বাবার মরদেহ সামনে রেখে ঋণ শোধ, শিশুর কান্নায় ভারী পরিবেশ

দাফনের আগে মৃত বাবার মরদেহ সামনে রেখে পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধের হৃদয়স্পর্শী একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জানাজার পর বাবার মরদেহ সামনে রেখে তার কাছে পাওনা থাকা ব্যক্তিদের টাকা পরিশোধ করতে দেখা যায় শিশুসন্তানকে। একই সঙ্গে বাবার কাছে কারও আরও কোনো ঋণ বা দাবি থাকলে তা জানিয়ে দেওয়ার জন্য উপস্থিত লোকজনের প্রতি অনুরোধ জানায় দুই শিশু।
বিজ্ঞাপন
উম্মে হুমায়রা কানিজ ফাতেমা নামে এক কনটেন্ট নির্মাতার ভিডিও চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ধারণ করা ওই ভিডিওতে তিনি জানান, আলী আকবার নামে ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। প্রায় আট মাস ধরে তার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তার জন্য একটি ঘরও করে দেওয়া হয়েছিল। পরে অসুস্থ অবস্থায় তিনি মারা যান।
ভিডিওতে ওই কনটেন্ট নির্মাতাকে বলতে শোনা যায়, এমন পরিস্থিতিতে ভিডিও করতে হবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি। মৃত আলী আকবারের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার সময় প্রায় আট মাস ধরে তিনি ওই ব্যক্তির খোঁজখবর রেখেছেন এবং তার জন্য একটি ঘরও করে দিয়েছিলেন। আগের রাতে আল্লাহর ডাকে তিনি মারা যান।
তিনি বলেন, ‘আজ দুই ঘণ্টা আগে আমি আসি উনার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করার জন্য। আসার পরে শুনি, উনার কাছে ধার পাবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এই দুই ঘণ্টার মধ্যে ৬০ হাজার টাকা জোগাড় করতে না পারলেও আমি ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করে লাশ সামনে রেখে তার এতিম শিশুর হাতে তুলে দিব ধারের টাকাটা।’
বিজ্ঞাপন
এ সময় পাশে থাকা এক হুজুরের কাছে মৃত ব্যক্তির মরদেহ সামনে রেখে এভাবে ঋণ পরিশোধের ঘটনা আগে দেখেছেন কি না জানতে চান তিনি। জবাবে ওই হুজুর জানান, এমন ঘটনা তিনি আগে দেখেননি। সাধারণত জানাজার মাঠে মৃত ব্যক্তির কাছে কারও ঋণ বা পাওনা আছে কি না, তা প্রকাশ করা হতো। এরপর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হতো।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ভিডিওতে মৃত আলী আকবারের শিশুসন্তানকে বাবার ঋণ পরিশোধের কথা বলতে দেখা যায়। কনটেন্ট নির্মাতার দেওয়া টাকা শিশুটি হুজুরের হাতে তুলে দিয়ে বলে, ‘আমার বাবা কবরে যাওয়ার আগে আমি সব টাকা শোধ করে দিয়েছি। আমার বাবাকে সবাই মাফ করে দেন।’
এরপর উপস্থিত পাওনাদারদের কাছে একে একে তাদের পাওনা টাকার পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়। একজন জানান তার ২৫ হাজার টাকা পাওনা, আরেকজনের ১০ হাজার এবং অন্য একজনের পাওনা ছিল ১২ হাজার ৯৬৮ টাকা। ওই কনটেন্ট নির্মাতা জানান, ১২ হাজার ৯৬৮ টাকা পাওনার মধ্যে ১০ হাজার টাকা মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ২ হাজার টাকা মাফ করে দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
পরে তিনি জানান, উপস্থিত লোকজনের সামনে চারজনের ধার পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনের ২৫ হাজার, একজনের ১০ হাজার, একজনের ২ হাজার এবং আরেকজনের ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে মৃত ব্যক্তির দোকানে আরও কিছু টাকা পাওনা রয়েছে বলে সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি জানান।
বিজ্ঞাপন
সবশেষে মৃত ব্যক্তির সন্তানরা উপস্থিত সবার কাছে বাবার কোনো ভুল বা ক্ষতি হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এসময় মৃত ব্যক্তির মেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবা কারও ক্ষতি করে থাকলে, আপনারা মাফ করে দিয়েন। আমার বাবা আর কোনদিন আপনাদের থেকে মাফ চাইতে পারবে না। আমরা লাশ সামনে রেখে রেখে ধার শোধ করে দিছি। আপনারা সবাই মাফ করে দিবেন।’
লাশ সামনে রেখে মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ এবং সন্তানদের কান্নাজড়িত বক্তব্যের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওটি নিজের ফেসবুক পেজেও শেয়ার করেন উম্মে হুমায়রা কানিজ ফাতেমা।
ওই পোস্টে আজিজুর রহমান নামে একজন মন্তব্য করেন, ‘জঙ্গলের পশুগুলো আমাদের থেকে ভালো আছে। টাকাই সবকিছুর মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই এলাকার সমাজের মনে হয় কোনো মানুষ নাই।’ তবে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘বোন আপনি যেভাবে ওই বাচ্চাগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন মহান রাব্বুল আলামিন যেন আপনার মঙ্গল করেন।’
বিজ্ঞাপন
মো. শফিকুল ইসলাম নামে একজন লেখেন, ‘জীবনে অনেক ভিডিও করছি এবং অনেক ভিডিও দেখছি; কিন্তু এমন ভিডিও আমি কখনোই দেখিনি।’ আনিসুর রহমান লেখেন, ‘আহারে! টাকা দিয়ে মানুষ কবরে যাবে।’








