Logo

'ফানাফিল্লাহ' বা আল্লাহতে বিলুপ্তির বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২২:১৮
'ফানাফিল্লাহ' বা আল্লাহতে বিলুপ্তির বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে আলোচনা
ছবি: সংগৃহীত

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘ফানা ও বাকা’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ 'ফানাফিল্লাহ' বা আল্লাহতে বিলুপ্তির বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

পৃথিবী ও পরকালের যাবতীয় বস্তু ও ব্যক্তির আকর্ষণ ও মহব্বত ত্যাগ করিয়া কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালাতেই দৃষ্টি ও আকাংখা নিবদ্ধ রাখাই ফানা।

কারণ আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোনো কিছুর প্রতি দৃষ্টি থাকা বস্তুতঃ আপন আকাংখা বা নাফসের খেয়ালের উপাসনা করা। অন্য সকল বস্তু হইতে খেয়াল বা আকর্ষণ আল্লাহতে নিবদ্ধ হওয়াকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ফানা-এ-জাত মতলোক' বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইহাকে নিঃশর্ত ফানা বলে। ইহাই বেলায়েতে মুহাম্মদী বা আকরাবিয়াতের মাকাম বা নবী (আঃ) দিগের বেলায়েতের মাকাম। ইহা এমন একটি স্তর, যে স্তরে ছালেক বা খোদাতালাশী ব্যক্তির ইচ্ছা, আকাংখা, নিজস্ব চেতনা ও জ্ঞান কিছুই থাকে না। ছালেক পরিপূর্ণ রূপে আল্লাহতায়ালাতে তাওয়াক্কুল বা নির্ভর করিয়া থাকে।

ছালেক যখন এই রূপ আত্মিক অবস্থায় উপনীত হয়; তখন আল্লাহতায়ালা তাহাকে দয়া করিয়া এমন নৈকট্য দান করেন যে, ছালেক তখন নিজেকে নিজের সহিত যে রূপ সম্বন্ধযুক্ত, আল্লাহতায়ালার সহিতও একইরূপ সম্বন্ধযুক্ত মনে করে, আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে এই রূপ জ্ঞান লাভ করে। এমতাবস্থায় ছালেক, "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" অর্থাৎ যে নিজের নাফসকে চিনিল, সে আপন প্রভুকে চিনিল এবং হযরত আদম (আঃ) তওবার মাকামে "আমার নিজের নাফসের উপর অত্যাচার করিয়াছি বলিয়াছিলেন" সেই নাফস বলিতে কি বোঝাইয়াছিলেন-তাহাও তাহার উপলব্ধিতে আসে। আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতে ওয়াল আরদ"-অর্থাৎ আল্লাহ আসমান জমিনের নূর এবং "অছিয়া কুরছিয়্যু হুস সামাওয়াতে ওয়াল আরদ" অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার সিংহাসন আসমান ও জমিন ব্যাপী এবং সুরা এখলাসে আল্লাহতায়ালার যে আহাদাত' এর বাণী ধ্বনিত হইয়াছে তাহার তাৎপর্য ছালেক অনুভব করিতে পারে ও আত্মিক দর্শনের দ্বারা জ্ঞান লাভ করিতে পারে। সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ব্যাপী যে আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব বা লা মাওজুদা ইল্লাল্লাহ্ বা আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব ব্যতীত কোন জিনিসই বিরাজমান নয় এবং আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব ও একত্ব এবং তাহার অনাদি অনন্ত সত্ত্বা যে সমস্ত সৃষ্টি জগৎ লইয়া বিস্তৃত; ছালেক তাহা তাহার আত্মিক দর্শনে দেখিতে পায়। ছালেক ইহাও অনুভব করিতে পারে যে সমগ্র সৃষ্টি জগৎ আল্লাহতায়ালার জাত পাকের মধ্যে নিমজ্জিত রহিয়াছে।

বিজ্ঞাপন

সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহপাক মানুষকে যে সকল গুণের সমষ্টিগত আধার কল্পনা করিয়াছিলেন বস্তুতঃ ইহা সেই সমষ্টি গুণের স্তর। সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহতায়ালা তাহার কল্পনাগুণ দ্বারা মানুষের মধ্যে হায়াৎ (আয়ু), এলেম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা), এরাদত (ইচ্ছা শক্তি), সামাওয়াত (শ্রবণ শক্তি), বাছারাত (দর্শন শক্তি), কালাম (বর্ণন শক্তি), তাকবীন (সৃজন শক্তি) ও হোব্ব (প্রেম গুণ) দ্বারা কল্পনা করিয়াছিলেন এবং সৃষ্টি জগতে আসিবার পূর্বে তাহার নিজস্ব হাকীকী গুণ হইতে মানুষকে এই সকল গুণ দান করিয়াছিলেন। এই সকল গুণকে সমাবিস্ট করিবার জন্যই মানুষের দেহ বা আদম এর সৃষ্টি করিয়াছিলেন।

আদমের অন্ধকার বা তম দোষের মধ্যেই ঐ সকল গুণের সমষ্টি বা অজুদ মিশ্রিত থাকে। যে অজুদকে আদামাত হইতে মুক্ত করিলেই আল্লাহতায়ালা তাহার সৃষ্টিকে দয়া করিয়া কবুল করেন ও প্রেমের পাত্র করিয়া তাহার হেরেমের জগতে প্রবেশের অধিকার দান করেন। আকরাবিয়াতের স্তরে ছালেক তাই আল্লাহতায়ালার মহব্বত, সিফাত ও জাতের সহিত পরিচিত হয়। ছালেকের এই চেতনা আসে যখন তাহার দেহ হইতে আদামাত' ঝরিয়া যায় এবং শুধুই অজুদ' বিদ্যমান থাকে। তাহার পরবর্তী স্তরে আল্লাহতায়ালা মহব্বত করিয়া তাহার আপন পরিচয় দান করিবার জন্য বান্দাকে তাহার নৈকট্য দান করেন। আদামাত ঝরিয়া যাইবার স্তর বেলায়েতে ছোগরার স্তর।

এই স্তরে জেল্লী বা নূরের প্রতিচ্ছবির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ হয়। সেই স্তর হইতে আল্লাহ যাহাকে নিকটে টানিয়া লন, তিনি আকরাবিয়াতের মাকামে প্রবেশ করেন। বেলায়েতে নবুয়তস্থিত কাওছের মাকামে যাইয়া এরাদতের কায়া দ্বারা আল্লাহর সহিত ছালেকের প্রগাঢ় মিলানানুভূতির ফানা লাভ হয়। ইহার পর বেলায়েতে উলিয়ার স্তরে ছালেকের আগুন, পানি ও বাতাস-এই তিন লতিফা পবিত্র হইলে আল্লাহতায়ালার সহিত ছালেকের তিন লতিফার ফানা লাভ হয়। পরবর্তীতে কামালাতে নবুয়তের স্তরে যাইয়া বান্দার দেহের মাটীর অংশ পবিত্র হয়। তখন বান্দার দেহের সর্বাংগের সহিত আল্লাহতায়ালার ফানা বা সম্মিলন লাভ হয়।

বিজ্ঞাপন

এই রূপে কামালাতে নবুয়তের মাকাম সমূহ তয় না করিলে; আল্লাহতায়ালার সহিত প্রকৃত ফানা সিদ্ধ হইয়াছে বলা যাইবে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় ছাহেবজাদাকে উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহতায়ালার জাত সম্পর্কে লিখিতেছেন-"আল্লাহপাক হইলেন ওয়াজেবুল অজুদ বা অবশ্যম্ভাবী সত্ত্বার হকিকত যাহা যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও পূর্ণতার উৎপত্তিস্থান। সৃষ্টি বস্তু সমূহ হইল তাহার বিপরীত। আল্লাহতায়ালার এই অস্তিত্বকে অজুদ-সেরেফ বা নিরংকুশ বা অবিমিশ্র শুভগুণের উৎপত্তি স্থলও বলা হয়।

এই উৎপত্তি স্থান সমুদয় সৌন্দর্য, শুভগুণ ও কর্মের আদি ও মূলের মূল। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন, সৃষ্টি জগতের যাবতীয় সম্বন্ধ তথা হইতে আসিতেছে, তথা হইতেই নিক্ষিপ্ত, যে অস্তিত্ব সাধারণ ও সমুদয় বস্তুর মধ্যে ব্যাপ্ত; তাহা আল্লাহপাকের সেই বিশিষ্ট অস্তিত্বের প্রতিবিম্ব-আর এই প্রতিবিম্বের অর্থ হইল অবতরণীয় স্তর সমূহে হযরতে অজুদ বা সেই মহান অস্তিত্বের প্রকাশ। এই প্রতিবিম্ব সমূহের মধ্য হইতে শ্রেষ্ঠ ও পূর্বোবর্তী ও সম্মানীয় প্রতিবিম্ব যাহার মধ্যস্থতার সহিত আল্লাহতায়ালার জাত পাকের বিধেয় হইয়া থাকে। অতএব মূল বস্তুর মর্তবায় আল্লাহু অজুদুন বা আল্লাহতায়ালাই অস্তিত্ব। অথবা আল্লাহ ব্যতীত কোনো অস্তিত্ব নাই-এই জ্ঞান ছালেক তখন লাভ করিতে, বুঝিতে ও অনুধাবন করিতে সক্ষম হয়।"

ওয়াজেবুল অজুদ যেমন সমস্ত সৌন্দর্য ও শুভ গুণের আধার বা উৎপত্তিস্থল, আদম হইল তাহার বিপরীত অর্থাৎ সমস্ত দোষের আধার। অজুদ সেরেফের বিপরীত হইল আদম সেরেফ বা নিছক নাস্তি বা সকল দোষের আধার। ওজুদ দ্বারা সে রঞ্জিত বা অভিভূত হয় নাই। ফানা প্রাপ্তি হইবার পর ছালেক যখন আল্লাহতায়ালার জাত ও সিফাতের পূর্ণজ্ঞান লাভ করেন, পূর্ণ আনফাস সিদ্ধ হন, তখন ওজুদ সেরেফের রংগে রঞ্জিত হইয়া আদম ছেরেফও সুসজ্জিত হয় ও পূর্ণ সৌন্দর্য লাভকরে। এই রূপে আল্লাহতায়ালার শুভ নাম, গুণ ও শানের সমষ্টিগত প্রকাশস্থল অজুদের সহিত ফানা প্রাপ্ত হইলে পরে ঐ ব্যক্তির আদামাতের স্বভাব চলিয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

এই স্তরে আসিয়া স্বভাবতই বুদ্ধি বৈকল্য ঘটে। ইহা বেলায়েতে ছোগরার স্তর। ঐ স্তরে যিনি উন্নীত হন তিনি আমি অর্থে তখন আল্লাহতায়ালাকেই বোঝাইয়া থাকেন। এই আমি আল্লাহতায়ালার জাতকেই বোঝা যাইবে। এই আমি আল্লাহর মধ্যে হারাইয়া যাওয়া আমি। তাহার অর্থ এই নয়

যে, "আমি" আল্লাহ হইয়া গিয়াছে, ইহার অর্থ এই যে এই আমির নিজস্ব জ্ঞান বিলুপ্ত হইয়াছে। এই আমি সকল কিছুকেই খোদা বলিতেছে না, কিন্তু খোদাকে এক দেখিতেছে ও খোদার অস্তিত্ব হইতে কোনো কিছুই পৃথক দেখিতেছে না। সকলই আল্লাহতায়ালা নয় কিন্তু সকলই আল্লাহতায়ালার, সকল কিছুতেই আল্লাহতায়ালা বিরাজিত এই উপলব্ধি করিতেছে। এই স্তর তৌহিদে ওজুদীর স্তর। 'তৌহিদে ওজুদী' স্তর হইল জেল্লীর মাকাম বা ফানা ফির রাসূলের মাকাম। আর আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত সংশ্লিষ্ট যে অবস্থা তাহা হইল আকরাবিয়াতের মাকামে ফানা প্রাপ্তির অবস্থা। এই অবস্থায় বেলায়েতে ছোগরার নেশা হইতে মুক্ত হইয়া ছালেকের এই উপলব্ধি হয় যে, আল্লাহতায়ালার জাত ভিন্ন সৃষ্টির অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব নাই।

সকল গুণ ও কর্ম আল্লাহতায়ালার-ছালেক তখন তাহা অনুভব করিতে পারে। এই আকরাবিয়াতের স্তর হইল আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শান অর্থাৎ আসমা ও সিফাতের জগৎ। আদামাত হইতে মুক্তি লাভ করিয়া ছালেক আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণ সমূহের নূর দ্বারা নিজেকে রঞ্জিত করিয়া লয়। মূলতঃ ছালেকের মধ্যে আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহের গুণাগুণ আসিতে থাকে। ছালেক আল্লাহতায়ালার ফিতরাতে ফিতরাত প্রাপ্ত হইতে থাকে। তাহার মধ্যে ছবর, তাওয়াক্কুল, রেজা, তসলিম প্রভৃতি গুণাবলী উদভাসিত হইতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

আকরাবিয়াতের মাকামে ফয়েজ পতনের স্থান হইল নাফস। নাফসের উপর ফয়েজ পতনের কারণে নাফস তখন আল্লাহতায়ালার প্রেমে মাতোয়ারা হয়। ইহার পর কাওছের মাকামের অধ্যায়-যে স্থানে মুরীদ আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত আহাদিয়াত প্রাপ্ত হয়। এই স্থানে মুরীদ অনির্দিষ্টভাবে বা সাধারণ অর্থে আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত বিলীন হয় বা ফানা লাভ করে বটে এবং হাকীকী সিফাত সমূহের সহিতও পরিচিত হয়। তবে আল্লাহপাকের জাত বা সিফাত সমূহের সহিত সুনিদিষ্ট ভাবে পরিচিত হয় না। বেলায়েতে কোবরা হইতেই বা আকরাবিয়াত হইতেই ছালেক আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত সমূহে ছায়ের শুরু করিতে পারে। ইহাকে ছায়েরে ফিল্লাহ বলে।

ছায়েরে ফিল্লাহর দুইট স্তর রহিয়াছে। ছায়েরে এসমোজ্জাহের ও ছায়েরে এছমোল বাতেন। এই উভয় ছায়েরই বস্তুতঃ নিজের মধ্যে সমপন্ন করিতে হয়। কাওছের শেষ মাকামে আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত আহাদাত বা ফানা লাভ করিবার জন্য ছালেক তখন আপন অস্তিত্বের মধ্যেই আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানসমূহের নূর পতন হইতে দেখে। বেলায়েতে কোবরার শেষ মাকামে "ওজুদ মাওহুব লাহু” দ্বারা বা খোদাদত্ত শরীর দ্বারা ছালেক আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত সমূহে ভ্রমণ করে। এই হাকীকী সিফাত সমূহের নূর সমূহ ছালেক তখন তাহার নিজের রূহ হইয়া নাফসের উপর পতিত হইতে দেখে। এই হাকীকী সিফাতের নূর ছালেকের নাফসকে আল্লাহমূখী ও ফিতরাতকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করিয়া তোলে।

বেলায়েতে উলিয়ার মাকামে ছালেকের এসমোল বাতেন বা গুণ মিশ্রিত নাম সমূহে ছায়ের শুরু হয়। এই মাকামে গেলে নাফস আল্লাহমুখী হয় এবং ফেরাউনী স্বভাব মুক্ত হয়। ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা এই ছায়ের শুরু হয়। আল্লাহতায়ালার এসমোল বাতেনের ছায়েরে ছালেকের আগুণ, পানি ও বাতাস-এই তিন লতিফা পবিত্র হয়। পরবর্তীতে কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত ও কামালাতে উলুল আজমের পর্যায়ে ছালেক আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী লাভ করিয়া সর্ব দেহের সর্ব লতিফা সমূহের পবিত্রতা লাভ করে। এই স্তরে ছালেকের সর্ব দেহ পবিত্রতা লাভ করিবার জন্য ছালেক আল্লাহতায়ালার এলহাম শুনিতে পায়।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার জাতি ফয়েজ সূক্ষ্ম হইবার কারণে ছালেক বুঝিতে পারে না যে তাহার উপর ফয়েজ ওয়ারেদ হইতেছে। তবে ছালেক যখন এই মাকামের ফয়েজ গ্রহণে অভ্যস্ত হয়, তখন সে নিজেকে "ফাকানা কাবা কাওছাইনে আও আদনা"-এই মাকামে দেখিতে পায়। দায়েরায়ে কামালাতে রেছালত ও কামালাতে উলুল আজমে আসিয়া ছালেক পুনরায় তাহার উপর নূর পতনকে উজ্জ্বল রূপে দেখিতে পায়। কামালাতে উলুল আজমের মাকামে ছালেক কুরআন মজীদের রহস্যাবৃত অক্ষর সমূহ তথা আলিফ, লাম, মিম, ইয়াসিন প্রভৃতির গুপ্ত ভেদ সমূহ বুঝিতে পারে।

কামালাতের দায়েরা সমূহ শেষে খোদাপ্রাপ্তির পথে ছায়েরের দুইটি বিশেষ পথ রহিয়াছে। ইহার একটি হইল ইবাদতের পথ, অন্যটি মহব্বত বা প্রেমের পথ। ইবাদতের পথ শেষ হইয়াছে মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকামে; আর মহব্বতের পথ শেষ হইয়াছে হোব্বে ছেরফার মাকামে। খোদাপ্রাপ্তির পথে ইবাদত ও মহব্বত অর্থাৎ উপাসনা ও প্রেম এই উভয় গুণই প্রয়োজন।

আকরাবিয়াতের মাকাম হইতে ছালেক আল্লাহতায়ালার প্রকৃত পরিচয় লাভ করে। তাই এই মাকাম হইতেই ছালেক আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান, শয়ুনাত, জাতের ইতেবার ও পবিত্রতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য আত্মিক ভ্রমণ বা ছায়ের শুরু করে। এই ছায়ের নিজের মধ্যেই শুরু হয়। কারণ আল্লাহ বলেন, "আমিতো তোমার ভিতরেই আছি, আমাকে দেখ না কেন"? আল্লাহতায়ালার এসেম, বা নাম, সিফাত বা গুণ, শান, ইতেবার ও পবিত্রতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য যে ছায়ের বা আত্মিক ভ্রমণ তাহাই হইল ছায়েরে ফিল্লাহ। আকরাবিয়াতের মাকাম হইতেই এই ছায়ের শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

আকরাবিয়াতের মাকামে মোরাকাবা করিতে হয় যে আল্লাহতায়ালার যে জাতপাক আমার অধিকতর নিকটবর্তী সেই জাত হইতে নূর বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা আসমা ও সিফাত দিয়া ছালেকের রূহ ও রূহ হইতে নাফসের উপর পড়িতেছে। এই রূপে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের নূর ছালেক' আকরাবিয়াতের স্তর হইতেই লাভ করিতে থাকে। আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের নূর মহব্বতের মাকামদ্বয় হইতে পীরে কামেল ও রাসূলে করীম (সঃ) এর ছুরাতে রূহী বেমেছালী হইয়া ছালেকের রূহ, রূহ হইতে নাফসের উপর পতিত হয়। তখন রূহ ও নাফস এক হইয়া যায়।

আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহে ভ্রমণের সময় ছালেক বিভিন্ন সিফাত হইতে বিভিন্ন রংয়ের নূর দেখিতে পায়। কিন্তু এই সকল সিফাত সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট জ্ঞান লাভ বা ভাষায় প্রকাশের মত জ্ঞান লাভ করিতে পারে না। ছালেক যাহা অনুভব করে তাহা হইল, প্রতি সিফাতের মোরাকাবা করিবার সময়ে ঐ সিফাতের নূর পতন হইতেছে। কখনো বা উরুজ করিতেছে, ইহাও দেখিতে পায়। বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরাতে আসিয়া ছালেক ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা এছমোল বাতেনের ছায়ের শুরু করে। ওজুদ মাওহুব লাহু হইল খোদা প্রদত্ত শরীর। এই শরীর নূরের তৈরী যাহা ছালেক অনেক খানি তাহার নিজ চেহারার মত দেখিতে পায়। এই ওজুদ মাওহুব লাহুকে হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেব তেফলুল মায়ানী বা আল্লাহ প্রেমের নবজাত শিশু রূপে বর্ণনা করিয়াছেন। কলেমা শরীফের জেকের দ্বারা এই শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত হয়; তখন এই নূরের দেহকে বয়ঃপ্রাপ্ত যুবকের মতন মনে হয়। এই দেহের গতি বিদ্যুতের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশী যাহা দ্বারা সেকেন্ডের মধ্যেই সমগ্র সৃষ্টিজগৎ পরিভ্রমণ করিয়া আসা যায়।

বেলায়েতে উলিয়ার দফতরে এছমোল বাতেনের ছায়ের এই ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারাই করিতে হয়। এই ছায়েরে আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাত মন্ডিত নাম সমুহের সাথে নূরের দ্বারা পরিচিত হয়। একই সাথে ছালেকের দেহের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সহিত আল্লাহতায়ালার জাতের ফানা সম্পন্ন হয়। ছালেক তখন জগতের আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সহিত আল্লাহতায়ালাকে মিলিত দেখিতে পায় ও বুঝিতে পারে যে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সর্ব বস্তুতেই আল্লাতায়ালার অস্তিত্ব বিরাজমান। পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্রাদির আগুন, পানি, বাতাসের সকল কিছুর সহিতই আল্লাহতায়ালা বিরাজিত, ছালেক তখন এই জ্ঞান লাভ করে। একই সাথে আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা যে সমগ্র জগৎ ব্যাপী তাহাও বুঝিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালা যে সকল কিছুই সম্পর্কে জ্ঞানী বা জ্ঞাত, তাহার নিকট হইতেই সকল প্রাণী জীবন লাভ করে, তাহার ইচ্ছাতেই সকল কার্য করণ সম্পাদিত, তিনি সকল কিছুর দর্শক ও শ্রোতা-এই জ্ঞান ছালেক লাভ করে। সমগ্র বস্তু যে আল্লাহতায়ালার জেকেরে রত তাহাও ছালেক শুনিতে পায়। আল্লাহতে বিলীন প্রাপ্ত ছালেক আত্মিক দর্শনে দেখিতে পায় যে সর্বত্র বিরাজিত আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বের মধ্যে সে নিজেও অস্তিত্ব বিহীন হইয়া গিয়াছে। নিজেকে ছালেক তখন হারাইয়া ফেলে। আমি সত্ত্বার তাৎপর্য ছালেক তখন বুঝিতে পারে।

এই স্তরে যাহা হয় তাহা হইল ছালেক তখন নিজের হাকীকী অস্তিত্ব অর্থাৎ যে সকল গুণাবলী দিয়া আল্লাহপাক বান্দাকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, সেই সকল গুণাবলীই শুধু তখন তাহার মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। এই অবস্থা হইল আলমে আরওয়াহ জগতে আসিবার পূর্বে ও আল্লাহতায়ালা কুন বলিয়া আদেশ দান করিবার পূর্বের অবস্থা। অতঃপর সমগ্র সৃষ্ট জীব ও জগৎকে আল্লাহতায়ালা একই আদেশে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাহারা ঐ অবস্থায় একই সাথে আল্লাহপাকের আদেশ শুনিয়াছিল। এই হাকীকী অবস্থা ছালেক বা খোদাপ্রাপ্তি সাধনার পথের পথিক ফিরিয়া পায়। তখন তাহার মধ্যে আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের দোষ কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। সকলই আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লী দ্বারা দূরীভূত হইয়া যায়। তখন ছালেক হাকীকী অবস্থা ফিরিয়া পাইবার কারণে একই সংগে সমগ্র সৃষ্ট জীবকে ও সৃষ্টিজগৎকে দেখিতে পায়। অবশ্য তাহাও হাকীকী রূপেই ছালেকের চোখে দেখা দেয়।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় ছাহেবজাদাকে লিখিত মতবুবে (২৩৪ মকতুব-মকতুবাত শরীফ) বলিতেছেন যে, আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত ছালেক ফানা প্রাপ্ত হইবে, না তাহার গুণের সহিত ছালেক প্রথম পরিচিত হইবে ইহা সম্পর্কে সুনিদিষ্ট কোনো বক্তব্য নাই। যে ছালেকের লক্ষ্য নাম, গুণ ও শান নয়, নিছকই জাতপাক; সেই সাধক পূর্বেই আল্লাহতায়ালার জাতের সহিত মিলিত হইবেন, কোনো সিফাত বা গুণ তাহার দৃষ্টি গোচর হইবে না। এই স্তরের আত্মিক অনুভূতি সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু"-অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের সত্ত্বাকে চিনিল সেই ব্যক্তি আপন প্রভুর সত্ত্বাকে চিনিল-এই হাদীস শরীফের তাৎপর্য ছালেক এই স্তরে যাহা অনুভব করে তাহা হইল তাহার আদামাতের দোষ ও ক্ষতিকেই নিজের বলিয়া জানে ও সকল উৎকর্ষ ও আত্মিক দৃষ্টি বা গুণ যাহা সে ঐ স্তরে লাভকরে তাহা যে আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের নূর হইতে বা আল্লাহতায়ালার সিফাত সমূহ হইতে আগত বলিয়া জানে। ইহা ছালেক তখন স্পষ্টরূপে বুঝিয়া লয়।

বিজ্ঞাপন

সমগ্র সৃষ্টি জগৎ ও সৃষ্ট জীব সমূহ ও নূরে মুহাম্মদীকে একই সাথে হাকীকী অবস্থায় দেখিতে পাইয়া আল্লাহতায়ালাই যে আসমান জমিনের নূর এই আয়াতে করীমার অর্থও ছালেকের নিকট স্পষ্ট হয়। ইহা ছাড়াও সকল সৃষ্টি সমূহ যে আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব ভিন্ন নাস্তি, ইহাও তাহার নিকট প্রতীয়মান হয়। যাহা কিছু গুণ সৃষ্টি জগতের মধ্যে নিহিত তাহা সবই যে সেই মহান অস্তিত্ব হইতে যাহা আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাত, এবং ইহাই প্রকৃত গুণ ও পূর্ণতা, রূপ ও সৌন্দর্য। কাজেই আসমান ও জমিনের নূর ঐ মহান অস্তিত্ব যাহা অবশ্যম্ভাবী জাতের হকিকত বা প্রকৃত তত্ত্ব। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় পুত্রের উদ্দেশ্যে বলিতেছেন এই নূর জেলাল বা প্রতিবিম্ব সমূহের মাধ্যমে আসমান ও জমিনে সমাগত।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, চিমনি বা কাঁচের ফানুস দ্বারা প্রদীপ আবৃত। এই কাঁচের ফানুসের দ্বারা প্রদীপের আলো দর্শকের চোখে বেশী নজরে পড়ে। এই কাঁচের ফানুস হইল মধ্যস্থতা।

মানুষের নিজস্ব যাহা তাহা নাস্তি ও অন্ধকার এবং মানুষের মধ্যে দোষণীয় প্রবণতা সমূহ উক্ত নাস্তি হইতে উদ্ভত। পক্ষান্তরে পূর্ণতা ও গুণ সমূহ যাহা ঐ নাস্তির মধ্যেই অবস্থিত তাহা আল্লাহতায়ালার মহান অস্তিত্বের পূর্ণতা সমূহের নূর হইতে ধারণকৃত। পার্থিব রূপ লাবণ্য যাহা নাস্তি তাহা হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া আল্লাহতায়ালার স্থায়ী গুণ ও শানের প্রতি দদৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে এই জন্য আল্লাহতায়ালা ও তদীয় রাসূলে করীম (সঃ) উপদেশ দান করিয়াছেন।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভের জন্য যাহা প্রয়োজন সে সম্পর্কে তরিকতের পীরানে পীরগণ বলিতেছেন-

  • আদামাত হইতে মুক্ত হওয়া তথা নাফসকে পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত করা যাহা সাধনা ও চেষ্টা সাপেক্ষ।

  • নিজেকে সকল দোষের উৎপত্তিস্থল মনে করা।

  • নিজেকে খালি ও সকল প্রকার জ্ঞান শূন্য মনে করা।

  • আল্লাহতায়ালার মহব্বত বা প্রেমকেই সার জানা।

  • জজবা ও আল্লাহতায়ালার আকর্ষণ।

  • ছায়েরে ফিল্লাহর পূর্ণতা।

  • আদামাত হইতে মুক্ত হইয়া ওয়াজেবুল অজুদের প্রতিবিম্ব বা ওজুদে উপস্থিত হওয়াকে ছায়েরে এল্লাল্লাহ বা আল্লাহতায়ালার অভিমুখে ছায়েরও বলা হয়। এখানে ছায়ের সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন।

    বিভিন্ন প্রকার ছায়েরের বিবরণঃ

    ছায়ের হইল আত্নিক ভ্রমণ। খোদাতায়ালাকে চেনা, জানা বা বুঝার জন্য ছায়ের ও ছুলুক শিক্ষা করিতে হয়। সূফীসাধকগণ ছায়ের বা আত্মিক ভ্রমণকে প্রধানতঃ চারটি ভাগে ভাগ করিয়াছেন। যথাঃ

    • ছায়েরে এলাল্লাহ-বা আল্লাহর দিকে ভ্রমণ।

  • ছায়েরে ফিল্লাহ-বা আল্লাহর মধ্যে ভ্রমণ।

  • ছায়েরে আনিল্লাহ বিল্লাহ-বা আল্লাহ হইতে আল্লাহর সাথে ভ্রমণ। এবং

  • ছায়েরে ফি আশিয়া বিল্লাহ-বা আল্লাহর সাথে সৃষ্ট বস্তুসমূহের মধ্যে ভ্রমণ।

  • প্রথম দুই ছায়ের তথা ছায়েরে এলাল্লাহ ও ছায়েরে ফিল্লাহ উরুজের সাথে সম্পর্কীত এবং দ্বিতীয় দুই ছায়ের নজুলের সাথে সংশ্লিষ্ট। অন্য কথায়-প্রথম দুই ছায়ের বেলায়েতের সহিত যুক্ত। এই দুই ছায়েরের সাহায্যে ছালেক আল্লাহতায়ালার নিকট থেকে নিকটতরে যায়; শেষ পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার জাতের সান্নিধ্য, মিলন, দরশন, ফানা ও বাকা লাভ করে। এই পর্যায়ে ছালেক আল্লাহর প্রেম সমুদ্রে ডুবিয়া থাকিতে ভালবাসে। দুনিয়ার দিকে আর আসিতে চায় না। কিন্তু আল্লাহতায়ালা বান্দাদের ভালবাসেন। তাই আল্লাহ ভোলা মানুষদের আল্লাহমুখী করিবার জন্য উক্ত ছালেককে কামালাতে নবুয়তের মর্যাদা ও জ্ঞান দিয়া দুনিয়ার দিকে পাঠাইয়া দেন। এ ক্ষেত্রে ছালেক আরও দুই প্রকারের ছায়ের সম্পন্ন করে যে ছায়েরদ্বয়কে ছায়েরে আনিল্লাহ বিল্লাহ এবং ছায়েরে ফি আশিয়া বিল্লাহ বলে।

    ছায়ের সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "ছায়ের বা আত্নিক ভ্রমণ হইল এলেমের তারতম্য মাত্র। ছায়েরে এলাল্লাহ এলেমের পরিবর্তন মাত্র। যথা ইতর বস্তুগণের জ্ঞান লাভকরতঃ উচ্চতর বস্তুর জ্ঞান প্রাপ্তি। তৎপর তাহা হইতে আরও উচ্চতর বস্তুর জ্ঞান লাভ, এইভাবে উঠিতে উঠিতে সৃষ্ট বস্তু সমূহের এলেম বা জ্ঞান পূর্ণরূপে তিরোহিত হওয়ার পর অবশ্যম্ভাবী খোদাতায়ালার জাতের জ্ঞান লাভ। এই অবস্থাই ফানা। এইরূপে ছায়েরে ফিল্লাহ ও এল্মের পরিবর্দ্ধন যাহা অবশ্যম্ভাবী মর্তবা খোদাতায়ালার এসেম, সিফাত, শান, ইতেবার এবং পবিত্রতা গুণ সমূহের উক্তরোক্তর জ্ঞান লাভ।"

    ছায়েরে এলাল্লাহঃ

    আগুন, পানি, মাটি বা বাতাসের তৈরী এই দেহ হইতে বাহির হইয়া ঊর্ধ্বদিকে আকরাবিয়াতের পূর্ব পর্যন্ত যে ছায়ের তাহাই ছায়েরে এলাল্লাহ। এই ছায়েরের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সমগ্র সৃষ্ট জগতের জ্ঞান বা আলমে খালক্ ও আলমে আমরের জ্ঞান, আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের জ্ঞান, সিফাতে এজাফিয়ার জ্ঞান ইত্যাদি লাভ করা যায়। এই ছায়েরের উদ্দেশ্য হইল-নাফসকে সকল পার্থিব আকর্ষণ হইতে মুক্ত করা; যাহা মোর্শেদে কামেলের দয়া ব্যতীত সম্ভব নয়। মোর্শেদে কামেলই তদীয় তাওয়াজ্জুহ প্রদান করিয়া মুরীদের রূহকে নাফসের দাসত্ব হইতে মুক্ত করিয়া আল্লাহতায়ালার পথে ফিরাইয়া আনেন। মোর্শেদে কামেল ব্যতীত এই গুণ অন্য কাহারও নাই।

    এই স্তর অতিক্রম করিলে ছালেক আলমে আরওয়াহের স্তরে উপনীত হয়। এই স্তরে ছালেক অনুধাবন করিতে পারে যে, সে নিজেই সকল দোষের উৎপত্তিস্থল। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "যে পর্যন্ত না নিজেকে পূর্ণ ভাবে দোষী মনে না করা যায়, এমন কি নাছারা কাফের হইতে দোষী মনে না করা যায় বা চামড়া ওঠা খেকী কুকুরের চেয়ে অক্ষম বা খালি মনে করা না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ করার আশা করা যায় না।”

    কথিত আছে, হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব যখন আপন পীরের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন, তখন এক দিবস তাহাকে পানি আনিতে আদেশ দান করা হইয়াছিল। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব পানি আনিবার জন্য কলসী ও কূপ হইতে পানি তুলিবার নিমিত্তে সংগে দড়ি ও বালতি লইলেন। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব যখন কূপ দেখা যায়, এমন দুরত্বে উপনীত হইলেন, তখন দেখিলেন যে বনের হরিণ কূপের পানি পান করিতেছে। তিনি কূপের নিকটবর্তী হইতে হইতে দেখিলেন হরিণ পানি পান শেষ করিয়া চলিয়া গেল। তিনি যখন কূপের তীরে উপনীত হইলেন, তিনি দেখিলেন, কূপের পানির স্তর এতই নীচে নামিয়া গিয়াছে যে, দড়ি ও বালতি দ্বারা কূপ হইতে পানি উত্তোলন সম্ভব নয়। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব তখন আল্লাহতায়ালার নিকট আফসোস করিয়া বলিলেন, “হে আল্লাহ! বনের হরিণকে আপনি এই কূপ হইতে পানি দান করিলেন, কিন্তু আমি কি অপরাধ করিলাম যে আমি আসিতেই পানি শুকাইয়া গেল?"

    আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে তখন এলহাম হইল, হরিণ আল্লাহর উপর নির্ভর করে তাই তাহাকে আমি খাওয়াই। তুমিতো আল্লাহর উপর নির্ভর কর নাই। তুমি নির্ভর করিয়াছ দড়ি ও বালতির উপর। এখন দড়ি ও বালতিকে বলো কূপ হইতে পানি তুলিতে। সেই মুহূর্তে হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) হাতের দড়ি ও বালতি দূরে ছুড়িয়া ফেলিলেন।

    আল্লাহতায়ালার উপর পরিপূর্ণ নির্ভর না করিলে বা নিজেকে পরিপূর্ণরূপে খালি মনে না করিলে আল্লাহতায়ালার রহমত পাওয়া যায় না। আর আল্লাহতায়ালার সহিত ফানা লাভ প্রকৃতই তাহার দয়া ও ফজল যাহাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন, তাহা না হইলে মাটির মানুষের পক্ষে আল্লাহতায়ালার সহিত মিলন লাভ সম্ভব নয়। সূফী সাধকগণ তাহাদের মনের এই অবস্থাকে এক একজন একেক ভাষায় ব্যক্ত করিয়াছেন। কেহ বলিয়াছেন, শূন্য হও, তাহা হইলে পূর্ণ হইবে।

    হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বলিয়াছেন, "মৃত্যুর পুর্বেই মরিয়া যাও।"মৃত্যুর পূর্বে মরিয়া যাওয়ার অর্থ হইল আমি সত্ত্বা বা নাফস যাহা আদামাতের প্রকাশ সেই আমি সত্ত্বারই মৃত্যু। হযরত রাসূলে করীম (সঃ) বলিয়াছেন, মানুষ দুইবার জন্ম গ্রহণ না করিলে তাহার আপন সত্ত্বাকে চিনিতে পারে না। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব উপমা দ্বারা বুঝাইয়াছেন, জীব জগতের মধ্যে পাখীরাই দুইবার জন্ম গ্রহণ করে। তাহাদের একবার জন্ম ডিম হিসেবে। পুনরায় জন্ম শাবক হিসেবে। মানুষেরও একবার জন্ম আদামাতসহ ওজুদ হিসেবে। মানুষের দ্বিতীয় জন্ম হইল খোদাদত্ত শরীর, ওজুদ মাওহুব লাহু লাভ; যে ওজুদ মাওহুব লাহুই আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, শান ও মহাপবিত্র জাতের জ্ঞান লাভ করে।

    ছায়েরে ফিল্লাহঃ

    ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা ছালেক কাওছের মাকাম ও তঊর্ধ্ব মাকামে ছায়ের করিতে পারে। এই ছায়েরকে ছায়েরে ফিল্লাহ বলে। অবশ্য এই ছায়েরের শুরু আকরাবিয়াত হইতে। আকরাবিয়াত হইল আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ সমূহের মাকাম।

    আল্লাহতায়ালার হাকীকী গুণ সমূহের জ্ঞান লাভের জন্য আল্লাহতায়ালার গুণের পর্দা সমূহ ও গুণ মিশ্রিত নাম সমূহের পর্দায় আত্মিক ভ্রমণের বিধান রহিয়াছে। আল্লাহতায়ালার গুণ সমূহের পর্দা হইল হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাসারত, কালাম ও তাকবীন। গুণ মিশ্রিত নাম সমূহ হইল হাই, আলীম, কাদীর, সামী, বশীর, কলীম, ও খালেক। এই সকল গুণের পর্দায় ও গুণ মিশ্রিত নাম বা জাতের পর্দায় ছায়ের বা ভ্রমণের সময় ছালেক প্রতি গুণের জন্য বা প্রতি গুণমিশ্রিত নামের জন্য পৃথক পৃথক নূর দেখিতে পায়। ঐ গুণ মিশ্রিত নূর তাহার ওজুদ মাওহুব লাহুর উপরে পড়ে ও ওজুদ মাওহুব লাহু হইতে হায়াতে ওহাদানীর শরীরে পড়ে। এই রূপে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণের নূর ওজুদ মাওহুব লাহু দ্বারা ছালেক প্রাপ্ত হইতে থাকে ও নিজের মধ্যে আল্লাহতায়ালার ফেতরাত বা স্বভাব ও গুণ সমূহ আসিতেছে বলিয়া অনুভব করিতে থাকে।

    আল্লাহতায়ালার জাতপাক সম্পর্কিত জ্ঞানও লাভ হয় এই ছায়েরে ফিল্লাহ দ্বারা। মাবুদিয়াতে ছেরফার মাকামে ছালেক খোদাদত্ত শরীর ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়া দ্বারা আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদায়, যে জাত নাম, গুণ ও শানাদি হইতে পবিত্র তাহাতে ছায়ের করেন। উক্ত জাত মোজাররাদাকেই আহাদিয়াতে মোজাররাদা বলে। উহাতে সৃষ্টিস্থ বস্তুর কোনে অধিকার নাই। নাম শানাদির কোনো নিদর্শনও নাই। কেবলমাত্র মাবুদ ও বান্দার সম্পর্ক, তাহাই মাবুদিয়াতে ছেরফা। ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরিয়ার ছায়ের দ্বারা ছালেক অনুভব করিতে পারে। আল্লাহতায়ালার জাতে এই ছায়ের দ্বারা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এই কালেমা শরীফের মর্মবাণী ছালেক লাভ করিতে পারে।

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলিতেছেন যে, এই রূপে আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ, জ্ঞান, শয়ুনাত, গুণ মিশ্রিত নাম, পবিত্রতা ও জাতের নূর দ্বারা জ্ঞান লাভ করিয়া ছালেক অবশেষে এমন মর্তবায় উপনীত হয়, যাহাকে কোন বাক্যের দ্বারা ব্যক্ত করা যায় না, ইংগিতকৃতও হয় না। যাহা কোনো নাম উপনাম দ্বারাও সম্বোধিত নয়। তাহাকে কেহ স্বীয় জ্ঞানে আনিতে পারে না ও অনুভব করিতে পারে না। এই ছায়ের দ্বারা যখন ছালেক উপরোক্ত অবস্থায় উপনীত হয় তখন তাহাকে বাকা সিদ্ধ বলা হয়।

    ছায়েরে আনিল্লাহ বিল্লাহঃ

    ইহা এলেমের তারতম্য। উচ্চতম বস্তু সমূহের এলেম বা জ্ঞান লাভের পর অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জ্ঞান লাভের পর অবতরণ বা সৃষ্টি জগতের বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্য ছায়ের বা আত্মিক ভ্রমণ। যিনি এই রূপে আল্লাহতায়ালার জাত হইতে নিম্নদিকে ইতেবার, শয়ুনাত, শান, আসমা, সিফাত, প্রতিবিম্ব হইয়া অবশেষে অবশ্যম্ভাবী বস্তু হইতে সৃষ্টি বস্তু সমূহে আসিয়া উপনীত হন, তাহাকে আরেফ বা খোদার পরিচয় লাভকারী ব্যক্তি বলা হয়। এমন আরেফ সম্পর্কে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "যিনি খোদাকে লইয়া খোদাকে ভুলিয়াছেন এবং খোদা হইতে খোদার সহিত প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। তিনিই প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত, মিলিত ও বিরহী, এবং নিকটবর্তী ও দূরবর্তী।"

    ছায়ের ফি আশিয়া বিল্লাহঃ

    ইহার অর্থ এই যে, 'ছায়েরে এলাল্লাহ' এর সময়ে যাহা ছালেক ভুলিয়া যায় তাহা এই ছায়ের দ্বারা পুনরায় স্মরণে আসে। এই চতুর্থ ছায়ের প্রথম ছায়ের তথা 'ছায়েরে এলাল্লাহ' এর ঠিক যেন বিপরীত। ছায়েরে এলাল্লাহ ও ছায়েরে ফিল্লাহ খোদাতায়ালার বেলায়েত বা নৈকট্য লাভের জন্য হইয়া থাকে। ইহাকে ফানা ও বাকা বলে। তৃতীয় ও চতুর্থ ছায়ের খোদাতায়ালার দিকে আহ্বাবনের জন্য বা হেদায়েতের জন্য হইয়া থাকে।

    আল্লাহতায়ালাকে পাইবার জন্য যেমন সাধনা প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন, আল্লাহতায়ালার প্রতি প্রেম। এমনই প্রেম যে আল্লাহতায়ালাকে সৃষ্টির সকল বস্তু হইতে, এমন কি নিজের জীবনের চেয়ে বেশী ভালবাসা। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, এই মহব্বত বা প্রেম এতই শক্তিশালী যে মাটির মানুষকে তাহা সাত তলা আসমানের উপর আল্লাহতায়ালার সহিত নিবিড় মিলনের মর্যাদা দান করে। অর্থাৎ রাসূলে করীম (সঃ) মেরাজে গমন করিয়া আল্লাহতায়ালার সহিত বিশেষ মিলনের সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিলেন, যাহা তাহার খাস ফেরেশতা হযরত জীব্রাইল (আঃ) এরও নসিব হয় নাই। এই প্রেমের দ্বারাই আল্লাহতায়ালার সহিত বান্দার এমন সম্বন্ধ হয়, যাহা হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব লায়লী ও মজনুর রূপক কাহিনীর সম্পর্ক দ্বারা বোঝাইয়াছেন। এই রূপক কাহিনীতে মজনুকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, 'মজনু কে?' মজনু উত্তর করিয়াছিল, আমি। আবার তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, 'লায়লী কে?' এই প্রশ্নের উত্তরেও মজনু বলিয়াছিল আমি অর্থাৎ লায়লী ও মজনুর মধ্যে এমনই মিলন বা ফানা সংঘটিত হইয়াছিল যে মজনু তাহাকে নিজ হইতে পৃথক করিতে পারে নাই।

    ফানা ও বাকা সিদ্ধ ওলীই প্রকৃত কামেল পীরঃ

    মারেফতের পথে তিনিই যোগ্য কামেল ও মোকাম্মেল ওলী, যিনি আল্লাহতে ফানা ও বাকা সিদ্ধ হইয়াছেন, বান্দার কালব-নাফস-রূহের হাল হকিকত বুঝিতে সক্ষম ও যাহার অসিলায় আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূর আসিয়া ছালেকের নাফসের স্বভাব সংশোধন করিতে পারে, যিনি বান্দাকে সকল প্রকার দৈহিক ও পার্থিব প্রবণতা হইতে মুক্ত করিয়া আল্লাহতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারেন। তিনিই মোর্শেদ হইবার যোগ্য। তিনি যেমন নিজে আল্লাহতায়ালার নূরের সহিত পরিচিত হইবেন, তেমনি বান্দাকেও সমস্ত নাফসানিয়াত' হইতে উদ্ধার করিতে সক্ষম। তাহার অসিলা দ্বারা আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূর আগমন করে, আল্লাহতায়ালার নাম, গুণ ও শানের নূর আগমন করে, আল্লাহতায়ালার জাতের দর্শন পাওয়া যায়; তাহার সাহচর্যে ছালেকের পার্থিব প্রবণতার মৃত্যু হয় এবং তাহার সাহচর্যে ছালেকের দেহে খোদাপ্রদত্ত নূরের শরীর ওজুদ মাওহুব লাহু তৈরী হয়। তেমন সাধকই হেদায়েতের জন্য যোগ্য সাধক। তিনি আল্লাহতায়ালার সম্পর্কে যেমন জ্ঞাত, তেমনি সৃষ্টি জগতের বিষয় বস্তু সম্পর্কেও জ্ঞানী।

    হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মসনবী শরীফে ঐরূপ গুণ সম্বলিত মোর্শেদ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট মারেফাত বা খোদাতত্ত্ব জ্ঞান লাভের জন্য যাইতে নিষেধ করিয়াছেন। এক্ষেত্রে তিনি উপমা সহ বলিয়াছেন, দরিদ্রের অতিথি হইলে অনেক সময়ে আগন্তুকের জুতা চুরি হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। অর্থাৎ দরিদ্র ব্যক্তি অতিথির জুতা চুরি করিয়া নিজের প্রয়োজন মিটাইবার চেষ্টা করিয়া থাকে এমন ঘটনা বিরল নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার নূরের মধ্যস্থ হইতে পারেন না, যাহার অছিলায় আল্লাহতায়ালার সিফাতে এজাফিয়া, সিফাতে হাকীকীর নূর খোদাতালাশী ব্যক্তির রূহ, কালব ও নাফসে আসে না, তাহার নিকট খোদাপ্রাপ্তির জন্য সাধনা করিতে যাওয়া নিস্ফল। বরং তাহার নিকট খোদাপ্রাপ্তি সাধনা করিতে গেলে খোদাতালাশী ব্যক্তির নিজস্ব কোনো নেক আমল থাকিলে তাহা নিস্ফল হইয়া যাইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে।

    হযরত রূমী (রঃ) ছাহেব তাই খোদাতালাশী ব্যক্তিদের সাবধান করিয়াছেন, তাহারা যেন কামেল মোর্শেদ চিনিতে ভুল না করেন, যাঁচাই না করিয়া যেন কেহ আল্লাহতায়ালার সন্ধানের জন্য অপরিপক্ক বা প্রচারণা সর্বস্ব মোর্শেদের নিকট গমন না করে। প্রচারণা সর্বস্ব পীর যিনি বস্তুতঃ পার্থিব ধন বা গরিমা লিঙ্গু তাহার সংসর্গে থাকিলে ছালেকের আধ্যাত্মিক উন্নতিতো হইবেই না, বরং ঐ প্রচারণা সর্বস্ব বা নাকেস ব্যক্তির অন্তরের কালিমা তাহার সংসর্গ লাভ কারী ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমিত হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে।

    পক্ষান্তরে কোন দানশীল বাদশাহের নিকট গেলে অতি সামান্য সৌজন্যের বিনিময়েও প্রচুর সহায় সম্পদ মিলিতে পারে। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তদীয় মছনবী শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন; বাগদাদের বাদশাহ হারুনুর

    রশিদের সময়ে তাহার রাজত্বের অধীন কোন এক গ্রামে অতিশয় দরিদ্র এক লোক বাস করিত। ঐ ব্যক্তির কোনো সহায় সম্বল ছিল না। তাহার আশা রাজ দরবারে গমন করিয়া বাদশাহ হারুনুর রশিদের নিকট হইতে কিছু তোহফা সংগ্রহ করিয়া তাহা দ্বারা জীবন অতিবাহিত করা। তাহার নিজস্ব কোনো সম্পদ ছিল না। মরুভূমির অঞ্চল বিধায় ঐ ব্যক্তি যে অঞ্চলে বাস করিত সেই অঞ্চলে সুপেয় পানিকেই যথেষ্ট মূল্যবান মনে করা হইতো। বেচারা দরিদ্রলোক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করিয়া এক মশক পানি বাদশাহের জন্য উপঢৌকন লইয়া বাদশাহ হারুনুর রশিদের দরবারে রওয়ানা হইল। বাদশাহের দরবারে আসিতে আসিতে উক্ত পানি বিস্বাদ হইয়া গেল।

    দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনই বাদশাহের সৌন্দর্য ও গুণ। হারুনুর রশিদ পাত্রের দিকে লক্ষ্য না করিয়া বরং সেই দরিদ্র বেচারী যে তাহারই শরণাপন্ন হইয়াছে, নিজে নিঃসম্বল হওয়া সত্ত্বেও উপঢৌকন হিসেবে সামান্য বৃষ্টির পানি সংগ্রহের চেষ্টা করিয়াছে-তাহাই লক্ষ্য করিলেন।

    ঐ দরিদ্র ব্যক্তির বিস্বাদ পানিই তিনি উপঢৌকন হিসেবে গ্রহণ করিলেন ও তাহাকে পর্যাপ্ত ধন দান করিয়া তাহার জীবন চলার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। সুপেয় পানি কি, তাহা বোঝাইবার জন্য বাড়ী ফিরিবার পথে দজলা নদী তাহাকে দেখাইবার সুযোগ করিয়া দিলেন। এই গল্পের উপমা দিয়া হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ইহাই বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, প্রকৃত আধ্যাত্মিক ধনে ধনবান বাদশাহ, কামেল ও মোকাম্মেল পীরের শরণাপন্ন হইলে খোদাতালাশী ব্যক্তির আমল যতই নগন্য হউক না কেন, তাহাকে তিনি খোদাপ্রাপ্তি সাধনার পথে পৌঁছাইয়া দেন-বিস্বাদ পানির মত এখলাস বিহিন আমলের বদলে প্রকৃত এখলাস ও মহব্বত সহ আমলের সক্ষমতা দান করেন।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD