ডিপিডিসির প্রকৌশলী স্বৈরাচার হেলাল ঘুষ-সিন্ডিকেটের মাস্টার

বিদ্যুৎ সংযোগের আশায় সাধারণ মানুষ দিনশেষে এসে দাঁড়ায় ঘুষের কাছে। নিয়ম ভেঙে, প্রভাব খাটিয়ে, সিন্ডিকেট গড়ে ডিপিডিসি হয়ে উঠেছে দুর্নীতির আখড়া। ডিপিডিসি মাতুয়াইল নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিনের কথায় চলে মাতুয়াইল ডিভিশনের প্রকৌশলীরা।
বিজ্ঞাপন
তার ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদার, সাবেক কমপ্লেন সুপারভাইজার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, লাইনম্যান ফিরোজ শেখের শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট। যার নাম ডিপিডিসির ভেতরে এখন স্বৈরাচারের দোসর প্রকৌশলীর ঘুষ বাণিজ্যে। এই দুই প্রকৌশলীর ইশারায় বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্রান্সফরমার ব্যবসা, এমনকি ঘুষ বাণিজ্য পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়।
অভিযোগ আছে, একেকটি সংযোগ পেতে গ্রাহককে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা। মিটার টেম্পারিং থেকে শুরু করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি সবখানে চলছে এই চক্রের দৌরাত্ম্য। অথচ গ্রাহক অভিযোগ তুললেও নিশ্চুপ ডিপিডিসির বড় কর্তারা। ফলে দুর্নীতি হয়ে উঠেছে ওপেন সিক্রেট। এ ঘটনা দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন এক গ্রাহকে বলেন, ডিপিডিসির যে এমডি আসেন তাকেই প্রতিমাসে মাসোহারা দিতে বাধ্য হই। তাহলে আপনি বলেন, ঘুষ ছাড়া কাজ করবো কিভাবে।
দুদকে অভিযোগে বলা হয়, ডিপিডিসি মাতুয়াইল অফিস থেকে গত ৬ মাস আগে অবসরপ্রাপ্ত যান কমপ্লেন সুপারভাইজার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান। অবসরে যাওয়ার পরও বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় অনৈতিকভাবে বকেয়াদার গ্রাহকদের কাছ থেকে বকেয়া আদায় না করেই বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করে আসছেন।
বিজ্ঞাপন
ডিপিডিসির আইন অনুযায়ী যেসব গ্রাহক এইচটি সংযোগ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার যোগ্য নন, সেই সকল গ্রাহককে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে সংযোগ প্রদান করা হচ্ছে। কমপ্লেন সুপারভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান অফিসে কোনো ডিউটি না থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত অফিসে অবস্থান করে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেন এবং এইচটি যোগ্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে আবাসিক সংযোগ প্রদান করান। এমনকি সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের বকেয়াদার গ্রাহক ম্যাপ এশিয়া (গ্রাহক নং: ১৪৯৩০৩২৬)-এর বিরুদ্ধে ডিপিডিসি কর্তৃক বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মামলা দায়ের করেন। ওই গ্রাহক পরবর্তীতে মাতুয়াইল ডিভিশনের আওতায় গ্রাহক নং: ৩৫৯৪৮২৫৩ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রায় ১৪ লাখ টাকা বকেয়া থাকা সত্ত্বেও ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেন। এতে করে রাজস্ব হারিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
এছাড়াও মোস্তাফিজুর রহমান সব সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর রুমে অবস্থান করেন। নতুন কোনো সংযোগের জন্য গ্রাহক আসলে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই মোস্তাফিজুরের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন। এ ভাবে প্রতিনিতই ঘুষের বিনিময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তবে হেলাল উদ্দিন সিন্ডিকেট উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার তালুকদার, সাবেক কমপ্লেন সুপারভাইজার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, লাইনম্যান ফিরোজ শেখের কথায় এই ডিভিশন চলে।
ডিপিডিসির আইন অনুযায়ী যেসব গ্রাহক সংযোগ পাওয়ার যোগ্য নন, তাদেরকে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে সংযোগ প্রদান করেন এই সিন্ডিকেট।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি মাতুয়াইল ডিভিশনের নতুন ফ্ল্যাটে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আকাশ। গৃহস্থালির সব আয়োজন তৈরি, শুধু নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। এক সপ্তাহ ধরে ডিপিডিসির অফিসে দৌড়ঝাঁপের পর অবশেষে একটি খবর পেলেন সংযোগ চান তো দিতে হবে পাঁচ লাখ টাকা। বিস্ময়ে হতভম্ব আকাশ বুঝলেন, নিয়ম মেনে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যেন স্বপ্নের মতো। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ঘুষের টাকা মিটিয়েই বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেন তিনি।
এ অভিজ্ঞতা শুধু আকাশের নয়, রাজধানীর মাতুয়াইল অসংখ্য ভুক্তভোগীর। অভিযোগ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের হাতে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন মাতুয়াইল নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন। তার নেতৃত্বে মাতুয়াইল এখন ঘুষের হাট খুলে বসেছেন। সূত্র বলছে, ডিপিডিসির মাঠ পর্যায়ের গ্রাহকদের অভিযোগ, নতুন একটি বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে হলে ঘুষ ছাড়া উপায় নেই।
এলাকাভেদে রেটও ভিন্ন। কেউ দিতে হয় দুই লাখ, কেউবা তিন লাখ, আর বড় বাসা বা বাণিজ্যিক সংযোগ চাইলে রেট ওঠে পাঁচ লাখে। সূত্র জানায়, ঘুষের এই টাকা সরাসরি একজন প্রকৌশলীর হাতে যায় না; ভাগ হয়ে যায় সিন্ডিকেটের মধ্যে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অফিসের দালাল, এমনকি ট্রান্সফরমার সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গেও মিলে তৈরি হয় দুর্নীতির শৃঙ্খল।
বিজ্ঞাপন
মাতুয়াইল বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের ভাষায়, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে ঘর সাজানো যায় না। অথচ সংযোগ চাইতে গিয়ে বুঝলাম, এ যেন বৈধ ঘুষের অফিস। টাকা ছাড়া কারও কানে কথা পৌঁছায় না।’
সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ সংযোগেই শেষ নয়, নির্দিষ্ট কোম্পানির ট্রান্সফরমার নিতেও গ্রাহকদের বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাজারে কম দামে ভালো মানের ট্রান্সফরমার পাওয়া গেলেও ডিপিডিসির কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের কোম্পানির কাছ থেকে ক্রয় করতেই চাপ দেন। এতে প্রকৃত গ্রাহকের খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিনের নির্দেশে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় বলে অভিযোগ প্রকৌশলীদেরই একটি অংশের। তার ইশারাতেই উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা ‘ট্রান্সফরমার কমিশন ব্যবসা’ পরিচালনা করেন।
মাতুয়াইল ডিভিশন থেকেই গ্রাহকদের অভিযোগের ছড়াছড়ি। তবে অভিযোগ করলেও লাভ নেই, কারণ বড় কর্তারা থাকেন নিশ্চুপ। গ্রাহকদের মতে, অভিযোগ করলেই উল্টো সংযোগ বিলম্বিত হয়।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর এক গৃহিণী বলেন, সংযোগ চাইতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, আর কখনো চাই না। মনে হয়েছে আমরা যেন অপরাধী, অথচ দোষ তো তাদের।
ডিপিডিসির দুর্নীতি নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। মাতুয়াইল ডিভিশনের হেলাল উদ্দিন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মিটার টেম্পারিং ও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারের অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছেন দুদক। দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি। কিন্তু প্রমাণ জোগাড় করা কঠিন। তবুও তদন্ত চলছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া দলবদলের খেলায় সবসময় নিরাপদ থাকেন সিন্ডিকেট নেতারা। প্রশাসনিক উদাসীনতা। গ্রাহক অভিযোগ করলেও বড় কর্তারা নীরব। অর্থের প্রভাব, কালো টাকার পাহাড় গড়ে তোলায় সব দিকেই প্রভাব বিস্তার সম্ভব হয়। অভ্যন্তরীণ জোট নির্বাহী থেকে উপ-সহকারী স্তর পর্যন্ত সিন্ডিকেটের শেকড়। ডিপিডিসির ভেতরে গড়ে ওঠা স্বৈারাচার প্রকৌশলী সিন্ডিকেট এখন খোলামেলা দুর্নীতির প্রতীক। গ্রাহক জিম্মি, রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত, আর কর্মকর্তারা ফুলেফেঁপে উঠছেন কালো টাকায়। রাজনৈতিক ছত্রছায়া আর প্রশাসনিক নীরবতায় এই সিন্ডিকেট দিনের পর দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ সংযোগ মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু সেটিই যখন ঘুষ বাণিজ্যে রূপ নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে কাদের হাতে নিরাপদ আমাদের বিদ্যুৎ খাত।
বিজ্ঞাপন
নাম প্রকাশে আনিচ্ছুক এ বিষয়ে ডিপিডিসির উপ সহকারী প্রকৌশলী বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার যেভাবে বলেন, সেভাবেই কাজ করি। তার নির্দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নাই। এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে, সিন্ডিকেটটি কতটা শক্তিশালী ও সুসংগঠিত।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক এক চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে যত বিনিয়োগই হোক, যদি মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে কোনো সংস্কারই সফল হবে না।”
এ ব্যাপারে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) মাতুয়াইল ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিনের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এর পরে তাকে খুদেবার্তা পাঠালে তিনি উত্তরে বলেন আমি অসুস্থ, থেরাপি সেন্টারে আছি। পরে কথা বলবো।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ’বিদ্যুৎ খাতে প্রতিনিয়তই দুর্নীতি বাড়ছে। আর বেশি দুর্নীতি করছেন প্রকৌশলীরা। তারা ঘুষের টাকা জন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিদ্যুৎ নতুন সংযোগ নিতে ঘুষ দিতে হয়। এটা ভালো খবর নয়। দুর্নীতি ঠেকাতে দুদকে কঠোর পদক্ষেপ দেওয়া জরুরি।








