নদীর বালিতে যাদের সংসার, তাদের খবর রাখে কজন

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় তাদের কর্মযাত্রা। জীবিকার তাগিদে কোমরসমান পানিতে নেমে নদীর তলদেশ থেকে বালি তুলে দিন কাটে তাদের। মাথার ওপর তীব্র রোদ, কখনো বৃষ্টি, আবার কখনো হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পানি—কোনো কিছুই থামাতে পারে না তাদের শ্রম। কারণ দিনের শেষে খালি হাতে ঘরে ফেরার সুযোগ নেই। পরিবারের জন্য কিনতে হবে চাল-ডাল, লবণ-তেল, সন্তানদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিংবা অসুস্থ স্বজনের ওষুধ।
বিজ্ঞাপন
পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর তীর ও বালুমহালে প্রতিদিন এমন জীবনসংগ্রামে নামেন শত শত শ্রমিক। কেউ বালি তোলেন, কেউ তা পরিবহন করেন, কেউ আবার এই বালি বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের শ্রমে গড়ে ওঠা এই কর্মযজ্ঞে প্রতিদিন বিপুল অর্থের লেনদেন হলেও নদীর পানিতে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরানো মানুষগুলোর জীবনে স্বচ্ছলতা খুব একটা আসে না।
পঞ্চগড় বালি ও নুড়ি পাথরের জন্য পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদী ও বালুমহালে অনেক মানুষ বালি উত্তোলন ও পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল।
জীবিকার তাগিদে অনেকেই যৌবনের শুরুতেই নেমে পড়েন নদীতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে দাঁড়িয়ে বালি তোলেন। নদীতে পানি থাকুক কিংবা না থাকুক, বালি তোলার কাজ তাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে এটি ছাড়া পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন বালুমহালে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা কাজ করে একজন শ্রমিক গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। দেবীগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর এলাকার বালি শ্রমিক নেপাল রায় বলেন, প্রায় আট ঘণ্টা পানিতে থেকে বালি তুলে দিন শেষে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পান। একই এলাকার সালমানও প্রায় একই আয়ের কথা জানান।
বালি পরিবহনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন অনেকে। দেবীগঞ্জের সোনাপোতা এলাকার ট্রাকচালক মমতাজুল ইসলাম জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি বালি পরিবহনের কাজ করছেন। প্রতিদিন তার আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে শুষ্ক মৌসুমে কাজের পরিমাণ বাড়লে আয় কিছুটা বেড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত হয়।
নদী থেকে এক ট্রাক্টর বালি তুলে ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দিলে শ্রমিকদের মজুরি হিসেবে দেওয়া হয় প্রায় ৩৫০ টাকা। এরপর সেই বালি ট্রাক্টর বা ট্রাকে করে পৌঁছে যায় জেলার বিভিন্ন এলাকা ও নির্মাণস্থলে।
বিজ্ঞাপন
বোদা উপজেলার বেংহাড়ি ইউনিয়নের সরকারপাড়া এলাকার ট্রাক্টরচালক দ্বীপক ও হাজীপাড়া এলাকার আরিফ হোসেন জানান, সারাদিন বালি পরিবহন করে তারা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। শুষ্ক মৌসুমে কাজের পরিমাণ বাড়ায় আয়ও কিছুটা বাড়ে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার আমতলা ও মীরগড়, তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এবং বোদা উপজেলার ফুলতলা এলাকার শ্রমিকদের কথাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। তাদের ভাষ্য, বালি উত্তোলন ও পরিবহনের সঙ্গে শত শত মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এই কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পরিবারগুলো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বে।
শুধু বালি শ্রমিক নন, এ কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন ট্রাক ও ট্রাক্টরচালক, হেলপার, পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীরা। জেলার বিভিন্ন বালুমহাল থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে বালি পরিবহন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষাকালে বালির চাহিদা ও দাম কিছুটা বেড়ে যায়। দেবীগঞ্জের সুলতানপুর-পাখুরিতলা এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে ১০ চাকার মোটা বালির একটি ট্রাক প্রায় ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে একই পরিমাণ বালির দাম থাকে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা।
চিকন বালির বর্তমান দাম প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। শুষ্ক মৌসুমে তা প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্ষাকালে একজন ব্যবসায়ী প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি ট্রাক বালি সরবরাহ করেন। শুষ্ক মৌসুমে সরবরাহের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
পঞ্চগড়ে বড় শিল্প-কারখানার সংখ্যা খুবই কম। অতীতে থাকা কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোও বর্তমানে বন্ধ। ফলে চা চাষের পাশাপাশি বালি ও পাথরকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জেলার মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বালি ব্যবসাকে ঘিরে প্রতিদিন বিপুল অর্থের লেনদেন হলেও এর সবচেয়ে বড় অংশের নেপথ্যে থাকা শ্রমিকদের আয় সীমিত। তাদের কারও হাতে নেই বড় মূলধন, নেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা নিজস্ব পরিবহন। তাদের একমাত্র পুঁজি শারীরিক শ্রম।
তীব্র রোদে মাথা পুড়িয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা ঠান্ডা পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বালি তোলেন তারা। দিন শেষে পাওয়া কয়েকশ টাকা দিয়েই চালাতে হয় সংসার। সেই টাকা থেকেই মেটাতে হয় খাবারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়।
নদীর বুকে প্রতিদিন যে বালির কর্মযজ্ঞ চলে, তার দৃশ্যমান অংশে থাকে ট্রাক, ট্রাক্টর আর ব্যবসার হিসাব। কিন্তু এর আড়ালে থাকে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, কষ্ট আর বেঁচে থাকার লড়াই।
বিজ্ঞাপন
তাদের হয়তো বড় কোনো পরিচয় নেই, নেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সুযোগ। কিন্তু তাদের শ্রমেই সচল থাকে বালি ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। নদীর বালিতে যাদের জীবন-সংসার, তাদের খবরও রাখা জরুরি। কারণ এই বালির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের অন্ন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।








