Logo

মৌলভীবাজারে আশঙ্কাজনক হারে ছড়াচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার
২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪:৪৭
মৌলভীবাজারে আশঙ্কাজনক হারে ছড়াচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

একসময় সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও গ্রামাঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে মরণনেশা ইয়াবা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে মাদক বিক্রির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। হাতের নাগালে ইয়াবা পাওয়ায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশ মাদকের ভয়াবহ আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধও বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদক সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষের পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইয়াবা সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রিকশাচালক, হকার ও দিনমজুরদের একটি অংশকে ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। রিকশায় যাত্রী পরিবহনের আড়ালে কিংবা রাস্তায় ঘুরে পণ্য বিক্রির ছদ্মবেশে ক্রেতাদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

শুধু শ্রমজীবী মানুষ নয়, বিভিন্ন বৈধ ব্যবসার আড়ালেও মাদক বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের পানের দোকান, মুদি দোকান, চায়ের স্টল, মোবাইল রিচার্জের দোকান এমনকি কিছু সেলুনকে ব্যবহার করে ইয়াবার খুচরা বেচাকেনা চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে স্থানীয় ছোট ছোট ডিলাররা মাদক সরবরাহ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, আগে মাদক ব্যবসা নির্দিষ্ট কিছু স্পটকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হলেও বর্তমানে তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায়। স্থানীয় কিছু উশৃঙ্খল যুবককে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় দেশের বাইরে থেকে বড় চালান প্রবেশের পর তা ছোট ছোট ডিলারের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইয়াবার সহজলভ্যতার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকাসক্তদের মধ্যে বেকার তরুণ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। নেশার টাকা সংগ্রহ করতে কেউ কেউ চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় দিনে কিংবা রাতে বাড়িঘরে চুরির ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের ভাষ্য, পানির পাম্প, গবাদিপশু, মোবাইল ফোন, বাইসাইকেল থেকে শুরু করে ঘরের আসবাবপত্র ও নগদ টাকা চুরির ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে কমলগঞ্জ পৌর এলাকা, ভূমি অফিসের আশপাশ ও পৌর বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও ধর্মীয় উপাসনালয়েও চুরির ঘটনা বেড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে নিয়মিত কৌশল পরিবর্তন করছে বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরাসরি মাদক ও টাকার লেনদেন এড়িয়ে এখন মুঠোফোনে যোগাযোগের পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। এরপর নির্দিষ্ট স্থানে মাদক রেখে ক্রেতাকে তার অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হয়। এতে সরাসরি মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন, অভিযোগ করেন—কমলগঞ্জ থানা পুলিশের কয়েকজন সদস্যকে অর্থ দিয়ে মাদক ব্যবসা চালানোর সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে তার এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, রাতের আঁধারে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, পুলিশকে কোনো মাদক ব্যবসায়ীর বিষয়ে তথ্য দেওয়া হলে অনেক সময় সেই তথ্য দ্রুত মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে যায়। পরে তথ্যদাতাদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

একজন অভিভাবক বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় এখন ইয়াবা। সন্তানদের নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। কেউ একবার মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।’

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আরেকজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘরে জিনিসপত্র রাখার উপায় নেই, কখন কী চুরি হয়ে যায় সেই ভয় থাকে। পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন পেশার আড়ালে যেভাবে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ উঠছে, তাতে সন্তানদের বাইরে পাঠাতেও ভয় লাগে।’

বিজ্ঞাপন

তবে পুলিশ বলছে, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কমর উদ্দিন বলেন, ‘পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দুটি ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।’

সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী কিংবা মাদকসেবী—কারও পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের তদবির বরদাশত করা হবে না। আমার অধীনস্থ সব সহকর্মীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মাদকসংক্রান্ত কোনো তদবির এলে তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে জানাতে হবে। আমি দেখতে চাই, ওই তদবিরের পেছনে কে বা কারা রয়েছেন।’

স্থানীয়রা বলছেন, মাদকের বিস্তার রোধে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; মাদক সরবরাহের উৎস, ডিলার নেটওয়ার্ক এবং এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD