Logo

যমুনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় স্কুল, আতঙ্কে হাজারো মানুষ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জ
২৮ জুন, ২০২৬, ১৭:৫৯
যমুনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় স্কুল, আতঙ্কে হাজারো মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষার শুরুতেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে যমুনা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়েছে সিরাজগঞ্জের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন স্থানে তীব্র আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে, যা যে কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যমুনার ভাঙনে ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প ও প্রতিরক্ষা বাঁধের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল কাজীপুর উপজেলার পলাশপুর ঘাট এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের দুটি অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পরে ৮ জুন চৌহালী উপজেলার চর বিনানই ঘাট এলাকায় প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা ধসে পড়ে। সর্বশেষ ২০ জুন সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামে ডান তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ভেঙে যায়।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বড় কয়ড়া, বর্ণি ও কৈগাড়ি জড়তা গ্রাম, রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা, চৌহালীর চর বিনানই এবং কাজীপুরের পলাশপুর ঘাট এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। নদীর অগ্রাসনে প্রতিদিনই কমছে আবাদি জমির পরিমাণ, আর বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছে।

সদর উপজেলার ভাটপিয়ারি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস ছালাম অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়েছে। তার দাবি, আগে নদীর মাঝখানে যে চর ছিল, অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে সেটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ওই চরে তিনি আখ, গম, কালাইসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করতেন। এখন সব জমি নদীতে চলে যাওয়ায় তিনি কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

কাওয়াকোলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া জানান, ইউনিয়নের বড় কয়ড়া, বর্ণি ও কৈগাড়ি জড়তা গ্রামে নদীভাঙন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুর্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ভবনে সাময়িকভাবে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেই আশ্রয়ণ কেন্দ্রটিও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে তিনি জানান।

বিজ্ঞাপন

নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেছেন। কৃষকদের চোখের সামনে নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে চাষাবাদ করা জমি। অন্যদিকে বিদ্যালয় ঝুঁকিতে পড়ায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান বলেন, বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রায় চার লাখ টাকায় নিলামের মাধ্যমে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবনে পাঠদান চলছে। তবে সেই ভবনটিও নদীভাঙনের হুমকির মধ্যে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় শহর রক্ষা বাঁধের হার্ড পয়েন্ট এলাকায় যমুনার পানি ৩ সেন্টিমিটার এবং কাজীপুরের মেঘাইঘাট পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি এখনও সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার এবং কাজীপুর পয়েন্টে ১৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগে নির্মিত নদীতীর সংরক্ষণ কাঠামোর কোথাও ক্ষতি হলে তা দ্রুত মেরামতের কাজও চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা আরও তীব্র হওয়ার আগেই কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে নদীপাড়ের আরও বহু বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি যমুনার গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন ও ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD