Logo

খেলার চেয়ে নাচে দর্শকের আগ্রহ, হারিয়ে যাচ্ছে সার্কাস

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শেরপুর, বগুড়া
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫১
খেলার চেয়ে নাচে দর্শকের আগ্রহ, হারিয়ে যাচ্ছে সার্কাস
ছবি: সংগৃহীত

একসময় মেলা মানেই ছিল সার্কাস। বিশাল তাঁবু, ঝলমলে আলো, মাইকের ঘোষণা আর ঢোলের শব্দে সন্ধ্যা থেকেই মুখর হয়ে উঠত মেলার মাঠ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সার্কাস দেখতে ছুটতেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ মুগ্ধ হতেন দড়ির ওপর খেলোয়াড়ের ভারসাম্যে, কেউ শিহরিত হতেন মোটরসাইকেলের ‘মৃত্যুকূপ’ কিংবা নানা দুঃসাহসিক কসরত দেখে।

বিজ্ঞাপন

সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের বিস্তার, অনুমতির জটিলতা, মেলা কমে যাওয়া, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং শিল্পী সংকটে একসময়ের জনপ্রিয় সার্কাসশিল্প এখন অস্তিত্বের সংকটে। অনেক সার্কাস বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছে, তারাও নিয়মিত মাঠে নামার সুযোগ পাচ্ছে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাচ-গানের বাড়তি চাহিদা। সার্কাসসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দর্শকের বড় একটি অংশ এখন ঐতিহ্যবাহী খেলার চেয়ে নাচ-গান দেখতে বেশি আগ্রহী। ফলে দর্শক ধরে রাখতে অনেক সময় সার্কাসের আয়োজনেও নাচকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

ঢাকার নবাবগঞ্জের দ্য লায়ন সার্কাস এই সংকটের একটি উদাহরণ। ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার্কাসের খেলা দেখিয়ে আসছে দলটি। বর্তমানে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় একটি মেলায় তাঁবু গেড়েছে তারা।

বিজ্ঞাপন

সার্কাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত সুমন বলেন, সার্কাসশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি সার্কাস দল থাকলেও বর্তমানে তা কমে ১৭ থেকে ১৮টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম চালাতে পারছে মাত্র ৫ থেকে ৬টি দল। করোনাকালে অনেক সার্কাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

তাঁর মতে, সার্কাস পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো অনুমতি। কোথাও মেলার অনুমতি থাকলেও বিনোদনের অংশ হিসেবে সার্কাস পরিচালনার অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা মেলায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে মেলা বন্ধ হয়ে যায়। এতে সার্কাসের শিল্পী ও কর্মীদের দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়।

সুমন বলেন, মেলার অনুমতি থাকলে সার্কাস পরিচালনার সুযোগও দেওয়া উচিত। মেলা চললে সার্কাসও চলবে—এমন সমন্বিত ব্যবস্থা থাকলে অন্তত এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

একসময় সার্কাসের শিল্পীরা বছরের প্রায় ১১ মাসই দেশের বিভিন্ন এলাকায় খেলা দেখাতেন। এখন অনুমতির জটিলতা ও মেলা কমে যাওয়ায় ছয় মাসও নিয়মিত খেলা দেখানোর সুযোগ হয় না।

ফরিদপুরের মধুখালীর সার্কাস খেলোয়াড় শুকলাল দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, এক যুগ আগেও বছরের প্রায় ১১ মাস সার্কাসের খেলা দেখানো হতো। এখন নানা প্রতিকূলতায় ছয় মাসও নিয়মিত কাজ পাওয়া যায় না। ফলে দীর্ঘ সময় আয়হীন থাকার কারণে অনেক খেলোয়াড়কে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় যেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, একসময় সার্কাসের সাধারণ শ্রমিকেরা মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা এবং দক্ষ খেলোয়াড়েরা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। কিন্তু এখন নিয়মিত খেলা না থাকায় অনেক শিল্পীর আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

শুধু অনুমতির জটিলতা নয়, দর্শকের রুচির পরিবর্তনকেও সার্কাসের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শুকলাল বলেন, দর্শকের বড় একটি অংশ এখন সার্কাসের খেলার চেয়ে নাচ-গানের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। বিশেষ করে অশালীন নৃত্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী সার্কাসের খেলাগুলো অনেকটা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

তাঁর ভাষায়, ‘খেলার চাহিদা কম, নাচের চাহিদা বেশি। এই বিষয়টিও সার্কাসের জন্য সমস্যা।’ দর্শক ধরে রাখতে অনেক সময় মালিকদেরও নাচের আয়োজন করতে হচ্ছে। এতে সার্কাসের মূল খেলার গুরুত্ব ও স্বাতন্ত্র্য কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন শিল্পীরা।

সার্কাসশিল্পী রিমা আক্তার ইতির অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। ছোটবেলা থেকেই সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত তিনি। তাঁর বাবা-মাও সার্কাসে খেলা দেখাতেন। তাঁরা মারা যাওয়ার পরও জীবিকার তাগিদে পেশাটি ধরে রেখেছেন ইতি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, সার্কাস দেখতে এসে দর্শকেরা কয়েকটি খেলা দেখার পরই নাচের দাবি করেন। দর্শক না থাকলে আয়ও থাকে না। ফলে অনেক সময় মালিকদের দর্শকের চাহিদার কাছে যেতে হয়। তাঁর মতে, নতুন কিছু খেলা যুক্ত হলেও আগের মতো সেগুলোর আকর্ষণ নেই; নাচই এখন বেশি দর্শক টানে।

সার্কাসের সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পীদের জীবন ও পরিবারে। একসময় একই পরিবারের একাধিক সদস্য সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তাদের অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

ইতি বলেন, আগে তাঁদের পরিবারের প্রায় সবাই সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন পরিবারের অন্য সদস্যরা সার্কাস ছেড়ে গার্মেন্টসে কাজ করছেন। তাঁর স্বামীও সার্কাস ছেড়ে দোকান করছেন। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে। সার্কাসে এখন তিনি একাই আছেন।

বিজ্ঞাপন

তবু সার্কাস ছাড়তে চান না ইতি। তাঁর কাছে এই পেশা শুধু জীবিকা নয়, শৈশব, পরিচয় ও জীবনের দীর্ঘ স্মৃতির অংশ।

বছরের বড় একটি সময় সার্কাস বন্ধ থাকায় শিল্পীদের কেউ গার্মেন্টসে, কেউ অটোরিকশা চালিয়ে, আবার কেউ অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন পুরোনো শিল্পীরা হারিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন শিল্পীও তৈরি হচ্ছে না।

কণ্ঠশিল্পী লিজা সরকার প্রায় ১৫ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরও অভিজ্ঞতা একই। বছরের বেশির ভাগ সময় সার্কাস বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার অনিশ্চিত। তিনি বলেন, তাঁর সন্তানরা পড়াশোনা করছে এবং তাদের এই পেশায় আনতে চান না।

বিজ্ঞাপন

তবে সার্কাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন লিজা। সরকারি সহায়তা, নিয়মিত অনুমতি এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

একসময় সার্কাসের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল বাঘ, ভালুকসহ বিভিন্ন প্রাণীর খেলা। এসব প্রদর্শনী দেখতে মেলার মাঠে ভিড় জমাতেন দর্শকরা। তবে আইন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে এখন এসব প্রদর্শনী অনেকটাই বন্ধ।

সার্কাসসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যপ্রাণীর প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে অনেক পুরোনো খেলাও হারিয়ে গেছে। এতে সার্কাসের খেলার বৈচিত্র্য কমেছে এবং দর্শক আকর্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে সার্কাসশিল্পীরা মনে করেন, সার্কাসকে যাত্রা বা পুতুলনাচের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। এটি মূলত শারীরিক দক্ষতা, কসরত ও নৈপুণ্যনির্ভর একটি বিনোদন, যা পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে উপভোগ করতে পারেন।

দ্য লায়ন সার্কাসের ইতিহাস ১২০ বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে বিনোদন দিয়ে আসছে দলটি। কিন্তু দীর্ঘ ঐতিহ্য ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্পীদের দাবি, তাঁরা খুব বেশি কিছু চান না। নিয়ম মেনে সার্কাস পরিচালনার সুযোগ, মেলার সঙ্গে সমন্বয় করে বিনোদনের অনুমতি এবং সরকারি সহযোগিতা পেলেই তাঁরা আবার নিয়মিত মাঠে ফিরতে চান।

বিজ্ঞাপন

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, সার্কাস মালিকরা সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।

সার্কাসের তাঁবুতে এখনো আলো জ্বলে, বাজে ঢোল। খেলোয়াড়েরা প্রস্তুত থাকেন তাঁদের কসরত দেখাতে। কিন্তু দর্শকের চাহিদা, অনুমতির জটিলতা ও অনিশ্চিত আয়ের কারণে সেই আলো ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। শিল্পীদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একদিন হয়তো মেলার মাঠে সার্কাসের তাঁবু থাকলেও সেখানে দেখা যাবে না সেই পুরোনো খেলা, শোনা যাবে না কসরতের উচ্ছ্বাস।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD