অন্যরকম এক হাট, যেখানে প্রতিদিন ‘বিক্রি’ হয় মানুষ!

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। ঘড়ির কাঁটা সকাল ৭টা ছুঁতেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ের পাশে জমতে শুরু করেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, আবার কেউ কোনো সরঞ্জাম ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই—আজ অন্তত একটি দিনের কাজ জুটবে কি না, সেই অপেক্ষা।
বিজ্ঞাপন
এটি কোনো গবাদিপশুর হাট নয়, আবার পণ্য কেনাবেচার বাজারও নয়। এটি শ্রমের বাজার, যেখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কৃষিশ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে এই শ্রমের হাট চলে প্রায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিক খুঁজতে আসা ব্যক্তিরা দরদাম করে প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘শ্রমিকের হাট’ নামেই পরিচিত।
শুধু ত্রিশাল নয়, একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকেই সেখানে কাজের আশায় জড়ো হন অসংখ্য দিনমজুর। কারও ভাগ্যে কাজ জোটে, আবার অনেকে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন।
ত্রিশালের এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. ইমরান হোসেন বলেন, প্রতিদিন সকালেই এই শ্রমের হাটে আসি। ভাগ্য সহায় হলে কোনো কাজ পায়, আর কাজ না মিললে দুপুর হওয়ার আগেই আবার বাড়ি ফিরতে হয়। তার ভাষায়, বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে থাকলেও প্রতিদিন সমান কাজ পাওয়া যায় না। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো কাজ মেলে না।
বিজ্ঞাপন
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষাকালে নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমে যায়। তবে ধান কাটা বা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। তারপরও বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে থাকে।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে অনেকের কাজের সুযোগও বাড়ে। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
শ্রমিক বাকের বলেন, আমাদের কোনো মাসিক বেতন নাই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়।
শ্রমিক নিতে আসা ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া বলেন, ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ।
শ্রমিকদের কারও বয়স ২০, কারও ৬০ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও থেমে নেই সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাটে।
এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।
বিজ্ঞাপন
সকাল গড়িয়ে সূর্য ওপরে উঠতে শুরু করলে ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায় এই শ্রমের হাট। কেউ নির্মাণস্থলে, কেউ কৃষিজমিতে, কেউ মাটি কাটার কাজে চলে যান। আর যাদের সেদিন কোনো কাজ জোটে না, তারা হতাশ মনে বাড়ির পথে হাঁটেন। তবে সেই হতাশাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ পরদিন ভোর হলেই আবার নতুন আশায় একই জায়গায় এসে দাঁড়ান তারা—হয়তো সেদিন মিলবে একটি দিনের কাজ, মিলবে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সুযোগ।








