায় তাহাদের জন্য শাহী খানার ডালা আসে। তাহারা আল্লাহর রাজ্যে আল্লাহর দয়ায় পরিভ্রমণ করেন, আল্লাহ তাহাদের ভূমন্ডল ও নভোমন্ডল পরিভ্রমণ করান। আবার বলিতেছেন, তাহারাই আল্লাহতায়ালার জাতপাকের ইতেবার হকিকতে কাবার দ্বার। তিনি নিজ সম্পর্কে বলিতেছেন, "আমি কাবা শরীফের দ্বার। আমি তোমাকে বলিয়া দিব কি ভাবে হজ্জ করিতে হয়। আমি তোমাকে এমন কথা শিখাইয়া দিব যদ্বারা তুমি কাবার মালিকের সাথে কথা বলিতে পারিবে।"

হযরত মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "নিজেকে পরিপূর্ণ রূপে ভুলিতে পারিলেই আল্লাহপাকের নূর তোমার অন্তরের মাঝে দেখা দিবে। তাহা হইলেই আল্লাহপাকের নূর সমুদ্রে ডুব দিতে পারিবে। তখন তুমি নিজের আসল সত্ত্বাকে চিনিতে পারিবে। তুমি যদি অন্ততঃ ৪০ দিন সকল কিছুই ভুলিয়া বুজর্গগণের সান্নিধ্যে কাটাইতে পার, তাহা হইলে তোমার অন্তর বাগানে গোলাপ ও চামেলী ফুল আল্লাহপাক ফুটাইয়া দিবেন; যেমন হযরত ইউসুফ (আঃ) এর স্মরণে নির্গত অশ্রুতে হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর চক্ষু দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইয়াছিল। তুমি যখন ইউসুফ (আঃ) এর মত পূর্ণ সৌন্দর্যময় নও, তখন তুমি হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর মত সকল কিছু ভুলিয়া হযরত ইউসুফ (আঃ) এর জন্য রোদন কর। তুমি যখন শিরীর মত সর্বাংগ সুন্দর নও, ফরহাদের মত পাগল হইয়া শিরীর জন্য ছুটিয়া বেড়াও। মজনুর মত নিজেকে ভুলিয়া লায়লীর জন্য পাগল হওয়ার মত আল্লাহকে পাওয়ার জন্য পাগল হও। তাহা হইলেই তোমার অন্তর চক্ষু খুলিয়া যাইবে-অন্তর বাগানে ফুল ফুটিবে।"

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, "দুনিয়া অভিশপ্ত, দুনিয়াই মালাউন”। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) বর্ণিত আর এক হাদীসে আছে- "তোমরা যদি আমার সান্নিধ্যে সৃষ্ট অবস্থায় থাক এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণে নিয়োজিত থাকিতে পার-তবে পথে-ঘাটে, শয়নে-জাগরণে আল্লাহর ফেরেশতা তোমাদের সাথে করমর্দন বা মোছাহেফা করিবেন"।

তাই বলা হইতেছে, তোমরা যদি আল্লাহর সহিত এই দুনিয়াতেই মিশিয়া থাকিতে চাও, তাহা হইলে ইনসানে হাকীকী লাভ করিয়াছেন, এমন কোনো কামেল ব্যক্তির সান্নিধ্যে থাকিয়াই তাহার নির্দেশ মত চল ও সমস্ত ভুলিয়া শুধু আল্লাহতায়ালাকেই মকসুদ ও মতলুব মনে কর-তাহা হইলেই তোমরা আল্লাহতায়ালার সহিত এই দুনিয়াতে থাকিয়াই মিশিয়া যাইতে পারিবে। বেহেশত-দোযখ, মালেকুল মউত কেহই তোমাদের খুঁজিয়া পাইবে না। তোমরা সত্যিকার স্থানে ফেরত যাইতে পারিবে। এইরূপ ইনসানে হাকীকী অর্জন করিয়া ছিলেন আমার দয়ালপীর কেবলাজান হুজুর হযরত মাওলানা খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। তাই তাঁহার রূহানী তাঈদ মদদ যাহাতে পাইতে পার-সেই চেষ্টায় নিয়োজিত হও। তাহা হইলেই তোমরা মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইতে পারিবে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD