কে ছিলেন শামস-ই-তাবরিজি, যাঁর সোহবতে বদলে গেল রুমির জীবন?

ত্রয়োদশ শতাব্দীর বাগদাদ, দামেস্ক কিংবা কোনিয়ার ধূলিধূসর পথে চটের ছালা গায়ে ঘুরে বেড়ানো এক রহস্যময় জীর্ণ অবয়ব। বাইরে থেকে তাঁকে মনে হতে পারত একজন পরিব্রাজক, অথচ তাঁর অন্তরে যেন জ্বলছিল তীব্র আধ্যাত্মিক আগুন। তিনি শামস-ই-তাবরিজি।
বিজ্ঞাপন
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার সীমারেখায় তাঁকে আবদ্ধ করা যায়নি, আবার কোনো নির্দিষ্ট সুফি তরিকার কাঠামোর মধ্যেও তাঁকে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। সুফিবাদের জগতে তিনি ছিলেন এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব, যার সংস্পর্শে এসে সে সময়ের অন্যতম বড় ইসলামি পণ্ডিত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির জীবন ও চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আসে।
শামসকে সাধারণ কোনো সাধক হিসেবে দেখলে তাঁর পরিচয়ের গভীরতা বোঝা কঠিন। সুফি পরিভাষায় তাঁকে বলা হতো ‘পাখির মতো মুক্ত’। তিনি যেন হঠাৎ আবির্ভূত হতেন, মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক আলো ছড়িয়ে আবার অজ্ঞাতেই হারিয়ে যেতেন। তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তীব্র আধ্যাত্মিক আত্মমর্যাদা এবং সত্যকে সরাসরি উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা। কেবল বইয়ের পাতা থেকে সংগৃহীত জ্ঞানকে তিনি জ্ঞানের পূর্ণতা মনে করতেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, যে জ্ঞান মানুষের হৃদয়কে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে, প্রকৃত জ্ঞান তার মধ্যেই নিহিত।
শামসের ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টির মধ্যেও ছিল এক ধরনের তীব্রতা। তাঁর চোখের দৃষ্টিকে ঘিরে নানা বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে, সেই দৃষ্টি মানুষের ভেতরের অহংকারকে নাড়িয়ে দিতে পারত। তিনি কোনিয়ায় এসেছিলেন কোনো সাধারণ শিষ্যের সন্ধানে নয়; বরং এমন একটি হৃদয়ের খোঁজে, যে হৃদয় তাঁর অন্তরের গভীর ঐশ্বরিক প্রেমকে ধারণ করতে সক্ষম। সেই যোগ্য হৃদয়টি শেষ পর্যন্ত তিনি খুঁজে পান জালালুদ্দিন রুমির মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
কোনিয়ায় রুমির সঙ্গে শামসের সাক্ষাৎ সুফি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তখন রুমি ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞান, তত্ত্ব ও পাণ্ডিত্যচর্চায় প্রতিষ্ঠিত একজন আলেম। শামসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের পর সেই জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের প্রচলিত ধারণাই যেন নতুন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
প্রচলিত একটি বর্ণনা অনুযায়ী, রুমির মূল্যবান পাণ্ডুলিপির দিকে ইঙ্গিত করে শামস জানতে চেয়েছিলেন, এগুলো কী। রুমি তাঁর জ্ঞানের প্রতি আত্মবিশ্বাস থেকে উত্তর দিয়েছিলেন, এগুলো এমন জ্ঞান, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এরপর শামস পাণ্ডুলিপিগুলো পানিতে ডুবিয়ে আবার সেগুলো শুকনো অবস্থায় তুলে আনেন—এমন একটি ঘটনা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।
রুমি বিস্মিত হয়ে এর রহস্য জানতে চাইলে শামস নাকি তাঁর আগের কথারই প্রতিধ্বনি করে বোঝান, এমন জ্ঞানও আছে যা শুধু কিতাবের অক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘটনাকে রুমির জীবনের এক প্রতীকী মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে রুমি উপলব্ধি করেন, বইয়ে অর্জিত জ্ঞান এবং হৃদয়ে ধারণ করা আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এক বিষয় নয়।
বিজ্ঞাপন
শামসের সোহবতে রুমির জীবনে যে পরিবর্তন
শামসের সংস্পর্শে এসে রুমির জীবনে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সাধারণ শিক্ষক-শিষ্য সম্পর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁদের সম্পর্ককে সুফি ঐতিহ্যে দুটি আত্মার গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ হিসেবে দেখা হয়।
শামসের সোহবত রুমিকে কেবল ফতোয়া, তত্ত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ঐশ্বরিক প্রেমের গভীরতর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। রুমির জীবনে আসে নতুন এক আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান। তাঁর মাদ্রাসাকেন্দ্রিক জীবন ও প্রচলিত ধর্মীয় পাণ্ডিত্যচর্চার পাশাপাশি প্রেম, আত্মঅনুসন্ধান ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে জায়গা করে নেয়।
বিজ্ঞাপন
শামসের সংস্পর্শেই রুমির জীবনে ‘সামা’ বা ঘূর্ণনের আধ্যাত্মিক অনুশীলনের গুরুত্ব বাড়ে বলে সুফি ঐতিহ্যে উল্লেখ করা হয়। রুমির ভাবনায় তখন এমন উপলব্ধি তৈরি হয় যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা যেন সৃষ্টিকর্তার প্রেমে আবর্তিত হচ্ছে; মানুষের হৃদয়ও সেই প্রেমের আবর্তনের বাইরে থাকতে পারে না।
পরবর্তী সময়ে শামস যখন কোনিয়া থেকে রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যান, তখন রুমির জীবনে নেমে আসে গভীর শূন্যতা। কিন্তু সেই বিচ্ছেদ তাঁকে থামিয়ে দেয়নি। বরং শামসের সঙ্গে কাটানো সময় ও তাঁর কাছ থেকে পাওয়া আধ্যাত্মিক প্রেরণা রুমির সৃষ্টিশীলতাকে আরও তীব্র করে তোলে। শামসের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক টান থেকেই রুমির কবিতা ও সাধনার জগতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এই আধ্যাত্মিক সম্পর্কের সবচেয়ে বিখ্যাত স্মারকগুলোর একটি হলো ‘দেওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজি’। রুমির এই বিশাল কাব্যভাণ্ডারে শামসের নাম ও স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এমনকি নিজের নামের পরিবর্তে তিনি সেখানে তাঁর প্রিয় আধ্যাত্মিক সঙ্গী শামসের নামকে সামনে এনেছেন।
বিজ্ঞাপন
শামস-ই-তাবরিজির সঙ্গে রুমির সম্পর্ক তাই কেবল একজন আলেম ও একজন সুফির সাক্ষাতের ঘটনা নয়। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক সম্পর্কের গল্প, যেখানে পাণ্ডিত্য থেকে প্রেমে, বাহ্যিক জ্ঞান থেকে অন্তর্দৃষ্টিতে এবং তত্ত্ব থেকে আত্মোপলব্ধির দিকে রুমির যাত্রা আরও গভীর হয়ে উঠেছিল।
তথ্যসূত্র:
মাকালাত-ই শামস-ই তাবরিজি
বিজ্ঞাপন
দেওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি







