Logo

রেয়াযত, রেয়াযতের গুরুত্ব এবং মানব ছিনার প্রশস্ততা নিয়ে আলোচনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০:১৯
রেয়াযত, রেয়াযতের গুরুত্ব এবং মানব ছিনার প্রশস্ততা নিয়ে আলোচনা
ছবি: জনবাণী।

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রেয়াযত, রেয়াযতের গুরুত্ব এবং মানব ছিনার প্রশস্ততা নিয়ে আলোচনা। এতদ্ব্যতীত- "মানুষ আল্লাহর ভেদ বা রহস্য”- খোদাতায়ালার এ বাণীর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যাঃ

বিজ্ঞাপন

'রেয়াযত' অর্থ কঠোর ব্রত বা কৃষ্ণ সাধনা। খোদাতায়ালাকে চিনিবার বা জানিবার ক্ষেত্রে বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের পথে যে কঠিন সাধনা করিতে হয়-পীরানে পীরগণ তাহাকে "রেয়াযত” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।

খোদাপ্রাপ্তির পথে কেন রেয়াযতের প্রয়োজন? সে সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে কিছু আলোচনা করিতেছি। মানুষের এই অজুদ রাজ্যে দুইটি অবস্থা বর্তমান। একটি সুক্ষ্ণ অবস্থা, অপরটি স্কুল অবস্থা। সুক্ষ্ণ অবস্থার সম্পর্ক আলমে আমর বা হুকুমের জগতের সাথে। স্কুল অবস্থার সম্পর্ক আলমে খাল্কের সাথে। এখানে উল্লেখ্য যে, সৃষ্টি জগত বা দায়েরায়ে এমকান দুই ভাগে বিভক্ত। যথাঃ আলমে আমর এবং আলমে খালক (স্কুল)। আলমে আমরকে নূরময় জগত বা হুকুমের জগত বলা হয়। আলমে খালকে স্থুল জগত বা অন্ধকারময় জগত বলা হয়। মানবদেহে আলমে আমর ও আলমে খালক-উভয় জগতের নিদর্শন বর্তমান। আলমে আমর হইতে মানবদেহে আছে পাঁচটি সুক্ষ্ণ লতিফা। যথাঃ কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা। এবং আলমে খালুল্ক হইতে মানবদেহে আছে আরও পাঁচটি লতিফা। যথাঃ আগুন, পানি, মাটি, বাতাস ও নাফস।

আলমে আমরের পাঁচটি লতিফাকে "আমর" বলার হেতু কি? রোজ আজলে (আদি সৃষ্টির দিনে) খোদাতায়ালা সিফাতে হাকীকীস্থিত সৃষ্টির নিরাকার হকিকতের প্রতি 'কুন' আদেশ প্রয়োগ করিয়াছেন। সেই কুন শব্দের আমর বা হও-এই আদেশ দ্বারা আল্লাহতায়ালা কালব, ছের, খফি ও আখ্যা লতিফাসহ রূহ সৃষ্টি করিয়াছেন। সেই আমর হইতে সৃষ্টি হওয়ার কারণে উক্ত পঞ্চ লতিফাকে আলমে আমরের লতিফা বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহপাক কুন আদেশের প্রভাবে রূহ সৃষ্টি করিলেন। রূহকে দিলেন কালব, ছের, খফি ও আখফা লতিফা। কালব, ছের, খফি ও আখফা সম্বলিত রূহকে মানবদেহে সংস্থাপন করিলেন। সেই ইতিহাসও বড় রহস্যময়। রূহ আলোকময় জগতের উপাদান। আল্লাহ পাকের সিফাতে এরাদত হইতে রূহের উৎপত্তি। রূহ আল্লাহর স্বভাবে স্বভাবিত। রূহ যাবতীয় সৎগুণের আকর। আদম (আঃ) এর দেহ তৈরীর পরে আল্লাহপাক সেই দেহে প্রবেশের জন্য রূহকে নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর আদেশে রূহ আদম (আঃ) এর মাটির দেহে প্রবেশ করিল। কিন্তু আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের তৈরী দেহতো জুলমতপূর্ণ, অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সেই অন্ধকারময় দেহে রূহ আল্লাহর নির্দেশে প্রবেশ করিল বটে; কিন্তু কিছুক্ষণেই দেহ হইতে বাহিরে আসিল। রূহ খোদাতায়ালাকে বলিল, "হে পাক পরোয়ারদেগার! অন্ধকারময় মানবদেহ তথা আদামাতে অবস্থান আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” ফলে আল্লাহতায়ালা আদম (আঃ) এর দেহে নূরে মুহাম্মদীকে প্রবেশ করাইলেন। অতঃপর রূহকে আদম (আঃ) এর দেহে পুনরায় প্রবেশের আদেশ দিলেন। এইবার রূহ অন্যান্য লতিফা সহ আদম (আঃ) এর দেহে প্রবেশ করিয়া নূরে মুহাম্মদীর আকর্ষণে তথায় থাকিয়া গেল। আল্লাহপাক অতীব কৌশলে নাফসের সাথে রূহের প্রণয় সম্পর্ক গড়িয়া দিলেন।

নাফস অন্ধকারে সৃষ্ট। ইহার স্বভাবও অন্ধকারময়। যাবতীয় কুচিন্তা, কুস্বভাব নাফস হইতে উৎপত্তি। নাফসই যাবতীয় অনিষ্টের মূল। সর্বক্ষণ অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত থাকা তাহার স্বভাব। খোদাতায়ালার নাফরমানির মধ্যেই তাহার তৃপ্তি। নাফস খোদাতায়ালাকে স্বীকার করিতে নারাজ। কিন্তু দয়াময় খোদাতায়ালা নাফসের কল্যাণ চান। তিনি নাফসের সাথে কথা বলিতে চান, নাফসের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী করিতে চান। অথচ নাফস খোদাতায়ালাকে চায় না। খোদাতায়ালার আদেশ-নিষেধ তাহার ভাল লাগে না। যশ-খ্যাতি, কর্তৃত্বতে সে আনন্দ পায়। অন্যের উপর ছদারি করিতে সে ভালবাসে। সে খোদাতায়ালার সমকক্ষতা দাবি করে। তাই ওলী-আল্লাহসকল নাফসকে "ফেরাউন” বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। নাফসকে তাহার এহেন হীন অবস্থা হইতে মুক্ত করিয়া নিজ বন্ধুত্বের পোশাকে সজ্জিত করিবার অভিলাসে মহান খোদাতায়ালা মানব দেহে রূহ প্রেরণ করিলেন। রূহের সহযোগী হিসাবে দিলেন কালব, ছের, খফি ও আখফা নামক লতিফা সমূহ। কিন্তু মানবদেহে আসিয়া রূহ নাফসকে হেদায়েত করিবেতো দূরের কথা-নিজেই

নাফস ও নাফস সৈন্যদের হাতে বন্দী হইল। নাফসের ত্রাসনে রূহ অষ্টেপৃষ্ঠে শংখলিত হইল। নাফস তাহার কুট-কৌশলে রূহের চেতনা শক্তিকে বিলুপ্ত করিল। রূহ তদীয় অতীত গৌরবময় ইতিহাস বেমালুম ভুলিয়া নাফসের দাসত্ব শুরু করিল। নাফসের সংগে ভোগ বিলাস, আরাম আয়েশে লিপ্ত হইল, পাপাচারে মাতিয়া উঠিল। অপরদিকে হর সহযোগী লতিফাসমূহ তথা কালব, ছের, খফি ও আখফার উপরে দুর্ধর্ষ নাফস পাপাচারের জুলমতপূর্ণ কাল আবরণ ফেলিল। ফলে উক্ত লতিফাসমূহও তাহাদের উৎপত্তিস্থলের মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাস বিস্মৃত হইয়া রূহের মতই নাফসের পায়রবী শুরু করিল। ফলে অন্যান্য লতিফাসহ রূহ নাফসের দাসত্ব শুরু করিল। ইহার ইশারা নিম্নে বর্ণিত আয়াতদ্বয়ে পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহপাক ফরমানঃ

বিজ্ঞাপন

كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَّا كَانُوا يَكْسِبُوْنَ

অর্থাৎ-“(আমার বাণী মিথ্যা) কখনও নহে, কিন্তু স্বীয় অর্জিত কর্মের দোষে তাহাদের কালবের উপর মরিচা পড়িয়াছে।" (সূরা মুত্বাফ্যিফীনঃ ১৪) আল্লাহতায়ালা আরও বলেন,

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَ أَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"আপনি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা দেখিয়াছেন, যে নিজের প্রবৃত্তিকে আপন মাবুদ সাব্যস্থ করিয়াছে, আর আল্লাহ তাহাকে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও পথভ্রষ্ট করিয়া দিয়াছেন।” (সূরা জ্বাছিয়াঃ ২৩)

কিন্তু নাফসের দাসত্ব করার জন্যতো রূহকে মানবদেহে পাঠানো হয় নাই। বরং অবাধ্য নাফসকে গ্রেফতার পূর্বক আল্লাহর সান্নিধ্যে নেওয়ার জন্য মানবদেহে রূহ প্রেরণ করা হইয়াছে। নাফসের কবল হইতে রূহকে মুক্ত করা প্রয়োজন। সেই জন্যই যুগে যুগে আল্লাহতায়ালা নবী রাসূল (আঃ) গণকে প্রেরণ করিয়াছেন। নবী রাসূলগণের পরে যুগে যুগে ওলীয়ে কামেল সকল আসিতেছেন। তাঁহারাই মানবরূহকে নাফসের প্রভাবমুক্ত করিতেছেন। আর এই কারণেই প্রত্যেক মানুষেরই প্রয়োজন কামেল পীর। প্রয়োজন পীরের তত্ত্বাবধানে কঠোর রেয়াযত। পীরের তত্ত্বাবধানে সাধনারত খোদাঅন্বেষীর প্রতি পীর তাওয়াজ্জুহ (আত্মিক শক্তি) প্রয়োগ করেন। ফলে মুরীদের কালব নাফসের প্রভাবমুক্ত হয়।

পাপাচারের ফলে সৃষ্ট কাল আবরণ কালবের উপর হইতে খসিয়া পড়ে। ফলে কালবের আয়নায় নূর আসিতে থাকে। কালব চেতনা প্রাপ্ত হয়। বিস্মৃত অতীত গৌরবময় ইতিহাস কালবের স্মরণে পড়ে। জাগ্রত কথা, আলোকময় জগতের কথা রূহের স্মৃতিপটে ভাসিয়া উঠে। কালবের কালব ঘুমন্ত রূহকে আঘাত করে। রূহও জাগ্রত হয়। উৎপত্তিস্থলের সহযোগিতায় জাগ্রত রূহ তখন নাফসকে আল্লাহমুখী করিতে প্রয়াস চালায়। কিন্তু কিভাবে তাহা সম্ভব হয়?

