পাচার হওয়া সেই শিশুই আজ বিশ্বকাপের নায়ক

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আইভরি কোস্টের জয়ের নায়ক হয়ে উঠেছেন আমাদ দিয়ালো। ইকুয়েডরের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন তিনি। তার সেই গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় পায় আফ্রিকার দেশটি। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে নায়ক হয়ে ওঠার পেছনে লুকিয়ে আছে মানব পাচার, পরিচয় সংকট ও শৈশবের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলা এই তারকা উইঙ্গার ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে আইভরি কোস্টকে মূল্যবান তিন পয়েন্ট এনে দেন। তে গ্রুপ ‘ই’-এর প্রথম ম্যাচে সেবাস্তিয়ান বেকাসেসের দল ইকুয়েডরকে পয়েন্ট ছাড়াই মাঠ ছাড়তে হয়।
আজকের এই সফলতার পেছনে রয়েছে সংগ্রামময় এক জীবন। ২০১৫ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে ইতালিতে পৌঁছান দিয়ালো। তবে সে যাত্রা ছিল না ফুটবলের স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে। ওই সময় আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসনের ঢেউয়ের সুযোগ নিয়ে একটি পাচারকারী চক্র ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে শিশুদের ইউরোপে নিয়ে যেত। দিয়ালোও ছিলেন সেই চক্রের শিকারদের একজন।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে, এই চক্রটি একাধিক আফ্রিকান কিশোর ফুটবলারকে অবৈধভাবে ইতালিতে নিয়ে গিয়েছিল। ২০২০ সালে পাচারচক্রটির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অবৈধভাবে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
ইতালিতে পৌঁছানোর পর দিয়ালোকে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। সরকারি নথিতে যাদের তার বাবা-মা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাস্তবে তাদের কাউকেই তিনি চিনতেন না। শুধু তাই নয়, বর্তমানে অলিম্পিক দ্য মার্শেইয়ের হয়ে খেলা হামেদ জুনিয়র ত্রাওরেকেও কাগজপত্রে তার ভাই হিসেবে দেখানো হয়েছিল। পরে তদন্তে প্রমাণ হয়, তাদের মধ্যে কোনো পারিবারিক বা রক্তের সম্পর্ক ছিল না।
শৈশবের সেই সময়ে চারপাশে কী ঘটছে তা বোঝার আগেই পাচার হওয়া শিশুদের বিভিন্ন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজের পরিচয়, পরিবার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তার মধ্যেই বড় হতে হয়েছে দিয়ালোকে।
বিজ্ঞাপন
তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, তিনি কখনোই নিজের জন্মদাতা বাবা-মা সম্পর্কে জানতে পারেননি। নিজের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের এই অন্ধকার ও মানসিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি হার মানেননি। বরং কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিভার জোরে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।
সব বাধা পেরিয়ে জন্মভূমি আইভরি কোস্টের জার্সিতেই আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সিদ্ধান্ত নেন দিয়ালো। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ইকুয়েডরের বিপক্ষে করা সেই গুরুত্বপূর্ণ গোলের মাধ্যমে দেশের ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় এক মুহূর্ত উপহার দেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
দিয়ালোর শেষ মুহূর্তের গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়ে বিশ্বকাপ অভিযান দারুণভাবে শুরু করেছে আইভরি কোস্ট। গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় তারা এখন অপেক্ষা করছে শক্তিশালী জার্মানির বিপক্ষে নিজেদের পরবর্তী ম্যাচের জন্য।
অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচে হতাশাজনক হারের পর ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে ইকুয়েডর। তবে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আইভরি কোস্টের জয়ের গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকবেন আমাদ দিয়ালো, যার জীবনকাহিনি প্রমাণ করে প্রতিকূলতাকে জয় করেও বিশ্বমঞ্চে নায়ক হওয়া সম্ভব।








