নৌকার ব্যাজধারী প্রকৌশলী ফয়সালের গণপূর্তে আধিপত্য

ছাত্র-জনতার রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও প্রশাসনের ভেতরে এখনো পুরনো ব্যবস্থার ছায়া কাটেনি এমন অভিযোগ উঠেছে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগকে ঘিরে।
বিজ্ঞাপন
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম, যিনি দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে নৌকার ব্যাজ বুকে লাগিয়ে চলাফেরা করতেন এবং নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি অভিযোগপত্র জমা পড়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি কৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্রিয় রয়েছেন। কখনও রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল, কখনও নতুন বলয়ের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে প্রভাব বজায় রাখছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩২তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তঘর এলাকার বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় আমুর পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগ সরকার আমলেও ঝালকাঠিতে সাধারণ ঠিকাদাররা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিষয়টি কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বরিশালে বদলি হয়ে এসে সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত হয়ে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগে আবারও আলোচনায় আসেন ফয়সাল আলম।
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়াভাবে শত শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে বরিশাল মেরিন একাডেমি, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, ক্যান্সার হাসপাতাল, বিটাক, তালতলী মডেল মসজিদ, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিমানবন্দর থানা ভবন ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ।
বিশেষ করে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারদের দাবি, প্রাথমিক কাজের পর ব্যয় বাড়ানোর নামে পুনরায় বরাদ্দ আদায়ের চেষ্টা চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকায় পূর্বে টেন্ডার বাতিল করা হয়েছিল, সেই একই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথ উদ্যোগ (জেভি) দেখিয়ে পুনরায় দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী লিড পার্টনারের ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণের কথা থাকলেও তা বাস্তবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং শর্ত শিথিল করে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি সাধারণ ঠিকাদারদের।
বিজ্ঞাপন
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ জানাতে গেলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকিও দেওয়া হয়।
এ বিষয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ফয়সাল আলম ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করেছেন। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হয়েছেন। যদি প্রকৌশলী পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। তাহলে সেটা দুর্নীতির মধ্যে পড়েন।
ঠিকাদার আব্দুর রহিম ও তসলিম মৃধা বলেন, ঝালকাঠি হোক কিংবা বরিশাল একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয় বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুর্দে বার্তা পাঠিয়ে উত্তর মেলেনি।
ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপন অভিযোগ করে বলেন, ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা প্রতিষ্ঠান কীভাবে টেন্ডারে অংশ নিল, সে বিষয়ে প্রকৌশলীকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। তিনি একজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী।