বিজ্ঞাপন

প্রথমে পীরের তাওয়াজ্জুহের প্রভাবে কালব জাগ্রত হয়। কালবে নূর আসিতে থাকে। সরিষা ফুলের ন্যায় হলুদ বর্ণের নূরে কালব পূর্ণ হয়। সেই নূরে কালবের পর্দায় ভাসিয়া উঠে আরশ, কুরছি, লওহ-কলম, বেহেশত-দোযখ, আসমান-জমিন সবকিছু। এক পর্যায়ে নূরের আধিক্য এত বেশী হয় যে, আসমান-জমিন সবই সেই নূরে প্লাবিত দেখা যায়। সেই নূরের সমুদ্রে ভাসিতে ভাসিতে বিচ্ছেদ অগ্নিতে দগ্ধ রূহ আল্লাহময় জগতের দিকে, তাঁহার উৎপত্তি স্থলের দিকে উরুজ (ঊর্ধ্বারোহন) করিতে থাকে। পথিমধ্যে সর্বত্রই সে আপন পীরের রূহ দেখিতে পায়। পীরের রূহকে সে নিজ রূহ মনে করে এবং নিজের রূহকে ভুলিয়া যায়, যাহা ফানা-ফিশ-শায়খের মাকাম। দ্রুত উরুজরত পীরের রূহে বিলুপ্ত মুরীদের রূহ বেলায়েতে ছোগরার মহা নূরময় জগতে পৌঁছায়। তথায় পীরের রূহে বিলুপ্ত মুরীদের রূহ রাসূলে পাক (সাঃ) এর রূহে বিলুপ্ত হয় এবং তাঁহার ফানা-ফির-রাসূলের মাকাম হাছিল হয়। ইহার পর মুরীদ যে দিকেই তাকায় সেই দিকেই মহান খোদাতায়ালার নূর (আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূর) দেখিতে পায়। তখন নিম্নে বর্ণিত আয়াতের মর্মার্থ মুরীদের নিকট প্রকাশ পায়। আল্লাহপাক কুরআন শরীফে বলেন, "যে দিকেই তুমি মুখ ঘুরাও সেই দিকেই আল্লাহর চেহারা আছে।" রূহ দ্রুতগতিতে ছায়ের করিয়া তাহার উৎপত্তিস্থল সিফাতে এরাদতে বিলীন হয়।

কালবের মূল আরশ; মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল। তাজাল্লীয়াতে আফয়ালের বিকাশ আকরাবিয়াতের নিম্নে বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতে। কালবের শেষ সীমা তাজাল্লীয়াতে আফয়াল পর্যন্ত। কিন্তু রূহের গন্তব্য আরও ঊর্ধ্বে; সিফাতে এরাদত পর্যন্ত। সিফাতে এরাদত আকরাবিয়াতে অবস্থিত। সিফাতে এরাদতই রূহের মূলের মূল।

উপরের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হইল যে, মানবদেহস্থিত কালবের পরিধি অতি বিশাল। লতিফায়ে কালব যখন মহাকালবের সাথে যুক্ত হয়, তখন ইহার পরিধি এত বিশাল হয় যে, সাধকের মনে হয়, তাহার কালব-সমুদ্রের মধ্যে সমগ্র পৃথিবী ছোট্ট একটি কাষ্ঠ খন্ডের মত ভাসিতেছে। সাধক তাহার বিকশিত কালবের মধ্যে সন্ধান পায় আপন পীরের, সন্ধান পায় রাসূলে করীম (সাঃ) এর; এমনকি খোদাতায়ালার আফয়ালী নূরের।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে লতিফা রূহের ক্ষেত্র লতিফা কালবের চেয়েও অনেক বড়। রূহের উরুজ হয় হাকীকী সিফাত পর্যন্ত। ফলে রূহ যখন তাহার শেষ সীমায় পৌঁছায়, তখন সাধকের দেহে তাজাল্লীয়াতে সিফাতের অবিরাম প্রবাহ আসিতে থাকে। উল্লিখিত নূরের প্রবাহ রূহে বেমেছালীর ছুরাত হইয়া রূহে; তৎপর রূহ হইয়া নাফসে আসে। তাজাল্লীয়াতে আফ্যাল ও তাজাল্লীয়াতে সিফাতের নূরে মুরীদের নাফস অপবিত্রতার খোলস ঝাড়িয়া ফেলিয়া পবিত্র হয়; খোদার প্রেমে স্নাত হয়।

লতিফা ছেরের পরিধি রূহের পরিধির চেয়েও বিশাল। কারণ ছেরের মূলের মূল আল্লাহতায়ালার শান (সিফাতসমূহের মূল)। বক্ষস্থিত লতিফায়ে ছেরের বিকাশ পূর্ণ মাত্রায় হইলে সাধকের উপর অবিরাম ধারায় তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরের কারেন্ট আসিতে থাকে।

লতিফা খফির পরিধি ছের লতিফার পরিধির চেয়েও বড়। খফির মূলের মূল সিফাতে ছলিয়া। সিফাতে ছলবিয়া খোদাতায়ালার ঐ সমস্ত গুণ যাহা খোদাতায়ালার পবিত্রতার মানদন্ড হিসাবে পরিচিত। সেখানে পৌঁছাইলে মুরীদ বুঝিতে পারে যে, খোদাতায়ালা লয়, ক্ষয় ও পরিবর্তনাদি হইতে পবিত্র। ইত্যাকার সিফাত খোদাতায়ালার জাতি নূরের সমুদ্রে অবস্থিত।

বিজ্ঞাপন

লতিফা আখফার উচ্চতা আরও ঊর্ধ্বে। আখফার মূলের মূল তাইনে আউয়ালের গভীর কেন্দ্র (যাহা হোব্বে সেরফা বলিয়া পরিচিত) এবং 'শানে জামেয়া'র কেন্দ্র (মাবুদিয়াতে ছেরফা)। কোন সাধকের লতিফা আখফা পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হইলে সেই সাধক হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফা পর্যন্ত উরুজ করিয়া খোদাতায়ালার নিছক জাতের কৈফিয়তশূন্য দর্শন ও সান্নিধ্য লাভ করে। সাধকের উপর অবিরাম জাতি নূরের কারেন্ট প্রবাহিত থাকে।

উল্লিখিত পঞ্চ লতিফা (কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা) মানুষের ছিনার মধ্যে অবস্থিত। যে মানুষের ছিনাস্থিত পঞ্চ লতিফা পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হয়-তাহার ছিনা তখন এতই প্রশস্ত হয় যে, ছিনার মধ্যেই সে আল্লাহকে পায়, রাসূল (সাঃ) কে পায়, আপন পীরকেও পায়। আল্লাহপাকের জাত, সিফাত ও আফ্রালের দর্শন নিজ ছিনার মধ্যেই সংঘটিত হয়। আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত, দোযখ-সবই সেই খোদাঅন্বেষী নিজের মধ্যেই দেখিতে পায়। এমন মানুষই আল্লাহর ভেদ (রহস্য)-এ পরিণত হয়। সে তখন বুঝিতে পারে "আল্লাহর ভেদ মানুষ, মানুষের ভেদ আল্লাহ"-এই কথার তাৎপর্য। আল্লাহপাক তাই পাক কালামে বলেন,

وَ فِي أَنْفُسِكُمْ طَ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"আমার নিদর্শন তো তোমাদের মধ্যেই আছে, তোমরা দেখ না কেন?" যাহার মর্মার্থ দাঁড়ায়ঃ আমি তো তোমাদের মধ্যেই আছি, তোমরা দেখার চেষ্টা কর না কেন? রাসূলে পাক (সাঃ) তাই বলিলেন, তুমি নিজেকে চেন, তাহা হইলে খোদাতায়ালাকে চিনিতে পারিবে।

আত্মতত্ত্বজ্ঞ সাধক নিজ ছিনার মধ্যে আশ্চর্য সব লীলাখেলা দেখিতে পায়। মানুষের এই দেহ যেন "গণি মিঞার বাক্স।" গণি মিঞার বাক্সের মধ্যে থাকে কাগজে অংকিত বিচিত্র ছবি। বাক্সের চতুষ্পার্শে বেশ কয়েকটি গোলাকার ছিদ্র থাকে। ছিদ্র মুখে কাঁচ লাগানো থাকে। সেই ছিদ্র পথে ভিতরে তাকাইলে অপূর্ব সব দৃশ্যাবলী দেখা যায়। গণি মিঞা হাতল ঘুরাইয়া ছবি টানিতে থাকে; আর দৃশ্যমান ছবির কাহিনী সম্বলিত কথার মালায় গান গাইতে থাকে। কৌতূহলী শিশু দর্শকেরা সেই দৃশ্য দেখিয়া এবং গণি মিঞার গান শুনিয়া অভূতপূর্ব আনন্দ পায়। মানব ছিনাকে গণি মিঞার বাক্সের সাথে তুলনা করা যায়, যে বাক্সের হাতল থাকে আত্মতত্ত্বজ্ঞ সাধকের নিজের হাতেই। সাধক যখন যাহা দেখিতে চায়, তখনই নিজ ছিনাস্থিত কালবের পর্দাতেই তাহা ভাসিয়া উঠে।

আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) ছিনার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কিছুই টের পায় না কেন? সমস্ত মারেফাত জ্ঞান মানববক্ষে থাকা সত্ত্বেও মানুষ কিছুই বুঝিতে পারে না কেন?

বিজ্ঞাপন

ইহার একটাই উত্তর-তাহা হইল মানুষের নাফস। যতক্ষণ পর্যন্ত নাফসের পরিশুদ্ধি অর্জন করা না যাইবে, যতক্ষণ পর্যন্ত নাফসের অশুভ প্রভাব হইতে কালবকে মুক্ত করা না যাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানবদেহস্থিত লতিফাসমূহ বিকশিত হইবে না, ফলে মানব ছিনা প্রশস্তও হইবে না; আজীবন ইহা সংকীর্ণই থাকিয়া যাইবে। আর ছিনা যতক্ষণ না প্রশস্ত হইবে, ততক্ষণ ছিনার মধ্যে আল্লাহ, রাসূল (সাঃ) বা আপন পীরকে পাওয়া সম্ভব নহে। আল্লাহর অপূর্ব লীলাখেলা দেখাও সম্ভব নহে।

কিন্তু নাফসের প্রভাবমুক্ত হওয়া তো সহজ কথা নয়। নাফস অবাধ্য এক জানোয়ার। তোমার কোন উপদেশই সে শুনিবে না। নাফসের শোধনের জন্যই প্রয়োজন পীরের নির্দেশিত পথে কঠোর রেয়াযত। কালামুল্লাহ শরীফে আল্লাহপাক বলেন,

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"যাহারা আমার জন্য আমার উদ্দেশ্যে সাধনা (রেয়াযত) করিবে, আমি অবশ্যই তাহাদিগকে আমার পথ প্রদর্শন করিব।" (সূরা আন্কাবুতঃ ৬৯)

প্রাথমিক পর্যায়ে পীরে কামেল তদীয় মুরীদবর্গকে তিন প্রকারের রেয়াযত শিক্ষা দেন। যথাঃ অল্প আহার, অল্প নিদ্রা ও অল্প কথার অভ্যাস করা। জগতে যত নবী-রাসূল (আঃ) গণ এবং ওলীয়ে কামেলবর্গ আসিয়াছেন, তাহারা সকলেই উক্ত তিন নীতির মধ্য দিয়া কঠোর রেয়াযতের মাধ্যমে নাফসের প্রভাব হইতে মুক্ত হইয়া আপন আপন ছিনাকে প্রশস্ত করিয়াছেন।

রাসূলে করীম (সাঃ) আজীবন রাত জাগিয়া ইবাদত করিয়াছেন। রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসারীবর্গ কখনও সারারাত্র ঘুমাইয়া থাকেন নাই এবং এখনও থাকেন না। কখনওবা সমগ্র রজনী ইবাদতে কাটাইয়া দেন। কখনওবা রজনীর একটি অংশ নিদ্রা যান; বাকী সময় মোরাকাবা-মোশাহাদা বা ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন।

আমার পীরকেবলাজানও প্রতি রাত্রেই নিজে যেমন জাগিয়া ইবাদত করিতেন, তেমনি নিশির শেষ ভাগে মুরীদানদের ডাকিয়া উঠাইতেন। এই দরবারে তথা বিশ্ব জাকের মঞ্জিলেও সেই নিয়ম পালন করা হয়। নিদ্রা হ্রাস করা-খোদাপ্রাপ্তির পথে রেয়াযতের অন্যতম অংশ। তেমনি কথা কম বলাও রেয়াযতে অংশ। হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব বলেন, "তোমার কথা যদি বেহেশত আদনের মুক্তার চেয়েও মূল্যবান হয়, তথাপিও যদি তুমি বেশী কথা বল, তবে তোমার দেল মারা যাইবে।"

রেয়াযতের মূল অংশ 'অনাহারে থাকা'ঃ

খোদাপ্রাপ্তি সাধনা বা রেয়াযতের মূল অংশই হইল-অনাহারে থাকা। ক্ষুধার চাবুক ছাড়া নাফসকে শায়েস্তা করা যায় না। ক্ষুৎপিপাসার সাধনা ব্যতীত রিপুসমূহকে দমন করা যায় না। নাফস ভয় পায় একমাত্র অনাহারের তলোয়ারকে। মানুষের সমগ্র শরীর, মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত প্রত্যেক অণু-পরমাণুকে নাফস শয়তান ঘেরাও করিয়া রাখিয়াছে। নাফস রূপ বৃক্ষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শিকড় দেহের প্রত্যেক গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে প্রোথিত আছে। একমাত্র ক্ষুধার তীক্ষ্ণ ধারালো চাকুর সাহায্যে সেই সমস্ত শিকড় কাটিয়া ফেলা সম্ভব-ইহার কোন বিকল্প নাই। তাই রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "জঠরজ্বালার মাধ্যমে তুমি তোমার কালবকে জ্যোতির্ময় কর; ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অস্ত্রের দ্বারা তুমি তোমার নাফসের বিরুদ্ধে জেহাদে প্রবৃত্ত হও। ক্ষুধার সাহায্যে তুমি সদা বেহেশতের দরজায় করাঘাত করিতে থাক।"

নাফসকে সৃষ্টি করিবার পর আল্লাহপাক তাহাকে প্রশ্ন করিলেন, "তুমি কে, আর আমি কে?” নাফস দাম্ভিকতার সাথে বলিল, "আমি আমি, তুমি তুমি।” তৎপর আল্লাহপাক নাফসকে এক হাজার বৎসর দোযখের অগ্নিতে পুড়াইয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি কে, আর আমি কে?" নাফস এইবারও পূর্ববৎ জবাব দিল। পুনরায় নাফসকে আরও এক হাজার বছর দোযখ-অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এইবার বল, "তুমি কে, আর আমি কে?” এইবারও নাফস পূর্ববৎ জবাব দিল।

ফলে আল্লাহপাক নাফসকে এক হাজার বৎসর অনাহারে রাখিলেন। অতঃপর একই প্রশ্ন করিলেন। বলিলেন, "তুমি কে, আর আমি কে?" এইবার নাফস খোদাতায়ালার প্রভুত্বকে মানিয়া অত্যন্ত বিনীতভাবে বালল, "হে খোদা! বেশখ, তুমি আমার প্রভু, আর আমি তোমার অনুগত দাস।"

রাসূলে পাক (সাঃ) এর নাফস জন্মগত পবিত্র থাকা সত্ত্বেও তিনি আজীবন অনাহারে থাকিয়াছেন। কয়েকদিন পর পর এত সামান্য পরিমান খাবার খাইতেন যে, তাহা আহার হিসাবে গন্য করা যায় না। ওলী আল্লাহসকল জীবনে কখনও পেট ভরিয়া আহার করেন নাই। যৎকিঞ্চিত খাদ্য খাইতেন। পেটের ক্ষুধা পেটেই থাকিত।

হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "আমি ইসলামে দীক্ষা নেওয়ার পর উদরপূর্তি করিয়া কোন দিনই আহার করি নাই। কারণ ইহাতে ইবাদতের স্বাদ হইতে বঞ্চিত হইতে হয়। অনুরূপ আমি কোন দিনই তৃষ্ণা মিটাইয়া পানিও পান করি নাই। কেননা আমার অন্তরে খোদার দীদারের তীব্র আকাংখা রহিয়াছে।" উদরপূর্তি করিয়া আহার গ্রহণ করিলে নাফস সতেজ হয়। রিপুসমূহ তাজা হয়। শয়তানও নাফসের উপর সহজে প্রভাব ফেলিতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, নাফসের মত শয়তানও মানুষের শত্রু। কিন্তু শয়তান নাফসের সহযোগিতা ভিন্ন মানুষকে ওয়াসওয়াসা দিতে পারে না। যাহার নাফস পরিশুদ্ধ; শয়তানের শয়তানী তাহার উপর অকার্যকর।

একদা হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) এর সহিত অভিশপ্ত ইবলিসের দেখা হয়। ইবলিসের হস্তস্থিত একটি বস্তুর প্রতি ইংগিত করিয়া আল্লাহর নবী (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, "তোমার হাতে এটা কি?” ইবলিস বলিল, "ইহা নাফসের তাড়না; ইহার সাহায্যে আমি বণী আদমকে শিকার করিয়া থাকি।" হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, "আমাকে শিকার করিবার জন্যেও কি তোমার নিকট কিছু আছে?" ইবলিস বলিল, "না; তবে এক রাত্রিতে আপনি পরিতৃপ্ত হইয়া ভোজন করিয়াছিলেন, সেই সুযোগে আমি আপনাকে অবসাদগ্রস্থ করিয়া নামাজ হইতে উদাসীন করিয়া ছিলাম।" হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বলিলেন, "আজ হইতে আমি আর কোন দিনই তৃপ্ত হইয়া আহার করিব না।" ইবলিস বলিল, "তাহা হইলে আমিও আজ হইতে আর কোনদিন বণী আদমকে উপদেশ দিব না।"

উপরের কাহিনীতে বুঝা যায় যে, পেট ভরিয়া আহার করার পরিণাম বড় ভয়াবহ। কাজেই শয়তানের মন্ত্রণা হহতে বাচিবার জন্য, নাফসের প্ররোচনা হইতে মুক্ত হওয়ার জন্যে, কালবের পরিচ্ছন্নতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন অনাহারের চাবুক হাতে নেওয়া।

কিন্তু ক্ষুৎসাধনার রেয়াযত অত্যন্ত কঠিন। নিদ্রা হ্রাস করা যায়, কথা কম বলা যায়, কিন্তু অনাহারে থাকা যায় না। অনাহারের পর্দাকে ছিন্ন করা বড় কঠিন। আবার অনাহারের পর্দাকে অতিক্রম না করিলে নাফসের করাল গ্রাস হইতে বাঁচাও কঠিন। তাই রাসূলে পাক (সাঃ) নাফসের সাথে সংগ্রামকে "জেহাদে আকবর" বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হাদীস শরীফে আছেঃ নবী করীম (সাঃ) এক জেহাদ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া সংগীগণকে বলিলেন, তোমাদের প্রত্যাবর্তন শুভ হউক; তোমরা ছোট জেহাদের ময়দান হইতে বড় জেহাদের ময়দানে উপস্থিত হইয়াছ। ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, বড় জেহাদ কি? নবী (সাঃ) বলিলেন, নাফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করা।

পীরানে পীরগণ বলেন, জেহাদ হইল তিন প্রকার। যথাঃ

★ পথ ভ্রষ্ট বাতিল পন্থীদের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে জেহাদ করা। যেমন আল্লাহপাক বলেন,

وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

অর্থাৎ-"তাহাদের সাথে বিতর্ক করুন সদ্ভাবে।" (সূরা নাহলঃ ১২৫)

★ দ্বিতীয় প্রকার হইতেছে-কাফের ও মোশরেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা; ইহা স্পষ্ট যুদ্ধ। যেমন কুরআন পাকে ইরশাদ হইতেছে,

يُجَاهِدُوْنَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

অর্থাৎ-"তাহারা আল্লাহর পথে জেহাদ করে।" (সূরা মায়েদাহঃ ৫৪)

★ তৃতীয় প্রকার হইতেছে নাফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। যেমন আল্লাহপাক ইরশাদ করেন,

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অর্থাৎ-"যাহারা আমার উদ্দেশ্যে জেহাদ করিবে, তাহাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করিব।" (সূরা আনকাবুতঃ ৬৯)

রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, বড় সংগ্রামী, বড় মোজাহেদ ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় নাফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও জেহাদ করে।"

নাফসের বিরুদ্ধে জেহাদকে বড় বলার কতিপয় কারণঃ

★ কাফেরদের সাথে যুদ্ধকালীন সময়ে অনাহারে থাকা শর্ত নয়। কিন্তু নাফস ও শয়তানের সাথে যুদ্ধ রত অবস্থায় অনাহারে থাকিতে হয়। ক্ষুধার তলোয়ারে নাফস ও শয়তানকে শায়েস্তা করিতে হয়।

★ কাফেরদের সাথে যুদ্ধ হয় সাময়িক ভাবে। কিন্তু নাফস ও শয়তানের সাথে যুদ্ধ করিতে হয় সারা জীবন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নাফসের সাথে সংগ্রাম করিয়া যাইতে হয়। নবী-রাসূল (আঃ)গণ ও ওলী-আল্লাহসকল সারা জীবন ব্যাপী নাফস ও শয়তানের সাথে যুদ্ধ করিয়া শত্রুপক্ষকে দুর্বল রাখিয়াছেন।

হযরত মালেক ইবনে দীনার (রঃ) ছাহেব একজন প্রথিতযশা ওলী ছিলেন। তাঁহার জীবন হইতে পাওয়া যায়ঃ তাঁহার নাফস অন্তিমকালীন অসুস্থতার সময়ে দুধ ও মধু মিশ্রিত গরম রুটির সরীদ (সুস্বাদু খাদ্য) খাওয়ার আকাংখা প্রকাশ করে। খাদেম দ্রুত সরীদ আনিয়া তাঁহার সম্মুখে হাজির করে। তিনি কিছুক্ষণ সরীদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া তাকাইয়া রহিলেন। অতঃপর বলিলেন, হে নাফস! তুমি দীর্ঘ ত্রিশ বৎসর ধরিয়া কঠোর রেয়াযতের মাধ্যমে ধৈর্য ধারণ করিয়া আসিতেছ। এখন এই অন্তিম অবস্থায় যখন তোমার মৃত্যুর মাত্র মুহূর্তকাল বাকী আছে............ এতটুকু বলিয়া তিনি

সরীদের পাত্র হাত হইতে নীচে রাখিয়া দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করিলেন। কি অপূর্ব রেয়াযত! মৃত্যুর পূর্বক্ষণেও নাফসকে বিন্দু পরিমান ছাড় দেন নাই।

হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেনঃ এক রাত্রে আমার মধ্যে আস্থরতা দেখা যায়। কোন কিছুই আমার ভাল লাগে না। আমি জেকের-আজকারে মশগুল হইলাম। তাহাতেও পূবের মত স্বাদ পাইলাম না। তখন নিদ্রা যাওয়ার ইচ্ছায় শয্যায় গেলাম, কিন্তু নিদ্রা আসিল না। অতঃপর বিছানা ত্যাগ করিলাম। তখন আমার দেলের ভিতর শুধু অস্থিরতা। আমি ঘর হইতে বাহির হইলাম। দেখিলাম, এক ব্যক্তি গায়ের উপর চুগা (পোশাক বিশেষ) জড়াইয়া পথের মাঝখানে পড়িয়া আছে। সে আমার আগমন অনুভব করিয়া বলিল, "হে আবুল কাসেম (হযরত জোনায়েদের উপনাম)! তুমি আমার নিকটে আস।" আমি নিকটে গেলাম। তিনি বলিলেন, "আমি আল্লাহর নিকট দু'আ করিয়াছিলাম, আমার জন্য তোমার দেলকে তিনি যেন উদ্বেলিত করিয়া দেন।" আমি বলিলাম, "ঠিক তাই হইয়াছে; এখন বলুন, আপনার দরকার কি?" তিনি আমাকে প্রশ্ন করিলেন, "নাফসের অসুস্থতার চিকিৎসা হয় কখন?" আমি বলিলামঃ "যখন নাফসের বাসনার বিপরীতে চলা যায়।” এই কথা শুনিয়া তিনি স্বীয় নাফসকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, "ওহে নাফস! শুনিয়া রাখ; এই একই জবাব আমি তোকে সাতবার দিয়াছি; কিন্তু তুই হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ব্যতীত অন্য কাহারও জবাব শুনিতে রাজী নস্, এখনতো তুই তাঁহার কাছেও সেই একই জবাব পাইলি।" এই কথা বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। আমি তাঁহাকে চিনিতে পারিলাম না।

উপরের কাহিনীদ্বয় হইতে ইহা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ওলী আল্লাহসকল আজীবন নাফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতেন।

★ কাফেরদের সহিত জেহাদে শত্রুপক্ষকে দেখা যায়। শত্রুপক্ষের কুট-কৌশলও জানা যায়। কিন্তু নাফস ও শয়তানের সাথে যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে অর্থাৎ নাফস ও শয়তানকে দেখা যায় না। আর ইহা সহজেই বোধগম্য যে, দৃশ্যমান শত্রুর চাইতে অদৃশ্য শত্রুর সহিত যুদ্ধ করা কঠিন। নাফস ও শয়তানকে দেখা যায় না বিধায় মুরীদকে পীরে কামেলের ইচ্ছায় বিলীন হইতে হয়। পীর কামেল নাফস ও শয়তানের গতিবিধি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তাই নাফসকে পরাজিত করিতে পীরের নির্দেশিত পথে অবিরাম রেয়াযত করিতে হয়।

