রাজনগরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার গবিন্দবাটি বাজারে পি.আর. এন্টারপ্রাইজের ডিলার রতন দাশের বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
সাব-ডিলারদের কাছে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির পাশাপাশি সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে কয়েকজন সাব-ডিলার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে অভিযোগের পক্ষে কয়েকটি বিক্রয় মেমো পাওয়া গেছে। এসব মেমো পর্যালোচনায় দেখা যায়, পি.আর. এন্টারপ্রাইজ থেকে সাব-ডিলারদের কাছে প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রির তথ্য রয়েছে। অথচ সরকার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩২০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৩০ টাকা এবং ডিএপির দাম ১ হাজার ২০ টাকা।
অর্থাৎ মেমোতে উল্লেখিত দামে ইউরিয়া প্রতি বস্তায় ৩০ টাকা, টিএসপিতে ৭০ টাকা এবং ডিএপিতে ৮০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে আরও বেশি দাম নেওয়া হতো। কোনো কোনো সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সার বিক্রির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পি.আর. এন্টারপ্রাইজের অধীনে রাজনগর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে দুটি ইউনিয়নের সার বিতরণের দায়িত্ব রয়েছে। উপজেলার মোট চারজন ডিলারের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি একটি। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রতন দাশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি সার ব্যবসায় নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত যাতায়াতের স্থান হিসেবেও পরিচিত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ওই প্রভাব কাজে লাগিয়ে সাব-ডিলার ও কৃষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং প্রতিবাদকারীদের চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন সাব-ডিলার অভিযোগ করেন, রতন দাশ প্রায়ই তাদের ভয়ভীতি দেখাতেন। কেউ নির্ধারিত দামের বাইরে সার কিনতে আপত্তি জানালে পরবর্তী সময়ে সার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হতো বলেও তারা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে অধিকাংশ সাব-ডিলারকে নিয়মিত মেমো দেওয়া হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে দু-একজনকে মেমো দেওয়া হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে তা বন্ধ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সাব-ডিলারদের অভিযোগ, আগে মেমোর মাধ্যমে সার কেনাবেচার হিসাব থাকলেও সম্প্রতি মেমো দেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। এ বিষয়ে তারা রাজনগর উপজেলা কৃষি অফিসে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পর রতন দাশকে কৃষি অফিসে ডেকে সতর্ক করা এবং সেখানে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন বলে কৃষি অফিস-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রতন দাশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। দুটি মোবাইল নম্বর থেকে মোট পাঁচবার ফোন করা হলেও তিনি প্রথমে ফোন ধরেননি। পরে তিনি নিজেই ফোন করে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, পি.আর. এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে দেখা হবে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে অভিযোগের ভিত্তিতে পি.আর. এন্টারপ্রাইজের ডিলারকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছিল কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি কর্মকর্তা সরাসরি মন্তব্য না করে বলেন, তার ডিলাররা যেকোনো সময় তার কাছে আসতে পারেন। এরপর এ-সংক্রান্ত অন্যান্য প্রশ্নেরও তিনি বিস্তারিত উত্তর দেননি।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার বলেন, পি.আর. এন্টারপ্রাইজের ডিলারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের বিষয়টি তার জানা নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কোনো সার ডিলার সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কিংবা রশিদ ছাড়া সার বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে ডিলারশিপের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, অতীতেও পি.আর. এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট ডিলার তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এবারও যদি অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে সার বিতরণে সরকারি মূল্য ও নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও সাব-ডিলারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।








