খোদাপ্রাপ্তির পথে ফকরের গুণ হাছিলের আবশ্যকতা

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ফকর, খোদাপ্রাপ্তির পথে ফকরের গুণ হাছিলের আবশ্যকতা, ফকরের ফজিলত এবং প্রকৃত ফকীরের পরিচয় ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
'ফকর' শব্দের আভিধানিক অর্থ দরিদ্রতা, নিঃস্বতা বা মুখাপেক্ষীতা। 'ফকর' থেকে ফকীর শব্দের আবির্ভাব। ফকীর অর্থ দরিদ্র, গরীব, নিঃস্ব, মুখাপেক্ষী, অভাবগ্রস্থ ইত্যাদি।
যে কোন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে তাহার বিপরীত বিষয়ের ধারণা প্রয়োজন হয়। যেমন আলোকে বুঝিতে হইলে অন্ধকারের প্রয়োজন। জ্ঞানকে বুঝিতে হইলে মুর্খতাকে বুঝা প্রয়োজন ইত্যাদি। তেমনি 'ফকীর' বা "ফকর' সম্পর্কে জানিতে হইলে ধনী বা বিত্তবানতা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ধনী কে?
যাহার কোন অভাব নাই, যিনি কাহারো মুখাপেক্ষী নহেন; তিনিই ধনী। গভীর ভাবে চিন্তা করিলে দেখা যায় যে, একমাত্র আল্লাহতায়ালাই ধনী; আল্লাহ ব্যতীত আর সবাই মুখাপেক্ষী। সমস্ত সৃষ্টিই খোদাতায়ালার মুখাপেক্ষী। খোদাতায়ালার দয়া ও ইচ্ছাতেই সৃষ্টি অস্তিত্ব লাভ করিয়াছে। তাহার দয়াতেই সৃষ্টি টিকিয়া ও বাঁচিয়া আছে। মানুষের যত গুণাগুণ-তাহাও খোদাতায়ালার দান। তাই আল্লাহতায়ালা পাক কুরআনে বলেন,
বিজ্ঞাপন
يايُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ
অর্থাৎ-'হে মানবজাতি! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট ফকীর বা মুখাপেক্ষী।' (সূরা ফাতিরঃ ১৫)
আল্লাহতায়ালা নিজের সম্পর্কে আরোও বলেন,
বিজ্ঞাপন
وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ
অর্থাৎ- 'এবং আল্লাহতায়ালাই একমাত্র ধনী, আর তোমরা সকলেই ফকীর বা দরিদ্র।' (সূরা মুহাম্মদঃ ৩৮)
উপরে বর্ণিত কুরআন পাকের আয়াতের মর্মার্থ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা ব্যতীত মানুষ, জীন, ফেরেশতা তথা সকলেই গরীব বা ফকীর।
বিজ্ঞাপন
ফকর (দরিদ্রতা) এর সংজ্ঞায় বলা যায়-যে কোন বস্তু বা বিষয়ের অভাবই ফকর বা দরিদ্রতা। তাহা হইতে পারে ধন-সম্পদের অভাব, জ্ঞানের অভাব, গুণের অভাব, ক্ষমতার অভাব ইত্যাদি।
ধন সম্পদের দিক দিয়া যে নিঃস্বতা বা দরিদ্রতা বা ফকর-সে সম্পর্কেই প্রথমে আলোচনা করিতেছি। ধন সম্পদের অভাবীকেও ফকীর বা দরিদ্র বলে। যাহার নিকট স্বীয় অভাব মোচনের পরিমানমত অর্থ সম্পদ নাই এবং সেই পরিমান অর্থ উপার্জনের ক্ষমতাও নাই-তিনিই (অর্থ সম্পদের দিক দিয়া) ফকীর বা দরিদ্র। খোদাপ্রাপ্তির পথে ফকর বা দরিদ্রতার পর্দাকে অতিক্রম করিতে হয়। সেই জন্য ফকরের গুণ ছালেককে অর্জন করিতে হয়।
খোদাপ্রাপ্তির পথ নিষ্কন্টক নহে। এই পথে আছে হাজার বিপদ। মুরীদ বা খোদাঅন্বেষীকে এই পথে বহুবিধ কষ্টকর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে হয়। এই সমস্ত পরীক্ষার মধ্যে আছেঃ
বিজ্ঞাপন
দরিদ্রতা বা ফকরের পরীক্ষা।
বালা-মুছিবতের পরীক্ষা।
রোগ-শোকের পরীক্ষা।
বিজ্ঞাপন
লোক নিন্দার পরীক্ষা।
নানাবিধ দুঃখ-যাতনা ভোগের পরীক্ষা
অনাহার-অনিদ্রার পরীক্ষা।
বিজ্ঞাপন
সর্বোপরি কঠিন রেয়াযতের পরীক্ষা
এই পথে দরিদ্রতা বা নিঃস্বতা বা ফকর যেন অনিবার্যভাবেই আসে। আল্লাহ-রাসূলের মহব্বত অর্জনের ক্ষেত্রে ফকর বা দরিদ্রতা যেন এক আবশ্যকীয় শর্ত।
একদা এক ব্যক্তি নবী করীম (সাঃ) এর খেদমতে আসিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে মহব্বত করি। দয়াল নবী (সাঃ) বলিলেন একবার ভাবিয়া দেখ, তুমি কি বলিতেছ! সে আবার বলিল, আল্লাহর কছম, আমি আপনাকে মহব্বত করি। এইভাবে সে তিনবার বলিল। এইবার রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন, যদি তুমি (আমাকে মহব্বত করার দাবীতে) সত্যবাদী হও, দরিদ্রতা বা ফকরের বর্ম প্রস্তুত করিয়া রাখ। কেননা যে ব্যক্তি আমাকে মহব্বত করে, দরিদ্রতা তাহার নিকট বন্যার গতি অপেক্ষা অধিক দ্রুত পৌঁছে। (মেশকাত, তিরমিজি।)
বিজ্ঞাপন
একদা হযরত মুসা (আঃ) কোন পথ দিয়া যাইবার কালে পথি পার্শ্বে এক ব্যক্তিকে দেখিলেন, একখানি ইটের উপর মস্তক স্থাপন পূর্বক জমিনের উপর শুইয়া গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন আছে। তাহার শরীরে একখানি কম্বল ব্যতীত আর কোন বস্ত্র নাই। ইহা দৃষ্টে হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহতায়ালার সমীপে নিবেদন করিলেন; ইয়া আল্লাহ! এই লোকটির জীবন কেন এমন দূরবস্থার মধ্যে বিনষ্ট হইতেছে? তাহারতো কিছুই নাই। ওহী আসিল-হে মুসা! তুমি জান না যে, আমার প্রতি যাহার হৃদয়ের আকর্ষণ বেশী হয়, আমি তাহাকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও সুখ শান্তি হইতে দূরে রাখিয়া থাকি।
হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, আল্লাহতায়ালা যখন মানুষকে অতি মাত্রায় ভালবাসেন, তখন তাহাদের উপর নানাবিধ আপদ-বিপদ চাপাইয়া দেন। আর যাহাদিগকে পূর্ণ মাত্রায় ভালবাসেন, তাহাদিগকে "একতেনা" করেন। ছাহাবীগণ "একতেনা” শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিয়াছিলেন, কাহারও ধন সম্পদ সমূলে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া এবং পরিজনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করিয়া ফেলাকে "একতেনা" বলা হয়।" (এহইয়াউলুমদ্দিন)
আল্লাহর ভালবাসা সম্পর্কে দয়াল নবী (সাঃ) আরও বলেন যে, আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন তাহাকে দুনিয়া হইতে এমনভাবে হেফাজত করেন যেমনভাবে তোমাদের কেহ আপন অসুস্থ রোগীকে ক্ষতিকর বস্তু হইতে বাঁচাইয়া রাখ। (আহমদ ও তিরমিজি)
বিজ্ঞাপন
উপরে বর্ণিত হাদীস সমূহ থেকে বুঝা যায়, আল্লাহর মারেফাত অর্জন করিতে হইলে, আল্লাহতায়ালার প্রেম ভালবাসা বা মহব্বত অর্জন করিতে হইলে নানাবিধ বিপদ-আপদের পর্দাকে অতিক্রম করিতে হয়। ইহাদের মধ্যে 'ফকর' বা দরিদ্রতার মাকাম তয় করা খোদাঅন্বেষীদের একান্ত জুরুরী।
ফকরের মাকাম হাছিল করা বা ফকরের গুণ অর্জন করার তাৎপর্য কি?
ফকরের গুণ অর্জনের তাৎপর্য হইলঃ
বিজ্ঞাপন
★ ফকর বা দরিদ্রতাকে খোদাতায়ালা থেকে আগত পরীক্ষা মনে করিয়া তাহার উপর ধৈর্য ধারণ করা।
★ দরিদ্রতা বা নিঃস্বতাকে খোদাতায়ালার নেয়ামত মনে করা।
★ দরিদ্রতাকে নেয়ামত মনে করিয়া খোদাতায়ালার শোকরিয়া আদায় করা।
★ দরিদ্রতাকে ভালবাসা।
★ সর্বাবস্থায় খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট থাকা।
★ দরিদ্রতার কারণে আল্লাহতায়ালার বিধানের প্রতি বিন্দু পরিমানও ক্ষোভ প্রকাশ না করা বা অসন্তুষ্ট না হওয়া ইত্যাদি।
দরিদ্রাবস্থায় যিনি উপরোক্ত শর্তসমূহ পালন করিতে পারেন-আল্লাহতায়ালা তাহাকে ফকরের সাথে আরও বহুবিধ গুণ দান করেন; শয়তানের প্ররোচনা মুক্ত করেন, নাফসের শৃংখলমুক্ত করেন, দুনিয়ার আকর্ষণমুক্ত করেন এবং মহামূল্য মারেফাতে ভূষিত করেন।
ধনসম্পদ খোদাপ্রাপ্তির পথে এক অন্তরায়। ধনসম্পদ সংসার আসক্তি বৃদ্ধি করে, মানুষকে দুনিয়ামুখী করে, খোদাতায়ালা থেকে দূরে সরায়, মানুষ ভোগ বিলাসের স্রোতে গা ভাসাইয়া দেয়, মানুষের জীবন বরবাদ হয়। যাহার হৃদয়ে সংসারাসক্তি যত বেশী, খোদাতায়ালা থেকে সে ততদূরে। যাহার হৃদয়ে সংসারাসক্তি নাই বা দুনিয়া প্রেম নাই; সে খোদাতায়ালার সর্বাধিক নিকটে। আর তাই, যে ধন-সম্পদ সংসারাসক্তি বৃদ্ধির কারণ, সেই ধন-ঐশ্বর্যকে দয়াল নবী (সাঃ) যেমন ঘৃণা করিয়াছেন, তেমনি অবহেলা করিয়াছেন দয়াল নবী (সাঃ) এর খাছ উম্মতেরা অর্থাৎ ওলীয়ে কামেল সকল।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, একদিন হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! আল্লাহতায়ালা আপনাকে সালাম জানাইতেছেন এবং আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন যে, আপনি যদি ইচ্ছা করেন; তবে পাহাড় পর্বতকে স্বর্ণে পরিণত করিয়া আপনাকে দান করিতে পারেন। ইহা শ্রবণে দয়াল নবী (সাঃ) বলিলেন, হে জিব্রাইল! আমি তাহা পাইতে চাই না। এই পথিবী গৃহহীন লোকের জন্য গৃহ এবং ধনবিহীন লোকের জন্য ধন। ইহজগতে ধন সঞ্চয় করা নির্বোধ লোকের কাজ। রাসূলে করীম (সাঃ) এর মুখে ইহা শুনিয়া জিবাইল (আঃ) বলিলেন, আল্লাহতায়ালা আপনাকে এই সুদৃঢ় মনোভাবের প্রতি অটল রাখুন।
একদা রাসূলে পাক (সাঃ) দুনিয়াকে মুর্তিমান হইয়া নিজের দিকে আসিতে দেখিয়া অবজ্ঞার সুরে দুনিয়াকে বলিলেনঃ আমার সামনে থেকে দূর হও, আমার সামনে থেকে দূর হও।
নবী করীম (সাঃ) ফকর বা দরিদ্রতার গুণে বিভূষিত ছিলেন, দরিদ্রতাকে ভালবাসিতেন, নিজে ফকীরী জীবন যাপন করিতেন এবং অপরকেও ফকীরী জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করিতেন। তিনি বলিতেন, দরিদ্রতা বা ফকর আমার গর্বের বস্তু। তিনি খোদাতায়ালার নিকট প্রার্থনা করিতেনঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখ। মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দান কর এবং মিসকিনদের দলে হাশর কর। (মেশকাত ও তিরমিজী)। এই প্রার্থনার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় তাহার জীবনে। তিনি কোন দিনই পেট পুরিয়া আহার করেন নাই। অধিকন্তু তিন দিন, পাঁচ দিন বা সাত দিন পর্যন্ত না খাইয়া থাকিতেন। অভাব-অনটন তাহার নিত্য সংগী ছিল। হযরত আনাস (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, নবী করীম (সাঃ) এর পরিবারের নিকট কোন সন্ধ্যাকালেই এক সা গম বা এক সা কোন খাদ্যদানাও (আগামী কল্যের জন্য) অবশিষ্ট থাকিত না। (মেশকাত, বোখারী)।
নবী করীম (সাঃ) যেমন ফকরের গুণে গুণান্বিত ছিলেন, তেমনি তাঁহার পবিত্র সংস্পর্শে আসিয়া তাহারই পাক তাওয়াজ্জুহ বলে সাহাবাগণও ফকরের গুণ অর্জন করেন। সাহাবাগণের জীবন চরিত থেকে ইহার প্রমাণ মিলে।
হযরত আবুবকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (কঃ) এবং অন্যান্য বহু সাহাবা ফকীরী জীবন যাপন করিতেন, দরিদ্রতাকে ভালবাসিতেন। তাহারা ছিন্ন কাপড় পড়িতেন; অধিক দিবসই অনাহারে থাকিতেন।
একদা হযরত আবুযর (রাঃ) ছাহেব কতিপয় লোকজনের সাথে ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করিতেছিলেন, এমন সময় তাহার স্ত্রী আসিয়া বলিলেনঃ তুমি এখানে বসিয়া নিশ্চিত মনে আলাপ করিতেছ-খোদার কছম, ঘরে খাবার কিছুই নাই, সংগ্রহ করিবারও কোন উপায় নাই। তিনি বলিলেন, তাহা অতিক্রম করিতে হইলে বোঝা ভারী না থাকাই উত্তম, হালকা হে রমণী, ছবর কর। আমাদের সম্মুখে এমন একটি দুর্গম ঘাটি রহিয়াছে, বোঝা বিশিষ্ট লোক ব্যতীত সেই দুর্গম ঘাটি আর কেহই অতিক্রম করিতে পারিবে না। পতির এই কথা শ্রবণে সৌভাগ্যবতী রমণী সন্তুষ্ট চিত্তে গৃহে ফিরিয়া গেল।
মা আয়েশাকে দয়াল নবী (সাঃ) বলিয়াছিলেন, "হে আয়েশা! যদি তুমি কেয়ামতের দিন আমার সংগে থাকিতে বাসনা রাখ, তবে ফকীরের ন্যায় জীবন যাপন কর। আমীর লোকের আচরণ ও তাহাদের সংগে উঠাবসা থেকে দূরে সরিয়া থাক। পরিধেয় বস্ত্রে গ্রন্থি লাগাইবার উপায় থাকা পর্যন্ত গ্রন্থি লাগাইয়া পরিধান করিতে থাক। তালি লাগাইয়া পরিধান করা ব্যতীত কোন পুরাতন কাপড় পরিত্যাগ করিও না।" মা আয়েশার জীবনীতে দেখা যায় যে, তিনি বরাবরই তালি দেওয়া কাপড় পরিধান করিতেন। যদিও তিনি নজরানা স্বরূপ লক্ষ লক্ষ দেরহাম পাইতেন। কিন্তু প্রাপ্ত নজরানা তিনি মানব কল্যাণে ব্যয় করিতেন। নিজের প্রয়োজনে তেমন ব্যয় করিতে দেখা যায় নাই। কিতাবে দেখা যায়, একদিন তিনি প্রাপ্ত লক্ষ দেরহাম গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করেন, নিজের নিকট একটি দেরহামও রাখেন নাই। অথচ সেদিন তিনি রোজা ছিলেন। ইফতারের জন্য কিছু ক্রয় করার উদ্দেশ্যে একটি দেরহাম অন্ততঃ রাখিতে পারিতেন। তাহাও রাখেন নাই। ইহার কারণ দরিদ্রতাকে তিনি ভালবাসিতেন। দরিদ্রাবস্থায়ই থাকিতে তিনি পছন্দ করিতেন।
দয়াল নবী (সাঃ) ও সাহাবাগণ যেমন ফকর বা দরিদ্রতাকে ভালবাসিতেন; তেমনি বিগত ওলীয়ে কামেলসকল বা নায়েবে নবী সকল দরিদ্রতাকে পছন্দ করিতেন এবং বর্তমানেও ওলী-আল্লাহগণ দরিদ্রতা বা ফকরকে ভালবাসেন।
প্রত্যেক ওলীয়ে কামেলকেই দরিদ্রতার পর্দাকে অতিক্রম করিতে হইয়াছে। তাহারা তাহা অতিক্রম করিতেন প্রেম বা মহব্বতের মাধ্যমে। সমস্ত সাধকই ফকরের গুণে গুণান্বিত ছিলেন। ওলী-আল্লাহদের জীবনী অধ্যায়ন করিলে দেখা যায়ঃ তাহাদের প্রত্যেকের জীবনেই দরিদ্রতা ছিল, অভাব ছিল। কিন্তু কখনও তাহারা নিজেদের অভাবের জন্য বিন্দু পরিমাণও অভিযোগ করেন নাই, মনক্ষুন্নও হন নাই; বরং ছিল, নিঃস্বতা বরণ করিয়াছেন। তাহারা সকলেই ছিলেন তুষ্ট। অভাব বা নিঃস্বতাকে খোদাতায়ালার নেয়ামত হিসাবেই বরণ করিয়াছেন। তাহারা সকলেই ছিলেন তুষ্ট। তাহারা তাই "তুষ্ট ফকীর বলিয়া পরিচিত। হয়তো এই কারণেও ওলী-আল্লাহগণ নিজেদেরকে ফকীর বলিয়া পরিচয় প্রদান করিতে পছন্দ করেন।
বড় বড় ওলী আল্লাহগণ নিজেদেরকে যে ফকীর বলিয়া পরিচয় দেন-ইহার আরও এক নিগুঢ় তাৎপর্য আছে। ওলী আল্লাহগণ যখন বেলায়েতে ছোগরাস্থিত তাজাল্লীয়াতে আফয়াল (আল্লাহর ক্রিয়াকলাপের নূর) প্রাপ্ত হন-তখন তাহারা স্পষ্ট বুঝিতে পারেন যে, এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সব কিছুই এক খোদাতায়ালার ইচ্ছায় সংঘটিত হইতেছে। দিবা-রাত্রির পরিবর্তন, ঋতুর পরিবর্তন, গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণন, প্রাণীর জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি সব কিছুই এক খোদাতায়ালার ইচ্ছায় সংঘটিত হইতেছে। মানুষ তথা সৃষ্টজগতের সবকিছুই খোদাতায়ালার মুখাপেক্ষী। ইহা দৃষ্টে তাহারা স্বেচ্ছায় তুচ্ছ ও নশ্বর দুনিয়াকে ত্যাগ করেন এবং ফকীরী জীবন অবলম্বন করেন।
এই স্তর হইতে সাধক যখন বেলায়েতে কোবরায় প্রবেশ করিয়া খোদাতায়ালা হইতে ধার স্বরূপ প্রাপ্ত গুণ সমূহকে ফেরত দেন, তখন নিজের মধ্যে দেখেন শুধু শূন্যতা। এই অবস্থাতে সাধক খোদাতায়ালার আরও মুখাপেক্ষী হন এবং খোদা প্রেমে বিভোর হন।
এখান হইতে সাধক যখন জাতি নূরের সমুদ্রের গভীরে প্রবেশ করেন, হকিকতে আহমদীর দায়েরাতে উপনীত হন-তখনতো নিজের ভিতর নিঃস্বতা ও মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। এই স্তরের সাধক নিজের ভিতরে দেখেন-নিঃস্বতা, অক্ষমতা, নীচতা, অজ্ঞতা, হীনতা ইত্যাদি। তাই সাধক নিজেকে জগতের সর্ব নিকৃষ্ট মনে করেন। এই স্তরে পৌঁছানোর পরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) নিজের হাল বর্ণনা করিতে যাইয়া তদীয় পীরের নিকট লিখিতেছেনঃ যে কোন আমল করি না কেন, তাহা আমার দক্ষিণের ফেরেশতা লিখিবার উপযোগী নহে। বরং আমার বিশ্বাস যে, আমার নেকীর আমলনামা শূন্য এবং ফেরেশতা যেন বেকার বসিয়া আসে। অতএব নিখিল বিশ্বে যাহা কিছু আছে বরং ফিরিংগি, কাফের এবং বেদীনও যেন আমার চেয়ে উৎকৃষ্ট। আমি যেন সবচেয়ে নিকৃষ্ট। এই মাকামের সাধক সর্বতোভাবে নিজেকে খোদাতায়ালার হাতে সোপর্দ করিয়া তাঁহার ইবাদতে মগ্ন থাকেন। এই মাকামের সাধক নিজ অভিজ্ঞতায় বুঝিতে পারেন, আল্লাহুচ্ছামাদ-অর্থাৎ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। আরও বুঝিতে পারেনঃ মানুষ সর্বদিক দিয়াই খোদাতায়ালার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ফকীর (যে অপরের মুখাপেক্ষী)। আল্লাহতায়ালার বাণী "ইয়া আইয়্যুহান্নাসু আনতুমুল ফুকারায় ইলাল্লাহে"-অর্থাৎ হে মনুষ্যজাতী! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট ফকীর-মুখাপেক্ষী)- এই আয়াতের মর্মার্থ বা তাৎপর্যও উপলব্ধি করেন। ইহাই মূলতঃ ওলীয়ে কামেলবর্গের-নিজেদেরকে 'ফকীর' বলিয়া পরিচয় দেওয়ার মুখ্য কারণ।
ওলীয়ে কামেল বর্গকে বা ফকীরগণকে যাহারা ভালবাসেন-তাহারা এই ভালবাসার কারণেই বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। নবী করীম (সাঃ) বলেন,
حُبُّ الفُقَرَاءِ مِفْتَاحُ الْحَنَّةِ
অর্থাৎ-'ফকীর লোকের মহব্বতই বেহেশতের চাবি।'
উল্লিখিত চরিত্রের ফকীরদের সম্পর্কে দয়াল নবী (সাঃ) আরও বলেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদিগকে বলিবেন, দেখতো আমার খাছ প্রিয় বান্দারা কোথায়? ফেরেশতাগণ নিবেদন করিবেনঃ ইয়া আল্লাহ! কাহারা আপনার বিশেষ প্রিয় বান্দা? উত্তর আসিবে, ফকীর লোক।
পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, খোদাপ্রাপ্তির পথে দরিদ্রতা একটি ধাপ। এই ধাপ যাহারা সন্তুষ্ট চিত্তে অতিক্রম করিতে পারে-তাহাদেরকে বলা হয় "তুষ্ট ফকীর।” তুষ্ট ফকীরদের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন। তাহাদের উপর রহমতের ধারা অবিরাম বর্ষিত হয়। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ফকীরদের প্রসংসায় তদীয় মসনবীতে বলেন,
যাঁকে দর্বেশী ওরায়ে কারেহাস্ত,
দমবদম আয হক মরী শাঁরা আতাস্ত।
অর্থাৎ-'ফকীরদের অবস্থাতো নিতান্তই স্বতন্ত্র। প্রতি মুহূর্তে তাঁহাদের জন্য আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে বিশেষ দান আসিতে থাকে।'
তুষ্ট ফকীরদের প্রশংসায় নবী করীম (সাঃ) বলেনঃ কিয়ামতের দিন সকলকে মহাবিচারালয়ে উপস্থিত করা হইলে মানুষ একে অন্যের নিকট ত্রুটি স্বীকার পূর্বক যেরূপ নম্রতার সহিত কথাবার্তা বলে, আল্লাহতায়ালা দরিদ্র লোকদিগকে সম্বোধনপূর্বক তদ্রুপ নম্রতার সহিত সান্তনা প্রদান করিয়া বলিবেন-হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! আমি যে তোমাদিগকে পৃথিবীতে ধন দৌলত প্রদান করি নাই, তাহাতে তোমরা এইরূপ মনে করিও না যে, তোমাদিগকে চীন এবং অপদস্ত করার জন্য নির্ধন করিয়াছিলাম: বরং এই জন্য তোমাদিগকে নির্ধন করিয়াছিলাম যে, পরকালে তোমাদিগকে মহান পুরস্কারে পুরস্কৃত এবং মহা গৌরবে গৌরবান্বিত করিব। এখন তোমরা এই জনতার সারিসমূহের মধ্যে প্রবেশ কর। ইহাদিগের মধ্যে যাহারা দুনিয়াতে তোমাদিগকে আমার খুশীর জন্য কোন দিন এক লোকমা অন্ন বা একখানী বস্ত্র দান করিয়াছিল-তাহাদিগকে টানিয়া লইয়া আস। তাহাদিগকে আজ আমি তোমাদের হস্তে সমর্পণ করিলাম। সেদিনের অবস্থা এমন হইবে যে, দারুণ উত্তাপে মানুষ ঘর্মসমুদ্রের মধ্যে ডুবিয়া থাকিবে। তখন দরিদ্রগণ জনতার সারিসমূহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের প্রতি অনুগ্রহকারীদিগকে হস্ত ধারণ পূর্বক টানিয়া বেহেশতে লইয়া যাইবে। তাই দয়াল নবী (সাঃ) বলেনঃ তোমরা ফকীরদেরকে ভালবাস এবং তাহাদের উপকার কর। পরকালের পথে তাহারা তোমাদের জন্য সংগৃহীত ধন এবং প্রধান সম্বল।
ফকরের ফজিলতঃ
ফকর বা দরিদ্রতার ফজিলত সম্পর্কে রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে ফকীর লোক সর্বাপেক্ষা উত্তম।" তিনি আরও বলেন, আমার প্রিয় দুইটি পেশা আছে। যথাঃ দরিদ্রতা ও জেহাদ (ধর্মযুদ্ধ)।
রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, আমাকে বেহেশত দেখান হইয়াছিল। দেখিলাম-বেহেশবাসীদের অধিকাংশই গরীব লোক। দোযখও আমাকে দেখান হইয়াছিল। দেখিলাম, অধিকাংশ দোযখীই ধনী লোক। রাসূলে পাক (সাঃ) আরও বলেন, ধনৈশ্বর্যের কারণে পয়গম্বরগণের মধ্যে হযরত সোলায়মান (আঃ) সকলের শেষে বেহেশতে যাইবেন। আর ছাহাবীগণের মধ্যে ধনবান হওয়ার কারণে সকলের শেষে বেহেশতে প্রবেশ করিবেন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)।"
তুষ্ট দরিদ্র বা ফকীরদেরকে আল্লাহপাক কি পরিমাণ ভালবাসেন, তাহা নিম্নের হাদীস থেকে বুঝা যায়ঃ একদা দরিদ্রদ ও নিঃস্ব ফকীর লোকেরা দয়াল নবী (সাঃ) এর নিকট অভিযোগ পেশ করিবার জন্য একজন প্রতিনিধি প্রেরণ করিল। প্রতিনিধি তৃষ্ট দরিদ্রদের পক্ষ হইতে হুজুরে লোকেরাইতো ইহকাল-পরকালের সমস্ত নেকী লুটিয়া নিতেছে। তাহারা পাক (সাঃ) এর খেদমতে নিবেদন করিলঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! ধনী গরীব-দুঃখীদের দান খয়রাত করে, যাকাত প্রদান করে, হজ্ব করে, ধর্ম যুদ্ধে যোগদান করে। আমরা ফকীর, নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্থ। আমরা উক্ত পুণ্য কাজ সমূহের কিছুই করিতে পারিতেছি না।" দয়াল নবী (সাঃ) দরিদ্রগণের প্রতিনিধিকে পরম সমাদরে সম্মানিত করিয়া বলিলেন, "তোমাকে স্বাগতম এবং তুমি যাহাদের পক্ষ হইতে আসিয়াছ, তাহাদিগকেও স্বাগতম জানাইতেছি। তুমি যাহাদের নিকট থেকে আসিয়াছ, আমি তাহাদিগকে বড়ই ভালবাসি। তুমি ফিরিয়া যাইয়া তাহাদিগকে এই শুভ সংবাদ প্রদান করিবে যে, যাহারা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায় ফকর বা দরিদ্রতার উপর ছবর করে এবং ধৈর্য সহকারে সর্বপ্রকার কষ্ট সহিয়া যায়, তাহাদের অদৃষ্টে এমন তিনটি সৌভাগ্য নির্ধারিত আছে-যাহা ধনী লোকের ভাগ্যে কখনই ঘটিবে না। যথাঃ
★ বেহেশতের সর্বোচ্চ শ্রেণীতে কতগুলো উজ্জল আলোকময় প্রকোষ্ঠ রহিয়াছে। সাধারণ বেহেশতীগণ নিম্নদেশ হইতে সেই প্রকোষ্ঠগুলোকে এত উচ্চে দেখিবে, যেমন ভূপৃষ্ঠের লোক আসমানে নক্ষত্ররাজী দেখিয়া থাকে। সেই সর্বোচ্চ ও মনোহর প্রকোষ্ঠগুলো কেবল দরিদ্র পয়গম্বর, দরিদ্র মুসলমান এবং দরিদ্র শহীদগণই প্রাপ্ত হইবেন।
★ দরিদ্র মুসলমানগণ ধনী লোকের ৫০০ বছর পূর্বে বেহেশতে প্রবেশাধিকার প্রাপ্ত হইবে এবং
★ দরিদ্র লোক যদি শুধু একবার পড়ে, "সোবহানাল্লাহে অলহামদুলিল্লাহে অলা ইলাহা ইল্লাল্লাহু অল্লাহু আকবর।" অর্থাৎ আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আল্লাহ ভিন্ন কেহ উপাস্য নাই এবং আল্লাহ অতি মহান।" আর ধনী লোক উক্ত কলেমা পাঠ করিয়া তৎসংগে দশ হাজার দেরহাম গরীব দুঃখীদের মধ্যে ছদকা করিয়া দিলেও দরিদের সমান অবস্থা ও মর্যাদা লাভকরিতে পারিবে না।"
প্রতিনিধি নিজ দলে ফিরিয়া আসিয়া উক্ত শুভ সংবাদ প্রদান করিলে সকলে সমস্বরে বলিয়া উঠিলঃ আমরা সন্তুষ্ট হইলাম, আমরা খুশী হইলাম।
এতক্ষণ তোমরা ফকর বা দরিদ্রতার ফজিলত বা খোদাপ্রাপ্তির পথে 'ফকর' গুণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বঝিতে পারিলে। আরও জানিতে পারিলে আল্লাহর দরবারে ফকীরদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে।
সকল নবী-রাসূল (আঃ) ও ওলীয়ে কামেল ফকরের গুণে গুণীঃ
পৃথিবীতে যত নবী ও ওলী আসিয়াছেন, তাহাদের প্রত্যেকেই স্ব স্ব সাধনা জীবনে দরিদ্রতার মোকাবেলা করিয়াছেন, দরিদ্রতাকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করিয়াছেন, দরিদ্রতা বা ফকরের গুণে গুণান্বিত হইয়াছেন। কেহ যদি বলেন, আমার জীবনে দরিদ্রতা আসে নাই; অথচ আমি খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইয়াছি। আমি বলিব, সে মিথ্যাবাদী। ফকর বা দরিদ্রতা খোদাপ্রাপ্তির পথে একটি দরজা। প্রত্যেককেই এই দরজা দিয়া খোদাতায়ালার মারেফাত দফতরে প্রবেশ করিতে হয়। ইহার কোন বিকল্প নাই।
হযরত মুসা (আঃ) প্রাচুর্যের মধ্যে রাজপুত্রের মতই প্রতিপালিত হন। ফেরাউন ও বিবি আছিয়া পরম আদরে মুসা (আঃ) কে বড় করিয়া তোলেন। কিন্তু তাহাকেও সেই প্রাচুর্য ত্যাগ করিতে হয়। আল্লাহতায়ালা এক কৌশলে মুসা (আঃ) কে ফেরাউনের ধনৈশ্বর্যের গন্ডি থেকে একবারে দরিদ্রাবস্থায় নিয়া আসেন। মুসা (আঃ) দীর্ঘ দশ বা বার বছর মেষপালক হিসাবে জীবন যাপন করেন। এক যুগ তাহাকে চরম দরিদ্রতার মধ্যে দিনাতিপাত করিতে হয়। অবশেষে আল্লাহপাক তাহার দিকে মুখ তুলিয়া তাকান। তাহাকে নবুয়তী দান করেন এবং ফেরাউনকে উপদেশ প্রদানের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
হযরত ঈসা (আঃ) আজীবন ফকীরী অবস্থায় অতিবাহিত করিয়াছেন। নিজ সংগীদেরকেও তিনি উপদেশ দিতেনঃ "তোমরা সংসারাসক্ত লোকের ধন-দৌলতের প্রতি দৃষ্টিপাত করিও না। তাহাদের ধনৈশ্বর্যের ছায়া তোমাদের হৃদয়ে পতিত হইলে তোমাদের ঈমানের স্বাদ ও মাধুর্য ছিনাইয়া লওয়া হইবে।"
বিশ্ব নবী, রাসূলে করীম (সাঃ) সারা জীবন মিসকিন হালতে অতিবাহিত করিলেন। কোন দিন পেট পুরিয়া খানা খান নাই; নরম বিছানায় শয়ন করেন নাই। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, দয়াল নবী (সাঃ) এর পরিবারবর্গ লাগাতার দুইদিন যবের রুটি খাইয়াও পরিতৃপ্ত হন নাই। এমতাবস্থায় রাসূলে করীম (সাঃ) এর ওফাত হইয়াছে (মেশকাত)। দয়াল নবীর (সাঃ) পরে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যাহারা খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছে, তাহাদের সকলকেই ফকরের মাকামকে তয় করিতে হইয়াছে অর্থাৎ স্বেচ্ছায় বা সন্তুষ্টচিত্তে দরিদ্রতাকে বরণ করিতে হইয়াছে। যেমন বলখের বাদশাহ হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ)। তিনি অত্যন্ত প্রতাপ ও প্রভাবশালী সুলতান ছিলেন। তিনি যখন ভ্রমণে বাহির হইতেন, ৪০ জন করিয়া স্বর্ণের ঢাল ও রৌপ্যের গুর্জধারী সৈন্য তাহার অগ্রে ও পশ্চাতে দেহরক্ষী রূপে মোতায়েন থাকিত। এমন প্রতাপশালী সুলতানকেও খোদাপ্রাপ্তির পথে আসিয়া বাদশাহী ত্যাগ করিয়া দরিদ্রতাকে স্বেচ্ছায়, সানন্দে গ্রহণ করিতে হয়। বর্ণিত আছেঃ একদা শাহী মহলে গভীর রাত্রে সুলতান ইব্রাহিম আদহাম সুকোমল শয্যাযুক্ত পালংকে শায়িত ছিলেন। এমন সময় ছাদের উপর লোক চলার শব্দ টের পাইলেন। তিনি উচ্চ শব্দে জিজ্ঞাসা করিলেন, ছাদের উপর কে? উত্তর আসিল, তোমারই একজন বন্ধু। আমার একটি উট হারাইয়াছে, উহা তালাশ করিতেছি। ইব্রাহিম আদহাম বলিলেন, তুমি তো দেখিতেছি বড় বোকা। রাজ প্রাসাদের ছাদের উপর উট আসিবে কেমন করিয়া? ছাদের উপরের লোকটি বলিলেন, হে গাফেল! তুমি ম্যুলের পোশাক পরিয়া স্বর্ণের সিংহাসনে বসিয়া আল্লাহতায়ালাকে অন্বেষণ করিতেছ। ইহা ছাদের উপর উট তালাশ করার চেয়ে অধিক আশ্চর্যের বিষয় নহে কি? একথা বলিয়াই ছাদের উপরের লোকটি অদৃশ্য হইয়া গেলেন। এই ঘটনায় ইব্রাহিম আদহামের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার হয়। তাহার অন্তরে খোদাপ্রেমঅগ্নি জ্বলিয়া উঠে। তিনি মহামূল্য বাদশাহী ত্যাগ করিয়া দরিদ্রতার সাজে সজ্জিত হন।
এ মিসকিনের জীবনে ফকর বা দরিদ্রতাঃ
খোদাপ্রাপ্তির সাধনায় আমিও নিজস্ব সবটুকু সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া নিপতিত হইলাম। আমার গায়ে জামা ছিল না। পরণে লুংগী ছিল না। দ্বীনের স্বার্থে সমুদয় টাকা পীরের কদমে প্রদান করিয়া চরম দরিদ্রতায় পেটেতে ভাত ছিল না। দিনের পর দিন অনাহারে-অর্ধাহারে অতিবাহিত করিতে হইয়াছে: কিন্তু সেই দুর্দিনে কখনও এই মিসকিন খোদাতায়ালার উপর কোন অভিযোগ করে নাই। তাই হয়তো আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্ট হইয়া কবুল করিলেন, নিজ সান্নিধ্য দান করিলেন এবং কামালাতে নবুয়ত ও বেলায়েতে নবুয়তের নূর প্রদান করিয়া আল্লাহভোলা মানব সমাজকে হেদায়েতের দায়িত্ব প্রদান করিলেন।
এখানে একটি কথা উল্লেখের প্রয়োজনঃ প্রত্যেক সাধককেই দরিদ্রতার পর্দাকে অতিক্রম করিতে হয়। অতঃপর যে সকল সাধকবর্গকে হেদায়েতের দায়িত্ব প্রদান করিয়া মহান খোদাতায়ালা দুনিয়ায় প্রেরণ করেন, তাহাদের কেহ কেহ সত্য প্রচার জীবনে ধন সম্পদ থেকে দূরে থাকেন; আবার কোন কোন সাধক মুরীদানের দেওয়া অর্থ সম্পদ গ্রহণ করেন, দৃশতঃ ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন।
দৃশ্যতঃ বিত্তবান মনে হইলেও আসলে তাহারা ধনী নহেন। তাহারা ফকীর এবং ফকীরী জীবনকেই পছন্দ করেন। তবে মুরীদানের দেওয়া অর্থ সম্পদকে তাহারা হয়, গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করেন, নতুবা দীন প্রচারের স্বার্থে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করেন।
কিতাবে দেখা যায়, হযরত মা আয়েশা (রাঃ) লক্ষ লক্ষ দেরহাম নজরানা পাইতেন। তিনি তাহা নিজের প্রয়োজনে ব্যয় না করিয়া সবই গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করিতেন। তেমনি হযরত গউস পাক (রাঃ), হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ), হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) প্রমুখ সকলেই মুরীদানদের নিকট থেকে যে প্রচুর পরিমাণ অর্থ সম্পদ প্রাপ্ত হইতেন-তাহা তাঁহারা মানব কল্যাণে ব্যয় করিতেন। নিজেরা ফকীরী জীবনকেই ভালবাসিতেন।
আসলে কামালাতে নবুয়ত ও বেলায়েতে নবুয়তের সাজে সজ্জিত উক্ত সাধকবর্গের নাফস, দেহ এবং সমগ্র অজুদই থাকে পবিত্র, গোনাহের কালিমা থেকে মুক্ত। উক্ত সব সাধকবর্গ খোদাতায়ালার এলহামী নির্দেশেই সমস্ত কর্ম সম্পাদন করেন। এমনকি দৈনন্দিন আহার-নিদ্রা, পোশাক
পরিধান করা, কিংবা অন্যের সাথে সাক্ষাত করা-সবই খোদাতায়ালার এসরি নির্দেশে করেন। মুরীদানের অর্থ গ্রহণ এবং সে অর্থ দ্বীন প্রচারে ব্যয় করা-তাহাও খোদাতায়ালার নির্দেশে করেন। খোদাতায়ালার সে নির্দেশের মধ্যে নিজেদের ব্যক্তিগত কোন ইচ্ছা থাকে না।
এই মিছকিনও খোদাতায়ালার এলহামী নির্দেশে মরিদান থেকে প্রাপ্ত নজরানা দ্বারা খোদাঅন্বেষীদের জন্য ধীরে ধীরে খোদাপ্রাপ্তির প্লাটফর্ম হিসাবে বিশাল তীর্থকেন্দ্র-এই বিশ্ব জাকের মঞ্জিল প্রতিষ্ঠা করে। আবার বিলহামী নির্দেশেই কোটি কোটি টাকার এই সম্পদ খোদাঅন্বেষীদের স্বার্থে, দীনের প্রচারকেন্দ্র হিসেবে ওয়াকফ্ করিয়া দেয়।
আমি সাধনা জীবনে মিসকিন ছিলাম, মাঝখানে দৃশ্যতঃ ধনাঢ্য মনে হইলেও মূলতঃ মিসকিনই ছিলাম। জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া সমস্ত সম্পত্তিকে ওয়াকফ্ করিয়া দিয়া আবার যথার্থ মিসকিনেই পরিণত হইলাম।
হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার প্রেম পিরিতি ভালবাসা লাভ করিতে চাও; তবে দরিদ্রতা, অনাহার, অনিদ্রা ও দুঃখ-কষ্টের জন্য সদা প্রস্তুত থাক। দরিদ্রতা খোদাপ্রাপ্তির পথে অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। তোমাদের উপর আপতিত দরিদ্রতায় ধৈর্য ধারণ কর, আগত বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবতে সবর কর; তাহা হইলে মাঞ্জিলে মাকসুদে পৌছাইতে পারিবে, ইনশাল্লাহ। আল্লাহতায়ালা তোমাদিগকে দয়া করুন। আমীন!





