সিজারিয়ানের পর প্রসূতির মৃত্যু, ডাক্তার নয় ক্লিনিকের মালিক সিজার করেছেন-পরিবারের অভিযোগ

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া বাজার এলাকায় অবস্থিত বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেস নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের পর সাবিকুন নাহার (৩১) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় স্বজনদের পক্ষ থেকে ভুল চিকিৎসা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
বিজ্ঞাপন
নিহত সাবিকুন নাহার উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের মাঠশিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী। তিনি স্থানীয় মাঠশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. পল্লবী সাহার সঙ্গে ১৫ হাজার টাকায় সিজারিয়ান অপারেশনের চুক্তি করা হয় এবং অগ্রিম ৩ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে সাবিকুন নাহার নিজ বাড়ি থেকে হেঁটে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আসেন। পরে ক্লিনিক থেকে ফোন করে জানানো হয়, ডাক্তার এসে গেছে রোগীকে দ্রুত নিয়ে আসতে হবে। পরিবারের সদস্যরা ক্লিনিকে উপস্থিত হয়ে ক্লিনিক মালিককে না পেয়ে প্রসূতিকে ক্লিনিকে রেখে দেন। এ সময় তার স্বামী নিচে চায়ের দোকানে গেলে, স্বজনদের অভিযোগ, ওই ফাঁকে প্রসূতিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। পরে শিশুকে দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে না পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ফোন করে ডেকে এনে নবজাতক তার কোলে দেওয়া হয় এবং জানানো হয় রোগীর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, রক্ত প্রয়োজন। তিনি জানান, এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরও স্ত্রীর অবস্থার অবনতি হলে তাকে খুলনায় রেফার করা হয়। পরিবারের ধারণা, বাঁকড়া মেডিকের সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী, ক্লিনিকের ডেন্টিস্ট মোছা. নিলুফা ইয়াসমিন সিজারিয়ান অপারেশন করান এবং পরে দোষ এড়াতে রোগীকে খুলনায় পাঠানো হয়।
বিজ্ঞাপন
নিহতের চাচী শাশুড়ি নাসরিন বেগম বলেন, “ওটিতে খুব নোংরা পরিবেশ ছিল, যেকোনো মানুষ আসা-যাওয়া করছিল। রোগীকে ওয়াশ করা হচ্ছিল এবং প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছিল। একজনকে ডাক্তার মনে করে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তিনি ডাক্তার নন। ডাক্তার কোথায় জানতে চাইলে বলেন, ডাক্তার চলে গেছেন। পরে বলেন রোগীর কিটিক্যাল অবস্থা, খুলনা মেডিকেলে নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, খুলনা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান রোগীর অবস্থা ভালো নয়, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। পরিবারের দাবি, রোগীর জরায়ুসহ ‘ফুল’ কেটে ফেলা হয়েছে এবং প্রায় ১৯-২০ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে।
নিহতের ননদ ফারজানা আক্তার রিমি বলেন, “আমি গিয়ে দেখি ওখানে তারা পায়তারা করছে, রোগী কাঁপছিল। একজনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন তিনি ডাক্তার নন। ডাক্তার কোথায় জানতে চাইলে বলেন, ডাক্তার চলে গেছেন।”
আরেক ননদ শাহানারা বলেন, “ওখানে ডাক্তারও ছিল না, নার্সও ছিল না। নিজেদের গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিচার চাই।”
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরুল ইসলাম বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। অপারেশন করেছেন সার্জন ডা. মেহেদী হাসান, তার সঙ্গে কথা বলুন।”
সার্জন ডা. মেহেদী হাসান বলেন, “আমি অপারেশন করেছি। তবে অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক ছাড়া অপারেশন করা ঠিক হয়নি।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুর রশিদ বলেন, “ঘটনার বিষয়ে অবগত হওয়ার পর তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকটি পূর্বে ‘বাঁকড়া সার্জিক্যাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে পরিচালিত হতো। এর আগেও একটি ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার পর এলাকাজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্বজনরা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।