★ কাফেরদের সাথে যুদ্ধে বিজয়ী হউক অথবা পরাজিত হউক-উভয় ক্ষেত্রের যোদ্ধা লাভবান হয়। উভয় ক্ষেত্রেই প্রচুর নেকী তাহার আমলনামায় লেখা হয়। অন্যদিকে নাফস ও শয়তানের সাথে যুদ্ধে জয়ী হহলে পুরস্কার স্বরূপ ট্রপি হিসাবে বেহেশত পাওয়া যাইবে। কিন্তু পরাজিত হইলে অনন্তকাল ধ্বংসের মুখে থাকিতে হইবে।

উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে নাফসের সাথে যুদ্ধকে জেহাদে আকবর বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে।

এই জেহাদে আকবরে বিজয়ী হওয়ার জন্য একমাত্র কার্যকরী অস্ত্র হইল ক্ষুধা। দেহে ক্ষুধার আগুন প্রজ্জলিত হইলে নাফস দুর্বল হয়; তদসংগে কালবও নাফসের ছোবল হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহপাকের নূর ধারণের যোগ্যতা ফিরিয়া পায়। কালবের সহযোগিতায় তখন মানবরূহ নাফসকে ঊর্ধ্বজগতের দিকে লইয়া যাইতে সফল হয়। ধীরে ধীরে নাফসের মধ্যে ঊর্ধ্ব জগতের গুণাগুণ ফিরিয়া আসে; নাফসের মধ্যেই খোদার প্রেম সৃষ্টি হয়। তমদোষসমূহ ঝাড়িয়া ফেলিয়া নাফস আল্লাহ-প্রেমিকের আসন দখল করে।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব নিজ রেয়াযতের কথা উল্লেখ করিয়া বলেন, "আমি দীর্ঘ কাল যাবৎ কঠোর রেয়াযতের মাধ্যমে নাক্সকে খোদার দরবারে লইয়া যাওয়ার চেষ্টা করিতে থাকি। কিন্তু নাফস খোদার দরবারে যাইতে রাজী হইত না, সে খুবই ক্রন্দন করিত। অতঃপর যখন আল্লাহর তরফ হইতে সাহায্য আসিল; আল্লাহর তরফ হইতে আগত নূরে নাফস যখন তাহার ভুল বুঝিতে পারিল, তখন এই নাফসই এমন হইয়া গেল যে, সে নিজেই আমাকে আল্লাহতায়ালার দরবারের দিকে টানিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। শুধু তাই নয়; নাফস আমার প্রতি হাস্য করিতে লাগিল।"

কাজেই হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার প্রসন্নতা অর্জন করিতে চাও, তবে কঠোর রেয়াযত কর, ক্ষুৎপিপাসার সাধনার দ্বারা রিপুসমূহকে দমন কর। ক্ষুধার আগুনে যদি নাফসকে জ্বালাইতে পার, তবে তোমাদের নাফস পরিশুদ্ধ হইবে। দেহস্থিত আলমে আমরের লতিফাসমূহ (কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা) বিকশিত হইবে। তোমাদের ছিনা প্রশস্ত হইবে। তোমাদের ছিনাতে আল্লাহপাকের জাত, সিফাত ও আয়ালের নূর আসিবে। ছিনার মধ্যেই আপন পীরকে পাইবে, রাসূল (সাঃ) কে পাইবে; এমনকি ছিনাতেই আল্লাহতায়ালাকে পাইবে।

মানব ছিনা আশ্চর্য এক টেলিভিশন-যে টেলিভিশনের ক্ষেত্র বা পরিধি সৃষ্টিজগত, নূরের জগত, সিফাতের জগত; এমন কি জাত (সত্ত্বা) এর জগত পর্যন্ত বিস্তৃত। তোমার ছিনা যখন প্রশস্ত হইবে: ছিনাস্থিত টেলিভিশন চালনার "রিমোট কন্ট্রোল" আল্লাহপাক তোমার হাতেই দিবেন। তখন তুমি আল্লাহময় জগত ও সৃষ্টি জগতের যাহা কিছুই দেখিতে ইচ্ছা কর না কেন; আল্লাহ প্রদত্ত রিমোট কন্ট্রোলের সুইচ-এ চাপ দিলেই তাহা দেখিতে পাইবে। যেমন টেলিভিশন কেন্দ্র হইতে যখন বলা হয়ঃ চলুন, আমরা এখন জাপানে যাই। তৎক্ষণাৎ টেলিভিশনের পর্দায় টোকিও-এর দৃশ্যাবলী ভাসিয়া উঠে।

ঠিক তেমনি তোমার প্রশস্ত ছিনার কালবের পর্দায় তুমি তোমার ইচ্ছানুযায়ী (সৃষ্টিজগত বা আল্লাহময় জগতের) দৃশ্যাবলী দেখিতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। এই দু'আ করিয়া রেয়াযত-শীর্ষক নসিহত এখানেই শেষ করিলাম। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD