আধুনিক কমপ্লেক্সে রূপ নিচ্ছে জরাজীর্ণ ‘শহীদ জিয়া হল’

নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চাষাঢ়ার ‘শহীদ জিয়া হল’ দীর্ঘদিন অবহেলা, অযত্ন ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। একসময় জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই মিলনায়তন এখন ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার হলটি পুনর্নির্মাণ করে অত্যাধুনিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।
স্থানীয়দের মতে, নারায়ণগঞ্জে একটি স্থায়ী মিলনায়তনের প্রয়োজনীয়তা প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৫৬ সালে। যদিও তখন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। পরে স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। ১৯৭৭ সালের ৮ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নারায়ণগঞ্জ সফরে এসে স্থানীয়দের দাবির মুখে চাষাঢ়া বালুর মাঠে একটি টাউন হল নির্মাণের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ১০ মার্চ তিনি নিজেই হলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
বিজ্ঞাপন
এরপর ১৯৮১ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটির উদ্বোধন করেন এবং এর নামকরণ করা হয় ‘শহীদ জিয়া হল’। প্রতিষ্ঠার পর বহু বছর ধরে এটি নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নাটক, সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হলটির ভাগ্যেও নেমে আসে অবহেলার ছায়া। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে এটি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ থেকে বঞ্চিত ছিল। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভবনটি ‘মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তন’ নামে ব্যবহার করা হলেও সাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ে। ২০০৮ সালের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ২০১৫ সালে ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিত্যক্ত হওয়ার পর ভবনটি মাদকসেবী ও অসাধু ব্যক্তিদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। চোরেরা ভবনের দরজা-জানালা, লোহার গ্রিলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যায়। বর্তমানে ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ছাদের বিভিন্ন অংশ দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ছে এবং ফাটলের ভেতর গজিয়ে ওঠা বটগাছের শিকড় পুরো কাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিজ্ঞাপন
সবশেষ ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল রাতে ভবনের ছাদে স্থাপিত জিয়াউর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং অভিযোগ ওঠে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সম্প্রতি ‘শহীদ জিয়া হল’ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে ভবনটি পুনর্গঠনের আবেদন জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়; বরং নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি আরও জানান, নতুন পরিকল্পনায় ‘শহীদ জিয়া হল’কে একটি আধুনিক কমপ্লেক্সে রূপান্তর করা হবে, যেখানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিক সুবিধাও থাকবে। এতে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আদর্শের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলমও এ প্রকল্পের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানান। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং এখানে অত্যাধুনিক হলরুম নির্মাণে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা থাকবে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরাও নতুন উদ্যোগে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
সাংস্কৃতিক কর্মী শাহীন মাহমুদ বলেন, একসময় জিয়া হলে নিয়মিত নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আয়োজন হতো। ভবনটি পরিত্যক্ত হওয়ার পর তাদের বিকল্প হিসেবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন করে সংস্কারের মাধ্যমে হলটি আবারও তার আগের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানও বলেন, ‘শহীদ জিয়া হল’ নারায়ণগঞ্জবাসীর আবেগের জায়গা। এটি ঘিরে মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে এবং খুব শিগগিরই পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম জানিয়েছেন, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেই ‘শহীদ জিয়া হল’ পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, এটি শুধু একটি অডিটোরিয়াম হিসেবে নয়, বরং বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাও সংযুক্ত থাকবে।
দীর্ঘ অবহেলা আর ধ্বংসের স্মৃতি পেছনে ফেলে ‘শহীদ জিয়া হল’ আবারও নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।








