৪০ বছর অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর স্বাদ পেল টাইগাররা

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক গৌরবগাথা। দীর্ঘ চার দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে ওয়ানডে সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর স্বাদ পেল টাইগাররা। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে দুর্দান্ত এক জয় তুলে নিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করেছে স্বাগতিকরা। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করার কীর্তি গড়ল বাংলাদেশ।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অনুষ্ঠিত ম্যাচে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স এবং ব্যাটারদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ৫ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ। ফলে সিরিজে অপ্রতিরোধ্য ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখায় মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বাধীন দল।
ম্যাচের শুরুতে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। তবে শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলারদের তোপের মুখে পড়ে তারা। ইনিংসের প্রথম কয়েক ওভারেই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামে। অবিশ্বাস্যভাবে কোনো রান স্কোরবোর্ডে যোগ হওয়ার আগেই তিনটি উইকেট হারিয়ে বসে তারা।
বিজ্ঞাপন
ওয়ানডে ক্রিকেটে এটি অস্ট্রেলিয়ার জন্য এক বিব্রতকর রেকর্ড। ১০২৪ ম্যাচের ইতিহাসে এই প্রথমবার তারা শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর ঘটনা দেখল। বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সামনে শুরুতেই অসহায় দেখাচ্ছিল অজিদের।
তাসকিন আহমেদ প্রথম আঘাত হানেন। আগের ম্যাচের মতো এবারও তিনি ম্যাথু শর্টকে দ্রুত ফিরিয়ে দেন। এরপর মোস্তাফিজুর রহমানের এক ওভারে ফেরেন কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশ। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বাংলাদেশের হাতে।
প্রথম ধাক্কার পর কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন অ্যালেক্স ক্যারি। তবে অন্য প্রান্তে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে অস্ট্রেলিয়া। স্পিনার তানভীর ইসলাম জশ ইংলিসকে ফিরিয়ে দিলে ৮১ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারীরা।
বিজ্ঞাপন
সেখান থেকে দলকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন জেভিয়ার বার্টলেট ও মার্নাস লাবুশেন। সপ্তম উইকেটে তাদের শতরানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে লড়াইয়ে ফেরায়। দুজন মিলে ১০৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব গড়ে দলীয় সংগ্রহকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যান।
তবে ইনিংসের শেষভাগে আবারও বাংলাদেশের বোলাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন। বিশেষ করে তাসকিনের জোড়া আঘাতে অস্ট্রেলিয়ার রান তোলার গতি থেমে যায়। বৃষ্টির আগ পর্যন্ত ৪২ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৮৭ রান সংগ্রহ করে সফরকারীরা।
এরপর বৃষ্টির কারণে খেলা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ম্যাচের ওভার সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। নতুন হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ১৯২ রান।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান তিনটি করে উইকেট শিকার করেন। স্পিনার তানভীর ইসলাম নেন দুটি উইকেট। তাদের সম্মিলিত বোলিং পারফরম্যান্সই মূলত অস্ট্রেলিয়াকে বড় সংগ্রহ গড়তে দেয়নি।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ইনিংসের প্রথম ওভারেই সাজঘরে ফেরেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। তবে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেন সৌম্য সরকার ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
দ্বিতীয় উইকেটে দুজন মিলে ৮৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলের ভিত শক্ত করেন। সৌম্য সরকার সাবলীল ব্যাটিং করে ৪২ রান করেন। তবে বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগিয়েও তিনি থামেন রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে শান্তও খেলেন দায়িত্বশীল ইনিংস। ব্যক্তিগত ৪২ রান করে আউট হওয়ার আগে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেন। বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে দুই হাজার রানের ক্লাবে প্রবেশ করেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের ইতিহাসে যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম ব্যাটার হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।
এরপর লিটন দাসের দিকে তাকিয়ে ছিল দর্শকরা। কিন্তু মিরপুরে নিজের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার গল্প বদলাতে পারেননি এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। ভালো শুরু করেও ২১ রানে থামতে হয় তাকে। ক্যামেরন গ্রিনের বাউন্সারে গ্লাভসে লেগে বল চলে যায় উইকেটরক্ষকের হাতে।
বিজ্ঞাপন
মধ্যক্রমে মোসাদ্দেক হোসেনও ইতিবাচক ব্যাটিংয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। অ্যাডাম জাম্পাকে আক্রমণ করে কয়েকটি চমৎকার বাউন্ডারি হাঁকান তিনি। কিন্তু বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হলে ১৪৪ রানে পঞ্চম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
একপর্যায়ে ম্যাচে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও শেষদিকে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে লক্ষ্য অতিক্রম করে স্বাগতিকরা। ৫ উইকেট হাতে রেখেই জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ এবং সিরিজও নিজেদের করে নেয়।
এই জয়ের মাধ্যমে শুধু একটি ম্যাচ বা সিরিজ জেতেনি বাংলাদেশ; ভেঙেছে দীর্ঘদিনের এক আক্ষেপও। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেবে।
বিজ্ঞাপন
মিরপুরে উদযাপিত এই ঐতিহাসিক জয় দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য হয়ে থাকবে স্মরণীয় এক অধ্যায়। চার দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল টাইগারদের হাতে।








